বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে দুর্যোগের কালো মেঘ!



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
২০২২ সালের শুরু থেকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে দুর্যোগের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে

২০২২ সালের শুরু থেকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে দুর্যোগের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে

  • Font increase
  • Font Decrease

২০২২ সালের শুরু থেকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে দুর্যোগের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে, যার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক, সামরিক ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বহুমুখী কার্যকারণ।

প্রথম থেকেই চলমান বৈশ্বিক মহামারি করোনার থাবা অনেককিছুর মতোই অর্থনীতিতেও হানা দিয়ে চলেছে। বেড়েছে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং কমেছে উৎপাদন। করোনার মধ্যেই রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনে আক্রমণ বিশ্বব্যাপীই খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহকে ভঙ্গুর করেছে। পাশাপাশি, জলবায়ুর পরিবর্তনে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে অর্থনীতির মেরুদণ্ডে পৌনঃপুনিক আঘাতের নানা ক্ষতিকর প্রতিফল ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। যার প্রভাবে পৃথিবীর দেশে দেশে বাজার ব্যবস্থা ও ভোক্তাদের জীবনে তীব্র ও সঙ্কটজনক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদি উন্নতির সম্ভাবনা কমে এসেছে, জ্বালানি ও অন্যান্য শক্তির দাম বেড়েছে, বাণিজ্য-সাম্য নেতিবাচকতার দিকে ঢলেছে, ফিসক্যাল ব্যালান্স (রাজস্বের সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের তুলনামূলক হিসাব) উচ্ছন্নে গিয়েছে, প্রায় প্রতিটি দেশেই টাকার মূল্যমান কমেছে। সর্বপরি বাজারে এক রকমের শঙ্কিত অবস্থায় বিরাজ করছে এবং ভোক্তারা মূল্যবৃদ্ধির আঁচ খুব ভাল করেই অনুভব করছেন।

আন্তর্জাতিক পরিসরে যুদ্ধাক্রান্ত শরণার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধিজনিত চাপ ছাড়াও বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে (যেখানে পৃথিবীর এক-ষষ্ঠাংশ মানুষ বাস করেন) দরিদ্রতর দেশগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর বলপূর্বক বা জীবনবাজি রেখে অনুপ্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে, চীনের উত্থানের ফলে ক্ষমতাবিন্দুর স্থানাঙ্ক পরিবর্তনেও অর্থনীতির গতি ঘুরে গিয়েছে। ইউরোপ নয়, বিশ্বের ক্ষমতা ও আর্থিক ভরকেন্দ্র এখন ইন্দো-এশিয়া অঞ্চল। পৃথিবী পূর্বতন শক্তিসাম্যকে ঝেড়ে ফেলে নতুন কোনও ব্যবস্থার জন্ম দেওয়ার প্রাক্কালে 'প্রসববেদনা কাল' অতিক্রম করছে।

এইসব রাজনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত পালাবদলকে আরও উতপ্ত করছে জৈব-সঙ্কটের ক্রমপ্রবাহ— ম্যাড কাউ ডিজিজ, সার্স, বার্ড ফ্লু, কোভিড-১৯ এবং নবাগত মাঙ্কি পক্সের মতো অতিমারি বা মহামারি।  ফলে স্বাভাবিকভাবেই পণ্য  উৎপাদন ও পরিবহণ এবং গণগতিশীলতা ও গণপর্যটন বিপর্যস্ত হয়েছে। এহেন স্থবিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকাকে শ্লথ কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে স্থবির করে দিচ্ছে।

আরেকটি বিপদ পুরো জগতকেই অলক্ষ্যে গ্রাস করতে চলেছে, তা হলো বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো বিষয়। ক্রনিক রোগের মতো তা সামগ্রিক শক্তি উৎপাদন, পরিবহণ ও ব্যবস্থাপনাকে  আকস্মিক বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে আর মানবজীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে প্রচণ্ড ধ্বস সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্বের বা কোনও কোনও দেশের আর্থিক মন্দা বৈশ্বিক প্রবাহের বাইরের বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনামাত্র নয়। নয় কোনও সস্তা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের বিষয়। হয়তো কোনও কোনও দেশের সুশাসনের ক্ষয়, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত আর্থিক মন্দাকে ত্বরান্বিত ও প্রকটিত করছে। তথাপি বিপদের কেন্দ্রবিন্দু একাধিক ও বৈশ্বিক, এটাই বাস্তবতা।

ফলে বৈশ্বিক পদক্ষেপের সম্মিলিত উদ্যোগ আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলার প্রধান অবলম্বন। তাছাড়া, বিভিন্ন দেশ বিপদের আঁচ আগাম টের পেয়ে ব্যয় সঙ্কোচন, দুর্নীতি ও সিস্টেম লস কমানো, বাজার মনিটরিং-এর মাধ্যমে মজুদদারি ও সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে ক্রমবর্ধমান সঙ্কটের প্রকোপ কমাতে সচেষ্ট হচ্ছে।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার সীমিতকরণ ও বিকল্প দ্রব্যসামগ্রীর সন্ধান চলছে বিশ্বের দেশে দেশে।  কঠিন এক আর্থিক দুর্গতির করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে রাষ্ট্র ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতন পদক্ষেপের নানা মাত্রাও উন্মোচিত হচ্ছে।

অতএব, বৈশ্বিক ও জাতীয় পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতির প্রতি তীক্ষ্ণ নজরদারি, নিজস্ব বাজারব্যবস্থার জন্য টেকসই নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন, বিকল্পের সন্ধান করা সকল রাষ্ট্রের জন্যেই বর্তমানে এক জরুরি কর্তব্য রূপে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিতর্ক ও পারস্পরিক দোষারোপের মাধ্যমে কোনও দেশের পক্ষেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিগন্তে ঘনায়মান দুর্যোগের কালো মেঘের প্রবল বিপদ থেকে নিষ্কৃতি সম্ভব হবে না।

ড.মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম।

বিনষ্ট সম্বল ও সীমাহীন কষ্ট বানভাসীদের



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
বিনষ্ট সম্বল ও সীমাহীন কষ্ট বানভাসীদের

বিনষ্ট সম্বল ও সীমাহীন কষ্ট বানভাসীদের

  • Font increase
  • Font Decrease

এ বছর বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ইতোমধ্যে পর পর তিনবার বন্যা ও পাহাড়ি ঢল হয়ে গেল। অল্প সময়ের ব্যবধানে এত ঘন ঘন বন্যা মোকাবিলা করার জন্য সেখানকার মানুষ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বিশেষ করে তৃতীয়বারের বন্যার পানির প্রবল স্রোত ও আক্রোশ এত বেশী ছিল যে তা দেখে অনেকে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। জীবন বাঁচাতে ডুবে যাওয়া বসতবাড়ি ও সহায়-সম্বল ছেড়ে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে ভেলা, নৌকা, ট্রলার, দূরের কোন উঁচু দালান, রাস্তার ধারে অথবা আশ্রয় শিবিরে।

অন্যান্যবার বন্যা হলে দু’তিনদিন পরে পানি নেমে যেত। তখন বন্যার্তরা নিজ নিজ বসতভিটায় ফিরে গিয়ে নতুনভাবে গুছিয়ে নিয়ে জীবন-জীবিকা শুরু করতো। কিন্তু এবারের বন্যার তান্ডব, বিস্তার ও স্থায়ীত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকায় পানি নামতে থাকর গতি খুবই ধীর প্রকৃতির। বন্যা শুরু হবার সাত-দশদিন পরেও কোথাও কোথাও পানি সরে যাবার লক্ষণ দেখা যায়নি। গ্রামাঞ্চলে কারো কারো বসতবাড়ির ঘরের চালের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল প্রবল স্রোত। সবকিছু ভেঙে-চুরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অনেকের। পানি নামার পর নিজেদের বাড়িঘরের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকে।  প্রলয়ঙ্কারী বন্যার পর এলাকায় ফিরে বিধ্বস্ত ও শূণ্য ভিটা দেখে অনেকে ডুকরে কেঁদে উঠছেন। সামনের দিনগুলোতে কি করবেন, কি খাবেন, সন্তানদের নিয়ে কিভাবে দিনাতিপাত করবেন-সেই চিন্তায় অধীর হয়ে উঠছেন তারা।

বন্যায় কি নষ্ট হয়নি তাদের? নষ্ট হয়ে যাওয়া বস্তভিটা ও সহায় সম্বলের মধ্যে চারদিকে শুধু কষ্ট খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। সিলেটে ৮০ ভাগ এলাকা এবং সুনামগঞ্জে ৯০ ভাগ এলাকা সাত থেকে ১০ দিন যাবত পানির নিচে ডুবে ছিল। এর ফলে যে চরম ক্ষতি হয়েছে তার সেটা মানুষ আগে মোটেও কল্পনা করেনি। বন্যার পর চারদিকে শুধু হাহাকার শব্দ যেন সেখানকার গৃহহারাদের কানে প্রতিধ্বনিত হয়ে পরিহাস করছে।

বিধ্বস্ত ভিটায় ফিরে প্রথমেই দেখছেন, তাদের খাবার পানির উৎসটি অকেজো বা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সুপেয় পানির উৎস টিউবওয়েলটি কাদা, বালুতে ডুবে নষ্ট। যাদের বাড়িতে পাইপলাইনের পানি সরবরাহ ছিল সেগুলোতে বন্যার দূষিত পানি ঢুকে গেছে লিকেজ হয়েছে অথবা ভেঙ্গে গেছে। জলাবদ্ধতায় সেগুলো মেরামত বা নতুন করে সংযোজন করার অবস্থায় নেই অনেক দুর্গত পরিবার। দূরবর্তী স্থান থেকে অতিকষ্টে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে অনেককে। বন্যার আগে অনেকে পাহাড়ি ঝর্ণার পরিষ্কার পানি ব্যবহার করতেন। এখন জমে থাকা বন্যার ময়লা পানি নিত্যসংগী হয়ে পড়েছে। এসব নোংরা পানি দিয়ে দৈনন্দিন কাজকর্ম সারানোর ফলে পেটের অসুখ শুরু হয়েছে অনেক পরিবারে। এভাবে ডায়রীয়া, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জ¦র, আমাশয় ও কলেরার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে সেটা অনেক ভয়ংকর হতে পারে। রিমোট পাহাড়ি এলাকায় খাবার পানির উৎস ঠিকভাবে কাজ না করলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এর পরের বড় কষ্ট হলো দ্রুত যোগাযোগ করার উপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ চালু হলেও রাস্তাগুলো ভেঙে যাওয়ায় চলাচলের গতি থমকে গেছে উপদ্রুত এলাকায়। মূল রাস্তায় তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি সংস্কারের মাধ্যমে কিছু গর্ত মেরামত করে গাড়ি চলাচল করলেও পাড়া-মহল্লা ও বিশেষ করে গ্রামীণ রাস্তাগুলোর সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এখনো। সুনামগঞ্জ জেলায় আড়াই হাজার কি.মি: সড়ক নষ্ট হয়ে গেছে। দুইশতাধিক ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে ফুটো হয়ে গেছে বলে সংবাদ হয়েছে।

কিছুদুর পর পর বড় বড় গর্ত, খানা-খন্দক সৃষ্টি হওয়ায় পায়ে চলতে গিয়ে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হচ্ছে সুনামগঞ্জের ছাতক, গোয়াইনঘাট, দিরাই, শাল্লা, সিলেটের আখালিয়া, জকিগঞ্জ, নেত্রকোণার কেন্দুয়া, নিকলী এমনকি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি, চিলমারী, জোড়গাছবাজার, উলিপুরের থেতরাই প্রভৃতি এলাকার পল্লী জনপদগুলোতে। এসব এলাকার অটোরিকসাচালকরা পড়েছেন মহা বিপাকে। ভাঙ্গা-চোরা রাস্তার কারণে তাদের দৈনিক আয় কমে যাওয়ায় পরিবারের ভরণ-পোষণ নিয়ে চরম কষ্টে রয়েছেন তারা। জরুরি পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে।

সিলেট এলাকায় এমনিতেই শাক-সব্জির দাম বেশী। বন্যায় সব্জির আবাদ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবং রাস্তা নষ্ট থাকায় কোন একান এলাকায় শাক-সব্জির চরম আকাল দেখা দিয়েছে। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এক হিসেব মতে, মতে শুধু সিলেট অঞ্চলে আট কোটি টাকার মাছের পোনা ভেসে গেছে। আমন ধানের বীজতলা ও চারা নষ্ট হওয়ায় এবার আমন ধানের ফলন হ্রাস পাবার ব্যাপক আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বন্যার পানি সরে যাবার সাথে সাথে দুর্গম পাহড়ি ও পল্লী অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা কাজের উপায় হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছেন। তাদের অনেকের সামান্য জমি। সেখানে বন্যায় পলিমাটি পড়ার নামে জমেছে বালুর পাহাড়। যেসব প্রান্তিক কৃষক  ও বেকার যুবকরা ঋণের টাকায় অন্যের পুকুর লিজ নিয়েছেন অথবা জমিতে বর্গা আবাদ শুরু করেছেন তারা ঋণের কিস্তি শোধ দেয়ার সময় বিপদের আশঙ্কা করছেন। ব্যাংকের ঋণ তারা শোধ দিবেন কীভাবে? এ নিয়ে তাদের চরম মানসিক যাতনা শুরু হয়েছে।

বসতভিটার সাথে যাদের যাদের ঘর-বড়ি কিছু অবশিষ্ট আছে তাদের আসবাবপত্র, তৈজষপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশী। উপদ্রুত এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এসব এলাকায় এবছর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠান নিয়ে এখনো চরম বিপাকে রয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

দেশের পাহাড়ের পাদদেশে পুন:পুন: বন্যায় মানুষের মন ভেঙ্গে গেছে। বিশেষ করে ভয়ংকর আগ্রাসী বন্যার রূপ তাদের কাছে একবারেই অনাকাঙ্খিত ছিল। তাই এটা মোকাবেলা করতে গিয়ে তারা চরম অসহায় ও ভীত হয়ে পড়েছে। এবারের বন্যায় আমাদের দেশে  জুন ২৬, ২০২২ পর্যন্ত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভারতের আসামে মৃত্যু হয়েছে ১৬৭ জনের। সেখানে রেড এলার্ট জারি করা হয়েছিল। আসামে বন্যার পরভয়াবহ জলাবদ্ধতা শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে ভয়ের আরেকটি কারণ হলো- চেরাপুঞ্জিতে এবছর আরো বেশী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাষ রয়েছে। সামনে ঘোর বর্ষাকাল। সেসময় চেরাপুঞ্জিতে আবারো অতিবৃষ্টি হলে সিলেটে ভরা বর্ষা মৌসুমে আবারো পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য আমাদের যথাযথ প্রস্তুতি কই?

দুর্নীতির পর দুর্যোগ আমাদের সব অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্থ করে তোলে। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের আয় বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান তৈরিতে প্রদান ভূমিকা রাখে। দুর্যোগের পর ত্রাণ চুরির মহোৎসব আমাদের সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য সৃষ্টির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তাই এদিকটিতে সতর্ক হওয়া জরুরি।

ঘরহারা বন্যার্তদেরকে ত্রাণ নয়- সেনাবাহিনীর মাধ্যমে গৃহনির্মাণ সামগ্রী কিনে অথবা ঘর তুলে দিন। ফসলহারা প্রান্তিক কৃষকদেরকে বাঁচাতে ঋণ মওকুফ করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দান করুন। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী বিনামূল্যে চিকিৎসা, বই-পুস্তক, পুষ্টিকর শিশুখাদ্য প্রদান করুন। উপদ্রুত এলাকায় বন্যার পানি না সরতেই দেশে করোনার চতুর্থ ধাপের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। ডায়রীয়া, কলেরা ও অন্যান্য অসুখের জন্য জরুরি চিকিৎসা জোরদার করার পাশাপাশি করোনার ওমিক্রণ ধরণের সংক্রমণ ঠেকাতে আশু তৎপরতা জোরদার করুন। আমাদের আনন্দের মাঝে সম্প্রতি সম্বলহারা ও সীমাহীন কষ্টের মধ্যে থাকা বানভাসীরা কেমন আছে তা একটু স্মরণ করা উচিত। এই দুঃসময়ে তাদের জন্য প্রাণ খুলে সাহায্যের হাত প্রসারিত করা সবার নৈতিক দায়িত্ব বটে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

 

;

দখিনের আনন্দ-দুয়ারে গর্বিত উত্তর-পূর্বের বানভাসী

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার



কবির য়াহমদ
দখিনের আনন্দ-দুয়ারে গর্বিত উত্তর-পূর্বের বানভাসী

দখিনের আনন্দ-দুয়ারে গর্বিত উত্তর-পূর্বের বানভাসী

  • Font increase
  • Font Decrease

দখিনের আনন্দ-দুয়ার পদ্মা সেতু নিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আংশিক জন-ভাবনার কথা মাথায় আসলো। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ বর্তমানে জীবনের জন্যে প্রকৃতির সঙ্গে লড়ছে। প্রবল ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় আক্রান্ত। পাতে নেই ভাত, এমনকি পাতও নেই অনেকের, ঘর আছে তবে আশ্রয় নেই। বানের জল বের করে দিয়েছে অনেককেই। কারো ঘরে হাঁটুসমান পানি, কারো বা তারচেয়ে বেশি অথবা কম। আছে সাপ-জোঁকের ভয়, উনুন চড়ানোর জো নেই; হয় সেখানে পানি নয়তো ঘরে নেই যথেষ্ট উপকরণ। লড়াই টিকে থাকার, বেঁচে থাকার। এমন অবস্থায় থাকা মানুষের মনে পদ্মা সেতুর প্রভাব কতখানি সে আগ্রহ আমার। তার ওপর আছে এইসময়ে একদিকে যেমন বিশাল আয়োজন, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিরোধিতা। এ বিরোধিতা অবশ্য সেতু নির্মাণ ভাবনা থেকে শুরু করে নির্মাণ কাজ সমাধার সকল স্তরে। কেবল কি বিরোধিতা? না, ওখানে ছিল নির্মাণে বাধার বিবিধ পরিকল্পনা, নীলনকশা!

বানভাসীদের ক’জনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী প্রতিক্রিয়া তাদের। স্বাভাবিক মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নৈরাশ্যবাদ ভর করেছে যাদের তাদের অনেকেই নিজেদের হাল নিয়ে উদ্বিগ্ন, করতলে মৃত্যু নিয়ে নিয়ে যারা বাঁচার স্বপ্ন দেখে তাদের চেহারায় খুশিভাব আছে, তারা আনন্দিত। পঞ্চাশোর্ধ মুহিত মিয়া বন্যায় ঘর ছাড়া। পাঁচজনের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম। কৃষিনির্ভর, কোরবানি উপলক্ষে অন্যের সহায়তা কয়েকটি গরু কিনেছেন। বন্যায় গোয়ালে পানি উঠে গেছে, ঘরেও হাঁটুসমান পানি, পাশের একটি বাড়িতে গরুগুলো নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তার কথায়, ‘এভাবেই বাঁচা লাগে। একটার লাগি আরেকটা আটকি থাকে না (একটার জন্যে আরেকটা আটকে থাকে না)। পদ্মা সেতু অইছে হুনছি, আমরার পানির লাগি সেতু আটকি যাইবো কেনে (আমাদের বন্যার জন্যে সেতু আটকে যাবে কেন)?’ একই জায়গায় আশ্রিত আরেকজনের সঙ্গে কথা। তার জবাব—‘আমরার কিতা অইতো, পানি কোনদিন নামতো (আমাদের কী হবে, পানি কবে নামবে)?’ এলাকার একটা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত এক নারীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম, বললেন না কিছু। গ্রামে এমনই হয় আসলে!

উত্তর-পূর্বের ভাবনাগুলো জড়ো করতে চাইলাম। কয়েকজনের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তায় মনে হলো মন্তব্য প্রকাশিত হয় মূলত প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের ধরনেই। প্রশ্নকর্তা যে ইঙ্গিতে প্রশ্ন করবেন উত্তর আসবে ও ইঙ্গিতেই। সাধারণের মধ্যে কথার মারপ্যাঁচ নেই। যেভাবে কথাগুলো কানে যায় সেভাবেই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। পদ্মা সেতু নিয়ে এটা যেমন, তেমনি অন্য যেকোনো বিষয়েই। যখন আপনি তুলনা করতে যাবেন তখন কারো কারো আচমকা ব্যাখ্যাহীন কষ্ট ঝরবে। এটা ছোট্ট কোন বিষয় থেকে শুরু করে যেকোনো বড় বিষয়ের সকল পর্যায়েই। উদাহরণ মেলে এইসময়ে একই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত অনেকের মাঝে। খাবার কার পাতে বেশি পড়ল, কার পাতে কম—এসব নিয়েও মানুষ ভাবে, প্রতিক্রিয়া দেখায়। আর এটা যখন বন্যায় অসহায় হয়ে পড়া মানুষদের শোনানো হয় ‘তুমি বঞ্চিত’ তখন তারা হতাশ হয়, কষ্ট পায়। এটাকে ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং’ বললে কি অত্যুক্তি হয়? মনে হয় না!

এই ক’দিন অসহায় হয়ে পড়া মানুষদের ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের’ চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের কানের কাছে বারবার বলা হচ্ছে—‘দেশ যখন বন্যায় আক্রান্ত তখন সরকার পদ্মা সেতু নিয়ে ব্যস্ত’। টেলিভিশনে এসে, বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে একই কথা বারবার বলা হয়েছে, বলা হচ্ছে। একই কথাগুলোয় বানভাসীদের অনেকেই অপ্রাসঙ্গিক হলেও কষ্ট পেয়েছে। কষ্ট পাওয়াটাই স্বাভাবিক তাদের। বিপদে পড়া মানুষেরা সবসময়ই নিজেদের বঞ্চিত ভাবে, বুকের গভীরে জমাট হয়ে পড়া হাহাকারগুলো চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চায়। ব্যক্তিগত কষ্টগুলোয় যেখানে আশাবাদের বাণী শুনিয়ে সারিয়ে তোলার চেষ্টার কথা আমাদের তখন সেখানে তাদেরকে কষ্টে আগুন দেওয়ার চেষ্টা অনুচিত। যেখানে অভয় বাণী বাঁচার প্রেরণাদায়ী হয় সেখানে কেন উদ্দেশ্যমূলক হতাশার ঝাঁঝ? এটা কি অমানবিক নয়? 

আমরা দেখেছি, পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রতি ধাপে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির বিরোধিতা। এই সেতু নিয়ে দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যগুলো এখনও বিস্মৃত হয়নি দেশের মানুষ। ‘সরকার সেতু বানাতে পারবে না, জোড়াতালি দিয়ে সেতু বানালেও সে সেতুতে কেউ উঠবেন না’—এমনও বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। বিএনপির বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে থাকে আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা প্রায়ই কথা বলেন এসব নিয়ে, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রায়ই অভিযোগ করে থাকেন। এই অভিযোগগুলোর বিপরীতে বিএনপি কখনই নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করেনি। তারা কেবলই সেতুর বিরোধিতা করে গেছে, আগেও করেছে, এখনও করছে। সেতু নির্মাণ কাজ সম্পন্নের পর উদ্বোধনের আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেও গ্রহণ করেনি বলেও বক্তব্য দিয়েছে। সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যায়নি বিএনপির প্রতিনিধিদের কেউ।

বিরোধিতার এই অবাক ধারাবাহিকতা কেন? আওয়ামী লীগ সরকার পদ্মা সেতুর মতো বড় স্থাপনা বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে করার সাফল্য দেখিয়েছে বলে; নাকি বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অভিযোগের সেই ‘ষড়যন্ত্র’ সফল হয়নি বলে? শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্ত, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের অর্থ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সাফল্যে যে পদ্মা সেতু তার কৃতিত্ব স্বাভাবিকভাবেই নেবে আওয়ামী লীগ। তবে শেষ পর্যন্ত এটা বাংলাদেশেরই সাফল্য। বাংলাদেশের এই সাফল্যে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। দেশে-দেশে পদ্মা সেতু যেখানে বাংলাদেশের অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সেখানে রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে এই সংকীর্ণতা থেকে কেন বের হতে পারছে না বিএনপি?

ঘটনা-দুর্ঘটনা, হাসি-কান্না, দুর্যোগ-সুযোগসহ অনেক কিছুই আসবে-যাবে।  এটাই মানুষের জীবন। অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হয় মানুষকে। রাষ্ট্র সমষ্টি মানুষের। এক অঞ্চলের মানুষের দুর্যোগে অন্য অঞ্চল ভারাক্রান্ত হলেও থেমে থাকে না, থাকা সম্ভবও না। একদিকে সিলেট অঞ্চলে আমরা যখন বন্যায় ভাসছি অন্যদিকে দখিনে খুলেছে আনন্দ-দুয়ার। আজ (২৫ জুন ২০২২) আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতু-সংগ্রামী তিনি। কারণ কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু থেকে তাদের প্রতিশ্রুত সহায়তা ফিরিয়ে নিয়ে কলঙ্ক লেপ্টে দিতে চেয়েছিল, তখন স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন পদ্মা সেতু করেই ছাড়ব, এবং সেটা নিজস্ব অর্থায়নে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন—‘আমরাও পারি’। শেখ হাসিনা পেরেছিলেন বলে বাংলাদেশ পেরেছে। পদ্মা সেতু যেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘দুর্মর’ কবিতা; ‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ ‘পূর্বাভাস গ্রন্থে সুকান্তের পূর্বাভাস—‘এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে/ সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন দান/ দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে/ দাউ দাউ করে বাংলাদেশের প্রাণ।’

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বানভাসী হয়েও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ানো পদ্মা সেতুর উদ্বোধনে আমরা গর্বিত। আমাদের অভিনন্দন গ্রহণ করুন প্রধানমন্ত্রী!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

পদ্মাসেতু: দূরদর্শী শেখ হাসিনা ও একজন নিভৃতচারী অর্থনীতিবিদ



ড. মতিউর রহমান
পদ্মাসেতু: দূরদর্শী শেখ হাসিনা ও একজন নিভৃততচারী অর্থনীতিবিদ

পদ্মাসেতু: দূরদর্শী শেখ হাসিনা ও একজন নিভৃততচারী অর্থনীতিবিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি  বেশকিছু মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করেন। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো ‘পদ্মাসেতু নির্মাণ’ প্রকল্প। এটি বাংলাদেশিদের জন্য একটি স্বপ্ন হিসেবে চিত্রিত বা রূপায়িত হয়েছিল। আর এই স্বপ্নের রূপকার ছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফলে এবং তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক যখন ২৯ জুন ২০১২ সালে পদ্মাসেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করে এবং অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীও সরে দাঁড়ায় তখন ওই বছরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নিমার্ণের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃঢ় মনোভাবের বাস্তব রূপায়নই আজকের স্বপ্নের পদ্মাসেতু। আমদের মত আমজনতার এটা জানা নেই যে, তিনি কিসের ভিত্তিতে, কোন ভরসায় এরকম একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন।

তবে এই ঘটনার পরপরই আমরা দেখতে পেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর মানবিক উন্নয়ন দর্শনের একজন নিঃস্বার্থ ছাত্র ও স্বনামধন্য গবেষক অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত পদ্মাসেতু নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী ও প্রায়োগিক একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন যা ওইসময় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। বৃহৎ গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ছিল “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ”। গবেষণাপত্রটি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কর্তৃক আয়োজিত “নিজ অর্থে পদ্মাসেতু” শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ হিসেবে ১৯ জুলাই ২০১২ সালে ড. আবুল বারকাত কর্তৃক পঠিত হয়। ওই গবেষণাপত্রেই তিনি উল্লেখ করেন “বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল অনৈতিক ও মহা অন্যায় তবে তা বাংলাদেশের জন্য এক মহা আশীর্বাদ (blessing  in disguise)। ১৯৭২-৭৩ এর বাংলাদেশ অর্থনীতি আর ২০১২-র অর্থনীতি এক কথা নয়। এখন আমাদের অর্থনীতি অনেক গুণ বেশি শক্তিশালী; জনগণ অনেকগুণ বেশি আত্মশক্তি-আত্মমর্যাদা সম্পন্ন। পদ্মা সেতু নির্মাণে জনগণ এখন অনেকগুণ বেশি ত্যাগ স্বীকারে সর্বাত্মক প্রস্তুত। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি ও তা সুসংহতকরণের এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।”

২০১২ সালের ওই গবেষণাপত্রে তিনি দেখান যে “ চার বছরেই পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব এবং এর জন্য ব্যয় হবে আনুমানিক ২৪,০০০ কোটি টাকা। আর ঠিক একই সময়ে অর্থাৎ ৪ বছর সময়কালে ১৪টি বিভিন্ন উৎস থেকে সম্ভাব্য অর্থ সংস্থান হতে পারে ৯৮,৮২৫ কোটি টাকা সেহেতু পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ পরিকল্পিতভাবে এমুহূর্তেই শুরু করা সম্ভব। অর্থ সংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দিতে হবে সুদ বিহীন উৎসসমূহে― যেসব উৎস থেকে সম্ভাব্য আহরণ হতে পারে মোট ৪৯,১৫০ কোটি টাকা অর্থাৎ ২টি পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ।”

তিনি আরো উল্লেখ করেন, “সেই সাথে জোর দিতে হবে নিজস্ব অর্থায়নের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ সংশ্লিষ্ট খাতসমূহে; এ ক্ষেত্রে করণীয় হবে নিম্নরূপ: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা; প্রবাসীদের প্রেরিত হুন্ডিকৃত অর্থ উত্তরোত্তর অধিক হারে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা; পদ্মা সেতু বন্ড (৮ থেকে ৩০ বছর মেয়াদী), সার্বভৌম বন্ড ও পদ্মা সেতু আইপিওতে প্রবাসী-বিদেশিদের বিনিয়োগে আগ্রহী করা; টাকার অঙ্কের উদ্বৃত্ত অর্থ (৪ বছরে মোট ৭৪,২২৫ কোটি টাকা) উৎপাদনশীল বিনিয়োগ করে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করা।”

তিনি বলেন, “করণীয় বিষয়াদির মধ্যে গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে: (১) ৩টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন। সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ও বাস্তবায়ন সমন্বয়কারী কমিটি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পদ্মা সেতু ইনটিগ্রিটি কমিটি, আর সাথে থাকবে অর্থায়ন-অর্থসংস্থান কমিটি এবং কারিগরী-প্রযুক্তি কমিটি, (২) “পদ্মা সেতু পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী” গঠন করে তার মাধ্যমে বাজারে আইপিও ছাড়া, (৩) পদ্মা সেতুসহ বৃহৎ অবকাঠামোর জন্য নির্মাণ সামগ্রী (যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল) উৎপাদন নিমিত্ত শিল্প স্থাপনে পদক্ষেপ নেয়া, (৪) সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের (দেশে-বিদেশে অবস্থানরত) হালনাগাদ তালিকা প্রণয়ন ও সংরক্ষণসহ জরুরিভিত্তিতে এবং নিয়মিত তাদের পরামর্শ গ্রহণের জন্য জীবন্ত-রিয়েল টাইম ওয়েব সাইট চালু রাখা, (৫) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ÒFriends of Padma Bridge, Bangladesh” চেতনায় উদ্বুদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলা, (৬) গণ অবহিতকরণ কার্যক্রমসহ সংশ্লিষ্ট প্রচার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।”

হিসেবপত্তর করে তিনি আরো দেখান যে “পদ্মা সেতু নির্মাণের ৩০ বছরের মধ্যেই নির্মাণ ব্যয় উঠে আসবে; ১০ম বছর থেকে যেহেতু ঘাটতি থাকবে না সেহেতু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পদ্মা সেতুর জন্য আর বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন হবে না; সেতু চালু হবার ৪০-তম বছরে নিট ক্যাশ ফ্লো ১০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে আর ১০০তম বর্ষে তা ছাড়িয়ে যাবে ২,০০,০০০ কোটি টাকা; উন্নত কানেকটিভিটি সমগ্র অর্থনীতির (শুধু দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের নয়) চেহারা আমূল পাল্টে দেবে। সুতরাং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বিনির্মাণ-বিষয়টি হতে পারে উন্নয়ন আন্দোলনের (development as movement) বিশ্ব নন্দিত মডেল Made in Bangladesh”।

বাঙালির অহংকার ও গর্ব―স্বপ্নের পদ্মাসেতুর শুভ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আজ ২৫ জুন। এ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে উতসবের আমেজ। ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংক পুরোপুরি উদ্দেশ্যমূলকভাবে পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি যখন বাতিল ঘোষণা করল, যার ফলে বিশ্বব্যাপী দেশ-জাতি-সরকারের ভাবমূর্তির অপরিসীম ক্ষতি হলো; আর অন্যদিকে, সামনে ২০১৪ সালের নির্ধারিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন―ঠিক এ ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব” শীর্ষক গভীর গবেষণালব্ধ লিখিত দলিল নিয়ে জাতির সামনে হাজির হয়েছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি,‘গণমানুষের অর্থনীতিবিদ’ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। আর সামগ্রিকভাবে প্রতিকূল এক জটিল অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কালক্ষেপণ না করে ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে “নিজ অর্থে পদ্মা সেতু” শীর্ষক জাতীয় সেমিনার আয়োজন করে।

উক্ত জাতীয় সেমিনারে অধ্যাপক আবুল বারকাত “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ” শিরোনামে তার সৃজনশীল ও বাস্তবধর্মী গবেষণাকর্ম উত্থাপন করেন। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ যে সম্ভব এ দেশে এ কথা বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্লাটফর্মে তিনিই প্রথম নৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রায়োগিক যুক্তি দিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণপূর্বক উত্থাপন করেন।

অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ছাড়া কেউ তখন বিস্তারিত হিসেবপত্তরসহ উল্লেখ করেননি যে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্ভব। একমাত্র তিনিই উল্লেখ করেছেন, বিশ্বব্যাংক ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে বলে ঋণ চুক্তি বাতিল করে। এটিই ছিল বিশ্বব্যাংকের সাথে একমাত্র মেগা প্রকল্পের চুক্তি। যা চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাতিল করা হয়। কারণটি ছিল খুবই সোজা―মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংক ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে আর ক্ষমতায় দেখতে চাইনি। এটি তাদের দ্বারা গতানুগতিক চর্চা করা ''Regime Change'' ফর্মূলা।

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পদ্মাসেতু এ দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবার ক্ষেত্রে ও জাতীয় একতা বৃদ্ধিতে এই সেতু মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। এক্ষেত্রে ড. বারকাত কর্তৃক “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্যের শ্রেষ্ঠ সুযোগ”, গবেষণা কর্মটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। 

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা ও গবেষণায় নীরবে, নিভৃতে ড. বারকাত যে অবদান রেখেছেন ও রেখে যাচ্ছেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। এ পর্যন্ত তিনি যত গবেষণাকর্ম করেছেন সেসবের কয়েকটি মাইলফলক বা দিকনির্দেশক হিসেবে যেমন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত হয়েছে তেমনি এদেশের উন্নয়নে তথা নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন শীর্ষক গবেষণাটিও ড. বারকাতের একটি দিকনির্দেশক ও মাইলফলক গবেষণা।

২০১২ সালে গবেষিত ও প্রকাশিত ড. আবুল বারকাতের ওই গবেষণা পুস্তিকাটি একটি নতুন সংযোজিত অধ্যায়সহ ২০২১ সালে গ্রন্থাকারে দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির শিরোনাম “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ‒ ২০১২ সালে গবেষণায় প্রমাণিত‒ ২০২১ সালে দৃশ্যমান বাস্তবতা”। গ্রন্থটির দ্বিতীয় প্রকাশ সম্পর্কে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তৎকালীন কার্যনির্বাহক কমিটি যে ভূমিকা-বক্তব্য প্রদান করেছেন তা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করি। “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব” দেশ ও জাতির গৌরবান্বিত উন্নয়ন-প্রগতিতে অধ্যাপক আবুল বারকাতের এই দিকনির্দেশক গবেষণাকর্মটির জন্য পুরো জাতি দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”

পরিশেষে বলা যায় আবুল বারকাত হলেন সেই অর্থনীতিবিদ যিনি সর্বদা দেশের ও সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন; তাদের কথা বলেন, তাদের উন্নয়নে কাজ করেন। সেজন্য তিনি গণমানুষের অর্থনীতিবিদ হিসেবেও খ্যাত। তিনি অন্তরে ধারণ করে আছেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বির্নিমাণের স্বপ্ন। নিজ অর্থে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা নিয়ে তিনি নীরবে, নিভৃতে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে গবেষণা করে যে তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন সেসময় তেমনটি আর কেউ করেছিল বলে জানা নেই। তাঁর সুগভীর ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে তিনি এদেশে বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, আলোকিত ও শোভন সমাজ বির্নিমাণে কাজ করে যাচ্ছেন।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

;

শেখ হাসিনার পদ্মা জয়



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পদ্মা সেতু শুধুই কি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নত মাধ্যম হিসেবে ইতিহাসে পরিচিতি পাবে? পদ্মা সেতু একজন অনন্য অসাধারণ দেশপ্রেমিক আপোষহীন মহান নেতার কন্যার ইতিহাস। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের যোগ্য কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যার পর যার নিজ দেশে ফেরায় ছিলো নিষেধাজ্ঞা, যিনি ছোটো বোনসহ বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, পরিবারের সবাইকে হারিয়ে যিনি এক বুক হাহাকার নিয়ে পরবাসী জীবন কাটিয়েছেন-পদ্মা সেতু তার হাতে গড়া।

প্রবাসে এক রকম করে জীবন শেখ হাসিনা পার করে দিতেই পারতেন। পারতেন নিরাপদ জীবন বেছে নিতে। কিন্তু তিনি বাংলার মানুষের জন্য সব কিছু উপেক্ষা করে ফিরে আসেন।

এই ফিরে আসা তার জন্য কতটুকু কঠিন ছিল, তা শুধু তিনিই জানেন। ৭১ এর সেই ঘাতক আর ৭৫ এর ঘাতকদের তখন প্রকাশ্য আঁতাত। সব জায়গায় বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। রাষ্ট্র তখন বঙ্গবন্ধুর ৩০ লাখ শহীদের রক্তের পতাকাকে অবমাননা করে রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছে। রাষ্ট্র জয় বাংলার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা থেকে অনাক্রম্যতা বা শাস্তি এড়াবার ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ আইন প্রণয়ন করে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। জিয়াউর রহমানসহ আরও কিছু দেশবিরোধী পাকিস্তানি দোসর ঘৃণ্য চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করে! সেই দেশে তার কন্যারা নিষিদ্ধ!

পদ্মা সেকিন্তু ‘বাপের বেটি’, ‘শেখের বেটি’ সকল অবরোধ, সকল রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে বৃষ্টি মুখর এক বিকেলে (১৯৮১ সালের ১৭ মে) বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন।

সেদিন আকাশ বাতাস শোঁকে অশ্রু বিসর্জন করেছিলো। আর তিনি দেশের মাটি ছুঁয়ে বলেছিলেন, আমি সব হারিয়ে আপনাদের জন্য ফিরে এসেছি।

আজ ২০২২ । ১৯৮১ থেকে এই সময় টুকুর ইতিহাস তার। তিনি সৃষ্টি করেছেন এই নতুন ইতিহাস। ছবির মতো করে এঁকেছেন বাংলাদেশকে। একটু একটু করে দেশকে নিয়ে গেছেন হিমালয়ের চেয়েও উচ্চতর আসনে। উন্নয়নশীল দেশ এবং উন্নয়নশীল মানসিকতা, আধুনিক জীবনবোধ, চিন্তা মুক্তি প্রগতি আমাদের এখনকার সময় চিত্র। আমরা জলে-স্থলে মহাকাশে উড়াই আমাদের পতাকা। স্বাধীন দুর্বার অবিচল চঞ্চল আমরা।

আমরা এখন কথা বলতে পারি, সমালোচনার টকশোর শাণিত ক্ষুরধার তরবারি রাষ্ট্রকে এখন প্রশ্ন করতে পারে, আমাদের প্রজন্ম রাজপথে নেমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি আদায় করতে পেরেছে। ইনডেমনিটি’র কালো অধ্যাদেশ গুঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে পেরেছে। আমরা ব্যবহার করি চতুর্থ/পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক।আমরা ডিজিটাল। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা মায়ের নাম দিয়ে ব্যাংক পাসপোর্ট আইডি নিয়ে নারীর ক্ষমতাকে সাদরে গ্রহণ করেছি। আমরা সাহসী হয়ে গেছি , আমাদের গৌরব আমাদের অর্জনকে আমরা বুঝতে জানতে চিনতে শিখেছি। এই দেশ এখন আর কেউ বিদেশি চক্রান্তকারীদের কাছে দিতে পারবে না।

সেই ৭৫ এর পর ১৯ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চক্রান্ত হয়েছে, আজকের প্রজন্ম আজকের রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের শিখরে। সেই শিখরে যিনি পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি শেখ হাসিনা। কিছু দেশি স্বার্থান্বেষী মানুষ যখন বিদেশিদের নিয়ে আমাদের উন্নয়নকে বাঁধা দেয়, হয়তো সেই সব কূজনরা ভেবেছিলো থমকে যাবে পথঘাট, থেমে যাবে সব প্রকল্প , কোনোদিন হবে না পদ্মা সেতু । শেখ হাসিনা মহান নেতার সন্তান। যিনি ভয় পাননি কোন কিছুকেই , ন্যায্যতার বিচারে তিনি অকুতোভয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন তিনি এদেশের যোগ্য রাষ্ট্র নায়ক, সৎ প্রধানমন্ত্রী। যিনি দেশের স্বার্থে দেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারেন, দিচ্ছেন। তিনি ১৭ মে ১৯৮১ সালে যা বলেছেন এদেশের মানুষের সেবা করতে ফিরে এসেছেন, তাই করে যাচ্ছেন।

প্রমত্ত পদ্মার বুকে সড়ক, রেলসহ এমন একটি সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে দিয়েছেন। আজ সেই স্বপ্ন পূরণের দিন। এই স্বপ্ন সম্মিলিতভাবে পুরো বাংলাদেশকে তিনি দেখিয়েছেন, এবং বলেছিলেন আমরা আমাদের টাকায় আমাদের পদ্মা সেতু বানাবো, আমাদের কোন বিদেশি টাকা লাগবেনা ।

তিনি পুরো জাতিকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের মতো এক পতাকাতলে নিয়ে এলেন। একতাই শক্তি, শেখ হাসিনায় মুক্তি।

আজ পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের ওপর পদ্মা সেতুর ইতিহাসগাঁথায় শেখ হাসিনার সাথে সাথী হয়ে হাজার বছরের রূপকথা হয়ে থাকব। সেই রূপকথার রাজকন্যা দেশের জন্য, দশের জন্য অনন্য প্রধানমন্ত্রী হয়ে বাংলাদেশকে, এদেশের মানুষকে নিয়ে যাচ্ছেন সম্মানজনক গর্বিত এক যাত্রাপথে।

আমাদের দেশ

আমাদের ভালোবাসা

আমাদের শেখ হাসিনা ।

;