‘বিশ্বরাজনীতিতে এশিয়া গুরুত্বপূর্ণ থিয়েটারে পরিণত হয়েছে’



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
প্রফেসর ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবীর

প্রফেসর ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবীর

  • Font increase
  • Font Decrease

[চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের বরিষ্ঠ শিক্ষক এবং 'সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ'-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক প্রফেসর ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবীর বাংলাদেশের একজন অগ্রগণ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। দেশে-বিদেশে শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিয়োজিত থেকে তিনি রচনা করেছেন আন্তর্জাতিক মানসম্মত গ্রন্থ ও প্রবন্ধ। তাঁর সঙ্গে বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতির নানা প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর, বার্তা২৪.কম'র অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ। প্রফেসর ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবিরের বক্তব্যের চুম্বক অংশ পত্রস্থ হলো:]

এশিয়ার গুরুত্ব

বিশ্বরাজনীতিতে এশিয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ থিয়েটারে পরিণত হয়েছে এবং আগামীতেও আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে, চীনের অপ্রতিরোধ্য বিকাশ, ভারতের শক্তি বৃদ্ধি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং এ অঞ্চলে বেশ কিছু 'সিরিয়াস টেনশন' ও 'কনফ্লিক্ট জোন' থাকাতে এই এশীয় অঞ্চলের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে বৈ কমবে না। এই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর মধ্যে আছে কাশ্মীর ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যু নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ, আফগানিস্তানে মার্কিন দখলদারিত্ব ও এর বিরুদ্ধে সশস্ত্র তালিবান প্রতিরোধ তথা আফগানিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলন, চীনের উত্থান, চীন-ভারত রেষারেষি ও প্রতিযোগিতা, তাদের সীমান্ত নিয়ে বিরোধ ও ১৯৯২ সাল থেকে ক্রমবর্ধমান ইন্দো-মার্কিন কৌশলগত সখ্যতা, চীন-মর্কিণ দূরত্ব সৃষ্টি, চীনের শিন জিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিমদের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রচেষ্টা ও এর বিরুদ্ধে চীনা সরকারের কঠোর ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ন্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ, হংকংয়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ন্যায় পদক্ষেপ, তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যু, জাপান-চীন টানাপোড়েন, বিশেষ করে সেনকাকু দ্বীপের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব, কোরীয় উপদ্বীপের সঙ্কট, মধ্যপ্রাচ্যের/পশ্চিম এশিয়ার সংকট, ইসলামী উগ্রপন্থার বিকাশসহ মধ্য এশিয়ার নতুন রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্নমুখীন সংকট আমরা লক্ষ্য করি, বিশ্বরাজনীতিতে এশিয়ার গুরুত্ব বৃদ্ধিতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে।

সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ

হাল আমলে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ হওয়া এশীয় অঞ্চলের নানা বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক-গবেষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি ও জারি রাখা খুবই জরুরি একটি প্রসঙ্গ। সেজন্যই একটি সম্পূর্ণ একাডেমিক উদ্দেশ্যে এমন একটা সেন্টার থাকলে ভালো, থাকা দরকার, এমন চিন্তা থেকেই :সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ' প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি একটি non-profit organization. কোন দেশ বা সরকারের প্রতি এই সেন্টারের বিশেষ কোন রাগ, অনুরাগ, বিরাগ নেই। এই সেন্টার কোন শর্তযুক্ত বা শর্তের ইঙ্গিতপূর্ণ কোন সাহায্য-সহযোগিতামূলক সম্পর্কের বিরোধী। নিজস্ব সীমিত অর্থায়নে এর কার্য পরিচালিত হয়। ফলে, এর কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তা সত্ত্বেও সেন্টার বেশ কয়েকটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করেছে, নিয়মিতভাবে ২০১৭ সাল থেকে এটি Journal of Asian Politics and Society -- JAPS নামক একটি অর্ধ-বার্ষিক একাডেমিক peer reviewed ও ISSN নম্বরযুক্ত জার্নাল প্রকাশ করে আসছে। আগামীতে Center for Asian Studies এর কার্যক্রম আরো সম্প্রসারিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে Center for Asian Studies-- CAS প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে। এটা প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের Higher Education Quality Enhancement Project  (HEQEP) এর একটি Subproject এর Off shoot. এই Sub-project টির বিষয়বস্তু ছিল অনেকটা নিম্নরূপ: Improving the Capability of Research on Political Science and Asian Studies in the Department of Political Science, University of Chittagong. ২০১১-২০১৩ পর্যন্ত এই তিনবছর মেয়াদী সাব-প্রজেক্ট শেষ হলে এই সাব-প্রজেক্টের টিম মেম্বারদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে গবেষণা কাজ অব্যাহত রাখার আকাঙ্খা থেকেই এই Center for Asian Studies -- CAS প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেয়া হয়। সেই মোতাবেক এই সেন্টার গঠনের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের একাডেমিক কমিটির মিটিংয়ে, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের মিটিংয়ে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের এবং সর্বশেষে সিন্ডিকেট মিটিংয়ে পাশ হয় ও তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রসঙ্গ: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল

ইন্দো-প্যাসিফিক টার্ম-এর ব্যবহার নিয়ে প্রথম কথা হলো, এই টার্মটা যতটা না ভৌগোলিক, তারচেয়ে ঢের বেশি "সিকিউরিটি" ও "স্ট্র্যাটেজিক"। ইন্ডিয়ান ওশ্যান ও প্যাসিফিক ওশ্যানকে কানেক্ট করা হয়েছে এই টার্মের মাধ্যমে। এই টার্মটা সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন একজন ভারতীয় স্ট্র্যাটেজিক ও সিকিউরিটি আ্যানালিস্ট। পরবর্তীতে এটা সমমনা বাকী অনেক দেশ, যেমন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাস্ট্র ইত্যাদি দেশ এই 'ইন্দো-প্যাসিফিক' টার্মটি ব্যবহার করতে থাকে। পূর্বে প্রচলিত ও ব্যবহৃত টার্মটা ছিল 'এশিয়া-প্যাসিফিক' অঞ্চল। ইন্দো-প্যাসিফিক টার্ম আসলে মেরুকরণের প্রতীকী উপস্থাপন। অর্থাৎ, এই টার্ম দ্বারা এটাই বুঝানো হয় যে, ভারত মহাসাগরীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত স্বার্থকে একক পরিকল্পনার ভিতরে বিবেচনায় নিতে হবে বা দেখতে হবে। কারণ, উভয় অঞ্চলের কৌশলগত স্বার্থ, চ্যালেঞ্জ এবং সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার কৌশলও এই ভারত মহাসাগরীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করা আবশ্যক।

চীনের উত্থান

কিন্তু, প্রশ্ন রয়েই যায় যে, কেন এবং কি সেই মেরুকরণ? কি তার প্রকৃতি? কি হতে পারে এর প্রভাব? এক্ষেত্রে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মেরুকরণের প্রধান ও বলা যেতে পারে, একমাত্র কারণ হলো গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের উত্থান। অনেকেই হয়তো বলবেন, কেন? ইতিপূর্বে ধ্বংসস্তূপ থেকে জার্মানিতে, জাপানে, অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছে, এমন পোলারাইজেশানতো তখন ঘটেনি! এখন চীনকে কেন্দ্র করে কেন ঘটছে? এই প্রশ্নটাও নিশ্চয়ই করা যেতে পারে।  লক্ষণীয় বিষয় হলো, যখন ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষ দিকে জাপানের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে মার্কিন পলিসি মেকারগণ ও থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করতে থাকেন, তখন মার্কিন যুক্তরাস্ট্র জাপানের উপর নানাধরণের বিধিনিষেধ ও শর্ত আরোপ করা শরু করে।  জাপানি মাইক্রো চিপসের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিস, মার্কিন কৃষি ও ফল, গাড়ি ইত্যাদি রফতানির জন্য বাধ্যতামুলক কোটা আরোপ, বোয়িং বিমান ক্রয়ে "রাজি" করানো ইত্যাদি পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছিল। সিনিয়র বুশ ১৯৯১ সালের দিকে বিশাল বহর নিয়ে জাপান সফর করেন ও ট্রেড কনসেশানের জন্য চাপ দিতে থাকেন। এমন প্রচণ্ডরকমের চাপ আসে যে, মনে করা হয়, এই প্রেসার নিতে না পারায় আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্যেই তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী, একদার ঝানু বুরোক্র্যাট, মি. কিচি মিয়াজাওয়া অজ্ঞান হয়ে পড়েন। কনসেশান মার্কিনিরা ঠিকই আদায় করেছিলেন। এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উঠতি অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে বশে রাখতে চেষ্টা করতো।

কিন্তু, চীনের উত্থানের বিষয়টা বহু দিক থেকে আলাদা। ইউরোপে উঠতি বড় অর্থনীতি জার্মানি ও এশিয়ার ইকনোমিক পাওয়ার হাউজ জাপান, কেউই কোন কমপ্রিহেনসিভ পাওয়ার ছিলনা, তেমন হওয়ার কোন সম্ভাবনা বা প্রয়াসও ছিল না। তদুপরি, তাদের উত্থান ঘটেছিল বেশ খানিকটা মার্কিন বদান্যতায়। আদর্শগতভাবে তারা মার্কিন-পশ্চিমা ভাবধারার অনুসারী ছিল। ফলে, সামরিক ও/বা আদর্শিক কোন চ্যালেঞ্জ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি মেকাররা এসব দেশের কাছ থেকে আশঙ্কা করেননি। সর্বোপরি, এই দেশগুলোর অর্থনীতি বড় হলেও এরা একটা অর্থনৈতিক পাওয়ার হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার ক্ষেত্রে "গ্লাস সিলিংয়ে" আটকা পড়ে যায়। এদের কারো টোটাল জিডিপির সাইজ ৪-৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপর উঠতে পারেনি।

পক্ষান্তরে, চীন এই জিডিপির গ্লাস সিলিং ব্রেক করে ফেলে। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী চীনের টোটাল জিডিপি হলো ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের মত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে প্রায় ০৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো কম। বিভিন্ন প্রোজেকশান থেকে জানা যে, মোটামুটি ২০৩১ সালের দিকে নমিনাল জিডিপির হিসাবে চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে যাবে। এমন বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিঃসন্দেহে দুঃসহ। এটা হলে, 'প্যাক্স আমেরিকানা'র আইডিয়া হোঁচট খাওয়ার আশংকা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, পিপিপির হিসাবে চীন ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।

চীন-মার্কিন প্রসঙ্গ

যদিও অন্যসব দেশের সাথে মার্কিন স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক তেমন কোনো কৌশলগত কোন বিষয়ও ছিলনা, তথাপি, চীনের ব্যাপারটা যথেষ্ট আলাদা। একথা নিঃসন্দেহে সত্য যে, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান পর্বের প্রথমদিকে প্রায় দুই দশক (১৯৭২-১৯৮৯) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা ও পশ্চিমাপন্থী পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের (যেমন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর) বিনিয়োগ, সহযোগিতা, মার্কেট এক্সেস ইত্যাদি অর্থনৈতিক নীতি চীনের উত্থানের জন্য পজিটিভ ফ্যাক্টর হিসাবে কাজ করেছে। তবে, এটা এদের সবারই জানা ছিল যে, চীনের অনুসৃত সংস্কার ও চার আধুনিকীকরণের (Four modernization) নীতির অন্যতম ছিল সামরিক সংস্কার, যার লক্ষ্য ছিল চীনের সামরিক শক্তিকে অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা। ফলে, চীনের উত্থানের একটা মৌলিক 'কম্পোনেন্ট' বা 'ইন্টিগ্রাল পার্ট'ই ছিল মিলিটারী রিফর্ম ও ডেভেলপমেন্ট। আসলে, এই সংস্কার কর্মসূচীর লক্ষ্যই ছিল চীনকে একটা টোটাল, কমপ্রিহেনসিভ পাওয়ার হিসাবে গড়ে তোলা। ১৯৮৯ সালের তিয়েনানমেন স্কোয়ারের ঘটনা, ঐ একই বছরে কোল্ডওয়ারের পরিসমাপ্তি চীনকে এক নতুন অপরিচিত বাস্তবতার মুখোমুখি করে দেয়। কিছুদিনের জন্য চীন নিজেকে "ক্ষুদ্র" হিসাবে দেখতে পায়। আপাতঃ কিংকর্তব্যবিমূঢ় চীন ১৯৯২ সালে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচীকে আরও বেগবান ও গভীর করার (deepening of reform)। এর মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে চীন আরও বেশী  Liberalization, Privatization, Marketization, Globalization -- LPMG এর পথে অগ্রসর হয় ও আরো বেশি বেশি করে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে মাকড়সার জালের মত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যায়। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা যেমন চলতেই থাকে, চীনের সামরিক শক্তিও তেমনিভাবে উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকে। সামরিক খাতে চীনের ক্রমবর্ধমান বাজেট বরাদ্দ থেকেই এটা বোঝা যায়। চীনের ব্যবসা, উন্নয়ন সহযোগিতা পূর্ব-এশিয়া, দক্ষিণ-এশিয়া, মধ্য-এশিয়া, আফ্রিকায় বিস্তৃত ও বর্ধিত হতে থাকে। চীনের এই বর্ধণশীল অবস্থা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি এড়ায়নি।

ফলে, সেই বিংশ শতকের শেষ থেকে ও একবিংশ শতকের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি মেকারদের ও থিঙ্কট্যাঙ্কের পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক ও আলোচনা চলতে থাকে 'চীনের পিসফুল রাইজ' নিয়ে। এটা কতটুকু পিসফুল, কতদিন পিসফুল থাকবে, কিভাবে চায়নার সঙ্গে ডিল করা যাবে, কনফ্রনটেশান না একোমোডেটিভ পলিসি নেয়া সঠিক হবে, সেসব বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা, তর্কবিতর্ক, মতামত প্রদান চলতে থাকে। এমনই পটভূমিতে চীনের উত্থানের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শংকার ক্ষেত্রগুলো নিম্নরূপ:

ক. চীন একটি একদল-শাসিত দেশ। গণতন্ত্রহীন। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। নানান উদাহরণ দিয়ে তা বোঝানো হয়। ফলে, আল্টিমেটলি গনতন্ত্র ও অগণতন্ত্রের বিরোধ-দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী।

খ. চীন ক্রমাগত একটি আগ্রাসী শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।  সে তার ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধি ও প্রসারিত করছে। তাইওয়ানকে হুমকি দিচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরে স্বীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপক ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী পদক্ষেপ নিচ্ছে। সেনকাকু/দাইয়ায়ুতি দ্বীপ নিয়ে জাপানের সাথে দ্বন্দ্ব বাড়িয়েই চলেছে।

গ. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিস ফলো করছে। পাশ্চিমা দেশগুলোর কোম্পানিগুলোকে প্রযুক্তি হস্তান্তরে বাধ্য করছে। চীনের মোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের প্রোডাক্টের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর সেনসিটিভ সিকিউরিটি রিলেটেড ডাটা ও তথ্যাবলী পাচার করছে।

ঘ. সামরিকভাবে "ভয়ঙ্কর রকমের" assertive হয়ে যাচ্ছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ট্র্যাডিশনালি ভারতের সহজাত প্রভাব বলয়ের অঞ্চল হিসাবে দক্ষিণ এশীয়াতে চীনের ব্যাপক আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামরিক পেনিট্রেশন ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঙ. মধ্য এশীয়াতেও চীন তার উপস্থিতি সরব করেছে। সেখানকার তেল, গ্যাস ও অন্যান্য কাঁচামালের ক্রেতা হয়েছে চীন।

চ. আফ্রিকাতে চীনের বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে ও সেখানকার বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালের বড় ক্রেতা হিসাবে চীন আবির্ভূত হয়েছে। ফলে, আফ্রিকাকে পূর্বের ন্যায় নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো ব্যবহার করা কমে যাচ্ছে। আফ্রিকার দেশগুলোর বার্গেইনিং পাওয়ার বাড়ার ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষে আগের ন্যায় আর সহজে আফ্রিকাকে এক্সপ্লয়েট করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রতি চ্যালেঞ্জ

আরো কিছু বলা গেলেও, আপাততঃ এটুকু বলাই যথেষ্ট, চীন-মার্কিন সংশ্লিষ্ট পয়েন্টটা এস্টাবলিস করার জন্য। এখন উপরের বিষয়গুলো যদি আমরা একসঙ্গে বিবেচনা করি, তবে আমরা কি পাই? পরিষ্কার চ্যালেঞ্জ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার প্রতি। অন্ততঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তিসমুহ সেভাবেই বিষয়টা দেখে থাকেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের বিজয়ের মাধ্যমে কোল্ডওয়ার শেষ হবার পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীতে তার নির্দেশে ও তার নেতৃত্বে 'ইউনিপোলার নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার' তৈরির প্রয়াসে মত্ত হয়ে পড়ে। সারা দুনিয়াকে তারা পদানত করতে থাকে। কিন্তু, চীনের উত্থানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পলিসিমেকাররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্নের ইউনিপোলার নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রতি চ্যালেঞ্জ বলে গণ্য করতে থাকেন। তারা চীনের কমপ্রিহেনসিভ পাওয়ার হয়ে ওঠার স্পষ্ট আলামত অবলোকন করেন ও এটাকে ডিল করার স্ট্র্যাটেজি হিসাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অনুসারী চারটি এশীয় দেশ (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, ও ভারত) নিয়ে ২০০৭ সালে Quadrailateral Agreement -- QUAD গঠন করে। পরবর্তীতে চীনের বিরূদ্ধে বিভিন্ন মাত্রার বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা, ইত্যাদি আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন পশ্চিমা দেশসমূহ। ২০১৩ সালে চীন তার মাল্টি-ট্রিলিয়ন ডলার বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ (Belt and Road Initiative) গ্রহণ করার পর থেকে চীনকে নিয়ে মার্কিনী উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার এশীয় অনুসারী দেশসুমহ চীনের এই উত্থান ও ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি অগ্রহণযোগ্য ও উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করেছে। ফলস্বরূপ একধরণের অলিখিত Containment of China পলিসি গ্রহণ করে। যেটাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন বলেছেন, নতুন স্নায়ুযুদ্ধ নয়, কিন্তু, policy of extreme competition। এ লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই কোল্ড ওয়ার আমলের মতো QUAD, Indo-Pacific Strategy -- IPS, AUKUS, Indo-Pacific Ecomomic Cooperston, ইত্যাদ বিভিন্ন নামে জোট গঠন করছে। এই মেরুকরণকে বলা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক দেশসমূহের জোট, রুল বা বিধি বিধান ভিত্তিক জোট, আগ্রাসী-সম্প্রসারণবাদী চীন-বিরোধী জোট।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, উভয়েই চাইবে বাংলাদেশকে তার সাথে পেতে। পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল হয়েছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে। বঙ্গোপসাগর বর্তমান প্রেক্ষাপটে নানা কারণে ও নানা দিক দিয়ে অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায়, চীন বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারী ও সাহায্যদাতা দেশ। তদুপরি, চীনের সাথে রয়েছে আমাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক। এখনও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্রায় সবটা হার্ডওয়্যারই আসে চীন থেকে। আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের বিবেচনাতেও চীন বাংলাদেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

একটা কথা কেউ সচরাচর প্রকাশ্যে না বললেও এটা সবাই অনুভব করেন যে, চীনের সাথে সুসম্পর্ক বাংলাদেশীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাবোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন নিজেও চায় না যে, বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি কোন নতুন "এশিয়ার স্নায়ুযুদ্ধের জোটে" যোগদান করুক। বাংলাদেশস্থ চীনা রাষ্ট্রদূত থেকে খোদ চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করে বাংলাদেশ যেন কোন মার্কিন জোটে না যায়, সেটা স্পষ্ট করে বলেছেন। এ ব্যাপারে চীন তার অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়ে গিয়েছে।

অপরদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে এসে চীনের বিরূদ্ধে বিরূপ বক্তব্য দিয়ে গিয়েছেন ও বাংলাদেশকে চীনের সাথে অতি-ঘনিষ্ঠতার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছেন।

এদিকে ভারত তার নিজের চীনের সাথে তীব্র টানাপোড়েনের সম্পর্কের কারণে ও "চীন ঠেকাও" জোটের অংশীদার হিসাবে বাংলাদেশে চীনের প্রভাবের বাড়বাড়ন্তের ব্যাপারে বাংলাদেশকে বারবার যৌক্তিক ও অযৌক্তিকভাবে সতর্ক করে দিয়েছে, যা অনেকটা ভারতের দিক থেকে হিস্টিরিয়াতে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু, এটা আমাদের ভুললে চলবেনা যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে আর আমাদের রফতানির অন্যতম বৃহৎ বাজার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সমগোত্রীয় ইউরোপীয় দেশসমূহ। কাজেই, একতরফাভাবে শুধু ভারত বা চীন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যাওয়া হবে আত্মঘাতী, হঠকারী ও বোকামীপূর্ণ। কোন পক্ষের দিকে "হেলে পড়ার" (Tilt) নীতি হবে 'দুঃখজনক' ও 'ভেরী আনস্মার্ট'। এটা এখন ভবিষ্যতের জন্য দেখার বিষয় যে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার কতটুকু তার বন্ধু ভারতের বুদ্ধিতে বা মার্কিন চাপে, বা কোন তাৎক্ষনিক সুবিধার জন্য চীনের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে কিনা। কিংবা যদি কখনো বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তবে কি তার পশ্চিমপ্রিয়তা তাকে চীনের প্রতি অতিসতর্কতার নীতির দিকে ঠেলে দেবে? মনে হয়, মার্কিন ও পশ্চিমপ্রিয়তা সত্বেও বিএনপির সম্ভাব্য সরকার হয়তো ভারতের সাথে সম্পর্কের কাউন্টারভেলিং ফোর্স হিসাবে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার নীতিই অনুসরণ করতে চাইবে।

মোদ্দা কথা হলো, আঞ্চলিক বা/ও বৈশ্বিক মেরুকরণের অভিঘাত বাংলাদেশের উপর পড়বেই। বাংলাদেশের উচিৎ হবে কোন অবস্থাতেই কোন একটি পক্ষে গিয়ে আরেক পক্ষের বিপরীতে নিজেকে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ফেলা। বরং, বাংলাদেশকে এই সকল কনফ্লিকটইলিং পক্ষগুলোর সাথে সম্মানজনক ভারসাম্য বজায় রাখার মতো ডিপ্লোম্যাটিক স্কিল ডেভেলপ করা আবশ্যক। সেইসাথে জোট নিরপেক্ষতার নীতিকে দৃঢ়ভাবে এস্টাবলিশ করার ব্যাপক উদ্যোগের নেতৃত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, আমাদের জন্য চীন, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ সবাই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশ এদের মধ্যে পক্ষ বেছে নেয়া এফোর্ড করতে পারেনা। সেটা করা সঠিকও নয়, সেটা করার বিলাসিতাও বাংলাদেশের জন্য মানায়ও না।

এশিয়া: ভবিষ্যতের সংকট/সম্ভাবনা

সকল কিছুরই দুটো দিকই থাকে। একদিকে যেমন অনেক সংকট থাকতে পারে, চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে। আবার তেমনি সম্ভাবনাও থাকতে পারে। সম্ভাবনাগুলোকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর দক্ষতা অর্জণ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার ও সংকট সমাধানের দক্ষতা অর্জন আমাদেরকে অবশ্যই করতে হবে।

চ্যালেঞ্জ ও সংকট, আমার মতে, আপেক্ষিক। আমরা চ্যালেঞ্জ ও সংকট মোকাবিলায় কতটা দক্ষতার বা অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছি, তার উপরই নির্ভর করবে চ্যালেঞ্জ ও সংকটের ক্ষেত্র, তীব্রতা, মেয়াদ। সকল চ্যালেঞ্জ ও সংকটই মোকাবিলাযোগ্য।

আপাতদৃষ্টিতে চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে আছে: চীন-ভারত রেষারেষি, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে জটিলতা, তাইওয়ান ইস্যু, ইত্যাদি। এছাড়াও, চীনের উত্থানের ফলে সৃষ্ট চীনের প্রভাবের বিস্তৃতি।

আর সম্ভাবনার কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, এশিয়া হলো পৃথিবীর গ্রোথ সেন্টার। ফলে, এশিয়ার বিকাশ ঘটতেই থাকবে। আর এর বেনিফিট সবাই পেতে থাকবে। আর এ অঞ্চলের কেউই হয়তোবা চাইবেনা, কোন সংকট সেই বিকাশের সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করে দিক। তদুপরি, চীন আজ গ্লোবাল ইকনোমির সাথে এতটাই লিঙ্কড হয়ে গিয়েছে যে, চীন গ্লোবাল ইকনোমির ইন্টিগ্রাল পার্ট। সেই চীনকে এর থেকে ডি-লিঙ্ক করার চিন্তা ও চেষ্টা করাটা নিদেনপক্ষে মধ্যমেয়াদে হবে চরম হঠকারী ও ভয়ংকর। সম্পূর্ণ গ্লোবাল প্রোডাকশন ও সাপ্লাই চেইনে এত বড় অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে যে, সেই ঝুঁকি কেউই হয়তোবা নিতে চাইবেনা। কারণ, সেটা কারোরই স্বার্থানুকুল নয়। তাই,  অন্যান্য চ্যালেঞ্জের বেশীরভাগেরই হয়তোবা শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব।

সিলেটের সৌন্দর্য বাংলাদেশের পযর্টনকে প্রস্ফুটিত করছে



মোঃ কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অপরূপ সুন্দরের সম্মিলন রয়েছে আমাদের সোনার বাংলায়। বাংলাদেশের সৌন্দর্য নানা রকমভাবে ফুটে উঠছে বিভিন্ন অঞ্চলভেদে। সেখানে সিলেটের সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। সমগ্র সিলেটই সবুজে ঘেরা। প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডাকছে পর্যটকদের। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা সব ঋতুতেই প্রকৃতির অপরূপে সৌন্দর্যর সাথে মিল রেখে নিজেকে ফুটিয়ে তোলে।

শীতকালে শীতের তীব্রতা যেমন থাকে, বর্ষায় উজানের পাহাড়ী ঢলে সুরমা-কুশিয়ারা-মনু নদীর পানি উপচে পড়া তীব্র স্রোতে স্রোতাস্বেনী হয়ে উঠে সুনামগঞ্জের হাওর বাওড়সহ সব খালবিল। গ্রীষ্মে প্রখর রোদে মাঠ ঘাট চৌচির হয়ে উঠার উপক্রম।

বর্ষায় সমগ্র সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কতভাবে নয়নাভীরাম হয়ে উঠতে পারে তা স্বচক্ষে না দেখলে বোঝার উপায় থাকে না। হাওরগুলো পুরো যৌবনা হয়ে উঠে। চারিদকে কুল উপচে পানিতে টইটম্বুর থাকে। সুনামগঞ্জের হাওরের সৌন্দর্য কত না বিস্তৃত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য অনেক ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠান হাওর ট্যুরিজম নিয়ে কাজ করছে। যাতে সহজে সুনামগঞ্জের হাওর বেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে নিশ্চিন্তে।

বর্ষায় সিলেটের চা-বাগানের সবুজপাতাগুলো নিজেদেরকে বিকশিত করে তোলে। চা-বাগানের সবুজ যেন সব ভালোলাগাকে ছাপিয়ে তোলে। দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি’র সৌন্দর্য পরতে পরতে সাজিয়ে রাখে, সঙ্গে ছায়াবৃক্ষগুলো একপায়ে দাড়িয়ে থেকে যেন সবুজ চা-বাগানের সৌন্দর্যকেই পাহাড়া দিচ্ছে। এ যেন প্রকৃতির অনাবিল প্রশান্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে সারা সিলেট জুড়ে। পুরো সিলেট জুড়েই রয়েছে প্রশান্তি মেশানো এই চা-বাগান। কয়েকটি চা-বাগানের নাম উল্লেখ না করলেই নয়, আদি অ-কৃত্রিম মালনীছড়া চা বাগান, যা ১৮৫৪ সালে যাত্রা, রয়েছে অপার সৌন্দর্য বিছানো লাক্কাতুরা চা বাগান আর পুরো শ্রীমঙ্গল জুড়েই রয়েছে অসংখ্য চা –বাগান। দেশের একমাত্র টি রিসার্স ইন্সটিটিউট ও রয়েছে শ্রীমঙ্গলে। 

বর্ষার জলে কলকলতানে ছাপিয়ে বেড়ানো দেশের একমাত্র জলাবন রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট। সে যেন এক অনাবিল প্রশান্তির নাম। নানারঙ্গে, নানাঢঙ্গে ভালোবাসা লুকিয়ে সারা সিলেট জুড়েই রয়েছে নানা পর্যটন স্পট । জাফলং এর সৌন্দর্য যেন প্রকৃতি নিজ হাতে সব সৌন্দর্য একসাথে ঢেলে সাজিয়ে রেখেছে। একপাশে বিশালাকৃতির পাহাড় আর হিম ছড়ানো পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ জলরাশি।

সিলেট থেকে জাফলং যাওয়ার পথে তামাবিল এ পাহাড় ঝর্ণা চা বাগান আর বাংলাদেশ-ভারত দু ‘দেশের বর্ডার লাইন সব কিছু একসঙ্গে দেখতে পাওয়া। যাত্রাপথে ডিবির হাওরে অসংখ্য লাল শাপলার মিলন মেলা যেন হাতছানি ডাকছে তার সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। অসম্ভব সুন্দর সেই দৃশ্য। আর চোখ মেলে দেখা দূর দূরান্তে বিশাল আকৃতির পাহাড় আর সরু ঝর্ণার জলধারা। যা মন ভালো করিয়ে দিবে যে কাউকে।

ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, বিছনাকান্দি, লালাখালের নৌকাভ্রমণ যে কাউকে মুগ্ধ করে ছাড়বে। এ যেন প্রকৃতির সাথে আলিঙ্গন করে যাওয়া প্রতিমূহূর্তে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এ অবস্থিত হাকুালুকি হাওর আর পুরো সুনামগঞ্জ জুড়েই বিস্তৃত হাওর অঞ্চল যেন বৃহত্তর সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

মাধবকুন্ডু, মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখায় অবস্থিত সারাবছর বয়ে চলা জলপ্রপাত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত অন্যতম এই ঝর্ণার সৌন্দর্য দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসে পর্যটকরা। আরেক সৌন্দর্য মাধবপুর লেক, ১৯৬৫ সালে চা বাগানের টিলায় বাধ দিয়ে এ লেক তৈরী করা হয়। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে রয়েছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। প্রকৃতিপ্রেমিকদের কাছে অনন্য সুন্দর একটি স্থান।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৈরী সিলেট শহরে প্রবেশ মুখের ক্বীন ব্রিজের কাছে অবস্থিত আলী আমজাদের ঘড়ি সিলেটের ঐতিহ্যকে লালন করে। একই শতাব্দীতে সিলেটের ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ গড়ে উঠে। যা সিলেটের ধর্মীয় শিষ্টাচার পরিপালনের ইতিহাসও উঠে আসে। হযরত শাহজালাল (রাঃ) ও হযরত শাহপরাণ (রাঃ) এর মাজার থাকার কারনে দেশ বিদেশ থেকে অনেকে জিয়ারাত করতে সিলেটে আসে।

গৌড় গোবিন্দ ১৩০০ শতকের সিলেট অঞ্চলের খন্ড রাজ্য গৌড়ের শাসক ছিলেন। তিনি ছিলেন ধার্মিক হিন্দু। ধর্ম পালনে ছিলেন কঠোর । রাজা গৌড় গোবিন্দ টিলা দেখার জন্যও অনেক হিন্দু ধর্মালম্বীরাও সিলেট ভ্রমণ করেন।

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের জন্ম বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায়। বাউল সম্রাটের স্মৃতি বিজড়িত সংস্কৃতির পরিমন্ডল দর্শনেও আসে অনেকে।

সিলেটের সাথে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকার কারনে পর্যটকরা সহজেই সিলেট ভ্রমণ করে থাকে। আকাশপথ, সড়কপথ, রেলপথ সব মাধ্যমেই সিলেটে যোগাযোগ করা যায়। সিলেট শহর থেকে খুব সহজেই সিলেটের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াত করা যায়। সিলেট, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জে অসংখ্য হোটেল. মোটেল, রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, যা পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তাসহ আরামদায়ক থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর তীর্থস্থান খ্যাত সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলো হয়ে উঠতে পারে অনেক বেশী চিত্তাকর্ষক সেই সঙ্গে দেশের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;

নৈতিক মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার জরুরি



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নৈতিক মূল্যবোধ হল এমন কিছু নির্দেশিকা যা একজন ব্যক্তিকে সঠিক এবং ভুলের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। দৈনন্দিন জীবনে সৎ, বিশ্বাসযোগ্য এবং ন্যায্য বিচার এবং সম্পর্ক তৈরি করতে, মানুষের নৈতিকতার সাথে আত্ম-সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নৈতিক মূল্যবোধ একজন ব্যক্তির আচরণকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। সুতরাং, নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জাতিকে নৈতিক মূল্যবোধের সংকট থেকে মুক্ত করতে শিক্ষার বিকল্প নেই।

আমাদের সমাজে প্রাচীন কিছু নৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে যা বাঙালিরা তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবে গ্রহণ করেছে, যেমন সত্যবাদিতা, অহিংসা, শান্তি, ক্ষমা, অধ্যবসায়, সরলতা, জ্ঞানের তৃষ্ণা, সহনশীলতা, সহযোগিতা এবং শ্রদ্ধা। আমাদের ঐতিহ্যবাহী সমাজ শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্ম নৈতিক মূল্যবোধ শেখায়।

মানুষের নৈতিক জীবন ও নৈতিকতার মূল ভিত্তি হল পরিবার থেকে গড়ে ওঠা মূল্যবোধ। পরিবার হল নৈতিক মূল্যবোধের উৎস যা মানুষ লালন করে এবং তাদের জীবনের বেশিরভাগ সময় অনুসরণ করে। বাংলাদেশ হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সভ্যতা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। এই সমাজে, পারিবারিক ঐতিহ্য দীর্ঘকাল ধরে টিকে আছে যা বৃহত্তম জনসংখ্যার জীবনধারা নিয়ন্ত্রণ করে।

কিন্তু সাম্প্রতিক নগরায়ণ, বিশ্বায়ন, অর্থনৈতিক জীবনের দ্রুত সম্প্রসারণ ও বিকাশ, প্রযুক্তির বিস্তার, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, মিডিয়ার প্রসার, টেলিভিশন ও অনলাইন বিনোদন বাণিজ্যের বিকাশ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের দ্রুত বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার দ্রুত স্থানান্তর, বৈশ্বিক ও দেশীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সংস্কৃতি ও শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ প্রথাগত মূল্যবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে এবং দ্রুত পরিবর্তন করছে।

বিশ্বায়নের সাম্প্রতিক যুগে পারিবারিক মূল্যবোধ, নীতি ও নৈতিকতার ব্যাপক অবক্ষয় ঘটেছে। ফলে শিশুরা কোনো নৈতিক মূল্যবোধ ছাড়াই বেড়ে উঠছে। পরিবার যখন তার নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশের দায়িত্ব নিতে পারে না, তখন তার দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তায়। দেখা যায় নানা প্রতিকূলতা, অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এ দায়িত্ব পালন করছে না। ফলে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঠেকানো সম্ভব হচ্ছেনা।

বাংলাদেশে আজকের সমাজ ব্যবস্থায় নৈতিক মূল্যবোধের সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আধুনিক জীবনের চাহিদার সাথে বর্তমান মূল্যবোধের সংঘাতের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংকট সৃষ্টি হয়। মূল্যবোধের সংকট বর্তমান সমাজে সুনির্দিষ্ট রূপ নিয়েছে এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সর্বব্যাপী। ব্যাপক দুর্নীতি, সন্ত্রাসের আক্রমণ, যুবকদের হতাশা এবং লক্ষ্যহীনতার করুণ চিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে যে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

ব্যক্তিজীবনে এসব মূল্যবোধের সংকট বিভিন্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। আধুনিক বাংলাদেশের সমাজের প্রকৃতি বিচার করলে আমরা দেখতে পাই সামাজিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। দেশটি ঘুষ, দুর্নীতি, সামাজিক কলহ, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং নৈতিক অবক্ষয় দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পরিবর্তে তা রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। নকলের প্রবণতা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, অস্বাস্থ্যকর রাজনীতিতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, মারামারি, দলাদলি ও ক্ষমতার চর্চা, শিক্ষার্থীদের অসহিষ্ণুতা, অসামাজিক আচরণ, মাদক সেবন সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। আর এসবের মূলে রয়েছে আমাদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অনুপস্থিতি।

নীতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় এক ভয়াবহ সামাজিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দেশে রাজনৈতিক আধিপত্য ও সামাজিক অবক্ষয়ের পরিবেশ বিরাজ করছে। শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রায়ই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য কাজে জড়িয়ে পড়ে। আমরা এখন ছাত্রদের শিক্ষকদের অপমান, দুর্ব্যবহার, হয়রানি এবং এমনকি হত্যার ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী। এ অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হবে।

সমাজের মানুষ বিপদ থেকে, অনৈতিকতা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। জাতি হিসেবে অগ্রসর হতে এবং বিশ্বে মর্যাদার সাথে দাঁড়াতে হলে আমাদের অবশ্যই সমন্বিত অর্থনৈতিক ও নৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের অবশ্যই মূল্যবোধের সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে, জীবন-দর্শনের মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে এবং ঐতিহ্যগত ও আধুনিক জীবনধারার মধ্যে দ্বন্দ্ব এড়াতে হবে। জ্ঞান ও বিজ্ঞান প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের সাথে ঐতিহ্যবাহী জীবনধারার মিলন ঘটাতে না পারলে মানব জীবনের গুরুত্বের সংকট দূর করা যাবে না। আর সমাজেও নিরাপত্তা ও শান্তি ফিরে আসবে না।

অর্থনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সৃষ্টির জন্য শিক্ষার্থীসহ সব বয়সী মানুষের একদিকে যেমন উদ্ভাবনমূলক কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে অন্যদিকে, স্বাধীন কর্মপন্থা বেছে নেওয়া, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্ম-সচেতনতাও তৈরি করতে হবে। মানুষের অভ্যন্তরীণ জগতের উন্নতি হচ্ছে তার নৈতিক গুণের উন্নতি। শিক্ষা, ধর্ম এবং নীতির অনুভূতি এসবই নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে অবদান রাখে। ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে মানবিক, সাংস্কৃতিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সামাজিক মূল্যবোধ তৈরিতে শিক্ষার্থীদের মনন, কর্ম ও ব্যবহারিক জীবন প্রতিষ্ঠায় নৈতিকতার মানদণ্ডে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

তাছাড়া সমাজের সর্বস্তরের মানুষের নৈতিক শিক্ষা দরকার। ব্যক্তিজীবনের আদর্শ গড়ে তুলতে হলে মানুষের মধ্যে সর্বজনীন আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। আধ্যাত্মিক বিষয় মানুষকে সৎ করে তুলবে। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে হবে এবং পরিবারে নৈতিক শিক্ষাকে প্রসারিত ও শক্তিশালী করতে হবে। শিশুদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার প্রসারে পরিবারের ভূমিকার দিকে মনোযোগ দিতে অভিভাবকদের উৎসাহিত করতে হবে।

পরিবারের পরে, যে প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড মানুষের নৈতিক জীবনে সবচেয়ে বেশি এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে তাহলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি অপরিহার্য দায়িত্ব রয়েছে। শুধু পাঠ্যপুস্তক বা তথ্যে নয়, বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, অনুশীলনের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ব্যক্তিগত আচরণে নৈতিকতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। আর এজন্য সমাজ থেকে অসমতা ও দারিদ্র দূরীকরণে সর্বাগ্রে মনোনিবেশ করতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আন্দোলন শুরু করতে হবে। আর এজন্য রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উদার হতে হবে। এছাড়া সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না।

ড. মতিউর রহমান: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

;

এগার বর্ষেও তিস্তা চুক্তি না হওয়া লজ্জাজনক



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
এগার বছরেও তিস্তা চুক্তি না হওয়া লজ্জাজনক

এগার বছরেও তিস্তা চুক্তি না হওয়া লজ্জাজনক

  • Font increase
  • Font Decrease

তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সেই ১৯৪৭ সাল থেকে এই নদীর পানিবন্টন নিয়ে বিরোধ চলছে। ভারত ২০১১ সালে তিস্তার পানির ৪৭.৭ শতাংশ শেযার করার জন্য রাজি হয়েছিল। শুকনো মৌসুমে অর্থ্যাৎ ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ৪২.৫ শতাংশ পানি ধরে রাখার জন্য একমত হয়। কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিন টালবাহানার মধ্যে নিপতিত হয়ে তিস্তা চুক্তি বাস্তবে রূপ নেয়নি। বিগত বছরগুলোতে নানা কমিটির আয়োজনে এবং অধীনে শত শত বার বৈঠকের পরও কোন ঐক্যমতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে দুই দেশ।

আসামের গৌহাটিতে (মে ২৮-২৯, ২০২২) অনুষ্ঠিত ‘এশিয়ান কনফ্লুয়েন্স রিভার কনক্লেভ’ থিম ব্যানারে আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনে উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তিস্তাসহ দেশের অন্যান্য নদীগুলো পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রন ও বন্টন নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। আর বিশেষ কোন অগ্রগতি হয়নি।

এরপর ভারতের এনডিটিভিতে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, ‘‘আমরা প্রস্তুত, তারাও (ভারত) প্রস্তুত, তবু এখনো চুক্তি হয়নি। এটা একটা লজ্জাজনক ব্যপার। ভবিষ্যতে পানির জন্য বড় ধরনের হাহাকার হবে। এবং আমাদের এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে” (ইত্তেফাক মে ৩১, ২০২২)।  তিনি আরো বলেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্য যে ১১ বছরেও আমরা তিস্তা পানি বন্টন চুক্তির সমাধানে পৌঁছাতে পারিনি। ভারতের সঙ্গে আমাদের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। আমরা সব নদীর যৌথ ব্যবস্থাপনা ভাগাভাগি ও একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। উভয় পক্ষ এবং নদী এলাকার মানুষের সুবিধার জন্য যৌথ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।’

অনেক ইস্যু নিয়ে আলোচনার পর সমাধান করা হরেও তিস্তা নদীর পানিবন্টন চুক্তির ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের দোহাই দিয়ে বার বার পিছুটান দেয়। কেন্দ্র বিগত কয়েক বছর দরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর উপর দোষ দিয়ে তিস্তা সমস্যাকে জিইয়ে রাখে। এটা বাংলাদেশর কোটি কোটি মানুষের জন্য শুধু দুর্ভাগ্য বললে ভুল হবে- আসলেই চরম লজ্জাজনক ব্যাপার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় আসাম কনফারেন্সে কিষয়টা উপলব্ধি করে মুখ ফুটে কিছু বলতে না পারলেও এনডিটিভিতে তার ক্ষোভ ঝেড়েছেন।

গতবছর তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে মমতা ব্যানার্জী বলেছেন- “আগে নিজে খাব, পরে তো দেব” (দৈনিক ইত্তেফাক ৮.৩.২০২১)। কথাটি  এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের সময় উভয় দেশের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য  চুক্তি সই করার বিষয় সম্পর্কে মমতা ব্যানার্জীর সামনে তিস্তা প্রসঙ্গ উত্থাপন করার প্রতিক্রিয়া হিসেবে।

এর আগে ২০১৭ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘তিস্তায় তো পানি নেই-চুক্তি হবে কিভাবে’? তাঁর কথা ছিল তিস্তা নয়- তোরসা, জলঢাকা, মানসাই, ধানসাই ইত্যাদি নদীতে পানি আছে। সেগুলো থেকে বাংলাদেশের জন্য পানি দেয়া যাবে। তিনি বলেছিলেন-বাংলাদেশের তিস্তা চুক্তি নয়, দরকার তো জলের! তবে এসব ক্ষীণ জলধারাকে বর্ষাকালে নদী মনে হলেও এগুলো সারা বছর প্রবাহমান কোন নদী নয়। এসব নদীর কোন অস্তিত্ব বা প্রবাহ কি বাংলাদেশে আছে? তিনি তিস্তা পানি বন্টনের কথা অন্যখাতে নিয়ে গেছেন। কিন্তু তিস্তা সমস্যার সমাধান তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি দিয়েই করতে হবে। তার আপাতত: কোন বিকল্প নেই। কারণ, চীনের সংগে তিস্তা পুন:র্জীবন ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রকল্পের একটি সফল বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন।

আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় হয়তো আগেকার বৈঠকের বিষয়গুলো পুরোপুরি মাথায় নেননি। কারণ নানা উছিলায় তিস্তা ইস্যু নিয়ে কালক্ষেপণ ভারতের একটি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। এটা নতুন ইস্যূ নয়। তিস্তা সমস্যাকে জিইয়ে রেখে অন্যান্য সব সুবিধা আদায় করে নেয়া তাদের কৌশল।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী আগমনে তিস্তা নিয়ে আলোচনার আশা ছিল। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বচ্চো কর্তৃপক্ষ থেকেও বলা হয়েছে- ওগুলো বাদ, এটা আনন্দ উৎসব। তিস্তা সমস্যা নিয়ে চিন্তা পরে হবে! পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি সই হয়ে গেছে ১০ বছর আগেই। তবে বাস্তবায়ন হয়নি। তিস্তা চুক্তি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিস্তা তো অলরেডি ১০ বছর আগে চুক্তি হয়ে গেছে। বাস্তবায়ন হয় নাই (দৈনিক যুগান্তর ১৩.৩.২০২১)।

গতবছর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় আরো বলেছিলেন, “তিস্তা চুক্তি ১০ বছর আগে পাতায় পাতায় সই হয়েছে। ডকুমেন্টও উভয়পক্ষ। ভারত সরকার আমাদের বলেছে, আগে যে চুক্তি হয়েছে সেটা স্ট্যান্ডবাই। তারা এটা গ্রহণ করে এবং তার থেকে কোনো ব্যত্যয় হয়নি। কী কারণে যে বাস্তবায়ন হয় নাই, আমরা তো সেটা জানি”(দৈনিক যুগান্তর ১৩.৩.২০২১)।

তিস্তা চুক্তি পরে আর কবে কোন সময় হবে সেটার আশ্বাস শুনতে শুনতে মানুষ বড্ড ক্লান্ত। সেটা কবে কীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে তা ভুক্তভোগীদের কাছে মোটেও বোধগম্য নয়! নয়াদিল্লীতে আগামী জুনের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিস্তা ইস্যুকে প্রাধান্য দেয়া হবে বলে এবারের আসাম সম্মেলনের পর জানা গেছে।

তিস্তা নদী বাংলাদেশ মৃতপ্রায়। বহু বছর ধরে খরা ও বন্যা উভয় মওশুমে তিস্তা নিয়ে দুর্গতির শেষ নেই। তিস্তানদী সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য কয়েক দশক ধরে চলমান উদ্যোগের ঘাটতি নেই, কিন্তু সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য জন্য প্রতিপক্ষের দীর্ঘসূত্রিতা ও অবহেলারও শেষ নেই। বাংলাদেশের তিস্তাতীরের ভুক্তভোগী মানুষের অপেক্ষা ও কষ্টের দীর্ঘশ্বাসকে কেউ পাত্তা দেয় বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল যেহেতু অনেকটা নিরাপদ কৃষিভূমি দ্বারা আবৃত, এটাকে সযত্নে লালন করার জন্য তিস্তা ক্যাচমেন্ট এলাকাকে নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ভারতের সাথে তিস্তাচুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা না গেলে দেশের কৃষি-অর্থনীতির উন্নয়নে চীনের ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এন্ড রেস্টোরেশন’প্রকল্পের মাধ্যম তিস্তা নদী তথা ডালিয়া ব্যরাজকে পুনরুজ্জীবন দেয়ার বিকল্প নেই। কিন্তু চীন গত দেড় বছরেও তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়নি। আলোচিত ১০০ কোটি ডলার ঋণও দেয়নি।

কোন কারণে যদি চীনও বিগড়ে যায়, তাহলে পদ্মা ব্রীজের মতো আমাদের নিজস্ব বুদ্ধি ও দেশীয় অর্থায়নে বর্ষার পানি ধরে রেখে ‘বিকল্প তিস্তা রেস্টোরেশন’প্রকল্পের বাস্তবায়ন করতে হবে। সেটাই মাথায় রাখা উচিত। কারণ বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং কৌশলগত সুবিধার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলো সুসম্পর্ক রাখতে চায়। আবার বেশী শান্তিতে থাকুক বা বেশী ক্ষমতাধর হোক সেটা প্রতিবেশী দেশগুলোর কেউ চায় বলে মনে হয় না। আগে বহুবার বহু লেখায় উল্লেখ করেছি, চীনের সংগে তিস্তা পুন:র্জীবন ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রকল্পের একটি সফল বাস্তবায়ন করতে গেলেও ভারতের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। যুগ যুগ চেষ্টা করেও কাঙ্খিত সহযোগিতা না পেলে নিজের দেশের চিন্তা নিজেকেই করতে হতে পারে।

লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

;

শিক্ষকদের বাঁচান



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পাঠ্যবইয়ে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতা আমরা পড়েছিলাম। পড়েছিলামই কেবল নয়, মনে ধরেছিলাম এর গূঢ়ার্থ। কবিতাটি এখনও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, শ্রদ্ধা ও মর্যাদার বিবেচনাবোধের স্মারক মনে হয়। শিক্ষাজীবনের দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে গেছে, তবু শিক্ষকদের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ কমেনি। শিক্ষকদের দেখে এখনও মন আর্দ্র হয়, শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে শির। এ অবস্থা যদিও ব্যক্তিপর্যায়ের তবে শিক্ষা সম্ভবত পরিবার এবং ওই শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া।

আমাদের সময়ে স্কুলে বেতের বাড়ির চল ছিল। পড়া না পারলে বেশিরভাগ শিক্ষকের কাছে থেকে শাস্তি হিসেবে ওটা জুটত। সে সময়ে সম্ভবত প্রাসঙ্গিক ছিল বলে প্রতিষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানে সে চর্চা ছিল। এখন এটা নাই, আইনি বাধ্যবাধকতায় ওঠে গেছে। বেতের বাড়ি শাস্তি ওঠে যাওয়ার পক্ষে আমরা যদিও তবু বলি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এখন অস্বাভাবিক হয়ে ওঠেছে। আমাদের সময়ে যে সকল শিক্ষক ‘খুব কড়া’ ছিলেন, পড়া শিখে না গেলে মারধর করতেন তাদেরকে আমরা ‘বাঘের মতো’ ভয় পেতাম। পড়া শিখে যেতাম। নামটাই ছিল যদিও ভয়ের, তবু অশ্রদ্ধা করার সাহস করতাম না কখনও। হ্যাঁ, আড়ালে-আবডালে অনেক কথাই হয়তো আমরা বলতাম কিন্তু অশ্রদ্ধা করার চিন্তাও করিনি কখনও।

আমাদের সে সময় গত হয়েছে। আমাদের সন্তানেরা এখন পড়ছে। তাদের ভয় নেই বেতের বাড়ির। শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হয়েছে, বদলেছে শিক্ষারধরনও। তবে মাঝেমাঝে এবং বলা যায় নিয়মিত বিরতিতে এখন শিক্ষক নিগ্রহের তথ্য আসছে। শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষক নিগৃহীত হচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলে পড়ছে, অপবাদ দিচ্ছে, লাঞ্ছিত করছে; সবশেষ লাঠির (ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্পের) আঘাতে হত্যাও করছে। সাভারের ঘটনা তার সবশেষ প্রমাণ যেখানে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর স্ট্যাম্পের আঘাতে মারা যান একজন শিক্ষক; উৎপল কুমার সরকার।

শিক্ষকের মৃত্যুর এই ঘটনার আগের সপ্তাহেই নড়াইল সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষকের গলায় যখন জুতার মালা দেওয়া হচ্ছিল তখন পুলিশের উপস্থিতি ছিল, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও’র সূত্রে জানাচ্ছে গণমাধ্যম। ওই প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী ধর্ম অবমাননা করেছেন এমন অভিযোগ ওঠার পর শিক্ষক স্বপন কুমার শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়েছেন এমনই অভিযোগ বিশৃঙ্খলাকারীদের। এই ঘটনার কয়েক মাস আগে মুন্সিগঞ্জের মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলে তারই শিক্ষার্থীরা। তাকে জেলে যেতে হয়। একই সময়ে আরেক শিক্ষক আমোদিনী পালের বিরুদ্ধে একইভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ আনা হয়।

ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক, করুণ-বীভৎস-ন্যক্কারজনক। একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে সারাদেশে। শিক্ষক নিগ্রহের বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তারা কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন কি করেননি সেদিকেও নজর দেওয়ার চেষ্টা করেনি কেউ। পুলিশ প্রশাসন তাদের রক্ষায় কোন ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো বিশৃঙ্খলাকারীদের সহায়তা করেছে। হৃদয় মণ্ডল কিংবা স্বপন কুমার বিশ্বাস--প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই পুলিশের ভূমিকা বিতর্কিত, হতাশাজনক।

অদ্য যে শিক্ষকের গলায় জুতার মালা ওঠল, যে শিক্ষক শিক্ষার্থীর স্ট্যাম্পের আঘাতে মারা গেলেন তাদের পরিবার বিচার পাবে কি-না জানি না, তবে এটা জানি বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা এই ধরনের বিশৃঙ্খলার সমূল উৎপাটনে পথ রোধ করে দাঁড়াবে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শিক্ষকেরা যেখানে কথিত ধর্ম অবমাননার শিকার হচ্ছেন সেখানে অজনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার ভয়ে সরকার-প্রশাসন কঠোর হতে যাবে না বলেও শঙ্কা!

ছয় বছর আগে নারায়ণগঞ্জের স্কুলশিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে ওঠ-বস করতে বাধ্য করেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। তার প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা কান ধরার ছবি দিয়েছিলেন, দেশের নানাপ্রান্তে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। ওই ঘটনায় রাষ্ট্র লজ্জিত হয়নি, শাস্তি হয়নি ‘শাস্তিদাতা’ সংসদ সদস্যের। উল্টো পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল শিক্ষকের। ওই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে শিক্ষক নিগ্রহের এমন ধারাবাহিকতা থাকত না বলে এখনও বিশ্বাস আমাদের।

শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হচ্ছেন বারবার। কখনও নিজেদের শিক্ষার্থীদের হাতে, কখনও দলবদ্ধ কথিত অনুভূতিশীল গোষ্ঠীগুলোর হাতে। রাষ্ট্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়সারা গোছের বক্তব্য দিয়েই দায়িত্ব সেরে যাচ্ছে। লাঞ্ছনাকারীদের একটা বড় অংশ বয়সে কিশোর। এই কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা নিয়ে মাঝেমাঝে কথা বলেন দায়িত্বশীলরা, কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে অপরাধ-রোধের ব্যবস্থা নিতে আগ্রহ দেখান না। ফলে কিশোর-অপরাধ বাড়ছে দ্রুততার সঙ্গে। এটা রোধ করতে হবে। উদ্যোগী হতে হবে সরকারকে। এখানে বক্তৃতা-বিবৃতি আর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসের মধ্যে সীমিত থাকা উচিত হবে না।

বলছিলাম কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতা নিয়ে। ব্যথাতুর বাদশাহ আলমগীর, পুত্র কেন শিক্ষকের পা নিজ হাতে ধুয়ে দিলো না এ কারণে। কবিতার দৃশ্যকল্প-ঘটনা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে যদিও তবু এমন সময় আসুক যখন শিক্ষার্থী নিজ হাতে শিক্ষকের পা না ছুঁয়ে দিক অন্তত শিক্ষার্থীর হাতে শিক্ষক যেন লাঞ্ছিত না হন। এটা বাড়াবাড়ি রকমের চাওয়া নয় আমাদের। এজন্যে যার যার অবস্থান থেকে আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে, উদ্যোগী হতে হবে। জাগতে হবে শিক্ষকসমাজকে, জাগতে হবে দেশকে; তা না হলে সরকার-প্রশাসন ‘উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে’ এটাও গুরুত্বহীন ভেবে দিন পার করবে!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক

;