সাকিব, বিসিবি এবং ক্রিকেট



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

'উচিত' শব্দটা একবার লিখতে অন্তত তিনবার ভাবি। শব্দের ধার, ভার, গুরুত্ব বিবেচনায় আমাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমার্থক অন্য শব্দের আশ্রয় নিতে হয়। কারণ এই শব্দে স্রেফ মতামত-মন্তব্যই থাকে না, বেশি থাকে সিদ্ধান্ত। যদিও সিদ্ধান্ত মূলত ব্যক্তিগত, তবু এই সতর্কতা।

প্রসঙ্গের অবতারণা অন্যতম বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের সঙ্গে একটি স্পোর্টস নিউজ পোর্টালের পণ্যদূতের চুক্তি, বিসিবির অবস্থান এবং শেষমেশ সমাধান। প্রথমত চলতি ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান বিসিবিকে না জানিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। দ্বিতীয়ত ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনলাইন জুয়া খেলার একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক। 'বেট উইনার নিউজ' নামের ওই প্রতিষ্ঠানটিতে যদিও বলা হচ্ছে বেটিং কিংবা জুয়া খেলার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। এদিকে 'বেট উইনার' নামের একটি জুয়ার ওয়েবসাইট দেখা যাচ্ছে অনলাইনে, প্রতিষ্ঠানটি যতই বলুক সম্পর্ক নাই তাতে তাদের সরাসরি কিংবা দূরতম সম্পর্ক মিথ্যা হয়ে যায় না। জুয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক ভেড়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করে, এটাও হতে পারে তাদের কৌশলের অংশ।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বৈধতা নেই। জুয়া বিষয়ক কোন প্রতিষ্ঠানের প্রচারণাও স্বাভাবিকভাবে সিদ্ধ নয়। এক্ষেত্রে অনলাইন বেটিংয়ের নামাঙ্কিত কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাকিব অথবা কোন ক্রিকেটারের পণ্যদূত হওয়া উচিত নয়। কারণ তার তারকামূল্য অবৈধ ওইসব প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করবে। বিসিবির কঠোর অবস্থান তাই সঠিক এবং অভিভাবকসম। বিসিবির সাবেক-বর্তমান একাধিক দায়িত্বশীলের বিরুদ্ধে যতই আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক অভিযোগ থাকুক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব আছে, সাকিবের ক্ষেত্রে তারা সে দায়িত্ব পালন করেছে। তাদের বর্তমান ভূমিকা তাই সমর্থন করি।

'বেট উইনার নিউজ' নিজেদেরকে খেলাধুলা বিষয়ক অনলাইন নিউজ পোর্টাল দাবি করছে। নিউজ পোর্টাল হিসেবে তারা নিশ্চয় তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের অনুমতি চেয়েছে। অনুমতি চাইলে এই ওয়েসাইটের প্রকাশক-সম্পাদকসহ এর সঙ্গে জড়িত সকলের তথ্য মন্ত্রণালয়ে থাকার কথা। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক তাদের নিয়ে তদন্ত হওয়ার কথা, প্রতিবেদন পাওয়ার কথা; আবার সবগুলো ধাপ সম্পন্ন না হলে সেগুলো নিশ্চয় প্রক্রিয়াধীন। 'বেট উইনার' বেটিং সাইটের সঙ্গে বেট উইনার নিউজের সম্পর্ক আছে কি নাই সেটা তাই প্রশ্ন-পাল্টা প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রমাণ হয়ে পড়ার কথা, অন্তত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেই। এছাড়া কথিত এই স্পোর্টস নিউজ পোর্টাল যদি তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের অনুমতি না চায় তাহলে তাদের ওয়েবসাইট বাংলাদেশে বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

দেশে কয়েক হাজার অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিবন্ধন চেয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। গত ছয় বছরে মাত্র শতাধিক আবেদনের নিষ্পত্তি করতে পেরেছে মন্ত্রণালয়। 'বেট উইনার নিউজ' নিয়ে যখন আইনত অসিদ্ধ একটা বেটিং সাইটের যোগ বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মিটিংয়ে, সেখানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংস্থা উদ্যোগ নিতে পারে। বিটিআরসি চাইলে পারে বেট উইনার নিউজ পোর্টালকে দেশে বন্ধ করতে। কারণ সাকিবের পণ্যদূত হওয়া, বিসিবির কঠোর অবস্থান, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার পর বেট উইনারের নাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাকিব বেট উইনার নিউজের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানোর পরও তাদের যে প্রচার হয়েছে সেটাই যথেষ্ট তাদের পরিচিতি ও মার্কেটিংয়ে। চুক্তি বাতিলে সিদ্ধান্ত স্বত্ত্বেও সাকিবের তারকামূল্য এখানে ব্যবহার হয়েই গেছে।

ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক পরিচালক লোকমান হোসেন ভুইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পরেও বিসিবি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন লোকমান হোসেনকে তার 'বন্ধু' দাবি করে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় অভিযোগে 'বিস্মিত' হয়ে প্রমাণের অপেক্ষা করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট পাপনের একটা ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের পর খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী 'ছবিটি দেশের নয়' বলে ব্যবস্থা নিতে আইনি সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছিলেন। পরিচালক ও দলের সঙ্গে নিয়মিত বিদেশ সফর করতে থাকা সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন একটা ক্যাসিনোতে যাওয়ার ছবি প্রকাশের পর 'ডিনার করতে' গিয়েছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। এছাড়া আছে প্রেসিডেন্ট পাপনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। বিসিবির বেশিরভাগ বৈঠক সংস্থাটির অফিসে না করে নিজের করপোরেট অফিসে করেন, টস জিতলে ব্যাটিং নাকি ফিল্ডিং এটা পূর্ব-সিদ্ধান্তে করতে অধিনায়ককে চাপ দেন, দলে অযথা হস্তক্ষেপ করেন, প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়িয়ে নানা কথা বলাসহ একপ্রকার স্বেচ্ছাচারের পরিবেশ তৈরি করেছেন। সবকিছুতে তার হস্তক্ষেপের কারণে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবি দাঁড়াতে পারছে না। তার কথাই শেষ কথা, হুটহাট নানা কথা বলার কারণে কোন সিদ্ধান্ত নিতে তিনি কারও সঙ্গে আলোচনা করেন এমনটাও মনে হয় না। এতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবশালী হলেও প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবি দুর্বল হয়েছে, দিন-দিন আরও হচ্ছে।

বিসিবির যখন এমন পরিবেশ তখন সাকিবও বিসিবিকে পাত্তা দেন না, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রায়ই ভঙ্গ করেন। তিনি ইচ্ছে হলে খেলেন, না হলে ছুটি কাটান। বিদেশের বিভিন্ন ফ্রাঞ্চাইজি লিগের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ, এমন অভিযোগও আছে। আনুষ্ঠানিক ফটোসেশান প্রায়ই এড়িয়ে চলেন। তিনি জানেন তার বিকল্প তৈরি হয়নি। ফলে বিসিবির সঙ্গে তার দ্বৈরথ চলে প্রায়ই। যদিও এটাকে বেশিরভাগ লোক; পাপন-সাকিব দ্বন্দ্ব' বলে মনে করেন। এর কারণ মূলত একজন নিজেকে বিসিবিতে সর্বেসর্বা মনে করেন, অন্যজন দলে। এমন অবস্থায় প্রতিষ্ঠানে যেমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি দলেও। এ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার আমাদের, এগুলো পরিহার করা উচিত।

সাকিব এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র সুপারস্টার, তবে তিনি নিশ্চয় সর্বশেষ নয়। আমাদের বিশ্বাস আরও অনেক ক্রিকেটার আসবে যারা সাকিবকেও ছাড়িয়ে যেতে পারেন। এমনটা হলে দেশের ক্রিকেটেরই মঙ্গল। সাকিব অনেকের 'আইডল', তাই তার সকল কিছু যে ভাবেই হওয়া উচিত যাতে ক্রিকেট থাকে ক্রিকেটের পথেই। একইসঙ্গে বিসিবিকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। স্বেচ্ছাচারের পরিবেশ রুখতে প্রয়োজনে ঢেলে সাজানো উচিত বিসিবিকে।

একক কর্তৃত্ব বিসিবিকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্বল করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক এই দুর্বলতায় জায়গায়-জায়গায় কর্তৃত্ববাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠেছে। দলে ও বিসিবিতে 'বিকল্প কোথায়' এই প্রচারণা-দাবি ও মনোভাব পরিহার করে ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। তা না হলে আমাদেরকে কিছুদিন পর পর এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে যেখানে ক্রিকেটই হুমকির মুখে থাকবে, অথচ আমরা এর নাম দেব 'সাকিব-পাপন দ্বৈরথ'!

আমরা সাকিবে মুগ্ধ ঠিক, কিন্তু সাকিব-অন্ধ নই; আমরা বিসিবি প্রেসিডেন্টে বিরক্ত, কিন্তু তার বিরোধিপক্ষ নই। আমাদের পক্ষ একটাই; ক্রিকেট, ক্রিকেট এবং ক্রিকেট!

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহালে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে



আদম তমিজী হক
আদম তমিজী হক

আদম তমিজী হক

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশব্যাপী বইছে নির্মল সম্প্রীতি থেকে উৎসারিত উৎসবের ফল্গুধারা। শারদীয় দুর্গোৎসব পালনের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও কল্যাণময় অবস্থানের বিকাশ আরও বিস্তৃত এবং বিকশিত হবে। পরাজয় ঘটবে অশুভ শক্তির- এই মর্মবাণী ধারণ করে শুরু হয়েছে দেবী দুর্গার বন্দনা।

এই শারদীয় উৎসব আমাদের শত শত বছরের ঐহিত্য। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ নানাভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যাবতীয় দুঃখ ভুলে গিয়ে হিংসা-বিদ্বেষের উর্ধ্বে উঠে প্রীতির মেলবন্ধন রচনার মাধ্যমে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। অসুরের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন দুর্গতিনাশিনী দুর্গা। সেই থেকে বিজয় ঘটে শুভশক্তির। দেবীর আগমন ঘটে অন্যায়ের বিনাশ ঘটিয়ে সজ্জনদের প্রতিপালনের অঙ্গীকার নিয়ে মানুষের মধ্যে নৈতিক আদর্শ জাগ্রত করার জন্য। মানুষের চিত্ত থেকে যাবতীয় দীনতা ও কলুষতা দূরীভূত করার জন্য।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দুর্গাপূজা উদযাপনে বিঘ্নিত করার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধ পরিকর।’

ধর্মীয় সূত্র অনুযায়ী বলা যায় যে,  প্রতি শরতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বর্গলোক কৈলাস ছেড়ে মর্তে আসেন দেবী দুর্গা। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে নির্দিষ্ট তিথি পর্যন্ত বাবার বাড়িতে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে। দেবীর অবস্থানকালে পাঁচদিন পৃথিবীতে ভক্তরা দেবী মায়ের বন্দনা করে। এই বন্দনাকে কেন্দ্র করে দেশবাসী মেতে ওঠে উৎসব আনন্দে। ধর্ম মানুষে মানুষে প্রীতি, প্রেম, সহিষ্ণুতা, ঐক্য ও শান্তির ডাক দিয়ে যায়। তারপরও অসুরের আকস্মিক উন্মত্ততা নষ্ট করে দেয় আবহমানকালের প্রীতিধন্য পারস্পরিক অবস্থানকে, ধ্বংস করে দেয় দীর্ঘকালীন হৃদ্যতাকে। প্রতিবছর মঙ্গলদাত্রী দেবী দুর্গার আগমন ঘটে কল্যাণ ও শান্তিকে সংস্থাপন করার জন্য এবং তা প্রতিবছরই। তিনি ন্যায়ের উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে যান সবাইকে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। প্রতিটি উৎসব নিরাপদ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে এমনটিই আমরা দেখতে চাই। পূজা মণ্ডপের নিরাপত্তার ব্যাপারে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে বাস্তবেও এর প্রতিফলন দেখতে চাই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার্থে নাগরিক দায়িত্বও কিন্তু কম নয়। এ ব্যাপারে সবাই আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসবেন-এমনই দেখতে চায় দেশের মানুষজন।

বর্তমানে এ দেশে দুর্গোৎসব কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচার-অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসব উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ সময়টাতে আগমনী সুর জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব বাঙালিকেই দোলা দিয়ে যায়। শরতের শুভ্র আকাশ, কাশফুলে হাওয়ার নাচন আর আগমনী ঢাক-শাঁখের আওয়াজ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। গ্রাম-নগরে ধনী-গরিব ছোট-বড় সবাই মিলিত হন শরতের মিলনোৎসবে। দেশের মিডিয়াগুলোও এটিকে সার্বজনীন উৎসব গণ্য করে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সাজায়। এটি অনুপম সম্প্রীতি চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।

এ উৎসব ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত থাকবে। যেন কোনো ধরনের অঘটন না ঘটে। পূজা বানচালের জন্য উগ্র সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় গোষ্ঠি সবসময় তৎপর থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড নিতে দেখা যায়। গত বছর কুমিল্লায় পূজা মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরীফ রাখাকে কেন্দ্র করে বহু পূজা মণ্ডপে তাণ্ডব চালানো হয়। এর সঙ্গে ধর্মীয় উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি জড়িত ছিল। এবার যেন সে রকম কিছু না ঘটে তার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগেভাগে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করায় সাধুবাদ।

প্রতিবছরই আমরা দেখি, পূজা আসার আগে থেকেই শুরু হয় প্রতিমা ভাঙার উৎসব। আগে বুঝত ঋতু দেখে, এখন প্রতিমা ভাঙার খবর পড়তে পড়তেই বাঙালি বুঝতে পারে দুর্গা পূজা সমাগত। সেই গোষ্ঠী বাংলাদেশে পূজা উদযাপন বন্ধ করতে চায়। এটা বন্ধ করে তারা সেই এই সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করার আয়োজন করে। গতবার ছিল তার চূড়ান্ত রূপ। যারা এমনটা করে তারা এখন নারীর কপালের টিপ নিয়ে কথা বলে, পোশাক নিয়ে কথা বলে। সেক্যুলার রাজনীতির ব্যর্থতায় রাষ্ট্রকাঠামোই সেদিকে ধাবিত হচ্ছে এবং সেটি এমন এক সংস্কৃতির জাগরণ ঘটাচ্ছে যা আসলে সংখ্যাগুরুর ধর্ম ও সামাজিকতা আধিপত্য কায়েম করছে। সে এখন চায় এদের নীতিকেই জাতীয় রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।

রাজনীতি ও সমাজের নীতিপুলিশি এখন নিয়মিত নজরদারি করে সংখ্যালঘুর ওপর। এই রাষ্ট্রে সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুষঙ্গগুলো ক্রমে সংস্কৃতির উপাদান হয়ে উঠছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ, নারী হলে আরও বেশি করে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। সমাজের সব স্তরে সংখ্যাগুরুর ধর্ম, সংস্কৃতির অভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে, উদযাপিত হচ্ছে। রাষ্ট্রের বর্তমান নিয়ন্ত্রকরা তাকে অগ্রাধিকার দেওয়াকেই স্বাভাবিক বলে দেখান। আর সেই সংস্কৃতির দাপটে সংখ্যালঘুর অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গতবারের কুমিল্লার ঘটনায় বোঝা গেল যেটুকু বা অধিকার সুরক্ষিত আছে, আজ তা লুণ্ঠিত হওয়ার পথে।

তবে উৎসব-পার্বণ পালনের মধ্য দিয়েই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় হোক। আমাদের মনের সব হিংসা, দ্বেষ, কালিমা দূর হয়ে যাক। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে আমরা সুখ ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাব- এই হোক প্রার্থনা। বাঙালির চিরায়ত এই উৎসব হোক আনন্দের, উৎসব হোক নিরাপদ। কোন রাজনৈতিক অপশক্তি এই সাংস্কৃতিক উৎসব কে ব্যহত করে ফায়দা নিতে চাইলে আমাদেরকেই সকলে মিলে দায়িত্ব নিয়ে তা প্রতিহতও করতে হবে।

লেখক: রাজনীতিক ও সমাজকর্মী।

;

পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা



ড. মতিউর রহমান
পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা

পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১ অক্টোবরকে প্রবীণ ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে মনোনীত করে। সেই থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর দিবসটির সামগ্রিক প্রতিপাদ্য বা থিম হল "পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা"। এই থিমটি নিউ ইয়র্ক, জেনেভা এবং ভিয়েনার এনজিও কমিটিগুলি দ্বারা উদযাপন করা হবে। সামগ্রিক থিমের  পাশাপাশি একটি অনন্য এবং পরিপূরক থিম নিয়েও আলোচনা হবে। নিউ ইয়র্কে গৃহীত পরিপূরক থিম টি হল: "বয়স্ক মহিলাদের সহনশীলতা এবং অবদান"।

যদিও বয়স্ক মহিলারা অর্থপূর্ণভাবে তাদের রাজনৈতিক, নাগরিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে অবদান রেখে চলেছেন; তাদের অবদান এবং অভিজ্ঞতাগুলি অনেকাংশে অদৃশ্য এবং উপেক্ষিত থেকে যায়। সারা জীবন জুড়ে জমা হওয়া লিঙ্গগত অসুবিধাগুলির দ্বারা সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বয়স এবং লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে বৈষম্যের মধ্যে নতুন এবং এবং বিদ্যমান বৈষম্যগুলিকে যুক্ত করে- যার নেতিবাচক প্রভাব বয়স্ক নারীদের প্রভাবিত করে।

জাতিসংঘ বলছে কোভিড-১৯ মহামারী বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত তিন বছরে বয়স্ক ব্যক্তিদের জীবনে, বিশেষ করে বয়স্ক মহিলাদের যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তাদের জীবনযাত্রার উপর আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত, স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু সম্পর্কিত প্রভাবকে তীব্র করেছে।

২০২২ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের থিম বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলি অতিক্রম করতে এবং সহনশীলতা এবং দৃঢ়তার সাথে তাদের সমাধানে অবদান রাখতে বয়স্ক মহিলারা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার একটি  অনুস্মারক হিসাবে কাজ করবে।

বিশ্বব্যাপী, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনসংখ্যা অন্যান্য সকল বয়সের জনগোষ্ঠীর তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। জনসংখ্যার আকার এবং বয়সের গঠন জনসংখ্যার তিনটি প্রক্রিয়া দ্বারা যৌথভাবে নির্ধারিত হয়: উর্বরতা, মৃত্যুহার এবং স্থানান্তর।

ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস: ২০১৯ রিভিশনের তথ্য অনুসারে, ২০৫০ সালের মধ্যে, বিশ্বের ছয়জনের মধ্যে একজনের বয়স ৬৫ বছরের বেশি হবে (১৬%), যা ২০১৯ সালে ছিল ১১ জনে ১ জন (৯%) ।

জাতিসংঘ বলছে সাম্প্রতিক দশকগুলিতে বিশ্ব জনসংখ্যার গঠন কাঠামোয় নাটকীয় পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে, বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু ৪৬ থেকে ৬৮ বছর বেড়েছে। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ৭০৩ মিলিয়ন মানুষ ছিল। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বয়স্ক ব্যক্তি (২৬১ মিলিয়ন) ছিল পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে। তারপরে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা (২০০ মিলিয়নেরও বেশি)।

পরবর্তী তিন দশকে, বিশ্বব্যাপী বয়স্ক ব্যক্তিদের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বা ২০৫০ সালে ১.৫ বিলিয়নেরও বেশি হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিশ্ব ২০১৯ এবং ২০৫০ এর মধ্যে বয়স্ক জনসংখ্যার বিপুল বৃদ্ধি দেখতে পাবে্। সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি (৩১২ মিলিয়ন) পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঘটবে বলে অনুমান করা হয়েছে, যা ২০১৯ সালে ২৬১ মিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে ৫৭৩ মিলিয়নে বৃদ্ধি পাবে।

উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ায় বয়স্ক ব্যক্তিদের সংখ্যা দ্রুততম বৃদ্ধির প্রত্যাশ্যা করা হচ্ছে, যা ২০১৯ সালে ২৯ মিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে ৯৬ মিলিয়নে উন্নীত হবে (২২৬ শতাংশ বৃদ্ধি)। দ্বিতীয় দ্রুততম বৃদ্ধি সাব-সাহারান আফ্রিকার জন্য অনুমান করা হয়েছে, যেখানে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনসংখ্যা ২০১৯ সালে ৩২ মিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে ১০১ মিলিয়নে বৃদ্ধি পেতে পারে (২১৮ শতাংশ)।

বিপরীতে, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে (৮৪ শতাংশ) এবং ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় (৪৮%), যেখানে বয়স্ক জনসংখ্যা ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যান্য অংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, এই বৃদ্ধি অপেক্ষাকৃত কম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বয়স্ক জনসংখ্যার দ্রুততম বৃদ্ধি স্বল্পোন্নত দেশগুলিতে ঘটবে বলে অনুমান করা হয়েছে, যেখানে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তির সংখ্যা ২০১৯ সালে ৩৭ মিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে ১২০ মিলিয়নে (২২৫%) বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১.৫ কোটিরও বেশি প্রবীণ নাগরিক রয়েছেন যা মোট জনসংখ্যর ৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে এটি ২ কোটিতে পরিণত হবে। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৪.৫ কোটিতে। তখন দেশে শিশুদের চেয়ে বয়স্কদের সংখ্যা আরও বাড়বে।

২০১৩ সালে, সরকার জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা প্রণয়ন করে, কিন্তু এই নীতিমালা এখনও পরিবার বা সমাজে কার্যকর হয়নি। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের বয়স্ক বলা হয়। তবে, বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলিতে, ৫৬ বছর বয়সী ব্যক্তিদের বয়স্ক হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

একটি বেসরকারি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি প্রবীণ মানুষ অসুস্থ, অসহায়, অবহেলিত, নিঃসঙ্গ এবং সেবাহীন জীবনযাপন করছেন। সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত অসহায় বৃদ্ধরা। কিন্তু বার্ধক্যের ক্রমবর্ধমান অসহায়ত্ব মোকাবেলা করার জন্য আমরা প্রস্তুত নই। এ কারণে প্রবীণদের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের নীতিনির্ধারকদের এগিয়ে আসা জরুরি।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বৃহত অংশ ক্রমাগত বৃদ্ধ হচ্ছে। কার্যত বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের জনসংখ্যার মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং অনুপাত বৃদ্ধির সম্মুখীন হচ্ছে। জনসংখ্যার বার্ধক্য একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামাজিক রূপান্তরগুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠতে যাচ্ছে, যার প্রভাব শ্রম ও আর্থিক বাজারসহ সমাজের প্রায় সকল ক্ষেত্রে পড়বে- যেমন আবাসন, পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা, পরিবহন এবং সামাজিক সুরক্ষা। সেইসাথে পারিবারিক কাঠামো এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় বন্ধন।

বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নে অবদানকারী হিসাবে দেখা হচ্ছে। সুতরাং, তাদের সুরক্ষার জন্য সব স্তরে নীতি ও কর্মসূচি থাকা উচিত। আগামী কয়েক দশকে, ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অনেক দেশই আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা অতীতের তুলনায় দ্রুত গতিতে বার্ধক্য পাচ্ছে এবং এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তন সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলবে। ইতিমধ্যে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১ বিলিয়নেরও বেশি লোক রয়েছে, যাদের অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করছে। অর্থ ও মর্যাদার জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সম্পদে অনেকেরই প্রবেশাধিকারের সুযোগ নেই। অন্য অনেকে একাধিক বাধার মুখোমুখি হন যা সমাজে তাদের সম্পূর্ণ অংশগ্রহণকে বাধা দেয়।

জাতিসংঘের স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের দশক (২০২১-২০৩০) হল একটি বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার দশক যা গত দশ বছরের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গঠিত, যা বয়স্ক মানুষ, তাদের পরিবার এবং সম্প্রদায়ের জীবনকে উন্নত করতে সরকার, সুশীল সমাজ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, পেশাদার, একাডেমিয়া, মিডিয়া এবং বেসরকারি খাতকে একত্রিত করে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই দশক বয়স্কদের জন্য স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের উপায় নিয়ে চারটি ক্ষেত্রে কাজ করবে।

বয়স-বান্ধব পরিবেশ: শারীরিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক এবং বার্ধক্যের অভিজ্ঞতা এবং বার্ধক্য যে সুযোগগুলি প্রদান করে তার উপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। বয়স-বান্ধব পরিবেশ হল আরও ভাল জায়গা যেখানে বসবাস, কাজ, খেলা এবং আবেগ ভাগাভাগির সুযোগ রয়েছে। এগুলি শারীরিক এবং সামাজিক বাধাগুলি অপসারণ করে যা স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের সামাজিক নির্ধারকগুলিকে মোকাবেলা করে এবং বয়স্কদের সক্ষম করে।

নেতিবাচক মনোভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করা: সমাজে বয়স্ক ব্যক্তিদের অনেক অবদান এবং তাদের বিস্তৃত বৈচিত্র্য সত্ত্বেও, বয়স্ক ব্যক্তিদের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সমাজ জুড়ে সাধারণ এবং খুব কমই চ্যালেঞ্জ করা হয়। স্টিরিওটাইপিং (আমরা কীভাবে চিন্তা করি), কুসংস্কার (আমরা কীভাবে অনুভব করি) এবং বয়স, বয়সের ভিত্তিতে মানুষের প্রতি বৈষম্য (আমরা কীভাবে কাজ করি), সমস্ত বয়সের মানুষকে প্রভাবিত করে তবে বয়স্কদের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার উপর বিশেষভাবে ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। সুতরাং, এই নেতিবাচক মনোভাবের বিরুদ্ধে কাজ করা।

ইন্টিগ্রেটেড কেয়ার: বয়স্ক ব্যক্তিদের ভাল মানের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলিতে অ-বৈষম্যহীন প্রবেশধিকার প্রয়োজন যাতে প্রতিরোধ অন্তর্ভুক্ত থাকে। নিরাময়মূলক, পুনর্বাসনমূলক, উপশমকারী এবং জীবন শেষের যত্ন; নিরাপদ, সাশ্রয়ী, কার্যকর, ভালো মানের প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং ভ্যাকসিন; দাঁতের যত্ন এবং স্বাস্থ্য এবং সহায়ক প্রযুক্তি, এই পরিষেবাগুলির ব্যবহার ও ব্যবহারকারীর আর্থিক অসুবিধার কারণ না হয় তা নিশ্চিত করা।

দীর্ঘমেয়াদী সেবা:  শারীরিক এবং মানসিক ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য হ্রাস বয়স্ক ব্যক্তিদের নিজেদের যত্ন নেওয়ার এবং সমাজে অংশগ্রহণ করার ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে। পুনর্বাসনের প্রবেশধিকার, সহায়ক প্রযুক্তি এবং সহায়ক, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারে; যাইহোক, অনেক লোক তাদের জীবনের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যখন তারা সমর্থন এবং সহায়তা ছাড়া আর নিজেদের যত্ন নিতে পারে না। এই ধরনের লোকেদের কার্যকরী ক্ষমতা বজায় রাখতে, মৌলিক মানবাধিকার উপভোগ করতে এবং মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার জন্য ভাল-মানের দীর্ঘমেয়াদী যত্নের প্রবেশধিকার অপরিহার্য।

কোভিড-১৯ মহামারী নীতি, সিস্টেম এবং পরিষেবাগুলিতে বিদ্যমান ফাঁকফোকরগুলি বন্ধের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছে। বয়স্ক ব্যক্তিরা যাতে মর্যাদা ও সমতা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাদের সম্ভাবনা পূরণ করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য নিয়ে এক দশকের সমন্বিত বিশ্বব্যাপী পদক্ষেপ জরুরিভাবে বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এভাবেই পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা আসতে পারে।

ড. মতিউর রহমান: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

;

একচোখা সমাজে অনিশ্চয়তায় যে শিশু



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শাকিব খান ও শবনম বুবলি নিয়ে ব্যস্ত গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম। নানা রকমের ইঙ্গিতবহ সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আলোচনায় আসছে আরও অনেকের নাম। এসবের যতটা না সংবাদ, তার চেয়ে বেশি গল্প। সামাজিক মাধ্যমে যেহেতু ব্যবহারকারীরা নিজেই সর্বেসর্বা; সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই নেই নিয়ন্ত্রণ। গণমাধ্যমে প্রতিবেদক, সম্পাদকের আলাদা জায়গা রয়েছে, রয়েছে পৃথক সম্পাদনা নীতি, দায়বদ্ধতা; কিন্তু সেখানেও প্রকাশিত নিয়ন্ত্রণহীনতা। জোয়ারে ভেসে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা, কে কার আগে কীভাবে পাঠক ধরতে পারে সে প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। এর ফাঁকে যে শিশু নিপীড়ন হচ্ছে সে কথা কে বলবে তাদের, সে কথা কে শোনাবে তাদের!

নিপীড়ন মানে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন; এখানে সীমিত থাকতে চলবে না। ছোট্ট অবুঝ একটা শিশু সন্তানের ছবি প্রকাশ করে একটা ভবিষ্যৎ যে আমরা অনিশ্চিত করে দিচ্ছি সে চিন্তার সময় বোধহয় আমাদের কারো নেই। তাই শিশুর ছবি প্রকাশে বেপরোয়া বেশিরভাগই। সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে যখনই শাকিব খান ও শবনম বুবলির আড়াই বছরের শিশু সন্তানের মুখ ভাসছে তখন একটা করুণ ভবিষ্যতের ছবি সামনে আসছে। একটা মায়াবি মুখের ভবিষ্যৎ কীভাবে অনিশ্চিত হতে যাচ্ছে সে চিন্তাই করছি এখন।

শেহজাদ খান বীর, শাকিব-বুবলির সন্তান। আড়াই বছর পর দুজন সামাজিক মাধ্যমে পৃথক পোস্ট দিয়ে সে তথ্য জানিয়েছেন। এরআগে বুবলি তার বেবি বাম্পের ছবি প্রকাশের পর সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছিল এই সন্তানের বাবা শাকিব খান।

এরআগে, অপু বিশ্বাসের একটা পুত্র সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে অনেক জল ঘোলা করে স্বীকার করেছিলেন শাকিব। অপু কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইভে এসে তার সন্তানের কথা জানিয়েছিলেন। সে সময় সন্তানের বয়স ছিল ছয় বছর। বুবলিকে অবশ্য কেঁদে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতে হয়নি, জায়গায়-জায়গায় ধর্না দিতে হয়নি; তার আগেই মিলেছে পুত্রের স্বীকৃতি। এখানে শাকিব খান পুত্রের স্বীকৃতি দিতে গড়িমসি না করলেও তিনি যে সৎ বাবা, সৎ স্বামী, সর্বোপরি সৎ মানুষ নন সেটা বলাই বাহুল্য।

আব্রাহাম খান ও শেহজাদ খান পিতৃপরিচয় পেয়েছে। তবে তারা অন্যদের মতো কি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠার পরিবেশ পাবে? এ সমাজ কি এটা মেনে নিতে প্রস্তুত? মনে হয় না। তারা যখন বড় হতে থাকবে, যখন তারা বুঝতে শুরু করবে তখন সমাজের অঙুলিগুলো তাদের দিকেই আসতে থাকবে। মায়ের চরিত্রহনন থেকে শুরু করে তাদের নিজেদের চরিত্র নিয়ে নানা কথা ভাসতে থাকবে সমাজে, এমনকি তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। অথচ এমন পরিস্থিতির জন্যে তারা মোটেও দায়ী নয়। অন্য সবার মতো পৃথিবীতে তারা নিজেদের ইচ্ছায় আসেনি। তবু তাদেরকে সইতে হবে সামাজিক এই একচোখা নীতির চাপ!

আমাদের দেশে ভিকটিম নারী ও শিশুর ছবি প্রকাশে আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। এটা যদিও সীমিত আকারে, আইনি প্রতিবিধানের পর্যায়ে। তবে সামগ্রিকভাবে শিশুর নিরাপত্তায় আইন ও আইনের প্রকাশ নাই দেশে। আজকের এই আব্রাহাম কিংবা শেহজাদ বুঝতে শেখার পর তাদেরকে নিয়ে বিগত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যে ইঙ্গিতবহ সংবাদ ও কথাবার্তা তার প্রতিবিধান কীভাবে চাইবে আইনের কাছে? এই বয়সে তারা মানহানি বিষয়ে জানে না, কিন্তু যখন এটা জানবে-বুঝতে পারবে তখন এই মানহানির জন্যে, তাদের ছবি বিনা-অনুমতিতে প্রকাশের কারণে কি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে। অবশ্য শিশুরা যতক্ষণ শিশু ততক্ষণ তাদের নিজেদের নিয়েও সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নাই, তাই অদ্যকার এই পরিস্থিতির প্রতিবিধান কীভাবে হবে?

আমাদের দেশে এ সংক্রান্ত আইন নেই। দ্য টেলিগ্রাফের একটা প্রতিবেদনে ফ্রান্সে এ সংক্রান্ত একটা আইন থাকার কথা জেনেছিলাম। ওই আইনের অধীনে শিশুর প্রাইভেসি লঙ্ঘনের দায়ে পিতা-মাতার এক বছর পর্যন্ত জেল এবং ৪৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কয়েক বছরের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্করা শিশুকালের তাদের ছবি প্রকাশের কারণে পিতামাতার বিরুদ্ধে মামলা করে ক্ষতিপূরণ দাবিও করতে পারে। দেশটিতে এই আইন থাকার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এসব শিশুর ছবি নানা অপরাধীদের কাছে চলে যেতে পারে, এবং অপরাধের কাজে সেগুলো ব্যবহৃত হতেও পারে।

পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন আইন আছে কি-না এখনই বলতে পারছি না। এটা মনে পড়েছে কেবল ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে গিয়ে চোখে পড়ায় এবং চলমান বাস্তবতার কারণে। কারণ ওই একই, শাকিব-বুবলির সন্তান শেহজাদ খান বীর, যা ছবি ভাইরাল সামাজিক মাধ্যমে। এই ছবি তার মা-বাবাও প্রকাশ করেছেন। তারা প্রকাশ করেছেন সন্তানের পিতৃত্বের দাবি ও স্বীকৃতি প্রসঙ্গে। তবে আমাদের নিয়ন্ত্রণহীন সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের কারণে এখানে পোডোফাইলের যে বিপদ সংকেত সেটা কীভাবে আগ্রাহ্য করি, যেখানে সংবাদমাধ্যমে প্রায়শই আসে নানা খবর। বলতে দ্বিধা নেই, এটা অনলাইনে যেমন আছে, তেমনি আছে অফলাইনেও। এছাড়া এই বিপদের সঙ্গে আছে শিশুর প্রাইভেসি, যা এখনই হয়তো সে অনুধাবন করতে পারছে না, কিন্তু যখন পারবে তখন কী মানসিক অবস্থা হবে তার; ভাবা যায়!

আমাদের সমাজ ভিকটিমকে দায় দিতে আগ্রহী। নিপীড়নের ওপর আরেকদফা নিপীড়ন। এই মানসিকতা সর্বক্ষেত্রে। সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের অনেকেই আবার এসবে যে ভাষায় প্রতিক্রিয়া দেখান তাতে অনেকের আবার লুঙ্গি খোলার অবস্থা! আক্রমণাত্মক সেই সব ব্যবহারকারীদের কারণে অনেক সময় নৈতিকতার পরাজয় দেখি আমরা। দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনোদন জগতের বাসিন্দাদের পারিবারিক সমস্যার এই প্রসঙ্গ আমাদেরকে অনলাইনে শিশু-নিরাপত্তার দিকটি নিয়ে গভীর ভাবনার দাবি রাখে।

এখানে কে দোষী, কে নির্দোষ সে তর্ক-বিতর্কে জড়ানোর উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য একটাই শিশুর প্রাইভেসি-নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা। এ সংক্রান্ত কোনো আইন থাকলে সে আইনের বহুল প্রচারের দাবি করি, আর আইন না থাকলে এনিয়ে ভাবার প্রয়োজনীয়তার কথাই বলি! এই একচোখা সমাজে আমরা শিশুর অনিশ্চিত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নয়, সার্বিক নিরাপত্তার দাবি করি।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

স্বর্গীয় বাগানের নাম ‘ইডেন’



মেজর নাসির উদ্দিন আহমেদ (অবঃ) পি এইচ ডি
স্বর্গীয় বাগানের নাম ‘ইডেন’

স্বর্গীয় বাগানের নাম ‘ইডেন’

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কলিন্স,  ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড, ম্যাকমিলান ও মারিয়ম ওয়েবস্স্টাটার ডিকশনারি এবং ইনসাইক্লোপিডিয়া ও ইউকিপিডিয়াসহ বহু সূত্রে ,"ইডেন" কে ঈশ্বরের বাগান বা স্বর্গীয় বাগান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন ইঞ্জিল ও বাইবেল মহাগ্রন্থে ইডেন নামে সরাসরি কিংবা নাম উল্লেখ না করে নদী বা নহর বেষ্টিত এমন এক বাগানের বর্ণনা রয়েছে, যেখানে মানবজাতির আদি পিতা-মাতা বসবাস করতেন। এই বাগানের বহু কাল্পনিক চিত্র এঁকেছেন চিত্রশিল্পীরা।  তাদের কল্পনার সেই আদি পিতা মাতার মাঝে কাম-ক্রোধ বা বৈষয়িক কোন চাহিদা ছিল না। তাই ইডেন নামের স্বর্গে তাদের মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানোর চিত্র ফুটে উঠেছে এসব চিত্রকর্মে।  ইন্টারনেটে ইডেন নামক এমন বহু কাল্পনিক,  ঐশ্বরিক বা স্বর্গীয় বাগানের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।  খ্রিস্টধর্ম গ্রন্থ বাইবেলের জেনেসিস ২ : ৮ - ১৪ পর্যন্ত বয়ানে ইডেন নামক স্বর্গীয় উদ্যানের বর্ণনা রয়েছে। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ ইজেকেইলে ( Ezekiel) ২৪ ও ৩১ নং  স্তবকে রয়েছে ইডেন নামক স্বর্গীয় উদ্যানের নাম।  পৃথিবীর বহু দেশে ইডেন নামে বহূ  বাণিজ্যিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতের কলকাতায় রয়েছে ইডেন গার্ডেন্স নামের ক্রিকেট স্টেডিয়াম।  বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়ও রয়েছে ইডেন মহিলা কলেজ (সংক্ষেপে ইডেন কলেজ)  নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এককালে গৌরবময় আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান পথভ্রষ্ট একদল তথাকথিত রাজনৈতিক নেত্রীর অপকর্মের স্বর্গ রাজ্য আর শিক্ষক বা প্রশাসক নামক একদল মেরুদণ্ডহীন শিক্ষিত মানুষের অসহায়ত্বের মুহূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে।

১৮৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এককালের কর্মচারী স্যার এ্যাসলে ইডেন (Sir Eshley Eden) বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে তৎকালীন বাংলার শাসক ব্রিটিশ সরকারের একজন সচিব হিসাবে নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ ১১ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই দায়িত্ব পালন শেষে তৎকালীন ব্রিটিশ বার্মার (বাংলা সহ) গভর্নর নিযুক্ত হন এই স্যার এ্যাসলে ইডেন। দীর্ঘ সাত বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।  দায়িত্ব পালনের শেষ দিকে ১৮৮৭ সালে দুটি বালিকা বিদ্যালয়ের সমন্বয়ে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় একটি গার্লস স্কুল। স্যার এ্যাসলে ইডেনের নামানুসারে এই স্কুলের নামকরণ করা হয় ইডেন গার্লস স্কুল। ১৯২৬ সালে কলেজ শাখা চালুর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় ইডেন গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ। ১৯৫৮ সালে কলেজ সেকশন আলাদা হওয়ার কারণে নতুন নাম হয় ইডেন মহিলা কলেজ। ১৯৬২ সালে আজিমপুর ১৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের ইডেন মহিলা কলেজ।

ইতিহাস মতে ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সৈন্যরা সিকিম দখলের পর রাজনৈতিক সমঝোতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল স্যার এ্যাসলে ইডেন কে। তুমলং চুক্তি সম্পন্ন করে সিকিমের রাজা সিদকেয়ং নামগয়ালকে ( Sidkeyong Namgyal) তিনি বশে আনেন।  সিকিম দিয়ে চলাচলকারী সকল যাত্রী ও বাণিজ্যিক বহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ছিলেন ইডেন । এই সাফল্যে উজ্জীবিত স্যার এ্য।সলে ইডেন কে ১৮৬৩ সালে ভুটানে পাঠানো হয় অনুরূপ সমঝোতার জন্য।  অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী ইডেন এই যাত্রায় কোন সৈন্য বাহিনী ছাড়াই ভুটান যান এবং তার কারিশমা প্রয়োগের চেষ্টা চালান । কিন্তু এবার বিধি বাম।  এক্ষেত্রে ভুটানের স্থানীয় জনগণ তাকে কেবল বর্জন করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার বাহারি চুল ধরে টানাটানি করে এবং মুখে কাঁচা গোবর মেখে দেয়। এই ঘটনার রেশ ধরে ১৮৬৪ সালের নভেম্বরে "ডুরাণ যুদ্ধ" শুরু হয়, যা চলে এক বছর পর্যন্ত। এতে শেষ বিচারে বৃটিশদেরই জয় হয়।

ঢাকাস্থ ইডেন মহিলা কলেজের রাজনৈতিক নেত্রী নামের কতিপয় বিপথগামী ছাত্রী পৌরাণিক ধর্মে বর্ণিত স্বর্গীয় বাগান ইডেন কিংবা ব্রিটিশ বার্মার গভর্নর ইডেনের ইতিহাস কতটুকু জানেন, তা বলার সাধ্য নেই। তবে যা টেলিভিশনের পর্দায় তা দেখেছি,  তা থেকে বুঝা যায় ভুটানের মানুষ ১৮৬৩ সালে যেভাবে স্যার  এ্যাসলে ইডেনের চুল টেনে ছিলেন,  তার চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সাথে নিজের সহপাঠী কিংবা ছোট বোন তুল্য অন্য ছাত্রীদের চুল টানায় পরাঙ্গম এ যুগের ইডেন মহিলা কলেজের কতিপয় ছাত্রী।  যেভাবে ভুটানের মানুষ স্যার ইডেনের মুখে গোবর লেপ্টে দিয়েছিল, ১৫৯ বছর পরে তেমনি করে ছাত্র রাজনীতির গৌরবজ্জ্বল অবয়বে কলঙ্কের চুনকালি লেপ্টে দিয়েছে এই ছাত্রী নামের দস্যুরা।   চাঁদাবাজি,  সিট বাণিজ্য, শারীরিক  ও মানসিক নির্যাতন,  বন্দী করে রাখা,আপত্তিকর ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল,  রাজনীতির নামে নিজেদের শোডাউনে যেতে বাধ্য করা সর্বোপরি নেতাদের বাড়িতে ছাত্রীদের পাঠানোর অভিযোগ আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

ইডেন কলেজে বেশ ক'দিন ধরেই চলছিল এমন অনাচার। ২০১৪ সালের ২৪শে জুন রাতে টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল চলবে না হিন্দি সিরিয়াল চলবে,  এ নিয়েও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক শাখার সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের দুটি দল সংঘর্ষে জড়ায়। সিট দখল, উচ্ছেদ  এবং পাল্টা দখলের ঘটনা নৈমত্তিক ব্যাপারে দাঁড়িয়ে ছিল বিগত কিছুদিন যাবত।  চলমান এই দ্বন্দ  চরমে  উঠে গত ২৫ সেপ্টেম্বর, রবিবার।  ঐদিন আবার ছিল বিশ্ব কন্যা দিবস। পুরুষ শাসিত সমাজে কন্যাদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা এবং তাদের ন্যায্য প্রাপ্যটুকু  নিশ্চিত করাই বিশ্ব কন্যা দিবসের প্রতিপাদ্য। আইয়েমে জাহিলিয়াত বা অন্ধকার যুগে সদ্য ভূমিষ্ঠ কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো বাকি জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে।  কন্যা সন্তান প্রসবের জন্য অনেক মা’র সংসার ভেঙে যেত বা অপয়া অপবাদ নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো। যৌতুকের অভিশাপ আজও বিরাজ করছে এই সমাজে।  এই উপমহাদেশে গর্ভের সন্তান যদি কন্যা হয়, তবে ক্লিনিকের দালালরা বলে, ৬০০০ টাকা খরচ করে গর্ভপাত ঘটাও, কন্যা বিয়ে দেওয়ার ৬ লাখ টাকা বাঁচবে।  পথে - ঘাটে, যানবাহনে ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্যের ও নীরব দহনের শিকার হয়। এমনি এক প্রেক্ষাপটে ২৫ সেপ্টেম্বর অন্ততঃ বিশ্ব কন্যা দিবসে কন্যার বাবারা একটু বাড়তি স্নেহে ভাসিয়ে দিতে চায় কন্যাদের।  সেই বাবারা আজ আতঙ্কে ভুগছে একদল কন্যার প্রতি আরেক দল কন্যার এমন হিংস্র আয়োজনে।  পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থে কন্যা বা মেয়েদের প্রতি সহনশীল, শ্রদ্ধাশীল এবং বন্ধু বৎসর হওয়ার তাগিদ রয়েছে।  আজ প্রশ্ন জাগে, এই তাগিদ কি কেবল পুরুষদের প্রতি?  ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ঈশ্বর একজন কন্যাকে তার ঘরেই পাঠায়,  যার একজন চিরজীবনের বন্ধু প্রয়োজন। একজন কন্যার বাবা হিসেবে বলবো,  টেলিভিশনের পর্দায় খোদ রাজধানীর এক ঐতিহ্যমন্ডিত মহিলা কলেজে মেয়েদের উপর নেত্রী নামের দস্যুদের এই আচরণ ক্ষমার অযোগ্য।

সবচেয়ে অবাক লাগে এক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা দেখে। দেশের শিক্ষা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর ছাত্র রাজনীতি নামে দস্যুপনার প্রভাব কতটা প্রবল, ইডেন কলেজের ঘটনা যেন তারই প্রমাণ।  হঠাৎ করেই যে ইডেন কলেজে  এমন ঘটনা ঘটেছে, তা নয়।  দীর্ঘদিন ধরেই এমন  বিস্ফোরণূন্মুখ পরিস্থিতি  বিরাজ করছিল ইডেন  কলেজে। অথচ প্রশাসন ছিল নির্বিকার। সাধারণ ছাত্রীরা বহূ অনুনয় বিননয়  করেও প্রশাসনের সাহায্য পায়নি ।  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এ সংক্রান্ত কোনো গোয়েন্দা তথ্য বা আগাম সংবাদ বা সংকেত কিছুই ছিল না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে কেন এমনটি ঘটলো,  তার কোন সদুত্তর নেই।

আজ ২৮ শে সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে "মাদার অফ হিউম্যানিটি" শেখ হাসিনার ৭৬ তম জন্মদিন। তাকে জন্মদিনের দোয়া ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলবো, ছাত্র রাজনীতিতে  নেতৃত্বের নামে যারা লুটতরাজ,  চাঁদাবাজি ও অনৈতিক জুলুম নির্যাতন করে, তাদের এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের ও অকর্মণ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে মাতৃস্নেহ নয়,  প্রয়োজন মায়ের কঠিন শাসন ও উপযুক্ত বিচার। রোহিঙ্গাদের নেপথ্যে অনেক এনজিও আছে,  মানবাধিকার সংস্থা আছে, দাতা সংস্থা আছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজ কতিপয় পথভ্রষ্ট, তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর নিরব সন্ত্রাসের শিকার সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পিছনে কেউ নেই।  সত্যিই তারা অসহায়।  আপনি তাদেরও "মাদার অফ হিউম্যানিটি" হবেন, এটাই প্রত্যাশা।  যে শিক্ষা প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসন অসহায় ছাত্রছাত্রীদের কন্যা দিবসেও নিরাপত্তা দিতে পারে না,  তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। তবেই আপনার নাম ইডেনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

লেখক: গবেষক, কলামিস্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক

;