বিশ্বব্যাপী শ্রীলংকার ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার তাগিদ



মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মদ (অবঃ) পি এইচ ডি  
বিশ্বব্যাপী শ্রীলংকার ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার তাগিদ

বিশ্বব্যাপী শ্রীলংকার ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার তাগিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

আজ থেকে ৪০০ বছরেরও বেশী আগে ইংরেজ কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেকসপিয়ার তাঁর অনবদ্য নাটক ‘হেমলেট’ এর রাজা ক্লডিয়াসের (Claudius) প্রধান পরামর্শকরূপে ‘পলোনিয়াস’ (Poloneous) নামক একটি চরিত্র সৃষ্টি করেন। কালজয়ী এই নাটকের প্রথম অংশের তৃতীয় দৃশ্যে ‘পলোনিয়াস’ তাঁর পুত্র ‘লয়ের্টিস’ (Lecrtes) কে প্যারিসে যাত্রার পূর্বে একটি মূল্যবান উপদেশ দেন; যার সারমর্ম হলো “কখনও ঋণদাতা অথবা ঋণ গ্রহিতা হবে না। এতে অর্থ ও বন্ধুত্ব দুটোই হারাবে’। সম্প্রতিকালে বন্ধু হিসাবে বিবেচিত চীন থেকে অবাধে ঋণ নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়া শ্রীলংকা এবং ঝুঁকিতে থাকা আরও কিছু দেশের করুন হাল দেখে ৪০০ বছর আগের লেখা হেমলেট নাটকের এই সংলাপটি স্মরণ করেছে ভারতীয় ইংরেজী সাপ্তাহিক ‘ওপেন’ (সূত্র: ওপেনঃ ২৮ মার্চ ২০২২)

আজ থেকে ২৭৭ বছর আগে (১৭৪৫ সাল) ইংল্যান্ডের রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট সেমুয়েল জনসন (Samuel Johnson) এক রাজনৈতিক পর্যালোচনা সভায় দেশ প্রেমের ধোঁয়াতুলে মতলববাজ ও পথভ্রষ্ট তথাকথিক রাজনীতিবিদদের সতর্ক করে বলেছিলেন “বদমাশদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হল দেশ প্রেম”। আর সে কথাই স্মরণ করেছেন শ্রীলংকার পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রপতির এক সময়ের উপদেষ্টা এবং পশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত পন্ডিত হারিম পেইরিস । (সূত্র: ভারতীয় ‘দি স্টেটস্ ম্যান; ০৩ ফেব্রুয়ারি’২২)

ঠিক একযুগ আগের অর্থাৎ ২০১০ সালের এমনি এক মে মাসের ঘটনা। শ্রীলংকার সদ্য বিদায়ী এবং বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজা পাকসে তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, কারণ তাঁর নেতৃত্বেই তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদিদের বিরুদ্ধে চলা ২৬ বছরের রক্ষক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ বা কাউন্টার ইনসারজেন্সি ওয়ার (Counter Insurgency War) শেষ হয়। তখন  (মে ২০১০) মাহিন্দা রাজা পাকসে দেশের রাষ্ট্রপতি তথা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারি হিসাবে ঐ গৃহযুদ্ধ থেকে শিক্ষনীয় বিষয় ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দিক নির্দেশনা তৈরি করতে শ্রীলংকার এটর্নি জেনারেল সি আর ডি সিলভার (C.R De Silva) নেতৃত্বে ‘লেসন্স লার্নন্ট এন্ড রিকনসেলিয়েশাল কমিশন’ (Lessons Learnt and Reconciliation Commission)  গঠন করেন। ভাগ্যের করুন পরিহাস এবং ভুলের কারণে ক্ষমতা হারানো সেই মাহিন্দা রাজা পাকসে এবং সার্বিক ভাবে শ্রীলংকা থেকে শিক্ষা নেয়ার তাগিদ আসছে বিশ্বের তাবৎ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

মূলত: ২০১০ সালের পর থেকেই শ্রীলংকাকে সাবধান করে একের পর এক প্রতিবেদন, গবেষণাপত্র এবং নিবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। বিশ্ব সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও সতর্ক করা হয় শ্রীলংকাকে। ঠিক ২ বছর আগে অর্থাৎ ২০ মে ২০২০ তারিখে শ্রীলংকারই নাগরিক সাংবাদিকদের (সিটিজেন জার্নাালিস্ট) ওয়েব সাইট ‘গ্রাউন্ড  ভিউজ’ (Ground Views) এ দেশটির রাজনীতিতে ১০টি ভুলের কথা তুলে ধরা হয়। তথ্যমতে ২০২০ সালেল ০২ মার্চ কভিডের ক্রান্তিকালে দেশের রাষ্টপতি নেন্দসে গোতাবায়া রাজাপাকশে মেয়াদ পূর্তির ৬ মাসের আগেই জাতীয় সংসদের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পরামর্শ ছাড়াই সংসদ ভেঙ্গে দেন এতে পরবর্তী নির্বাচন সংবিধানের ৭০ (৫) ধারা মোতাবেক ৯০ দিনের মধ্যে কভিড জনিত কারণে আয়োজনের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপনে ১৪ মে ২০২০ তারিখে নির্বাচনের কথা বলা হলেও নির্বাচন কমিশন পৃথক প্রজ্ঞাপনে ২ জুন ২০২০ তারিখে অর্থাৎ সংসদ ভাঙ্গার ৯০ দিনের পরিবর্তে ১০৮ দিনের মাথায় নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এই বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের উপদেশ নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন প্রস্তাব করলেও তা আমলে নেয়নি রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া। বহু নাটকের পর ০৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে নির্বাচন হলেও কোন দলই এই নির্বাচনে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে শুরু হয় দর কষাকষির রাজনীতি। যার করুন পরিণতি রাষ্ট্রপতির ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দার অপমানজনক বিদায়।

অন্যদিকে সংসদীয় নির্বাচনে কোন আসনে জয়লাভ না করেও নির্ধারিত কোটায় মনোনিত ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির সবেধন নীলমনি নেতা ও ৪ বার মেয়াদ পূর্তির আগে বিদায় নেয়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিং এর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের (১২ মে ২০২২) নাটকীয় ঘটনা ঘটে। রাজনীতিকে কলুষিত করে শিক্ষত, ভদ্র, সৎ ও গ্রহণযোগ্যদের রাজনীতি বিমুখ করার পরিণাম এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক বলে মন্তব্য বিশ্লেষক সমাজের। পরিবারতন্ত্র, গোষ্ঠিতন্ত্র, কিচেন কেবিনেট কিংবা সরকারের ভেতর সরকার থাকলে একটি দেশের পরিণতি কি হতে পারে; শ্রীলংকা তারই একটি সাম্প্রতিক নজির বলে মনে করে দেশ বিদেশের বেশ কিছু গণমাধ্যম। এদেশের নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক ওয়েবিনারের বরাতে ইংরেজী দৈনিক দি নিউজ টাইমস ২৪ এপ্রিল ২০২২ তারিখে শ্রীলংকার আর্থিক সংস্থা সর্বোদয় (Sarvodaya) ডেভেলপমেন্ট ফিনান্স লিঃ এর চেয়ারম্যান এবং প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক বিশ্লেষক চান্না ডি সিলভার কিছু বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে। তার মতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলংকার মোট বার্ষিক বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশের নিয়ন্ত্রন ছিল রাষ্ট্রপতি নন্দসেনা গোতাবায়া রাজাপাকসে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হাতে। বিশ্ব মিডিয়ায় শ্রীলংকা সংকটের জন্য বার বার উচ্চাতি হয়েছে রাষ্ট্রপতির বড় ভাই সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজা পাকসের নাম। আরও উচ্চারিত হয়েছে রাষ্ট্রপতির মেঝভাই সদ্য ক্ষমতাচ্যুত কৃষিমন্ত্রী চমল জয়ন্ত রাজাপাকসে এবং ছোট ভাই সদ্য ক্ষমতাচ্যুত অর্থমন্ত্রী বাসিল রোহানা রাজা পাকসের নাম। বাদ পড়েনি মাহিন্দা রাজা পাকসের ৩৬  বছর বয়সী পুত্র (রাষ্ট্রপতির ভাতিজা) সদ্য বিদায়ী যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী লক্ষণ নামাল রাজা পাকসের নামও। এর মধ্যে বাসিল রাজা পাকসে ২০২০ সালে কোভিড মোকাবিলায় গঠিত টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। উল্লেখ্য রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া ও তার ভাতিজার (মন্ত্রী) বাসিল একই সাথে শ্রীলংকা ও আমেরিকার দ্বৈত নাগরিক।

বৈশ্বিক অর্থখাতের সংবাদ, তথ্য উপাত্ত, বিশ্লেষণ ও গবেষণার জন্য জগৎ সেরা প্রতিষ্ঠান নিউইয়র্ক ভিত্তিক ‘ব্লুম বার্গ’ (Bloomberg)। প্রতিষ্ঠানটির এশিয়া সংস্করণের প্রকাশনায় ২৭ এপ্রিল ২০২২ তারিখে দি নিউ ইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরোর রিপোর্টার কাই স্কুল্টজ একটি নিবন্ধ লিখেছেন। এই প্রতিবেদন মতে একটি শক্তিশালী পরিবারতন্ত্র মাত্র ৩০ মাসের মধ্যে শ্রীলংকাকে দেউলিয়ায় পরিণত করেছে। এজন্য দায়ী করা হয় রাষ্ট্রপতি গোতাবাায়া, তার তিন ভাই (প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রী), ভাতিজা (যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী) এবং কয়েক ডজন আত্মীয়-পরিজনকে, যারা গড়ে তুলে ছিলেন ক্ষমতার বলয়। এতে এই পরিবারকে মার্কিন লেখক, নাট্যকার ও সাংবাদিক মারিত্ব পূঁজো রচিত ‘গড ফাদার’ নাটকের মূল চরিত্রের মত ক্ষমতাশীল ব্যক্তি তৈরীর কেন্দ্র বিন্দু এবং শ্রীলংকার শাসন ব্যবস্থাকে প্রচ্ছন্ন বা সহনীয় মাত্রার এক নায়কতন্ত্রের’ সাথে তুলনা করা হয়। মূলত: আর্থিকখাত এবং রাজনীতিসহ অন্যান্য ভুলের মধ্যে এই প্রতিবেদনে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর ১৫ থেকে ৮ শতাংশে নামানো, চীন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণগ্রহন, ঋণ পরিশোধে  বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার অভাব, ভুল পথে বা আপাতঃ আনুৎপাদনশীল মেগাপ্রকল্পে বিপুল পরিমাণ ঋণের টাকা ব্যয়, জাতীয় ঐক্যের বদলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেও ধর্মগোষ্ঠি তথা সিনহালী বুদ্ধদের কাজে লাগানোর চেষ্টা,  জ্বালানি তেল নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, মানবাধিকার লংঘন, দূর্নীতি, যুদ্ধ অপরাধ, কোভিড জনিত সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতা, সামরিক বাহিনীকে দিয়ে গায়ের জোরে সব কিছু ঠিক করার প্রচেষ্টা, স্বচ্ছতার অভাব, জনগণকে সংকট মোকাবিলার জন্য সচেতন করতে ব্যর্থতা, সুশাসনের অভাব, নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্য জোগানে ব্যর্থতা, ১০ বছরে বৈদেশিক ঋণ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া, অর্বাচীনের মতো রাতারাতি সিঙ্গাপুর হওয়ার অলিক স্বপ্ন, ২০১৯ সালে ইস্টার সানডে’তে সন্ত্রাসী হামলা, পর্যটন ও প্রবাসী শ্রমিকদের আয়ের উপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, আকস্মিকভাবে রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন ‘দি ডিপ্লোমেট’ এর ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখের সংখ্যায় অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৯ মাস আগে শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতি ও সামরিক জান্তাদের এক হাত নিয়েছিলেন ম্যাগাজিনটির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সম্পাদিকা সূধা রামাচন্দ্র। ২৬ এপ্রিল ১৯৭১ থেকে ০১ নভেম্বর ১৯৯১ পর্যন্ত টানা সাড়ে ২০  বছর শ্রীলংকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সেনাবাহিনীতে চাকরী করেন। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছর মেয়াদে তাঁকে গায়ের জোরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচীব তথা অলিখিতভাবে তিনবাহিনীর প্রধান করা হয়। তবে প্রতিরক্ষার গন্ডি পেরিয়ে তিনি রাজধানী কলম্বোর সৌন্দর্য বর্ধনসহ নানা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নেরও দায়িত্ব পালন করেন। শ্রীলংকায় সংকট দেখা দিলে স্বাভাবিকভাবে একজন প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা ও প্রাক্তন প্রতিরক্ষা সচীব হিসাবে সর্বাগ্রে সেনানিয়োগের মাঝেই সমাধান খুঁজতেন গোতাবায়া। বিদূষী সাংবাদিক সূধা খাদ্যসহ ভোগ্য পণ্যের সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া কর্তৃক মেজর জেনারেল সেনারাথ নিউনহেলা’কে ‘জরুরী সেবা প্রদানের কমিশনার’ হিসাবে নিযুক্তির বিষয়টি তুলে ধরেন। এই জেনারেল খাদ্য গুদামে হানা, ব্যবায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি, মূল্য বৃদ্ধির অপরাধে গ্রেফতারের মতো সামরিক কায়দায় সমস্যার সমাধান খুঁজেন, যা দীর্ঘ মেয়াদে কাজে আসেনি। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত ‘ন্যাশনাল অপারেশান সেন্টার ফর প্রিভেনশান অব কভিড-১৯ অডিট ব্রেক’ নামক শক্তিশালী টাক্সফোর্স গঠন করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের বদলে এই টাস্ক ফোর্সের প্রধান করা হয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল সাভেন্দ্র সিলভাকে । ২০২১ সালের জানুয়ারী মাসে আরও ২৫ জন মেজর জেনারেল কে ২১ জেলার করনা মহামারি মোকাবিলার সার্বিক দায়িত্ব প্রদান করা হয়। জেনারেলদের সান্ধ্য আইন ও ধরপাকড়সহ নানা সামরিক তত্ত্বের প্রয়োগ সত্ত্বেও শ্রীলংকায় করোনা জনিত মৃত্যু হার বিশ্বের সর্বাধিক মৃত্যুর হারের কাছাকাছি। সামরিক কায়দায় যে সব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মিমাংসা হয় না, সেটাই প্রমাণ করল শ্রীলংকা।

মালয়েশিয়ার জাতীয় বার্তা সংস্থার সাবেক প্রধান ও বহু দেশী বিদেশি সম্মাননা বিজয়ী প্রধান সাংবাদিক আজমান উজাং  স্থানীয় ‘দি সান’ প্রত্রিকায় ২১ এপ্রিল ২০২২ তারিখে শ্রীলংকা সংকট থেকে মালয়েশিয়ার জন্য শিক্ষণীয় বিষয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। দেশের প্রাক্তণ অর্থ সচীব তান শ্রী শরীফ কাসেমের বরাতে এই সাংবাদিকের তীর সরকার কর্তৃক অতিমাত্রায় ভর্তূকী দেয়ার দিকে। বিশেষত জ্বালানি বাবদ বাৎসরিক ২০ বিলিয়ন রিঙ্গিত ভর্তূর্কি এবং শেয়ারের মূল্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে প্রচ্ছন্নভাবে বহুজাতিক বিদ্যুৎ কোম্পানি তেনেগা ন্যাশনাল ভর্তূকি প্রদানের তীব্র সমালোচনা করেন। ভর্তূর্কি দিলেই গরিরেব উপকার হবে, এই সমাজতান্ত্রিক ধারণাকে অর্থনীতির দুষ্টচক্র বলে চিহ্নিত করে তিনি দাবি করেন। মিশর কিংবা গ্রীস আগেই এই দুষ্ট চক্রের বলি হয়েছে, আর এখন হল শ্রীলংকা। কারণ এর ফলে সরকার দেউলিয়া হয়ে পড়লে আদতে গরিবদেরই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তখন অর্থ সংকটে ব্যাংক ঋণ বন্ধ হয়ে গেলে দেশের শিল্পপতিরাও উৎপাদন করার সক্ষমতা হারায়। উদাহারণ হিসাবে বলা যায় সরকারী ভর্তূকি দিয়ে সস্তায় পানি বা বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে অপচয়ের হার বেড়ে যায়। সুতরাং দেখা যায় যে, ভর্তুকির ফসল গরিরেব চেয়ে ধনীর ঘরেই বেশী জমা হয়। প্রবন্ধের শেষে বলা হয় জনগন যখন সস্তায় বা বিনামূল্যে কিছু পায়, রাজনৈতিক সরকার তা পরিবর্তন করতে পারে না। ফলে অর্থনীতিতে পচন ধরে। আর অর্থনীতিতে পচন ধরলেই রাজনীতিতে পচন ধরে।

এসব প্রবন্ধ এবং পর্যালোচনার বাইরে আরও কয়েক ডজন লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেশ-বিদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মূলধারার গণমাধ্যমে। এসব লেখার আলোকে দেখা যায় জনগণ অতীতের অর্জন দ্রুত ভুলে যায়, বর্তমান সংকট সামনে আসার কারণে। চাটুকারিতা করে সরকারকে বিভ্রান্তকরা মানুষেরাই সংকটে সুর পাল্টায়। সংকটকালে আগের মত বিশ্বসংস্থা বা বিদেশি রাষ্ট্র অন্ধভাবে এগিয়ে আসে না বরং অনেক ছক কষে পা ফেলে। বিদেশি পেশী শক্তি বা বিদেশি মারণাস্ত্রের চেয়ে বৈদেশিক মুদ্রা তথা ইউরো, রুবেল বা ডলারই এখন বিশ্বের চালিকা শক্তি। জার্মানের প্রখ্যাত স্থপতি এবং ১৮৭১-১৮৯০ মেয়াদের চ্যান্সেলর অটো ভন বিসমার্ক বলেছিলেন “বোকারাই কেবল নিজে ভুল করে কিছু শিখে। যারা বুদ্ধিমান, তারা অন্যের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়।” একথা আজ সর্বজন বিদিত যে শ্রীলংকা ভুল করেছে। ভুলের শব্দ শোনা যায় পাকিস্তান, নেপাল, লেবানন, গ্রীস এমনকি খোদ ইংল্যান্ড থেকে। বিশ্বের এই ক্রান্তিকালে আমরা নিজেদের ভুলের খেসারত নয়, বরং অন্যের ভুল থেকে শিখব, এটাই প্রত্যাশা।

লেখকঃ গবেষক, কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক , ইমেই- [email protected]

দখিনের আনন্দ-দুয়ারে গর্বিত উত্তর-পূর্বের বানভাসী

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার



কবির য়াহমদ
দখিনের আনন্দ-দুয়ারে গর্বিত উত্তর-পূর্বের বানভাসী

দখিনের আনন্দ-দুয়ারে গর্বিত উত্তর-পূর্বের বানভাসী

  • Font increase
  • Font Decrease

দখিনের আনন্দ-দুয়ার পদ্মা সেতু নিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আংশিক জন-ভাবনার কথা মাথায় আসলো। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ বর্তমানে জীবনের জন্যে প্রকৃতির সঙ্গে লড়ছে। প্রবল ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় আক্রান্ত। পাতে নেই ভাত, এমনকি পাতও নেই অনেকের, ঘর আছে তবে আশ্রয় নেই। বানের জল বের করে দিয়েছে অনেককেই। কারো ঘরে হাঁটুসমান পানি, কারো বা তারচেয়ে বেশি অথবা কম। আছে সাপ-জোঁকের ভয়, উনুন চড়ানোর জো নেই; হয় সেখানে পানি নয়তো ঘরে নেই যথেষ্ট উপকরণ। লড়াই টিকে থাকার, বেঁচে থাকার। এমন অবস্থায় থাকা মানুষের মনে পদ্মা সেতুর প্রভাব কতখানি সে আগ্রহ আমার। তার ওপর আছে এইসময়ে একদিকে যেমন বিশাল আয়োজন, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিরোধিতা। এ বিরোধিতা অবশ্য সেতু নির্মাণ ভাবনা থেকে শুরু করে নির্মাণ কাজ সমাধার সকল স্তরে। কেবল কি বিরোধিতা? না, ওখানে ছিল নির্মাণে বাধার বিবিধ পরিকল্পনা, নীলনকশা!

বানভাসীদের ক’জনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী প্রতিক্রিয়া তাদের। স্বাভাবিক মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নৈরাশ্যবাদ ভর করেছে যাদের তাদের অনেকেই নিজেদের হাল নিয়ে উদ্বিগ্ন, করতলে মৃত্যু নিয়ে নিয়ে যারা বাঁচার স্বপ্ন দেখে তাদের চেহারায় খুশিভাব আছে, তারা আনন্দিত। পঞ্চাশোর্ধ মুহিত মিয়া বন্যায় ঘর ছাড়া। পাঁচজনের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম। কৃষিনির্ভর, কোরবানি উপলক্ষে অন্যের সহায়তা কয়েকটি গরু কিনেছেন। বন্যায় গোয়ালে পানি উঠে গেছে, ঘরেও হাঁটুসমান পানি, পাশের একটি বাড়িতে গরুগুলো নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তার কথায়, ‘এভাবেই বাঁচা লাগে। একটার লাগি আরেকটা আটকি থাকে না (একটার জন্যে আরেকটা আটকে থাকে না)। পদ্মা সেতু অইছে হুনছি, আমরার পানির লাগি সেতু আটকি যাইবো কেনে (আমাদের বন্যার জন্যে সেতু আটকে যাবে কেন)?’ একই জায়গায় আশ্রিত আরেকজনের সঙ্গে কথা। তার জবাব—‘আমরার কিতা অইতো, পানি কোনদিন নামতো (আমাদের কী হবে, পানি কবে নামবে)?’ এলাকার একটা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত এক নারীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম, বললেন না কিছু। গ্রামে এমনই হয় আসলে!

উত্তর-পূর্বের ভাবনাগুলো জড়ো করতে চাইলাম। কয়েকজনের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তায় মনে হলো মন্তব্য প্রকাশিত হয় মূলত প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের ধরনেই। প্রশ্নকর্তা যে ইঙ্গিতে প্রশ্ন করবেন উত্তর আসবে ও ইঙ্গিতেই। সাধারণের মধ্যে কথার মারপ্যাঁচ নেই। যেভাবে কথাগুলো কানে যায় সেভাবেই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। পদ্মা সেতু নিয়ে এটা যেমন, তেমনি অন্য যেকোনো বিষয়েই। যখন আপনি তুলনা করতে যাবেন তখন কারো কারো আচমকা ব্যাখ্যাহীন কষ্ট ঝরবে। এটা ছোট্ট কোন বিষয় থেকে শুরু করে যেকোনো বড় বিষয়ের সকল পর্যায়েই। উদাহরণ মেলে এইসময়ে একই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত অনেকের মাঝে। খাবার কার পাতে বেশি পড়ল, কার পাতে কম—এসব নিয়েও মানুষ ভাবে, প্রতিক্রিয়া দেখায়। আর এটা যখন বন্যায় অসহায় হয়ে পড়া মানুষদের শোনানো হয় ‘তুমি বঞ্চিত’ তখন তারা হতাশ হয়, কষ্ট পায়। এটাকে ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং’ বললে কি অত্যুক্তি হয়? মনে হয় না!

এই ক’দিন অসহায় হয়ে পড়া মানুষদের ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের’ চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের কানের কাছে বারবার বলা হচ্ছে—‘দেশ যখন বন্যায় আক্রান্ত তখন সরকার পদ্মা সেতু নিয়ে ব্যস্ত’। টেলিভিশনে এসে, বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে একই কথা বারবার বলা হয়েছে, বলা হচ্ছে। একই কথাগুলোয় বানভাসীদের অনেকেই অপ্রাসঙ্গিক হলেও কষ্ট পেয়েছে। কষ্ট পাওয়াটাই স্বাভাবিক তাদের। বিপদে পড়া মানুষেরা সবসময়ই নিজেদের বঞ্চিত ভাবে, বুকের গভীরে জমাট হয়ে পড়া হাহাকারগুলো চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চায়। ব্যক্তিগত কষ্টগুলোয় যেখানে আশাবাদের বাণী শুনিয়ে সারিয়ে তোলার চেষ্টার কথা আমাদের তখন সেখানে তাদেরকে কষ্টে আগুন দেওয়ার চেষ্টা অনুচিত। যেখানে অভয় বাণী বাঁচার প্রেরণাদায়ী হয় সেখানে কেন উদ্দেশ্যমূলক হতাশার ঝাঁঝ? এটা কি অমানবিক নয়? 

আমরা দেখেছি, পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রতি ধাপে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির বিরোধিতা। এই সেতু নিয়ে দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যগুলো এখনও বিস্মৃত হয়নি দেশের মানুষ। ‘সরকার সেতু বানাতে পারবে না, জোড়াতালি দিয়ে সেতু বানালেও সে সেতুতে কেউ উঠবেন না’—এমনও বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। বিএনপির বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে থাকে আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা প্রায়ই কথা বলেন এসব নিয়ে, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রায়ই অভিযোগ করে থাকেন। এই অভিযোগগুলোর বিপরীতে বিএনপি কখনই নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করেনি। তারা কেবলই সেতুর বিরোধিতা করে গেছে, আগেও করেছে, এখনও করছে। সেতু নির্মাণ কাজ সম্পন্নের পর উদ্বোধনের আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেও গ্রহণ করেনি বলেও বক্তব্য দিয়েছে। সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যায়নি বিএনপির প্রতিনিধিদের কেউ।

বিরোধিতার এই অবাক ধারাবাহিকতা কেন? আওয়ামী লীগ সরকার পদ্মা সেতুর মতো বড় স্থাপনা বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে করার সাফল্য দেখিয়েছে বলে; নাকি বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অভিযোগের সেই ‘ষড়যন্ত্র’ সফল হয়নি বলে? শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্ত, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের অর্থ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সাফল্যে যে পদ্মা সেতু তার কৃতিত্ব স্বাভাবিকভাবেই নেবে আওয়ামী লীগ। তবে শেষ পর্যন্ত এটা বাংলাদেশেরই সাফল্য। বাংলাদেশের এই সাফল্যে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। দেশে-দেশে পদ্মা সেতু যেখানে বাংলাদেশের অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সেখানে রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে এই সংকীর্ণতা থেকে কেন বের হতে পারছে না বিএনপি?

ঘটনা-দুর্ঘটনা, হাসি-কান্না, দুর্যোগ-সুযোগসহ অনেক কিছুই আসবে-যাবে।  এটাই মানুষের জীবন। অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হয় মানুষকে। রাষ্ট্র সমষ্টি মানুষের। এক অঞ্চলের মানুষের দুর্যোগে অন্য অঞ্চল ভারাক্রান্ত হলেও থেমে থাকে না, থাকা সম্ভবও না। একদিকে সিলেট অঞ্চলে আমরা যখন বন্যায় ভাসছি অন্যদিকে দখিনে খুলেছে আনন্দ-দুয়ার। আজ (২৫ জুন ২০২২) আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতু-সংগ্রামী তিনি। কারণ কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু থেকে তাদের প্রতিশ্রুত সহায়তা ফিরিয়ে নিয়ে কলঙ্ক লেপ্টে দিতে চেয়েছিল, তখন স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন পদ্মা সেতু করেই ছাড়ব, এবং সেটা নিজস্ব অর্থায়নে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন—‘আমরাও পারি’। শেখ হাসিনা পেরেছিলেন বলে বাংলাদেশ পেরেছে। পদ্মা সেতু যেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘দুর্মর’ কবিতা; ‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ ‘পূর্বাভাস গ্রন্থে সুকান্তের পূর্বাভাস—‘এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে/ সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন দান/ দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে/ দাউ দাউ করে বাংলাদেশের প্রাণ।’

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বানভাসী হয়েও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ানো পদ্মা সেতুর উদ্বোধনে আমরা গর্বিত। আমাদের অভিনন্দন গ্রহণ করুন প্রধানমন্ত্রী!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

পদ্মাসেতু: দূরদর্শী শেখ হাসিনা ও একজন নিভৃতচারী অর্থনীতিবিদ



ড. মতিউর রহমান
পদ্মাসেতু: দূরদর্শী শেখ হাসিনা ও একজন নিভৃততচারী অর্থনীতিবিদ

পদ্মাসেতু: দূরদর্শী শেখ হাসিনা ও একজন নিভৃততচারী অর্থনীতিবিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি  বেশকিছু মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করেন। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো ‘পদ্মাসেতু নির্মাণ’ প্রকল্প। এটি বাংলাদেশিদের জন্য একটি স্বপ্ন হিসেবে চিত্রিত বা রূপায়িত হয়েছিল। আর এই স্বপ্নের রূপকার ছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফলে এবং তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক যখন ২৯ জুন ২০১২ সালে পদ্মাসেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করে এবং অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীও সরে দাঁড়ায় তখন ওই বছরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নিমার্ণের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃঢ় মনোভাবের বাস্তব রূপায়নই আজকের স্বপ্নের পদ্মাসেতু। আমদের মত আমজনতার এটা জানা নেই যে, তিনি কিসের ভিত্তিতে, কোন ভরসায় এরকম একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন।

তবে এই ঘটনার পরপরই আমরা দেখতে পেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর মানবিক উন্নয়ন দর্শনের একজন নিঃস্বার্থ ছাত্র ও স্বনামধন্য গবেষক অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত পদ্মাসেতু নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী ও প্রায়োগিক একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন যা ওইসময় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। বৃহৎ গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ছিল “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ”। গবেষণাপত্রটি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কর্তৃক আয়োজিত “নিজ অর্থে পদ্মাসেতু” শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ হিসেবে ১৯ জুলাই ২০১২ সালে ড. আবুল বারকাত কর্তৃক পঠিত হয়। ওই গবেষণাপত্রেই তিনি উল্লেখ করেন “বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল অনৈতিক ও মহা অন্যায় তবে তা বাংলাদেশের জন্য এক মহা আশীর্বাদ (blessing  in disguise)। ১৯৭২-৭৩ এর বাংলাদেশ অর্থনীতি আর ২০১২-র অর্থনীতি এক কথা নয়। এখন আমাদের অর্থনীতি অনেক গুণ বেশি শক্তিশালী; জনগণ অনেকগুণ বেশি আত্মশক্তি-আত্মমর্যাদা সম্পন্ন। পদ্মা সেতু নির্মাণে জনগণ এখন অনেকগুণ বেশি ত্যাগ স্বীকারে সর্বাত্মক প্রস্তুত। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি ও তা সুসংহতকরণের এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।”

২০১২ সালের ওই গবেষণাপত্রে তিনি দেখান যে “ চার বছরেই পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব এবং এর জন্য ব্যয় হবে আনুমানিক ২৪,০০০ কোটি টাকা। আর ঠিক একই সময়ে অর্থাৎ ৪ বছর সময়কালে ১৪টি বিভিন্ন উৎস থেকে সম্ভাব্য অর্থ সংস্থান হতে পারে ৯৮,৮২৫ কোটি টাকা সেহেতু পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ পরিকল্পিতভাবে এমুহূর্তেই শুরু করা সম্ভব। অর্থ সংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দিতে হবে সুদ বিহীন উৎসসমূহে― যেসব উৎস থেকে সম্ভাব্য আহরণ হতে পারে মোট ৪৯,১৫০ কোটি টাকা অর্থাৎ ২টি পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ।”

তিনি আরো উল্লেখ করেন, “সেই সাথে জোর দিতে হবে নিজস্ব অর্থায়নের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ সংশ্লিষ্ট খাতসমূহে; এ ক্ষেত্রে করণীয় হবে নিম্নরূপ: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা; প্রবাসীদের প্রেরিত হুন্ডিকৃত অর্থ উত্তরোত্তর অধিক হারে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা; পদ্মা সেতু বন্ড (৮ থেকে ৩০ বছর মেয়াদী), সার্বভৌম বন্ড ও পদ্মা সেতু আইপিওতে প্রবাসী-বিদেশিদের বিনিয়োগে আগ্রহী করা; টাকার অঙ্কের উদ্বৃত্ত অর্থ (৪ বছরে মোট ৭৪,২২৫ কোটি টাকা) উৎপাদনশীল বিনিয়োগ করে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করা।”

তিনি বলেন, “করণীয় বিষয়াদির মধ্যে গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে: (১) ৩টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন। সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ও বাস্তবায়ন সমন্বয়কারী কমিটি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পদ্মা সেতু ইনটিগ্রিটি কমিটি, আর সাথে থাকবে অর্থায়ন-অর্থসংস্থান কমিটি এবং কারিগরী-প্রযুক্তি কমিটি, (২) “পদ্মা সেতু পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী” গঠন করে তার মাধ্যমে বাজারে আইপিও ছাড়া, (৩) পদ্মা সেতুসহ বৃহৎ অবকাঠামোর জন্য নির্মাণ সামগ্রী (যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল) উৎপাদন নিমিত্ত শিল্প স্থাপনে পদক্ষেপ নেয়া, (৪) সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের (দেশে-বিদেশে অবস্থানরত) হালনাগাদ তালিকা প্রণয়ন ও সংরক্ষণসহ জরুরিভিত্তিতে এবং নিয়মিত তাদের পরামর্শ গ্রহণের জন্য জীবন্ত-রিয়েল টাইম ওয়েব সাইট চালু রাখা, (৫) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ÒFriends of Padma Bridge, Bangladesh” চেতনায় উদ্বুদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলা, (৬) গণ অবহিতকরণ কার্যক্রমসহ সংশ্লিষ্ট প্রচার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।”

হিসেবপত্তর করে তিনি আরো দেখান যে “পদ্মা সেতু নির্মাণের ৩০ বছরের মধ্যেই নির্মাণ ব্যয় উঠে আসবে; ১০ম বছর থেকে যেহেতু ঘাটতি থাকবে না সেহেতু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পদ্মা সেতুর জন্য আর বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন হবে না; সেতু চালু হবার ৪০-তম বছরে নিট ক্যাশ ফ্লো ১০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে আর ১০০তম বর্ষে তা ছাড়িয়ে যাবে ২,০০,০০০ কোটি টাকা; উন্নত কানেকটিভিটি সমগ্র অর্থনীতির (শুধু দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের নয়) চেহারা আমূল পাল্টে দেবে। সুতরাং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বিনির্মাণ-বিষয়টি হতে পারে উন্নয়ন আন্দোলনের (development as movement) বিশ্ব নন্দিত মডেল Made in Bangladesh”।

বাঙালির অহংকার ও গর্ব―স্বপ্নের পদ্মাসেতুর শুভ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আজ ২৫ জুন। এ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে উতসবের আমেজ। ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংক পুরোপুরি উদ্দেশ্যমূলকভাবে পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি যখন বাতিল ঘোষণা করল, যার ফলে বিশ্বব্যাপী দেশ-জাতি-সরকারের ভাবমূর্তির অপরিসীম ক্ষতি হলো; আর অন্যদিকে, সামনে ২০১৪ সালের নির্ধারিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন―ঠিক এ ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব” শীর্ষক গভীর গবেষণালব্ধ লিখিত দলিল নিয়ে জাতির সামনে হাজির হয়েছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি,‘গণমানুষের অর্থনীতিবিদ’ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। আর সামগ্রিকভাবে প্রতিকূল এক জটিল অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কালক্ষেপণ না করে ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে “নিজ অর্থে পদ্মা সেতু” শীর্ষক জাতীয় সেমিনার আয়োজন করে।

উক্ত জাতীয় সেমিনারে অধ্যাপক আবুল বারকাত “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ” শিরোনামে তার সৃজনশীল ও বাস্তবধর্মী গবেষণাকর্ম উত্থাপন করেন। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ যে সম্ভব এ দেশে এ কথা বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্লাটফর্মে তিনিই প্রথম নৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রায়োগিক যুক্তি দিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণপূর্বক উত্থাপন করেন।

অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ছাড়া কেউ তখন বিস্তারিত হিসেবপত্তরসহ উল্লেখ করেননি যে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্ভব। একমাত্র তিনিই উল্লেখ করেছেন, বিশ্বব্যাংক ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে বলে ঋণ চুক্তি বাতিল করে। এটিই ছিল বিশ্বব্যাংকের সাথে একমাত্র মেগা প্রকল্পের চুক্তি। যা চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাতিল করা হয়। কারণটি ছিল খুবই সোজা―মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংক ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে আর ক্ষমতায় দেখতে চাইনি। এটি তাদের দ্বারা গতানুগতিক চর্চা করা ''Regime Change'' ফর্মূলা।

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পদ্মাসেতু এ দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশ উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবার ক্ষেত্রে ও জাতীয় একতা বৃদ্ধিতে এই সেতু মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। এক্ষেত্রে ড. বারকাত কর্তৃক “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্যের শ্রেষ্ঠ সুযোগ”, গবেষণা কর্মটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। 

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা ও গবেষণায় নীরবে, নিভৃতে ড. বারকাত যে অবদান রেখেছেন ও রেখে যাচ্ছেন তার গুরুত্ব অপরিসীম। এ পর্যন্ত তিনি যত গবেষণাকর্ম করেছেন সেসবের কয়েকটি মাইলফলক বা দিকনির্দেশক হিসেবে যেমন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত হয়েছে তেমনি এদেশের উন্নয়নে তথা নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন শীর্ষক গবেষণাটিও ড. বারকাতের একটি দিকনির্দেশক ও মাইলফলক গবেষণা।

২০১২ সালে গবেষিত ও প্রকাশিত ড. আবুল বারকাতের ওই গবেষণা পুস্তিকাটি একটি নতুন সংযোজিত অধ্যায়সহ ২০২১ সালে গ্রন্থাকারে দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির শিরোনাম “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ‒ ২০১২ সালে গবেষণায় প্রমাণিত‒ ২০২১ সালে দৃশ্যমান বাস্তবতা”। গ্রন্থটির দ্বিতীয় প্রকাশ সম্পর্কে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তৎকালীন কার্যনির্বাহক কমিটি যে ভূমিকা-বক্তব্য প্রদান করেছেন তা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করি। “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব” দেশ ও জাতির গৌরবান্বিত উন্নয়ন-প্রগতিতে অধ্যাপক আবুল বারকাতের এই দিকনির্দেশক গবেষণাকর্মটির জন্য পুরো জাতি দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।”

পরিশেষে বলা যায় আবুল বারকাত হলেন সেই অর্থনীতিবিদ যিনি সর্বদা দেশের ও সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন; তাদের কথা বলেন, তাদের উন্নয়নে কাজ করেন। সেজন্য তিনি গণমানুষের অর্থনীতিবিদ হিসেবেও খ্যাত। তিনি অন্তরে ধারণ করে আছেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বির্নিমাণের স্বপ্ন। নিজ অর্থে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা নিয়ে তিনি নীরবে, নিভৃতে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে গবেষণা করে যে তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন সেসময় তেমনটি আর কেউ করেছিল বলে জানা নেই। তাঁর সুগভীর ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে তিনি এদেশে বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, আলোকিত ও শোভন সমাজ বির্নিমাণে কাজ করে যাচ্ছেন।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

;

শেখ হাসিনার পদ্মা জয়



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পদ্মা সেতু শুধুই কি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নত মাধ্যম হিসেবে ইতিহাসে পরিচিতি পাবে? পদ্মা সেতু একজন অনন্য অসাধারণ দেশপ্রেমিক আপোষহীন মহান নেতার কন্যার ইতিহাস। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের যোগ্য কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যার পর যার নিজ দেশে ফেরায় ছিলো নিষেধাজ্ঞা, যিনি ছোটো বোনসহ বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, পরিবারের সবাইকে হারিয়ে যিনি এক বুক হাহাকার নিয়ে পরবাসী জীবন কাটিয়েছেন-পদ্মা সেতু তার হাতে গড়া।

প্রবাসে এক রকম করে জীবন শেখ হাসিনা পার করে দিতেই পারতেন। পারতেন নিরাপদ জীবন বেছে নিতে। কিন্তু তিনি বাংলার মানুষের জন্য সব কিছু উপেক্ষা করে ফিরে আসেন।

এই ফিরে আসা তার জন্য কতটুকু কঠিন ছিল, তা শুধু তিনিই জানেন। ৭১ এর সেই ঘাতক আর ৭৫ এর ঘাতকদের তখন প্রকাশ্য আঁতাত। সব জায়গায় বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। রাষ্ট্র তখন বঙ্গবন্ধুর ৩০ লাখ শহীদের রক্তের পতাকাকে অবমাননা করে রাজাকার যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছে। রাষ্ট্র জয় বাংলার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা থেকে অনাক্রম্যতা বা শাস্তি এড়াবার ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ আইন প্রণয়ন করে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। জিয়াউর রহমানসহ আরও কিছু দেশবিরোধী পাকিস্তানি দোসর ঘৃণ্য চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করে! সেই দেশে তার কন্যারা নিষিদ্ধ!

পদ্মা সেকিন্তু ‘বাপের বেটি’, ‘শেখের বেটি’ সকল অবরোধ, সকল রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে বৃষ্টি মুখর এক বিকেলে (১৯৮১ সালের ১৭ মে) বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন।

সেদিন আকাশ বাতাস শোঁকে অশ্রু বিসর্জন করেছিলো। আর তিনি দেশের মাটি ছুঁয়ে বলেছিলেন, আমি সব হারিয়ে আপনাদের জন্য ফিরে এসেছি।

আজ ২০২২ । ১৯৮১ থেকে এই সময় টুকুর ইতিহাস তার। তিনি সৃষ্টি করেছেন এই নতুন ইতিহাস। ছবির মতো করে এঁকেছেন বাংলাদেশকে। একটু একটু করে দেশকে নিয়ে গেছেন হিমালয়ের চেয়েও উচ্চতর আসনে। উন্নয়নশীল দেশ এবং উন্নয়নশীল মানসিকতা, আধুনিক জীবনবোধ, চিন্তা মুক্তি প্রগতি আমাদের এখনকার সময় চিত্র। আমরা জলে-স্থলে মহাকাশে উড়াই আমাদের পতাকা। স্বাধীন দুর্বার অবিচল চঞ্চল আমরা।

আমরা এখন কথা বলতে পারি, সমালোচনার টকশোর শাণিত ক্ষুরধার তরবারি রাষ্ট্রকে এখন প্রশ্ন করতে পারে, আমাদের প্রজন্ম রাজপথে নেমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি আদায় করতে পেরেছে। ইনডেমনিটি’র কালো অধ্যাদেশ গুঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে পেরেছে। আমরা ব্যবহার করি চতুর্থ/পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক।আমরা ডিজিটাল। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা মায়ের নাম দিয়ে ব্যাংক পাসপোর্ট আইডি নিয়ে নারীর ক্ষমতাকে সাদরে গ্রহণ করেছি। আমরা সাহসী হয়ে গেছি , আমাদের গৌরব আমাদের অর্জনকে আমরা বুঝতে জানতে চিনতে শিখেছি। এই দেশ এখন আর কেউ বিদেশি চক্রান্তকারীদের কাছে দিতে পারবে না।

সেই ৭৫ এর পর ১৯ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চক্রান্ত হয়েছে, আজকের প্রজন্ম আজকের রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের শিখরে। সেই শিখরে যিনি পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি শেখ হাসিনা। কিছু দেশি স্বার্থান্বেষী মানুষ যখন বিদেশিদের নিয়ে আমাদের উন্নয়নকে বাঁধা দেয়, হয়তো সেই সব কূজনরা ভেবেছিলো থমকে যাবে পথঘাট, থেমে যাবে সব প্রকল্প , কোনোদিন হবে না পদ্মা সেতু । শেখ হাসিনা মহান নেতার সন্তান। যিনি ভয় পাননি কোন কিছুকেই , ন্যায্যতার বিচারে তিনি অকুতোভয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন তিনি এদেশের যোগ্য রাষ্ট্র নায়ক, সৎ প্রধানমন্ত্রী। যিনি দেশের স্বার্থে দেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারেন, দিচ্ছেন। তিনি ১৭ মে ১৯৮১ সালে যা বলেছেন এদেশের মানুষের সেবা করতে ফিরে এসেছেন, তাই করে যাচ্ছেন।

প্রমত্ত পদ্মার বুকে সড়ক, রেলসহ এমন একটি সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে দিয়েছেন। আজ সেই স্বপ্ন পূরণের দিন। এই স্বপ্ন সম্মিলিতভাবে পুরো বাংলাদেশকে তিনি দেখিয়েছেন, এবং বলেছিলেন আমরা আমাদের টাকায় আমাদের পদ্মা সেতু বানাবো, আমাদের কোন বিদেশি টাকা লাগবেনা ।

তিনি পুরো জাতিকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের মতো এক পতাকাতলে নিয়ে এলেন। একতাই শক্তি, শেখ হাসিনায় মুক্তি।

আজ পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের ওপর পদ্মা সেতুর ইতিহাসগাঁথায় শেখ হাসিনার সাথে সাথী হয়ে হাজার বছরের রূপকথা হয়ে থাকব। সেই রূপকথার রাজকন্যা দেশের জন্য, দশের জন্য অনন্য প্রধানমন্ত্রী হয়ে বাংলাদেশকে, এদেশের মানুষকে নিয়ে যাচ্ছেন সম্মানজনক গর্বিত এক যাত্রাপথে।

আমাদের দেশ

আমাদের ভালোবাসা

আমাদের শেখ হাসিনা ।

;

রাষ্ট্র একজন চিকিৎসককে অসহায় বানাচ্ছে না তো?



ডা. রাজীব দে সরকার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমার কেন যেন মনে হয়, চিকিৎসকদের দুর্নীতিবাজ করে গড়ে তোলার ইন্ধন চিকিৎসকদের পাঠ্যক্রমের মধ্যেই দেওয়া আছে!!

মানে এই যে কতিপয় চিকিৎসকের নামে অভিযোগ ওঠে তারা ম্যালপ্র্যাকটিস করেন, কমিশন বাণিজ্য করেন, ঔষধ কোম্পানির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেন, সম্ভবতঃ এসব কিছু করতে চিকিৎসকদের অনুপ্রাণিত করে বিদ্যমান সিস্টেম।

ইন্টার্নি শেষ করে এফসিপিএস পার্ট ১ পরীক্ষা দিতে ১১,০০০ টাকা প্রয়োজন। রেসিডেন্সি কোর্সে শুধু ভর্তি হতে ইন্সটিটিউট ও কোর্স বিবেচনায় গড়ে ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা প্রয়োজন।

আবার একবারেই এসব কোর্সে চান্স পাওয়া যায় না। বার বার পরীক্ষা দিতে হয়। বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা করতে হয়।

শুধু ঢুকতেই যদি ৫০,০০০ টাকা খরচ হয়, আনুষাঙ্গিক খরচ কতো দাঁড়ায়? বই-খাতা, গাড়ি ভাড়া, ঐ ইন্সটিটিউটের আশেপাশে বাসা ভাড়া, টার্মে টার্মে পরীক্ষার ফিস এসব খরচ একেবারে ছোট না।

পড়াশোনার কথা বাদ দিলাম, সদ্য ইন্টার্নি পাশ করা একজন চিকিৎসক এই টাকাগুলো কোথায় পাবেন? চিকিৎসক হবার পরও কী সে পরিবার থেকে টাকা নেবে?

কোর্সে থাকাকালীন চেম্বার প্র্যাকটিস করা অবৈধ, এই অবস্থায় একজন চিকিৎসক সংসার চালাবেন কীভাবে? বাবা-মা কে খাওয়াবেন কিভাবে? স্ত্রী-সন্তানের ভরণ পোষণ কিভাবে করবেন?

রাষ্ট্র কি কখনো এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে?

একজন চিকিৎসককে বিশেষজ্ঞ করে গড়ে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একজন চিকিৎসক 'বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক' হয়ে উঠলে যতোটা সে নিজে উপকৃত হবে, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি উপকৃত হবে একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ, একটি জনপদ।

তাহলে একজন চিকিৎসকের স্নাতকোত্তর পড়াশোনার দায় কেন শুধু ঐ চিকিৎসকের? কেন একজন চিকিৎসকের স্নাতকোত্তর পড়াশোনা ‘সম্পূর্ণ বিনামূল্যে’ হবে না?

বাংলাদেশের সকল চিকিৎসক তো স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করছেন না। ভর্তি পরীক্ষায় যারা যুদ্ধ করে জয়ী হচ্ছেন, শুধু তারাই তো সুযোগ পাচ্ছেন। তাহলে কেন এই অর্থদণ্ড? বিশেষজ্ঞ হতে চাওয়া কি একজন চিকিৎসকের অপরাধ?

ইন্টার্নি একজন চিকিৎসক একজন পুরো দস্তুর চিকিৎসক। একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো টারশিয়ারি স্থাপনায় জরুরি বিভাগ, কিছু আউটডোরে, ইনডোর এবং ওপিডি ওটিতে তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাহলে কেন তারা ১৫,০০০ 'ভাতা' পাবেন? দৈনিক ৫০০ টাকা ভাতায় কাজ করেন এই শহরের কোন পেশাজীবী?

রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, এই মহান পেশায় যারা কাজ করেন, তাদেরও পাকস্থলী আছে, স্ত্রী-সন্তান আছে, বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন এবং অসুখ-বিসুখ-দুর্যোগ আছে। রাষ্ট্র যেন জেনেশুনে তার মেধাবী একজন সন্তানকে 'অসহায়ত্ব' কিংবা 'অনৈতিকতা'র পথে যেতে অনুপ্রাণিত না করে।

লেখক: ডা. রাজীব দে সরকার, সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও কলামিস্ট।

;