পদ্মা সেতুসহ প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিলেন ড. ইউনূস



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
পদ্মা সেতুসহ প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিলেন ড. ইউনূস

পদ্মা সেতুসহ প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিলেন ড. ইউনূস

  • Font increase
  • Font Decrease

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধে ভূমিকা ও গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মাদ ইউনূসের বিরুদ্ধে নানা সময়ে অভিযোগ করে আসছেন। বুধবার (২৯ জুন) গণমাধ্যমে এই সব অভিযোগের জবাব পাঠিয়েছেন প্রফেসর ইউনূস।

যা হুবহু তুলে ধরা হলো- সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নোবেল লরিয়েট প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে কিছু গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

এই অভিযোগগুলির অনেকগুলিই কয়েক বছর আগেও করা হয়েছিল এবং আমরা তখন এগুলির জবাবও দিয়েছিলাম।

যেহেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একই অভিযোগ আবারও করছেন এবং এর সঙ্গে নতুন আরো অভিযোগ যুক্ত করেছেন, সাংবাদিকবৃন্দ এবং অন্যরাও এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য জানতে চাচ্ছেন, তাই এগুলির জবাবও আবার দেবার প্রয়োজন হয়েছে  বলে আমাদের নিকট মনে হচ্ছে যাতে এর মাধ্যমে জনগণ প্রকৃত তথ্য জানতে পারেন। আমরা আমাদের বক্তব্য নিচে তুলে ধরলাম।

অভিযোগ:

গ্রামীণ ব্যাংক একটা ব্যাংক, তার যিনি এমডি তিনি হচ্ছেন ডক্টর ইউনূস। আইনমত তার ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত এমডি থাকা যায়। বেআইনিভাবে সে ৭০-৭১ বছর বয়স পর্যন্ত তার যখন বয়স তখন সে এমডি ছিল। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে নোটিশ দেয়। কিন্তু তাকে কিন্তু কোন অপমান করা হয়নি। আমাদের সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব এবং উপদেষ্টা গওহর রিজভী সাহেব তাকে প্রস্তাব দেয় যে, আপনি গ্রামীণ ব্যাংকের উপদেষ্টা হয়ে যান। উপদেষ্টা ইমিরেটাস হিসেবে আপনাকে আমরা মর্যাদা দিব। কিন্তু উনি ওই এমডিই উনাকে থাকতে হবে। এখন একজন এমডি ব্যাংকের, তার তো বাইরে গেলে জিও নিতে হয়, সে তো জিও নেয়নি কোনদিন। বরং আমরাও তাকে অনেক বেশী সুযোগ দিয়েছি ।

আমাদের জবাব:

শুরুতেই পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে, গ্রামীণ ব্যাংক এমন একটি ব্যাংক যার ৭৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক এর ঋণগ্রহীতারা। একটি আলাদা আইনের মাধ্যমে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য সন্নিবেশ করে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো, ফলে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এর সাথে এর পার্থক্য আছে।

গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয় এর পরিচালনা পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে একটি চুক্তির অধীনে। এই নিয়োগের জন্য কোনো বয়সসীমা আইনে বা পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে উল্লেখ ছিলো না।

প্রফেসর ইউনূস ৬০ বছর বয়সে পদার্পণ করলে তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পরিচালনা পরিষদকে জানান যে, যেহেতু তাঁর বয়স ৬০ বছর হয়েছে তাঁরা একজন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। পরিচালনা পরিষদ অন্য কোনোরূপ সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকেই দায়িত্ব পালন করে যেতে বলেন। পরিচালনা পরিষদ তাঁর বর্তমান নিয়োগের মেয়াদ শেষ হবার পর তাঁকেই ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পুনঃনিয়োগ প্রদান করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ৬১ বছর ৬ মাস। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নিয়মিত পরিদর্শন প্রতিবেদনগুলির একটিতে এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিলে গ্রামীণ ব্যাংক বিষয়টি ব্যাখা করে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তি প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আর কোন পর্যবেক্ষণ করা হয়নি।

জিও বিষয়ে বলতে হয়, বিদেশ ভ্রমণের জন্য তাঁকে কখনো জিও নিতে হয়নি কারণ তিনি সরকারী কর্মচারী ছিলেন না। এ ব্যাপারে সরকার কোনো সময় আপত্তি তোলেনি।

যখন ২০১১ সালে এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো এবং প্রফেসর ইউনূসকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলা হলো তখন ব্যাংকটির মৌলিক আইনী মর্যাদা হুমকির মুখে পড়ে গেল যা প্রফেসর ইউনূস ক্রমাগতভাবে সকল সরকারের সমর্থন নিয়েই গড়ে তুলেছিলেন। এখন অপসারণের নির্দেশের কারণে সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো।

তিনি চেয়েছিলেন মহামান্য হাইকোর্ট ব্যাংকটির আইনী মর্যাদা সমুন্নত রাখুন। বিষয়টির আইনগত দিকগুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন। প্রফেসর ইউনূস তাঁর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চাকরি রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শত্রুভাবাপন্ন আচরণ করেছেন, যেমনটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বার বার অভিযোগ করছেন - বিষয়টি মোটেই তা নয়। প্রফেসর ইউনূস যা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন তা ছিল ব্যাংকটির আইনী মর্যাদা রক্ষা। কেননা তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন যে, যে আইনী কাঠামোয় তিনি বিগত সকল সরকারের সহায়তায় গ্রামীণ ব্যাংক গড়ে তুলেছিলেন তা দারিদ্র নিরসনে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যাংকটিকে সফল করে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তাঁর চাকরি বিষয়ে বলতে হয়, প্রফেসর ইউনূস ৬০ বছর বয়সে পদার্পণের পর তিনি কয়েকবারই পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিচালনা পরিষদ প্রতিবারই তাঁকে দায়িত্ব পালন করে যেতে বলেছিলেন।

২০১০ সালে প্রফেসর ইউনূস তাঁর একজন উত্তরসূরি খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু করতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জনাব এ এম এ মুহিত সাহেবকে অনুরোধ করেছিলেন। যেহেতু তিনি নিজেই একজন যোগ্য উত্তরসূরির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ ছেড়ে দিতে চাইছিলেন।

অর্থমন্ত্রী জনাব মুহিতকে লেখা প্রফেসর ইউনূসের এই চিঠি সে সময়ে দেশের সকল সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, যেহেতু  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ আঁকড়ে রাখার জন্য প্রফেসর ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রফেসর ইউনূসের বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে ২০০১ সালে। কিন্তু সে সময়ে সরকার কখনোই তাঁর বয়স নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও এ-নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি।

প্রফেসর ইউনূস ব্যাংকের আইনী মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হাইকোর্টে যান। তিনি মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তাঁর চাকরি ধরে রাখার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

মহামান্য হাইকোর্ট এই কারণ দেখিয়ে প্রফেসর ইউনূসের পিটিশন শুনানির জন্য গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান যে, এ বিষয়ে তাঁর কোনো  “Locus Standi”  নেই অর্থাৎ এ বিষয়ে পিটিশন দাখিল করার কোনো এক্তিয়ার তাঁর নেই। এরপর তিনি আপিল বিভাগে যান এবং আপিল বিভাগও একই যুক্তিতে তাঁর আবেদন গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

এরপর প্রফেসর ইউনূস মে ১২, ২০১১ তারিখে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।

অভিযোগ:

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশ যখন আসলো, ইউনূস তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে এবং আমাদের সরকারের বিরদ্ধে মামলা করলো। কিন্তু প্রত্যেকটা মামলাই সে হেরে গেল কারণ আইন তো তাকে কভার দিতে পারে …  আইন তো তার বয়স কমাতে পারে না। কোর্ট তো আর তার বয়স কমাতে পারে না। হেরে যেয়ে আরও ক্ষেপে গেল। হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে আমাকে ফোন করিয়েছে, টনি  ব্লেয়ারের স্ত্রী  শেরি ব্লেয়ার, তাকে দিয়ে ফোন করিয়েছে, তারপরে একজন  ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধি আসছে ... সবাই কি ... ইউনূসকে  ব্যাংকের এমডি রাখতে হবে।

মাননীয় স্পীকার, আমি জাতির কাছেই প্রশ্ন করি, ব্যাংকের এমডিতে কি এত মধু ছিল যে ওইটুকু উনার না হলে চলত না? সে তো নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। তো আমি জিজ্ঞেস করলাম নোবেল প্রাইজ যে পায় সে তো এমডি পদের জন্য এত লালায়িত কেন? সেটা আমার মনে হয় সকলের একটু চিন্তা করে দেখা উচিৎ।

এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যাতে টাকাটা বন্ধ করে, তার জন্য বারবার ইমেইল পাঠানো,  হিলারীর সঙ্গে দেখা করা, এর ফাঁকে দিয়ে ইমেইল পাঠানো এবং তার সাথে আমাদের একজন সম্পাদকও খুব ভালভাবে জড়িত ছিল। কাজেই একটা কথা হচ্ছে যে এদের মধ্যে কি কোন দেশপ্রেম আছে?

আমাদের জবাব:

গ্রামীণ ব্যাংক থেকে প্রফেসর ইউনূসের অপসারণের সংবাদটি বিশ্বব্যাপী সংবাদে পরিণত হয়েছিল। তবে তা এ কারণে নয় যে তিনি এ পদে থাকতে চেয়েছিলেন। বরং এ কারণে যে বিশ্বব্যাপী গ্রামীণ দর্শন ও এর কর্মপদ্ধতির অনুরাগী ও অনুসরণকারীদের বিশাল কমিউনিটির কাছে এটি ছিল অত্যন্ত অবিশ্বাস্য ও হতবুদ্ধিকর একটি ঘটনা। তাঁরা বিভিন্নভাবে তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন। তাঁরা প্রফেসর ইউনূসকে তাঁর পদে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না, তাঁরা এটা দেখতে চাইছিলেন যে, গ্রামীণ কর্মসূচিগুলির অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। দরিদ্রদের আশার স্থল হিসেবে বিশ্বজুড়ে গ্রামীণকে কী দৃষ্টিতে দেখা হয় এটি ছিল তারই একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

প্রফেসর ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা একটি  সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র  কাহিনী।  দূর্নীতির কারণে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধে বিশ্ব ব্যাংকের সতর্কসংকেতের ঘটনা একই সময়ে ঘটেছিল।

একই সময়ে চলমান দুটি আলোচনার বিষয়কে মিশিয়ে ফেলে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন কাহিনী সৃষ্টি করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  বলছেন যে, প্রফেসর ইউনূস হিলারী ক্লিনটনের সাথে চক্রান্ত করে বিশ্ব ব্যাংকের উপর চাপ সৃষ্টি করায় পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

পদ্মা সেতুতে বিশ্ব বাংকের অর্থায়ন বন্ধে প্রফেসর ইউনূস চাপ প্রয়োগ করেছেন এ বিষয়টি প্রথমবার যখন উল্লেখ করা হয় তখনই প্রফেসর ইউনূস এ বিষয়ে একটি সুষ্পষ্ট বক্তব্য দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সকল মানুষের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন-- এবং তিনিও এস্বপ্নে  বিশ্বাসী। । এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টির কোনো প্রশ্নই আসে না। প্রফেসর ইউনূস বলেন "আজ পদ্মা সেতুর নির্মাণ সমাপ্ত হওয়ায়  দেশের মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত । দেশের সকল মানুষের সঙ্গে আমিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এই ঐতিহাসিক সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি।

এই কাহিনীতে  বলা হয়েছে যে  প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে প্রফেসর ইউনূস পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধে তাঁর “বিশাল প্রভাব” কাজে লাগিয়েছেন। প্রফেসর ইউনূস বিশ্ব ব্যাংকের উপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ না করলেও তিনি তাঁর বন্ধু হিলারী ক্লিনটনের মাধ্যমে তা করিয়েছেন। অন্য কথায়, বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক চুক্তি বাতিলের ঘটনায় তাঁর কোনো না কোনো সংযোগ নিশ্চয়ই আছে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন যে, একটি নামকরা সংবাদপত্রের এক সম্পাদক অর্থায়ন বন্ধে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে প্ররোচিত করতে বিশ্ব ব্যাংক কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতও করেছেন। আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত-গ্রহণের কঠিন জগৎ দুই বন্ধুর খেয়াল-খুশী বা একজন পত্রিকা সম্পাদকের সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার উপর নির্ভর করে না। প্রফেসর ইউনূস যত “গুরুত্বপূর্ণ” ব্যক্তিই হোন না কেন, তাঁর যত “প্রভাবশালী বন্ধুই” থাকুক না কেন, একটি ৩০০ কোটি ডলারের প্রকল্প শুধু এ-কারণে বন্ধ হয়ে যেতে পারে না যে, তিনি চাইছিলেন এটা বাতিল হয়ে যাক । অভিযোগের জবাবে আবারো বলতে হচ্ছে যে, প্রফেসর ইউনূস পদ্মা সেতু বিষয়ে বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোনো সংস্থা বা ব্যক্তির কাছে কখনও কোনো অভিযোগ বা অনু্যোগ জানাননি। সুতরাং বিষয়টি নিতান্তই কল্পনা প্রসূত।

অভিযোগ:

কিন্তু গরিবের কাছ থেকে প্রায় ৪৭ ভাগ সে ইন্টারেস্ট নিত । এটি হচ্ছে সব থেকে দুর্ভাগ্যের বিষয় ।

আমাদের জবাব:

এ বক্তব্য  মোটেই সঠিক নয়। ব্যবসা ঋণের উপর গ্রামীণ ব্যাংকের  সুদ বরাবরই ২০% যা একটি ক্রমহ্রাসমান সরল সুদ। এটা কখনো কোন উপলক্ষ্যে বাড়ানো হয়নি। বলা বাহুল্য মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটি মাইক্রো ক্রেডিটের সর্বোচ্চ সুদের অনুমতি দিয়েছে ২৭%। গ্রামীণ ব্যাংক বরাবরই সরকার নির্ধারিত সুদের হার থেকে অনেক কম সুদে ঋণ দিয়ে গেছে। এছাড়া অন্যান্য সুদের হার আরো অনেক কম।

গৃহঋণের উপর ৮%, সদস্যদের ছেলে মেয়ের শিক্ষা ঋণের উপর শিক্ষাকালে ০% এবং শিক্ষা সমাপান্তে ৫%, হত- দরিদ্রের জন্য ০%। গ্রামীণ ব্যাংকে ৪৭% সুদ কখনো ছিল না এখনো নেই।

তাছাড়া যেকোন ব্যাংকের সুদ আয়ের উপর যে লাভ হয় তার ভাগিদার হন মালিকগণ। গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক ২৫% সরকার আর ৭৫% গরিব সদস্যগণ। তাই সরকার ও সদস্যরা নিয়মিত লাভ পেয়ে আসছেন। প্রফেসর ইউনূসের এতে একটা শেয়ারও নেই। তাই ৪৭% সুদ নিয়ে কাউকে ঠকানোর কোন সুযোগই তার নেই!

প্রফেসর ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অপসারণের পরও এই ঋণ-নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি।

অভিযোগ:

বরং গ্রামীণ ব্যাংকের যত টাকা, সব কিন্তু সে নিজে খেয়ে গেছে। নইলে একজন ব্যাংকের এমডি এত টাকার মালিক হয় কিভাবে? দেশে-বিদেশে এত বিনিয়োগ করে কিভাবে?

আমাদের জবাব:

প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো টাকা “খেয়ে” ফেলেননি। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তাঁর কর্মকালীন সময়ে তাঁর বেতনের বাইরে তিনি আর কোনো অর্থ ব্যাংক থেকে গ্রহণ করেননি। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্যও কোন সময়  তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো টাকা খরচ করেননি। দেশে ও দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে তিনি ব্যাংকের টাকা নিয়েছেন বলে যে দাবী করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ অসত্য।

বর্তমান সরকার দেশের সমস্ত ব্যাংকের সকল শাখা থেকে তাঁর ব্যাংক হিসাবগুলি তদন্ত করে দেখতে আদেশ দিয়েছিল। মিডিয়াতে এই আদেশ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। তাঁর ট্যাক্স রিটার্ণসমূহ বহুবার পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে এবং এই সংবাদও দেশব্যাপী প্রচার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এসব তদন্তে কোনরূপ অনিয়ম কোন কর্তৃপক্ষ খুঁজে পেয়েছে এরকম কোনো সংবাদ আমরা কখনো পাইনি। গ্রামীণ ব্যাংকের অনিয়ম খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে সরকার গঠিত একটি রিভিউ কমিটি ও একটি কমিশন বহু চেষ্টা করেও এধরণের অর্থ অপসারণের কোনো তথ্য বের করতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিতভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের সকল হিসাব ও আর্থিক বিষয়াদি নিরীক্ষা করে দেখে। এর কোনো রিপোর্টে প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক থেকে কোনো টাকা সরিয়েছেন এমন কোনো কথা বলা হয়নি। মিডিয়াতেও এ ধরনের কোনো রিপোর্ট কখনো আসেনি।

প্রফেসর ইউনূস নিয়মিতভাবে তাঁর কর পরিশোধ করেন এবং ট্যাক্স রিটার্ণ জমা দেন।

তাঁর আয়ের উৎস:

প্রফেসর ইউনূসের আয়ের উৎস তিনটি: ১) বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সম্মেলনে বক্তা হিসেবে প্রদত্ত ভাষণের জন্য লেকচার ফি। তিনি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ফি প্রাপ্ত বক্তাদের অন্যতম। তাঁর আয়ের প্রধান উৎস এটি। ২) পৃথিবীর ২৫টি ভাষায় প্রকাশিত তাঁর বইগুলির রয়্যালটি। তাঁর বইগুলির মধ্যে কোন কোনটি নিউইয়র্ক টাইমস-এর বেষ্ট সেলার তালিকাভূক্ত। ৩) প্রথম ও দ্বিতীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখে তা থেকে আয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় উৎস থেকে প্রতিটি প্রাপ্তির তথ্য কর কর্তৃপক্ষের নিকট নিয়মিত জমা দেয়া হয়। সুতরাং তাঁর আয়ের উৎস সম্বন্ধে কিছু না জানার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না।

তাঁর লেকচার ও বই থেকে প্রাপ্ত সমস্ত আয় তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে গ্রহণ করেন। ব্যাংকগুলি থেকে পাওয়া এ সংক্রান্ত ডকুমেন্ট কর কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেয়া হয়। ফলে তাঁর আয়ের উৎস সরকারের অজানা একথা একেবারেই সত্য নয়। প্রফেসর ইউনূস তাঁর টাকা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসাবে রাখেন। তিনি কখনোই স্টক বা শেয়ারে কোনো রকম বিনিয়োগ করেন না। পৃথিবীর কোথাও কোনো কোম্পানীতে তাঁর কোনো শেয়ার নেই।

পৃথিবীর অনেক দেশের সরকার, কর্পোরেশন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবী সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ প্রফেসর ইউনূসের দর্শন ও প্রায়োগিক কর্মসূচিতে অনুপ্রাণিত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন। এঁদের অনেকে প্রফেসর ইউনূসের দর্শন ও ব্যবসায়িক কাঠামোর প্রতি তাঁদের সার্বিক ঐকমত্য প্রকাশ করতে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে “ইউনূস” বা “গ্রামীণ” নাম যোগ করে পরিচিতি দেন। তাঁদের ব্যবসায়ে এই নামগুলির ব্যবহার শুধু ইউনূসের দর্শনের প্রতি উদ্যোক্তাদের একনিষ্ঠতার বহিঃপ্রকাশমাত্র। এগুলি কোনোভাবেই এই ব্যবসাগুলিতে ইউনূস বা গ্রামীণের মালিকানার পরিচয় বহন করে না। তাঁদের ব্যবসাগুলি তাঁদের স্ব-স্ব দেশের আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত। এদের অর্থায়নও হয় উদ্যোক্তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী। এসব ব্যবসার কোনোটিতেই প্রফেসর ইউনূসের কোনো বিনিয়োগ নেই। এই ব্যবসাগুলির কোনো কোনোটি পরবর্তীতে মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে। তারা তাদের সফলতার কথা গর্বের সাথে বিশ্ববাসীর কাছে যখন তুলে ধরে তখন তাদের সামাজিক সমস্যাগুলি সমাধানের পথ বের করার উদ্যোগে বাংলাদেশ থেকে পাওয়া তাত্তিক কাঠামো এবং অভিজ্ঞতার জন্য সব সময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

প্রফেসর ইউনূস বিশ্বব্যাপী তাঁর দর্শন ছড়িয়ে দেন, টাকা নয়। তিনি অনেকবার বলেছেন যে, পৃথিবীর কোথাও কোনো কোম্পানীতে তাঁর কোনো শেয়ার নেই, পৃথিবীর কোথাও কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তিনি কোনো বিনিয়োগ করেননি।

অভিযোগ:

এবং ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে তিন লক্ষ ডলার সে কিভাবে অনুদান দেয়? কার টাকা দিল? কিভাবে দিল? সেটা তো কেউ খোঁজ করল না!

আমাদের জবাব:

প্রফেসর ইউনূস কখনোই ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে কোনো অংকের কোনো অনুদান দেননি। অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ:

এবং গ্রামীণফোন যখন নেন তখন বলেছিল যে গ্রামীণফোন থেকে যে লভ্যাংশ সেটা গ্রামীণ ব্যাংকে যাবে এবং ওইটা দিয়ে ব্যাংক চলবে। খোঁজ নিয়ে দেখবেন আজ পর্যন্ত কোনদিন গ্রামীণফোনের একটি  টাকাও সে গ্রামীণ ব্যাংকে দেয় নাই।

আমাদের জবাব:

গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে গ্রামীণ ব্যাংককে লভ্যাংশ প্রদান করার এ ধরনের কোনো কথা ছিলনা। গ্র্রামীণ ব্যাংক এই জয়েন্ট ভেঞ্চারের কোন পক্ষ ছিলনা।

এই জয়েন্ট ভেঞ্চার গ্রামীণফোনের প্রধান অংশীদার নরওয়ের কোম্পানী টেলিনর, যা নরওয়ে সরকারের মালিকানাধীন। গ্রামীণফোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশীদার গ্রামীণ টেলিকম যা কোম্পানী আইনের ২৮ ধারায় নিবন্ধনকৃত একটি অলাভজনক কোম্পানী যার কোনো ব্যক্তি মালিক নেই। গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ টেলিকম দুইটি পৃথক আইনগত সত্তা। গ্রামীণফোন একটি পাবলিকলি লিস্টেড (publicly listed) কোম্পানী।

গ্রামীণ টেলিকম সরোস ফাউন্ডেশনের নিকট থেকে ধারকৃত টাকায় গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ করেছিল।

প্রফেসর ইউনূস কোনোকালেই গ্রামীণফোনের কোনো শেয়ারের মালিক ছিলেন না, এখনো তাঁর কোনো শেয়ার নেই। শেয়ার কেনার কোনো ইচ্ছাও তাঁর কখনো ছিলনা।

গ্রামীণ টেলিকম দরিদ্র নারী উদ্যোক্তাদের কাছে গ্রামাঞ্চলে ফোন সার্ভিস বিক্রি করতে “পল্লী ফোন কর্মসূচি” চালু করেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে গ্রামীণ টেলিকমই প্রথম কোম্পানী যা দরিদ্র মানুষের কাছে, বিশেষ করে দরিদ্র মহিলাদের কাছে এবং গ্রামাঞ্চলে টেলিফোন সেবা পৌঁছে দিয়েছে। “পল্লী ফোন কর্মসূচি” থেকে লক্ষক্ষ লক্ষ মহিলা উল্লেখযোগ্য আয় করতে পেরেছেন। কর্মসূচিটির তাৎপর্যের কারণে এটি প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। গ্রামীণ টেলিকমের “পল্লী ফোন কর্মসূচি” গ্লাসগো  প্রযুক্তি জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে।  এই প্রযুক্তি জাদুঘরে স্থান পাওয়াটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। গ্রামীণফোনের যুগান্তকারী কাজের ফলস্বরূপ দেশের সর্বত্র এমনটি দরিদ্রতম মানুষটির কাছেও টেলিফোন সেবা পৌঁছে গেছে।

অভিযোগ:

যখন আমরা ডিজিটাল সিস্টেম নিয়ে এলাম। টেলিকমিউনিকেশন, আগে সব এনালগ ছিল এবং মোবাইল ফোনের ব্যবসা দিয়ে দিলাম প্রাইভেট সেক্টরে, তাকেও একটা মোবাইল ফোনের ব্যবসা দেওয়া হলো। আরও যে দুটো আমরা দিয়েছিলাম তাদের আমরা বেশি সুযোগ দেইনি কিন্তু গ্রামীণ ফোনের জন্য রেলওয়ে অপটিক ফাইবার ক্যাবল ব্যবহার করার সুযোগ আমরা দিয়েছিলাম।

আমাদের জবাব:

রেলওয়েকে তৎকালীণ সময়ে ফাইবার অপটিকস নরওয়ে অনুদান হিসেবে দিয়েছিল। রেলওয়ে তার পূর্ণাংগ ব্যবহার করতে পারছিল না। অথচ জনবল ও ক্যাবল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিনিয়ত বিপুল খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছিলো। রেলওয়ে খরচ সাশ্রয়ের জন্য তখন গ্রামীণফোনের সাথে একটা লীজ চুক্তি করে।এটা একটা বাণিজ্যিক চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে রেলওয়ের একাজে নিয়োজিত সকল লোকবলের দায়িত্ব গ্রামীণফোনের নিকট ন্যস্ত করে দেয়া হয়।

গ্রামীণফোন দেশের সবচেয়ে বৃহৎ মোবাইল  ফোন কোম্পানি। ২৫ বছর পরে সব দেখে এখন সবাই বলবে  গ্রামীণ ফোনকে লাইসেন্স দিয়ে সরকার সঠিক কাজ করেছে। লাইসেন্স ন্যায্যত তাদেরই  প্রাপ্য ছিল।

অভিযোগ:

ড. মুহাম্মদ ইউনূস কোনো একটি ফাউন্ডেশনে ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ দিয়েছিলেন- এক আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য সম্প্রতি এমন বক্তব্য দিয়েছেন। এ বিষয়ে তদন্ত হবে কি না- এমন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা সাংবাদিক। আপনারাও তো তদন্ত করতে পারেন, কিন্তু করেন না। আপনারা তদন্ত করুন। একজন ব্যাংকের এমডি হয়ে কোনো ফাউন্ডেশনে এত অর্থ কীভাবে দেন? আপনারা অনুসন্ধান করুন। আমি (তদন্ত) করতে গেলে তো আবার বলবেন প্রতিহিংসাপরায়ণ। তাই আপনারা খুঁজে বের করলেই ভালো হয়। ড. ইউনূসের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে আরও অভিযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোন ব্যাংকে কত টাকা আছে, কোন ব্যাংক থেকে কত টাকা সরিয়ে নিয়েছেন, সেগুলো খুঁজে বের করুন। কোনো ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্ট করে তার টাকা কীভাবে ব্যক্তিগত হিসাবে চলে যায়? এক চেকে ৬ কোটি টাকা তুলে নিয়ে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা করে, সেই টাকা উধাও (ভ্যানিশ) করে দেওয়া হলো! এসব বিষয় নিয়ে অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বেশিদিন আগের কথা তো নয়। ২০২০ সালের কথা। অ্যাকাউন্ট নম্বর তো আছেই। আপনারা অনুসন্ধান করুন, তথ্য বের করুন। তারপর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হলে আমরা নেব।

আমাদের জবাব:

কোনো ট্রাস্ট থেকে ৬ কোটি টাকা বা অন্য কোনো অংকের টাকা ২০২০ সালে বা অন্য কোনো সময়  প্রফেসর ইউনূসের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়নি। তিনি কোন ফাউন্ডেশনে ৬ মিলিয়ন ডলার অনুদানও দেননি। এটা সম্পূর্ণ একটা কল্পনাপ্রসূত এবং মানহানিকর অভিযোগ।

আগেই বলা হয়েছে, সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলো থেকে প্রফেসর ইউনূসের ব্যাংকিং বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করেছে তাই সকল তথ্যই সরকারের কাছে আছে।

সাকিব, বিসিবি এবং ক্রিকেট



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

'উচিত' শব্দটা একবার লিখতে অন্তত তিনবার ভাবি। শব্দের ধার, ভার, গুরুত্ব বিবেচনায় আমাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমার্থক অন্য শব্দের আশ্রয় নিতে হয়। কারণ এই শব্দে স্রেফ মতামত-মন্তব্যই থাকে না, বেশি থাকে সিদ্ধান্ত। যদিও সিদ্ধান্ত মূলত ব্যক্তিগত, তবু এই সতর্কতা।

প্রসঙ্গের অবতারণা অন্যতম বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের সঙ্গে একটি স্পোর্টস নিউজ পোর্টালের পণ্যদূতের চুক্তি, বিসিবির অবস্থান এবং শেষমেশ সমাধান। প্রথমত চলতি ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান বিসিবিকে না জানিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। দ্বিতীয়ত ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনলাইন জুয়া খেলার একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক। 'বেট উইনার নিউজ' নামের ওই প্রতিষ্ঠানটিতে যদিও বলা হচ্ছে বেটিং কিংবা জুয়া খেলার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। এদিকে 'বেট উইনার' নামের একটি জুয়ার ওয়েবসাইট দেখা যাচ্ছে অনলাইনে, প্রতিষ্ঠানটি যতই বলুক সম্পর্ক নাই তাতে তাদের সরাসরি কিংবা দূরতম সম্পর্ক মিথ্যা হয়ে যায় না। জুয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক ভেড়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করে, এটাও হতে পারে তাদের কৌশলের অংশ।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বৈধতা নেই। জুয়া বিষয়ক কোন প্রতিষ্ঠানের প্রচারণাও স্বাভাবিকভাবে সিদ্ধ নয়। এক্ষেত্রে অনলাইন বেটিংয়ের নামাঙ্কিত কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাকিব অথবা কোন ক্রিকেটারের পণ্যদূত হওয়া উচিত নয়। কারণ তার তারকামূল্য অবৈধ ওইসব প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করবে। বিসিবির কঠোর অবস্থান তাই সঠিক এবং অভিভাবকসম। বিসিবির সাবেক-বর্তমান একাধিক দায়িত্বশীলের বিরুদ্ধে যতই আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক অভিযোগ থাকুক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব আছে, সাকিবের ক্ষেত্রে তারা সে দায়িত্ব পালন করেছে। তাদের বর্তমান ভূমিকা তাই সমর্থন করি।

'বেট উইনার নিউজ' নিজেদেরকে খেলাধুলা বিষয়ক অনলাইন নিউজ পোর্টাল দাবি করছে। নিউজ পোর্টাল হিসেবে তারা নিশ্চয় তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের অনুমতি চেয়েছে। অনুমতি চাইলে এই ওয়েসাইটের প্রকাশক-সম্পাদকসহ এর সঙ্গে জড়িত সকলের তথ্য মন্ত্রণালয়ে থাকার কথা। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক তাদের নিয়ে তদন্ত হওয়ার কথা, প্রতিবেদন পাওয়ার কথা; আবার সবগুলো ধাপ সম্পন্ন না হলে সেগুলো নিশ্চয় প্রক্রিয়াধীন। 'বেট উইনার' বেটিং সাইটের সঙ্গে বেট উইনার নিউজের সম্পর্ক আছে কি নাই সেটা তাই প্রশ্ন-পাল্টা প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রমাণ হয়ে পড়ার কথা, অন্তত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেই। এছাড়া কথিত এই স্পোর্টস নিউজ পোর্টাল যদি তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের অনুমতি না চায় তাহলে তাদের ওয়েবসাইট বাংলাদেশে বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

দেশে কয়েক হাজার অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিবন্ধন চেয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। গত ছয় বছরে মাত্র শতাধিক আবেদনের নিষ্পত্তি করতে পেরেছে মন্ত্রণালয়। 'বেট উইনার নিউজ' নিয়ে যখন আইনত অসিদ্ধ একটা বেটিং সাইটের যোগ বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মিটিংয়ে, সেখানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংস্থা উদ্যোগ নিতে পারে। বিটিআরসি চাইলে পারে বেট উইনার নিউজ পোর্টালকে দেশে বন্ধ করতে। কারণ সাকিবের পণ্যদূত হওয়া, বিসিবির কঠোর অবস্থান, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার পর বেট উইনারের নাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাকিব বেট উইনার নিউজের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানোর পরও তাদের যে প্রচার হয়েছে সেটাই যথেষ্ট তাদের পরিচিতি ও মার্কেটিংয়ে। চুক্তি বাতিলে সিদ্ধান্ত স্বত্ত্বেও সাকিবের তারকামূল্য এখানে ব্যবহার হয়েই গেছে।

ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক পরিচালক লোকমান হোসেন ভুইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পরেও বিসিবি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন লোকমান হোসেনকে তার 'বন্ধু' দাবি করে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় অভিযোগে 'বিস্মিত' হয়ে প্রমাণের অপেক্ষা করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট পাপনের একটা ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের পর খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী 'ছবিটি দেশের নয়' বলে ব্যবস্থা নিতে আইনি সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছিলেন। পরিচালক ও দলের সঙ্গে নিয়মিত বিদেশ সফর করতে থাকা সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন একটা ক্যাসিনোতে যাওয়ার ছবি প্রকাশের পর 'ডিনার করতে' গিয়েছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। এছাড়া আছে প্রেসিডেন্ট পাপনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। বিসিবির বেশিরভাগ বৈঠক সংস্থাটির অফিসে না করে নিজের করপোরেট অফিসে করেন, টস জিতলে ব্যাটিং নাকি ফিল্ডিং এটা পূর্ব-সিদ্ধান্তে করতে অধিনায়ককে চাপ দেন, দলে অযথা হস্তক্ষেপ করেন, প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়িয়ে নানা কথা বলাসহ একপ্রকার স্বেচ্ছাচারের পরিবেশ তৈরি করেছেন। সবকিছুতে তার হস্তক্ষেপের কারণে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবি দাঁড়াতে পারছে না। তার কথাই শেষ কথা, হুটহাট নানা কথা বলার কারণে কোন সিদ্ধান্ত নিতে তিনি কারও সঙ্গে আলোচনা করেন এমনটাও মনে হয় না। এতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবশালী হলেও প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবি দুর্বল হয়েছে, দিন-দিন আরও হচ্ছে।

বিসিবির যখন এমন পরিবেশ তখন সাকিবও বিসিবিকে পাত্তা দেন না, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রায়ই ভঙ্গ করেন। তিনি ইচ্ছে হলে খেলেন, না হলে ছুটি কাটান। বিদেশের বিভিন্ন ফ্রাঞ্চাইজি লিগের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ, এমন অভিযোগও আছে। আনুষ্ঠানিক ফটোসেশান প্রায়ই এড়িয়ে চলেন। তিনি জানেন তার বিকল্প তৈরি হয়নি। ফলে বিসিবির সঙ্গে তার দ্বৈরথ চলে প্রায়ই। যদিও এটাকে বেশিরভাগ লোক; পাপন-সাকিব দ্বন্দ্ব' বলে মনে করেন। এর কারণ মূলত একজন নিজেকে বিসিবিতে সর্বেসর্বা মনে করেন, অন্যজন দলে। এমন অবস্থায় প্রতিষ্ঠানে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি দলেও। এ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার আমাদের, এগুলো পরিহার করা উচিত।

সাকিব এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র সুপারস্টার, তবে তিনি নিশ্চয় সর্বশেষ নয়। আমাদের বিশ্বাস আরও অনেক ক্রিকেটার আসবে যারা সাকিবকেও ছাড়িয়ে যেতে পারেন। এমনটা হলে দেশের ক্রিকেটেরই মঙ্গল। সাকিব অনেকের 'আইডল', তাই তার সকল কিছু যে ভাবেই হওয়া উচিত যাতে ক্রিকেট থাকে ক্রিকেটের পথেই। একইসঙ্গে বিসিবিকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। স্বেচ্ছাচারের পরিবেশ রুখতে প্রয়োজনে ঢেলে সাজানো উচিত বিসিবিকে।

একক কর্তৃত্ব বিসিবিকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্বল করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক এই দুর্বলতায় জায়গায়-জায়গায় কর্তৃত্ববাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠেছে। দলে ও বিসিবিতে 'বিকল্প কোথায়' এই প্রচারণা-দাবি ও মনোভাব পরিহার করে ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। তা না হলে আমাদেরকে কিছুদিন পর পর এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে যেখানে ক্রিকেটই হুমকির মুখে থাকবে, অথচ আমরা এর নাম দেব 'সাকিব-পাপন দ্বৈরথ'!

আমরা সাকিবে মুগ্ধ ঠিক, কিন্তু সাকিব-অন্ধ নই; আমরা বিসিবি প্রেসিডেন্টে বিরক্ত, কিন্তু তার বিরোধিপক্ষ নই। আমাদের পক্ষ একটাই; ক্রিকেট, ক্রিকেট এবং ক্রিকেট!

;

সুখী হওয়ার জন্য জৈবিক উপাদানের ভূমিকা



প্রফেসর ড. মামুনুর রশীদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এই পৃথিবীতে সবাই সুখী হতে চায়। সবাই নিজের জীবনে সুখ এবং আনন্দ উপভোগ করতে চায়। সুখী হওয়ার জন্য ধনী গরিব সব শ্রেণীর মানুষের জীবনে চেষ্টার কোন কমতি থাকে না। যে ধনী যার অর্থ-বিত্ত, ধন-সম্পদ সবই আছে সেও যেমন সুখী হতে চায়, আবার যে গরিব যার সহায়-সম্পদ কিছুই নেই সেও সুখী হতে চায়। আবার অনেকেই নিজের স্বার্থহীন ভালোবাসা আর ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে প্রিয়জন, পরিবার, আত্বীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শী, বন্ধু-বান্ধবের সাথে সুখ এবং আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চায়। প্রিয়জনের এই ভালোবাসা আর ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে পরিবারে একে অন্যকে সুখী ও আনন্দমুখর রাখার প্রচেষ্টা সমাজে অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। পারিবারিক এবং সামাজিক অটুট বন্ধন এই সব ক্ষেত্রে গুরুপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। মানব সেবার মাধ্যমে এবং অন্যকে সুখ ও আনন্দ উপভোগ করতে সাহায্য করার মাধ্যমে অনেক মানুষ নিজের সুখ খুজে ফিরেন।  পার¯পারিক বন্ধন এবং ভালোবাসা সমাজে একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কর্তব্যপরায়ণ  এবং দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করে। স্বামী-স্ত্রীর, পরিবারের সদস্যদের এবং বন্ধুদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী, ইতিবাচক, এবং মজবুত সম্পর্ক বা বন্ধন সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, শারীরবৃত্তীয় এবং আচরণগত বৈশিষ্টকে প্রভাবিত করে। দৃঢ় সামাজিক বন্ধন মানুষকে একাকিত্ব, বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠা থেকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে এবং এর ফলে মানুষ সন্তুষ্ট, সুখ ও আনন্দ উপভোগ করে থাকে। সামাজিক বন্ধনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে (যেমন, বৈবাহিক সমস্যা, দ্বন্দ্ব, বিচ্ছিন্নতা, অবহেলা) মানুষের মানসিক এবং শারীরিক সুস্থতার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং এর ফলে মানুষের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার পরিলক্ষিত হতে পারে। নেতিবাচক সামাজিক সম্পর্কের কারণে সমাজে অশান্তি, হানাহানি, মারামারি এবং সামাজিক অবক্ষয় হয়ে থাকে। মজবুত সামাজিক বন্ধন পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রে সকল নারিগকের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে সুখ, শান্তি এবং আনন্দ প্রদান করতে পারে। পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রে অসহায়, দরিদ্র, লাঞ্ছিত, নিরূপিত মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে অপরকে সুখী করা মানবিক গুণাবলির মধ্যে অন্যতম।

এ বছর জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় আছে ফিনলান্ড। এই নিয়ে পঞ্চম বারের মত ইউরোপের এই ছোট দেশটি বিশ্বের সুখী দেশের তালিকায় প্রথম হলো। এর পরেই সুখী দেশের তালিকায় আছে ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ড। ১৫০টিরও বেশি দেশের মধ্যে সুখী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯৪তম। অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে কম সুখী দেশের তালিকায় আছে আফগানিস্তান। সুখী দেশের তালিকা করার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানবিদরা গ্যালাপ ওয়ার্ল্ড পোল (সূচকঃ আইন-শৃঙ্খলা, খাদ্য ও আশ্রয়, প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো, ভালো চাকরি, সুস্থতা, এবং মেধা লাভ) থেকে প্রাপ্ত ডেটা এবং পাশাপাশি প্রতিটি দেশের মানুষের ব্যক্তিগত সুস্থতার অনুভূতি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, জিডিপি ও দুর্নীতির মাত্রা, আয়ু এবং আরও অনেক কিছু সহ অন্যান্য বিষয়গুলির উপর ভিত্তি করে র‌্যাঙ্কিং তৈরি করেন। আমেরিকান বিজনেস ম্যাগাজিন ফর্বোস” এর সাথে সাক্ষাতে ফিনল্যান্ডের আল্টো ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ র্ফ্যাঙ্ক মার্টেলাকে (যিনি একজন দার্শনিক এবং এ ওয়ান্ডারফুল লাইফ-ইনসাইটস অন ফাইন্ডিং এ মিনিংফুল এক্সপেরিয়েন্স” বইয়ের লেখক) প্রশ্ন করেছিলেন ফিনল্যান্ড এত সুখী কেন। মার্টেলা উত্তরে বলেছিলেন, জীবনের সন্তুষ্টি উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলি কীভাবে এবং কতটুকু তাদের নাগরিকদের যত্ন নেয় ও সুরক্ষা দেয় সেটীই গুরুত্বপূর্ণ।

ডেল্লি ফেভ এবং তার গবেষকদল ২০১১ সালে সোশ্যাল ইন্ডিকেটরস রিসার্চ জার্নালে উল্লেখ করেন সুখ হল একটি আবেগ যা বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন এবং যার বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। অন্যদিকে যস্মিতা মারিয়া ডিসুজা এবং তার সহযোগীগণ ২০২০ সালে জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল এন্ড ডায়াগনস্টিক রিসার্চে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন সুখ একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যা মস্তিষ্কের বিশেষজ্ঞ কোষ দ্বারা নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণের ফলে অনুভুত হয়। যে নির্ধারকগুলি সুখ প্রদান করে থাকে সেগুলি হলো জৈবিক, জ্ঞানীয়, আচরণগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি। এর মধ্যে জৈবিক কারণগুলি হল এন্ডোজেনিক (দেহের ভিতরের) উপাদান যা মানুষের সুখকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে। সুখ ও মঙ্গলের জন্য অনুসন্ধান একটি ঐক্যবদ্ধ মানব অভিপ্রায় এবং বিশ্বস্তরে মানব সম্প্রীতি সৃষ্টির ভিত্তি। সুখী লোকেরা তাদের সামাজিক সম্পর্ক, পেশা এবং সামগ্রিক সুস্থতায় সফলতা লাভ করে থাকে। একাধিক গবেষণা এবং অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুখী হওয়া জেনেটিক্যালি কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত হয়, অন্যদের ক্ষেত্রে, এটি আয়, শিক্ষা ইত্যাদির মতো পরিবেশগত কারণগুলির দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে। আমাদের মস্তিষ্কের কিছু অংশ (অ্যামিগডালা, লিম্বিক সিস্টেম এবং হিপ্পোক্যাপ্লাস) থেকে নিঃসৃত কিছু হরমোন/নিউরোট্রান্সমিটার যেমন, ডোপামিন, সেরোটোনিন, অক্সিটোসিন, এন্ডোরফিনস, ইত্যাদি সুখ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এছাড়াও, মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্য মানুষকে সুখী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত যে, সুখ এবং আনন্দ লাভ করতে হলে মানুষের জৈবিক উপাদান এবং স্বাস্থ্য একটি

গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। সুতরাং, এটা পষ্ট যে সন্তুষ্টি বা সুখ এক বা দুটি কারণের উপজাত নয়, বরং বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণ। সুখকে উন্নীত করতে হলে বহিরাগত কারণের (আচরণগত, ভৌগলিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং জীবনের অভিজ্ঞতা) পাশাপাশি জৈবিক কারণগুলিও (হরমোন/নিউরোট্রান্সমিটার, জেনেটিক ফ্যাক্টর এবং নৃতাত্ত্বিক শ্রেণীকরণ) অন্যতম। নিচে জৈবিক কারণগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হরমোন/নিউরোট্রান্সমিটারের (সেরোটোনিন, ডোপামিন, অক্সিটোসিন এবং এনডরফিনস) ভুমিকা তুলে ধরা হলো।

সেরোটোনিনকে ‘হ্যাপি হরমোন’ বা সুখী হরমোন’ বা আত্ববিশ্বাসের অণু’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে যা সন্তুষ্টি, সুখ এবং আশাবাদের ক্ষেত্র তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণত, সেরোটোনিন নিঃসৃত হয় যখন কেউ ভালো কিছু অনুভব করে। বিচ্ছিন্নতা বা বিষণ্নতার সময়, সেরোটোনিনের মাত্রা কম থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, অবৈধ বা প্রতিকূল কার্যকলাপের সাথে সেরোটোনিন মাত্রা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। সেরোটোনিনের নিম্ম মাত্রার কারণে উদ্বেগ, ভয়, আতংক, হতাশা এবং বিষণ্নতার মত রোগ তৈরি হয়।  বিষণ্নতার ফলে মানুষের মনে নেতিবাচক (মন খারাপ, দুঃখ, ইত্যাদি) প্রভাব পরিলক্ষিত হয় যা পরবর্তীতে করুণ পরিণতি ডেকে আনে এবং মানুষকে নিঃশেষ করে দেয় তিলে তিলে। সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়ানোর চারটি উপায় হল সূর্যালোক, ম্যাসেজ, ব্যায়াম এবং সুখী ঘটনা মনে রাখা। প্রতিদিন, প্রায় ১০-১৫  মিনিটের জন্য রোদের সংস্পর্শে থাকা ভিটামিন ডি এর মাত্রা বাড়াতে পারে, যা সেরোটোনিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়। সাঁতার, দ্রুত হাঁটা, জগিং,পর্যাপ্ত ঘুম ইত্যাদি সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়াতেও কার্যকরি। ম্যাসেজ থেরাপি আমাদের মধ্যে সেরোটোনিন নিঃসরণ করার আরেকটি সাধারণ উপায়। বেশিরভাগ খাবারে (কলা, মটরশুটি, ডিম, ফলমূল, শাকসবজি, ইত্যাদি) সেরোটোনিন থাকে। ট্রিপটোফ্যান, ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন ডি এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো পুষ্টি ছাড়া আমাদের শরীর সেরোটোনিন তৈরি করতে পারে না।

ডোপামাইন ফিল-গুড’ হরমোন হিসাবে পরিচিত। এটি আনন্দের অনুভূতি দেয়। যখন কেউ আনন্দ অনুভব করে তখন এই হরমোন কিছু করার অনুপ্রেরণাও দেয়। ডোপামিন মস্তিষ্কের নার্ভের মাধ্যমে শারীরবৃত্তীয় কাজের প্রতিদান তৈরি করে থাকে। এজন্য এটিকে রিওয়ার্ড কেমিক্যাল” বা পুরস্কার অণু বলা হয়ে থাকে। শরীরে ডোপামিন পর্যাপ্ত পরিমান থাকলে আনন্দ এবং পুরস্কারের সাধনা বাড়ায় যা সুখের জন্য অপরিহার্য। চিনি এবং স্যাচুরেটেড চর্বিযুক্ত খাবারগুলি ডোপামিনকে দমন করতে পারে। খাদ্যে প্রোটিনের ঘাটতি হলে অথবা প্রোটিন তৈরির উপাদান টাইরোসিন এমাইনো এসিডের পরিমান কম হলে শরীরে ডোপামিন তৈরির ক্ষমতা কমে যায়। দেহে ডোপামিনের পরিমান কমে গেলে পারকিনসন রোগ এবং বিষণ্নতা দেখা দেয়। ডোপামিনের মাত্রা কমে গেলে শরীর ক্লান্ত ও মেজাজহীন হয়ে পড়ে, উৎসাহ এবং উদ্দীপনা হ্রাস পায় এবং অন্যান্য অনেক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে ডোপামিনের মাত্রা বাড়ানোর সেরা উপায়গুলো হলো: প্রচুর প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট জাতীয় খাবার গ্রহণ, প্রোবায়োটিক গ্রহণ, মটরশুটি খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, গান শোনা এবং ধ্যান করা। গবেষণায় দেখা গেছে যে সাধারণ ক্রিয়াকলাপ যেমন বাইরে ঘুরতে যাওয়া, কেনাকাটা করা, টিভিতে বিনোদনমুলক অনুষ্ঠান দেখা, প্রকৃতির সাথে সময় কাটানো, বাহিরে রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়া, গান শোনা, সবই ডোপামিন প্রবাহকে বাড়িয়ে দেয়।

অক্সিটোসিনকে কাডল হরমোন’ বা বন্ধন অণু’ বা ভালোবাসার হরমোন’ হিসাবে অভিহিত করা হয় কারণ আমরা যখন আলিঙ্গন করি, কাউকে জড়িয়ে ধরি বা মন থেকে ভালোবাসি তখন এটি নির্গত হয়। অক্সিটোসিনের মাত্রার সাথে মানুষের বন্ধন, বিশ্বাসের বিকাশ এবং সততার একটি সংযোগ রয়েছে এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্কগুলোকে সুরক্ষিত করে। জেনেটিক কারণ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং পুষ্টির ঘাটতি অক্সিটোসিনের মাত্রা হ্রাসের সম্ভাব্য কারণ। এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে, সমাজে মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব, হিংসা, নেতিবাচক চিন্তাভাবনা অক্সিটোসিনের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে। যাদের অক্সিটোসিন বেশি আছে তারা বেশি সুখী এবং তারা অতিরিক্ত আনন্দদায়ক সম্পর্ক রাখে। স্নেহপূর্ণ আলিঙ্গন এবং ভালোবাসার স্পর্শ অক্সিটোসিনের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয় এবং মানব বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করে। প্রোটিন, লিপিড, খনিজ পদার্থ, ভিটামিন, ডুমুর, অ্যাভোকাডো, তরমুজ, পালং শাক, গ্রিন টি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া এই প্রেমের হরমোনের সংশ্লেষণকে বাড়িয়ে দেয়। কম মাত্রার অক্সিটোসিন অনেক ধরনের জটিল মানসিক ব্যাধি তৈরির কারণ হতে পারে যেমন, অটিজম, সিজোফ্রেনিয়া এবং মেজাজ ও উদ্বেগজনিত রোগ। লীবারউথ এবং ওয়াং ২০১৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউরোসাইন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ করেন অক্সিটোসিন সামাজিক বন্ধন, স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ, এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একাকীত্ব, ভয়, সঙ্গীর সম্পর্ক এবং যৌন সমস্যাগুলির বিরুদ্ধে প্রতিকার হিসাবে এটি একটি সর্বজনীন প্রেমের হরমোন’ হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে।

এন্ডোরফিনকে পেইন-কিলার মলিকিউল’ বা ব্যথা-নাশক অণু’ হিসাবে অভিহিত করা হয় কারণ এই হরমোন ব্যথা উপশম করে এবং সুখকে চালিত করে। এন্ডোরফিন ব্যথার উপলব্ধি কমিয়ে দেয় এবং মরফিনের মতো শরীরে একটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। সুতরাং, এন্ডোরফিনকে স্ব-উৎপাদিত মরফিন হিসাবেও উল্লেখ করা হয়। যখন শরীরে ব্যথা বা চাপ অনুভব হয় তখন এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসৃত হয়। এগুলি মস্তিষ্কে উৎপাদিত হয় এবং দেহে বার্তাবাহক হিসাবে কাজ করে। এন্ডোরফিন ব্যথা উপশম করতে, মানসিক চাপ কমাতে এবং মেজাজ উন্নত করতে সাহায্য করে এবং সুস্থতার অনুভূতি দিতে সাহায্য করতে পারে। যাদের এন্ডোরফিনের অভাব রয়েছে তাদের ব্যথা, বিষণ্নতা, মেজাজের পরিবর্তন এবং আসক্তির মতো স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এন্ডোরফিনের অভাবের অন্যান্য প্রভাবগুলির মধ্যে ফাইব্রোমায়ালজিয়ার লক্ষণ থাকতে পারে, যা এমন একটি অবস্থা যেটা সারা শরীরে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা সৃষ্টি করে। এন্ডোরফিন হরমোন ব্যায়াম, যৌনতা, হাসি, নাচ এবং গান শোনার মতো কার্যকলাপের সময় উৎপাদিত হয়। সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি এবং ম্যাসেজ থেরাপি এন্ডোরফিনের মাত্রা বাড়াতে পারে। মশলাদার খাবার যেমন মরিচ এবং সবুজ মরিচ মুখের মধ্যে একটি ব্যথা সংবেদন তৈরি করার মাধ্যমে এন্ডোরফিনের বৃদ্ধিকে প্ররোচিত করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যে ডার্ক চকলেট খেলে এন্ডোরফিনের পরিমান বাড়তে পারে কারণ এতে কোকো পাউডার এবং ফ্ল্যাভোনয়েড নামক যৌগ থাকে যা মস্তিষ্কের জন্য এন্ডোরফিনের পরিমান বাড়াতে অনুকূল বলে মনে হয়।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি বুঝা যায় যে মানুষের অভ্যন্তরিন জৈবিক উপাদানগুলো সুখ এবং আনন্দ প্রদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সুখ এবং আনন্দ হলো একটি আবেগ যা জৈবিক উপাদানের নিঃসরণের মাধ্যমে তৈরি হয়, যা টাকা পয়সা খরচ করে আহরণ করা যায় না, কিন্তু কিছু সাধারণ জিনিস থেকে উদ্ভূত হতে পারে। নিজে সুখ এবং আনন্দ অনুভব করতে না পারলে অন্য কেউ বা কোন ভাবেই তাকে সন্তুষ্টি করানো সম্ভব নয়। আবার অনেকের বাহ্যিক সবকিছু (অর্থ-বিত্ত, ধন-সম্পদ) থাকার পরেও দেখা যায় সুখী হতে পারে না। সুখ এবং আনন্দ লাভের কারণগুলি সম্পর্কে আমাদের বোঝার উন্নতি করতে হবে এবং সুখকে নিয়ন্ত্রণ করে দেহের ভিতর এমন জানা অজানা পথগুলিকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

লেখক: প্রফেসর ড. মামুনুর রশীদ, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

;

বঙ্গমাতা: প্রেরণাদায়ী ও মমতাময়ী সহচর



খায়রুল আলম
বঙ্গমাতা : প্রেরণাদায়ী ও মমতাময়ী সহচর

বঙ্গমাতা : প্রেরণাদায়ী ও মমতাময়ী সহচর

  • Font increase
  • Font Decrease

একজন নারী । যিনি তার সারা জীবন বিলিয়ে  দিয়েছেন দেশ ও জাতির তরে। যার ত্যাগের কারণেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন দেশ ও একজন নেতা। যিনি বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। খোকা থেকে মুজিব, মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং সবশেষে বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে যে নারীর অবদান অনস্বীকার্য তিনি আর কেউ নন। তিনি আমাদের নারী জাতির অহংকার শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যিনি সোনার বাংলা বির্নিমানে আড়ালে অন্তরালে থেকে রেখেছেন অসামান্য অবদান।

যিনি কখনো নিজের সুখ সাচ্ছ্যন্দ ও ভোগ বিলাসের কথা ভাবেনি। ভেবেছেন দেশ, দেশের মানুষ আর নেতা কর্মীদের কথা। বঙ্গবন্ধুর বন্দি জীবনে দক্ষ হাতে সামলিয়েছেন ছেলে মেয়ে, সংসার এবং ভেবেছেন নেতা কর্মীদের কথা। সেই দক্ষ সংগঠক মহিয়সি নারী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

তিনি এক মহীয়সী নারীর অনন্য উদহারণ। যিনি নিজের ও পরিবারের স্বার্থ ত্যাগ করে কাজ করেছেন বাঙ্গালী জাতির জন্য। যেমন বলা যায় এই লেখাটির অংশবিশেষে: ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন,দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ,আপনি নিশ্চিত মনে সেই কাজে যান,আমার জন্য চিন্তা করবেন না।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলে থাকাকালে তার স্ত্রীর লেখা একটি চিঠির অংশ। এভাবেই স্বামীর পাশে থেকে সারাজীবন উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বিজয়লক্ষী নারী জাতির পিতার অর্ধাঙ্গীনী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। স্বাধীনতার জন্য বঙ্গমাতার মহান ত্যাগ ইতিহাসে চিরভাস্মর হয়ে আছে। পিতৃ-মাতৃহারা এক অনাথ শিশু জীবন শুরু করেছিলেন শত প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে। নিজের আন্তরিকতা, প্রচেষ্টা ও মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। 

১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট । শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক এবং হোসেন আরা বেগমের কোল আলো করে শ্রাবণের দুপুরে জন্ম নিল এক মহিয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছা যার ডাক নাম রেনু। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি তার পিতাকে হারান। তারপরে দু’বছরের মাথায় তার মাকে ও হারান। বড় বোন জিনাতুন্নেছা, ডাকনাম জিন্নি ও ছোট বোন ফজিলাতুন্নেছা এই দুই অনাথ শিশুর দায়িত্ব নেন বঙ্গমাতার দাদা শেখ মো. আবুল কাসেম। দাদার ইচ্ছায় মাত্র তিন বছর বয়সের ফজিলাতুন্নেছার সাথে দশ বছরের শেখ মুজিবুর রহমানের বিয়ে হয়। শাশুড়ি সায়রা খাতুন এবং শ্বশুর শেখ লুৎফর রহমানের কাছে তিনি বাড়ির বউ হয়ে থাকেননি, থেকেছেন নিজের সন্তান হয়ে। শিশু অবস্থায় বিয়ে হলেও বঙ্গমাতার সংসার শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর এন্ট্রান্স পাশের পর ১৯৪২ সালে।

ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্থানীয় একটি মিশনারি স্কুলে ভর্তি হলেও তার স্কুল জীবনের পড়ালেখা বেশি দূর এগোয়নি। তিনি ঘরে বসেই পড়ালেখা শিখেছেন। তারা যখন সংসার শুরু করেন, তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স ১৯ বছর আর ফজিলাতুন্নেছার বয়স ১০ বছর। স্বামী বাইরে থাকাকালীন ফজিলাতুন্নেছা অবসর সময়ে বিভিন্ন রকমের বই পড়তেন, গান শুনতেন।

বাংলাদেশের মুক্তির দীর্ঘ  সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও দেশ গঠনে, উচ্চারিত নাম মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির পিতার নামের সাথে শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত নামটি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যখনই আমরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলি তখনই বঙ্গমাতার নাম চলে আসে।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণের সঙ্গে বঙ্গমাতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জন বাঙালি নৌ ও সেনাবাহিনীর সদস্য এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র্রদ্রোহের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। বঙ্গবন্ধু এ মামলায় বিচলিত না হয়ে আইনিভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য আইনজীবীদের অর্থ জোগানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন। এ মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবিতে বাঙালি রাস্তায় নামে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজপথ বিক্ষোভে জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

বঙ্গবন্ধু কলকাতায় লেখাপড়া ও রাজনীতি করতেন, দফায় দফায় কারাবরণ করেছেন। এই নিয়ে কোন অভিযোগ ছিলনা তার। বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, “রেনু খুব কষ্ট করত কিন্তু কিছুই বলতোনা। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করে রাখত। যাতে আমার কষ্ট না হয়।”

১৯৪৪ সালের ডিসেম্বরে তাদের প্রথম সন্তান জন্মের সময় মারা যায়। দুই কন্যা ও তিন পুত্র সন্তানের মধ্যে ’৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহন করেন কন্যা শেখ হাসিনা, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৯ সালে পুত্র শেখ কামাল, ১৯৫৩ সালে শেখ জামাল, ১৯৫৭ সালে কন্যা শেখ রেহানা, ১৯৬৪ সালে পুত্র রাসেল জন্মগ্রহন করে।

অনন্য মানবিক গুণাবলী ছিল তার। ঘরে বসে নিজেই স্কুল খুলে মেয়েদের লেখাপড়া ও সেলাই শেখাতেন। গরীব ছেলেমেয়ে, এতিম, কন্যাদায়গ্রস্থ পিতামাতাকে অর্থ সাহায্য করতেন। দলের নেতাকর্মীদের চিকিৎসার খরচ যোগাতেন। সংগঠন ও আন্দোলন সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর প্রয়োজন মেটাতে নিজের সম্পদ বিলিয়ে দিতেন। তার কাছ থেকে কেউ কোনদিন রিক্ত হস্তে ফেরেনি।

এ প্রসঙ্গে কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,“বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনীতিক জীবন, লড়াই, সংগ্রামে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে, কিন্তু কখনো মাকে ভেঙ্গে পড়তে দেখিনি। যতো কষ্টই হোক আমার বাবাকে কখনোই বলেননি যে তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও বা সংসার কর বা খরচ দাও। আব্বা যে পদক্ষেপ নিতেন সেটাকেই সমর্থন করতেন তিনি।”

নিজের জমানো টাকা ও আবাসন ঋণ নিয়ে ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়ি নির্মান করেন। এ প্রসঙ্গে বেবী মওদুদ ‘মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন নেছা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “সব কাজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করতেন। খরচ বাঁচানোর জন্য নিজের হাতে পানি দেয়া, ইট ভেজানোসহ বহু শ্রম, যত্ন ও মমতা দিয়ে বত্রিশ নম্বরের বাড়িটি নির্মান করেন।”

জাতির এক সন্ধিক্ষণে বঙ্গমাতা মুজিবের একটি সিদ্ধান্ত বাঙালিকে মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্যারলে মুক্তি নিতে চাপ দেওয়া হয়। মাকে ভয় দেখানো হয়েছিল ‘পাকিস্তানিদের শর্ত না মানলে তিনি বিধবা হবেন।’ কিন্তু মা কোনো শর্তে মুক্তিতে রাজি হননি। আব্বাও প্যারলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে পাকিস্তান সরকার আব্বাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।”

১৯৬৬ এর ৫ ফেব্রুয়ারি, বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। ৮ মে নারায়নগঞ্জে ছয়দফার সমর্থনে জনসভা করে ঘরে ফেরার পর গভীর রাতে গ্রেফতার হন। ঐ সময় ছয়দফা না আটদফা বিভ্রান্তিতে অনেক নেতাও আটদফার পক্ষে কথা বলেন। ছয়দফা থেকে একচুলও নড়া যাবে না- বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশ বাস্তবায়নে বঙ্গমাতা ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। ছয়দফার সমর্থনে বোরকা পরে জনসংযোগ করেন।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বঙ্গমাতার বুদ্ধিমত্তার ছাপ। ওইদিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বঙ্গমাতার জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ৭ মার্চ ভাষণের আগে কতজনের কত পরামর্শ, আমার আব্বাকে পাগল বানিয়ে ফেলছে! সবাই এসেছে-এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে। আমার মা আব্বাকে খাবার দিলেন, ঘরে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। আব্বাকে সোজা বললেন, তুমি ১৫টা মিনিট শুয়ে বিশ্রাম নিবা। অনেকেই অনেক কথা বলবে। তুমি সারা জীবন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল খেটেছ। তুমি জান কী বলতে হবে? তোমার মনে যে কথা আসবে, সে কথা-ই বলবা।

৭১ এর ২৫মার্চ, দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বত্রিশ নম্বর বাড়ি আক্রমন করে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনারা। বঙ্গমাতা ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রথমে পাশের বাসায় আশ্রয় নেন। বত্রিশ নম্বর বাড়ি তছনছ করে, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মা বাবার সামনে বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। বড় ছেলে শেখ কামাল ২৫ মার্চ রাতেই মুক্তিযুদ্ধে যান, আটক অবস্থায় শেখ জামাল ও যান। উনিশবার জায়গা বদল করেও রেহাই পেলেন না, একদিন মগবাজারের বাড়ি থেকে ছেলে-মেয়ে সহ বঙ্গমাতাকে গ্রেফতার করে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের একটি বাড়িতে রাখে পাকসেনারা, বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন কিনা জানতেন না। বন্দি অবস্থায় কন্যা শেখ হাসিনার সন্তান জন্ম নেয়ার সময় তাকে একবারের জন্যও ঢাকা মেডিক্যালে যেতে দেয়া হয়নি।

কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ‘একজন আদর্শ মায়ের প্রতিকৃতি’ লেখায় এ প্রসঙ্গে বলেছেন,“জুলাই মাসের শেষ দিকে হাসু আপা হাসপাতালে গেল। মা যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েও যেতে পারলেন না। সৈন্যরা তাকে যেতে দিলনা। বলল, ‘তুমি কি নার্স না ডাক্তার যে সেখানে যাবে’ মা খুব কষ্ট পেয়ে সারারাত কেঁদেছিলেন।” বন্দি অবস্থায় তিনি অসুস্থ্য শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করান তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (যা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়), সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, খবরাখবর আদান প্রদান করতেন।

তাদের যুদ্ধ দিনের বন্দীদশার অবসান ঘটে ১৭ ডিসেম্বর। মুক্তি পেয়ে বঙ্গমাতা বাড়ির ছাদ থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে টুকরো টুকরো করে আগুন ধরিয়ে দেন। জয় বাংলা শ্লোগান দেন। এসময় হাজার হাজার জনতা ছুটে আসে।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর সেখান থেকেই লন্ডনে যান। লন্ডন থেকেই বেগম মুজিবের সঙ্গে তার প্রথম কথা হয়। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। অবসান ঘটে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার দীর্ঘ প্রতীক্ষার। এরপর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজেও বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়ান তিনি। অনেক বীরাঙ্গনাকে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন জীবন দেন। 

স্বাধীনতার পর বীরাঙ্গনাদের উদ্দেশ্যে বঙ্গমাতা বলেন, ‘আমি তোমাদের মা।’ তিনি বলেন, ‘এই বীরাঙ্গনা রমণীদের জন্য জাতি গর্বিত। তাদের লজ্জা কিংবা গ্লানিবোধের কোনো কারণ নেই। কেননা তারাই প্রথম প্রমাণ করেছেন যে, কেবল বাংলাদেশের ছেলেরাই নয়, মেয়েরাও আত্মমর্যাদাবোধে কী অসম্ভব বলীয়ান। (দৈনিক বাংলার বাণী, ১৭ ফাল্গুন, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ)। ’

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা অবিছিন্ন সত্তা ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থে মযহারুল ইসলাম লিখেছেন, “আমি বঙ্গবন্ধুর অনাবিল সাক্ষাতকার লাভ করেছি। একবার তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে দুটো বৃহৎ অবলম্বন আছে-- একটি আমার আত্মবিশ্বাস, অপরটি --- তিনি একটু থেকে আমাকে বললেন, অপরটি বলুন তো কি?’ হঠাৎ এ-রকম একটি প্রশ্নের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি একটু মৃদু হেসে বললেন,‘অপরটি আমার স্ত্রী, আমার আকৈশোর গৃহিণী।”

তিনি বঙ্গবন্ধুকে শক্তি, সাহস, মনোবল, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, বঙ্গবন্ধু ‘জাতির পিতা’ হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু জীবনে যত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন সবটাতেই বঙ্গমাতা তাকে ছায়ার মত সাহায্য করেছেন। ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম বলেন,“রেণু ছিলেন নেতা মুজিবের Friend, Philosopher and Guide.”।

৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাঙালী জাতির জীবনে নিকষ কালো অধ্যায়। খুনী মোশতাক, খুনী জিয়া বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গমাতা সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে ঘাতকদের বলেন,“তোমরা আমাকে এখানেই মেরে ফেল।” জীবনের মত মরণেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী হলেন এই মহাপ্রাণনারী।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং শ্রেষ্ঠ স্মরনীয় মানবী। বিশ শতকের প্রথমার্ধে নারীর অবরোধের বেড়াজাল উপেক্ষা করে সাহসী পদক্ষেপে বেরিয়ে আসেন তিনি। সহধর্মিণী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে আজীবন প্রিয়তম স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়াসঙ্গী ছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ইতিহাসের কালজয়ী মহানায়ক শেখ মুজিবের অনুপ্রেরণাদায়িনী হয়ে পাশে ছিলেন। বাঙালি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ধাপে বঙ্গমাতার অবদান রয়েছে। আর সেটা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবে নয়, একজন দক্ষ নারী সংগঠক হিসেবে। যিনি ধূপের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়সম আসনে অধিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছেন।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক , ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন(ডিইউজে)

;

স্বপ্ন বাস্তবায়নে সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স



মো. কামরুল ইসলাম
স্বপ্ন বাস্তবায়নে সঠিক পরিকল্পনায় এগিয়ে চলছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

স্বপ্ন বাস্তবায়নে সঠিক পরিকল্পনায় এগিয়ে চলছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের আকাশ পরিবহনে বন্ধ হওয়ার মিছিল যখন দীর্ঘায়িত হচ্ছিল, ঠিক তখনই দেশের সর্বকনিষ্ঠ এয়ারলাইন্স হিসেবে দেশের এভিয়েশনে আবির্ভাব ঘটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের। অনেক স্বপ্নকে সাথে নিয়ে ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই ঢাকা থেকে যশোরে ড্যাশ৮-কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে যাত্রা শুরু করে। দেশের আকাশ পরিবহনে যাত্রীদের অনেক না পাওয়ার আক্ষেপ রয়েছে। সেই অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দিতেই ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের আকাশ পরিবহনে একটি নিশানা ঠিক করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।

যাত্রা শুরুর পর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স সর্বপ্রথম যে সিদ্ধান্তটা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তা হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে সবগুলো বিমানবন্দরে প্রথম বছরেই ফ্লাইট পরিচালনা করা। সেবা আর সময়ানুবর্তীতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাত্রীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চারন ঘটিয়েছে ইউএস-বাংলা। এক বছর শেষ হওয়ার পূর্বেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, যশোর, সৈয়দপুর, রাজশাহী ও বরিশালে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে।

পরিকল্পনার মাঝে ইউএস-বাংলা দেশের অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের প্রতিটি গন্তব্যে ডে-রিটার্ণ ফ্লাইট সূচী দিয়ে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনাকে সহজ করে দিয়েছে, যার ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। বরিশাল ও রাজশাহীতে যেখানে অন্য এয়ারলাইন্সগুলো প্রতিদিন একটি ফ্লাইট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই অনেক সময় ব্যয় করেছে, সেখানে ইউএস-বাংলা প্রতিদিন দু’টি করে ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে শুরু থেকে। সিলেটে একটি ফ্লাইটের সূচীই যেখানে বিগত দিনে বন্ধ হওয়া কিংবা বর্তমানে চালু এয়ারলাইন্সগুলো  নিয়মিত পরিচালনা করতে বেগ পেতে হয় সেখানে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বৃহত্তর সিলেটবাসীর কাছে প্রতিজ্ঞাস্বরূপ প্রতিদিন ঢাকা থেকে সর্বোচ্চ চারটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে। 

সঠিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউএস-বাংলা যাত্রা শুরুর পর দু’বছর অতিক্রম করার পূর্বেই ঢাকা থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যাত্রা শুরু করে।

তিনটি ড্যাশ৮ –কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে যাত্রা শুরুর পর তিন বছরের মধ্যে বহরে বড় এয়ারক্রাফট যোগ করার পরিকল্পনা ছিলো। যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব এশিয়ার দেশ গুলোতে বিচরণ করা সহজ হয়। যার ফলশ্রুতিতে বহরে ২টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট যোগ করা হয়। বাংলাদেশের নাগরিকদের সেবা দেয়ার মানসিকতায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গন্তব্য মাস্কাট, দোহা, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জনপ্রিয় গন্তব্য কলকাতায় নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে তৃতীয় বছর থেকে।

স্বাধীনতার পর প্রায় ৪৬ বছরে বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি এয়ারলাইন্স কিংবা জাতীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চীনের কোনো প্রদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারেনি। জিএমজি এয়ারলাইন্স, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ কিংবা রিজেন্ট এয়ারওয়েজ সবাই শুধু স্বপ্ন দেখেছে কিন্তু বাস্তবে কেউ তা পূরণ করতে পারেনি এমনকি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও চীনে ফ্লাইট পরিচালনার স্বপ্ন দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। অথচ চীন সিভিল এভিয়েশন অথরিটির সকল ধরনের শর্ত পূরণ করে চার বছরের অধিক সময় ধরে ২০১৮ এর ২৬ এপ্রিল থেকে ঢাকা থেকে চীনের অন্যতম গন্তব্য গুঢয়াংজুতে প্রতিনিয়ত ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে। এমনকি করোন মহামারির সময়েও বাংলাদেশ থেকে একটি মাত্র রুট উন্মুক্ত ছিলো তা হচ্ছে ঢাকা-গুয়াংজু।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ চিকিৎসা সেবার জন্য ভারতের বিভিন্ন  গন্তব্যে ভ্রমণ করে থাকে। চিকিৎসা সেবার জন্য সবচেয়ে বেশী যাত্রী ভ্রমণ করে থাকে ভারতের চেন্নাই। অথচ স্বাধীনতার পর একমাত্র এয়ারলাইন্স হিসেবে ইউএস-বাংলা গত চার বছর ধরে প্রতিদিন ঢাকা থেকে চেন্নাই ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে। ভারতের চেন্নাই কিংবা চীনের গুয়াংজু সবই ইউএস-বাংলার সুষ্ঠু পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন।  

আকাশপথের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানবহরে প্রতিনিয়ত উড়োজাহাজ যুক্ত করে চলেছে। বর্তমানে বহরে ১৬টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ৬টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, ৭টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০ আর ৩টি ড্যাশ৮-কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স যাত্রীদের নিরাপত্তা আর সেবাকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলের জন্য ব্র্যান্ডনিউ এয়ারক্রাফট দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। বাংলাদেশে বেসরকারী বিমান পরিবহনের ইতিহাসে ইউএস-বাংলাই সর্বপ্রথম ব্র্যান্ডনিউ এয়ারক্রাফট দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। এয়ারক্রাফটগুলোর গড় আয়ূ ১০ বছরের নীচে রাখার কাজ করছে ইউএস-বাংলা।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা দেয়ার ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইউএস-বাংলা শারজাহ, দুবাই, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ মালদ্বীপের রাজধানী মালে, পূর্ব এশিয়ার অন্যতম পর্যটন গন্তব্য থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে চট্টগ্রাম থেকে কলকাতা ফ্লাইট পরিচালনার মধ্য দিয়ে প্রতিদিন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনা করবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

নিকট ভবিষ্যতে ভারতের রাজধানী দিল্লী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবী, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম গন্তব্য সৌদি আরবের জেদ্দা, রিয়াদ, মদিনা, দাম্মাম রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

চলতি বছর বহরে ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ও ৩টি এটিআর৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট ইউএস-বাংলার বিমানবহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্য ও ২০২৫ সালের মধ্যে উত্তর আমেরিকার টরেন্টো ও নিউইয়র্ক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত রয়েছে ইউএস-বাংলার।

১৭ জুলাই ২০২২, নয় বছরে পদার্পণ করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। স্বল্প সময়ের যাত্রায় ইউএস-বাংলা শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের এভিয়েশনের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ইউএস-বাংলা শুধু স্বপ্ন দেখে না, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। 

লেখক- মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;