পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, আমাদের আত্মমর্যাদা



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে’, মন্তব্যের আলোচনা থামেনি এখনও। এবার নতুন এবং আরও স্পর্শকাতর বক্তব্য এসেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের কাছ থেকে। সরাসরি বলেছেন তিনি, ভারতকে বলেছি শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমনটাই বলেছেন তিনি। তার এই বক্তব্যে দেশবাসী স্বভাবত ক্ষুব্ধ হবে, রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আসবে, বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন রকমের আলোচনা-সমালোচনা হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “আমি ভারতে গিয়ে বলেছি, শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। শেখ হাসিনা আমাদের আদর্শ। তাকে টিকিয়ে রাখতে পারলে আমাদের দেশ উন্নয়নের দিকে যাবে এবং সত্যিকারের সাম্প্রদায়িকতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক একটা দেশ হবে। ...শেখ হাসিনা আছেন বলে ভারতের যথেষ্ট মঙ্গল হচ্ছে। বর্ডারে অতিরিক্ত খরচ করতে হয় না। আটাশ লাখ লোক আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর ভারতে বেড়াতে যায়, ভারতের কয়েক লাখ লোক আমাদের দেশে কাজ করে। ...শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা দরকার, আমি ভারতবর্ষের সরকারকে সেটা করতে অনুরোধ করেছি।” বক্তব্যটি প্রায় প্রত্যেকটি গণমাধ্যমে এসেছে।

মন্ত্রী যেখানে বক্তব্য দিচ্ছিলেন সেটা দল ও সরকারের নীতিনির্ধারণী গোপন কোন বৈঠক ছিল না। প্রকাশ্য অনুষ্ঠান। এমন প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে এমন তিতা সত্য প্রকাশে দল ও সরকার যে বিব্রত হবে তা সন্দেহ নেই। এমনিতেই দেশে আছে ভারতবিরোধী নগ্ন প্রচারণা। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্কের কথাটি সর্বজনবিদিত। আছে সরকারে ভারতের হস্তক্ষেপ বিষয়ক অপ্রমাণিত প্রচারণাও। এই প্রচারণা চলমান থাকাকালে মন্ত্রীর বক্তব্যে প্রচারণাকে শক্ত ভিত্তি দেবে নিশ্চিত।

মন্ত্রীদের বিদেশ সফরের পর সাধারণত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায় না। কী ধরনের আলোচনা, দ্বিপাক্ষিক অনিষ্পন্ন নানা বিষয়ে কতটুকু অগ্রগতি সে খবরও জানা যায় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। যেটুকু আসে সেটা নানা অনুষ্ঠানে অথবা অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে। ওটা যথেষ্ট না হলেও এটাই মেনে নিয়েছি আমরা। এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্রে আমরা জানতে পারল সবশেষ বৈঠকে আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতবর্ষের সরকারকে অনুরোধ করার কথাটাই। মন্ত্রী সবশেষ যখন ভারত সফর করছিলেন তখন সিলেট ভাসছিল বানের জলে। ওই সফর শেষ করে তিনি দেশে ফিরেছিলেন এবং এরপর বন্যার্তদের কাছাকাছি গিয়েছিলেন। উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকের আর কিছু না জানলেও এবার আমরা ‘সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ভারতকে অনুরোধের’ যে কথাটা আমরা জানলাম সেটা আর যাই হোক দেশবাসীর জন্যে সম্মানের নয়। একই সঙ্গে সরকারের জন্যেও বিব্রতকর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী সোজাসাপ্টা কথাগুলো বলে তোপের মুখে পড়েছেন। ব্যক্তিগত ক্রোধের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন ঠিক, কিন্তু এরমাধ্যমে তিনি কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দীনতা সামনে আনলেন না? এজন্যে তিনি ধন্যবাদ পেতেই পারেন। হতে পারে তিনি সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছেন, বেকায়দায় পড়তে যাচ্ছেন নিজেও; তবু এর মাধ্যমে দেশবাসী অন্তত জানল কোন পথে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি! এমন নতজানু বক্তব্যের কারণে এতবড় দায়িত্বে থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে নানা আলোচনা হতে পারে, কিন্তু এটা নিশ্চয়ই তার ব্যক্তিগত অবস্থান নয়; এটাই কি সরকারের অবস্থান নয়? সরকার যদি এমন পররাষ্ট্রনীতির পথ ধরে এগোয় তবে আমাদের প্রতিবাদের দরকার আছে। আমরা প্রতিবাদ করি।

এ কে আব্দুল মোমেন আগেও একবার বলেছিলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো।’ সম্পর্কের গভীরতা বুঝাতে বক্তব্যের অন্তর্গত ভাব ধরতে অক্ষম অনেকেই সে সময় সমালোচনা করেছিল, এখনও করেন। এনিয়ে আলোচনা নয়। তবে কোথায় কী বলতে হবে এটা বুঝা উচিত রাজনীতিক, বিশেষত মন্ত্রীদের। রাজনীতির মাঠ ও জনগণ উচ্চাঙ্গ সংগীতের শ্রোতা নয় যে অন্তর্গত ভাব ধরতে বসবে। এই মাঠ সবসময়ই উত্তপ্ত এবং অপেক্ষায় অন্যের বক্তব্যের ফাঁকফোকর ধরতে। মন্ত্রী কেন তাদের সুযোগ দিচ্ছেন? এরইমধ্যে সপ্তাহ পেরোয়নি আগের মন্তব্যের রেশ কাটতে যেখানে তিনি বলেছিলেন ‘বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে’।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী ছিলেন তিনি সিলেট-১ আসনে। এই আসনে আওয়ামী লীগ দলের কোন রাজনীতিককে মনোনয়ন দেয় না। নির্বাচনে জিততে রাজনীতির বাইরের মানুষদেরও মনোনয়ন দিয়ে আসছে। ওখানে আবুল মাল আবদুল মুহিতের উত্তরসূরি খুঁজতে দুইবছর আগে দীর্ঘদিন কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করা এ কে আব্দুল মোমেনকে আমেরিকা থেকে নিয়ে আসা হয়। এই সময়ে তিনি নানা নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশেছেন নানা সভা-সমাবেশের মাধ্যমে। নির্বাচনের সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের এক কলোনিতে এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে নির্বাচন যারাই করছে তারা প্রত্যেকেই যোগ্য। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী (বিএনপির মনোনীত প্রার্থী) তিনিও যোগ্য, আমিও যোগ্য। তবে তার চাইতে আমি বেশি যোগ্য’। তার ওই বক্তব্যে অনেকেই নানা কথা বলছিল সত্য, কিন্তু এটা ছিল সারল্যের প্রকাশের সঙ্গে অন্যকে ছোট না করে না দেখার বড় ভাবনাও। সচেতন মানুষমাত্র এমন বক্তব্য পছন্দ করবে ঠিক, কিন্তু রাজনীতির মাঠ...সে ভিন্ন গল্প!

এসব ‘সরল বিশ্বাসে’ বলা কথা জানি। জানি তিনি তার ক্ষেত্রে সৎ ও পরিশ্রমী। তবু বারবার খেই হারিয়ে ফেলছেন। কারণ একটাই রাজনীতি না করা, রাজনীতির নানামুখী চরিত্রের খবর না জানা, না রাখা। পিতামহের কাল থেকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে উচ্চশ্রেণির তারা, যাদের সুযোগ ছিল না মানুষের ভাষা রপ্তের, মানুষের নানামুখী চিন্তার সঙ্গে ছিল না পরিচিতি। তাই সব কথা হড়হড় করে বেরিয়ে আসছে মুখ থেকে। তার অগ্রজ প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজে যা ভেবেছেন সেটাই সরাসরি বলে দিয়ে একাধিকবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন, কিন্তু দিনশেষে তিনি সফল জীবনের অধিকারী, তিনি সফল অর্থমন্ত্রী ছিলেন বলে পার পেয়ে গেছেন। কিন্তু এ কে আব্দুল মোমেনের সফল হতে ঢের বাকি। এখনই তাই সব কথা বলা প্রকাশ্যে বলা উচিত নয় তার। জায়গা বুঝে কথা বলতে পারাটাও বিশেষ যোগ্যতা! এখানে এখনও সফল নন তিনি।

‘ভারতকে অনুরোধ করেছি শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে’; পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সরকারপক্ষ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে সত্য, তবে দেশের নাগরিক অন্তত এই বক্তব্যে বুঝতে পারছে দিন-দিন আমরা আত্মমর্যাদা হারাতে বসেছি। আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, দেশের অর্থায়নে আমরা পদ্মাসেতুর মতো মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি, এছাড়াও বৈশ্বিক নানা সূচকে আছে বাংলাদেশের নানা অগ্রগতি। কিন্তু এই অগ্রগতির বিপরীতে আত্মমর্যাদার এই অধোগতি আমরা মেনে নিতে পারছি না। টিকিয়ে রাখতে প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপের আবদারের বিষয়ে তাই সরকারের সুস্পষ্ট বক্তব্য আশা করি। এটা আত্মমর্যাদার প্রশ্ন, ছোটখাটো কোন বিষয় নয়!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য



ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

২০২০ সালের নির্বাচনে এনএলডির বিজয়ের পর ক্ষমতায় তাদের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। বর্তমানে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ অবস্থা বিরাজ করছে এবং সেনাবাহিনীর এই সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে জনগণের উপর অত্যাচার ও নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁরা এখন বেসামরিক মানুষকে হত্যা, নির্যাতনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত কাজ করছে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণ এখনও সম্ভব হয়নি। পশ্চিমা দেশগুলোর চলামান এই গৃহযুদ্ধ বন্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর উপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। দেশের অভ্যন্তরে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আধিপত্য এখন আর আগের মতো নেই। সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলো সেনা শাসনের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে চায়। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলো একত্রে জাতীয় ঐক্যের সরকার (এন ইউ জি) গঠন করেছে। এন ইউ জি তাদেরকে সমর্থন দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে এবং অনেক দেশ এতে সাড়া দিয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রকাশ্যে দেখা করেছেন আসিয়ান ও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণের পর গণতন্ত্রপন্থীদের ওপর দমন পীড়ন শুরু হলে তাদের অনেকে দেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো থেকে সহায়তা ও সামরিক প্রশিক্ষণ নেয়। অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে নতুন প্রায় ১০০টির মত সশস্ত্র গোষ্ঠী আত্মপ্রকাশ করেছে, এবং এদের বেশিরভাগই দুর্গম এলাকাভিত্তিক। সারা দেশের গণতন্ত্রপন্থীদের সংগঠিত করে এন ইউ জি পিপল'স ডিফেন্স ফোর্স- পিডিএফ গঠন করেছে। পি ডি এফ এখন অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে মিলে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোর শহর, নগর আর গ্রামে তারা সামরিক শাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২০২১ সালের অক্টোবর নাগাদ দেশের সব শহর এলাকায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করে পিডিএফ। এই অস্থিরতার সুযোগে মিয়ানমারের আরাকান, কাচিন, কারেন, শান এবং ওয়া বাহিনীর মতো ১১টি জাতিগত গোষ্ঠী, যারা বহুদিন ধরে মিয়ানমারের স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তারা নিজেদের আধিপত্য এবং দখল বাড়ানোর জন্য নতুন করে লড়াই শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে সামরিক অভিজ্ঞতা লাভ করে পিডিএফের যোদ্ধারাও।

গণতান্ত্রিক সরকার সরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা সেনাবাহিনীকে ভালোভাবে নেয়নি মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিক। জান্তাবিরোধী বিক্ষোভের সময় কয়েক হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয় এবং তাঁদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন এখন ও চলছে এসব নিয়ে ক্ষুব্ধ দেশের সাধারণ মানুষ। জান্তাবাহিনীর চালানো অত্যাচার ও লুটপাটের রেশ এখনো সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে আছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিদ্রোহ-বিক্ষোভ হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সহযোগিতাতেই জান্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে বিদ্রোহীরা। বর্তমানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতি দেশটির নাগরিকদের সমর্থন প্রায় নেই বললেই চলে। এ কারণেই কেউ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। একসময় সেনা সদস্য হওয়াকে গর্বের বিষয় মনে করত তরুন সমাজ এবং এর মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের দেশপ্রেম তুলে ধরত। নতুন করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের জন্য মিডিয়ার মাধ্যমে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানোর পর ও খুব কম সংখ্যক আবেদনপত্র জমা পড়ায় আবেদনের সময়সীমাও দুইদফা বাড়ানো হয়েছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের সময় বহু সামরিক কর্মকর্তা ও সেনা সদস্য স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীর চাকুরি ছেড়ে দেয়। বিদ্রোহীদের দলগুলোর সাথে চলমান সংঘর্ষে প্রায় ২০ হাজার সেনাসদস্য নিহত ও প্রায় ৭ হাজার গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। ফলে সেনাবাহিনীতে এখন জরুরি ভিত্তিতে সৈন্য নিয়োগের প্রয়োজন পড়েছে। আগে তরুণদের মধ্যে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে যে আগ্রহ দেখা যেত বর্তমানে সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে তেমন আগ্রহী নয় দেশটির তরুণ সমাজ। সেনাবাহিনীতে জনবল সংকট কাটাতে ঋণখেলাপি ও মাদকসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িতদেরকেও এখন নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে সামরিক জান্তা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে বিরোধিতা পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিদ্রোহ দমনে তাদেরকে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে সবসময়। অভ্যুত্থানের পৌনে দু'বছর পরও সেনাবাহিনী দেশটিতে তাঁদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘর্ষের পাশাপাশি দেশের মধ্যাঞ্চলের মাগোয়ে ও সাগাইং অঞ্চলে সেনাবাহিনীর সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ হচ্ছে।এই এলাকা গুলোতে সংখ্যা গরিষ্ঠ ভামার জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। দেশের মূল জনগোষ্ঠী ভামাররা এতদিন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়নি। এখন তারাও এখন সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত। অভ্যুত্থানের পর বিরোধীদের দমন করতে ব্যাপক শক্তি ব্যবহার করছে সেনাবাহিনী। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে একাধিক বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হচ্ছে সামরিক জান্তাকে।

সরকারি বাহিনী মিয়ানমার জুড়ে একাধিক ফ্রন্টে মোতায়েন রয়েছে এবং সেখানে সশস্ত্র দলগুলোর সাথে লড়াই করছে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এবং এ এ’র মধ্যে লড়াই সাম্প্রতিক সময়ে তীব্রতা পেয়েছে। আরাকান আর্মি একাধিক সামরিক ঘাঁটি দখল করেছে এবং কৌশলগত পরিবহন রুটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। আরাকান আর্মি দাবি করেছে যে মিয়ানমারের উত্তর রাখাইন ও দক্ষিণ চিন রাজ্যে এএ’র কাছে দেশটির সেনাবাহিনীর শতাধিক সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছে। ২০২০ সালের নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের আগে শুরু হওয়া অঘোষিত অস্ত্রবিরতির পর প্রায় ১৬ মাস রাখাইন ও পালেতওয়াতে আপাত শান্তি বিরাজ করছিল। মে মাস থেকে পালেতওয়াতে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ শুরু হয় এবং আগস্ট মাসে ভারত – মিয়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সে সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাছে মংডু এলাকাতে ও সংঘাত শুরু হয়। এই সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে সরকার ক্রমাগত সেনা মোতায়েন বাড়াচ্ছে এর ফলে সামনের দিনগুলোতে লড়াইয়ের তীব্রতা আর ও বাড়বে।

সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের শীর্ষ সাতটি সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠীর সদস্যরা ওয়া রাজ্যের পাংসাংয়ে বৈঠকে বসে। এসব গোষ্ঠীর প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। নিজেদের মধ্যে একতা আরও বৃদ্ধি করার উদ্যোগই হবে বৈঠকের মূল লক্ষ্য। বর্তমানে উত্তর রাখাইন, চিন, শান ও কাচিন রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তারা ভারী অস্ত্র ও ট্যাঙ্কের সহায়তা অনেকগুলো শহরে প্রবেশ করে সেখানকার একাধিক গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে এবং গ্রামে গ্রামে অভিযান চালাচ্ছে। সাধারণ জনগণের ওপর সামরিক বাহিনীর ভারী অস্ত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সামরিক সরকারের রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভামার জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাতে ও সংঘর্ষ হচ্ছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যাই বেশি। 

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ দমন করতে ট্যাঙ্ক, ভারী অস্ত্রের পাশাপাশি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে শুরু করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে একই সঙ্গে বিভিন্ন সীমান্ত প্রদেশগুলোয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পাশাপাশি দেশের ভেতরের বিভিন্ন প্রদেশে গণতন্ত্রপন্থী পিডিএফ বাহিনীর সাথে ও সংঘর্ষে জড়াতে হচ্ছে।এই বহুমুখী সশস্ত্র আন্দোলন ঠেকাতে গিয়ে যেভাবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হওয়ায় তারা কোন জায়গাতেই ঠিক মতো সামাল দিতে পারছে না। সেনাবাহিনীর ভেতরে ও সৈন্যদের মনোবল আগের মত নেই, সেনাবাহিনী থেকে প্রচুর সৈন্য পালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জুনিয়র অফিসার এবং সৈনিকদের মধ্যে অনেকে সেনাবাহিনী ছেড়ে সরাসরি পিডিএফে যোগ দিচ্ছে কিংবা পালিয়ে যাচ্ছ। জাতিগত বাহিনীগুলো ও পিডিএফ আরও বেশি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের সামর্থ্য, যোগাযোগ আর সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অনেক এলাকায় সরকারি শাসন ভেঙ্গে পড়েছে।

১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার কিছুকাল পরই বার্মার রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রবেশ ঘটে। এর কিছুকালের মধ্যেই দেশটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভামারদের সাথে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ওই সময় শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অভাবে দেশের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার নামে সামরিক বাহিনী রাজনীতিক অঙ্গনে তাঁদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে তাঁদের এই আধিপত্য চালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল থেকে নিষেধাজ্ঞাসহ নানা কারণে মিয়ানমারের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের বেড়ে গেছে।সব কিছু মিলিয়ে মিয়ানমারের অর্থনীতির অবস্থা ভালো না। মিয়ানমারে চীন সিঙ্গাপুর, জাপান এবং ভারতের বিনিয়োগ আছে এবং কয়েকটি বন্ধুপ্রতিম দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে তাঁরা এসব চাপ উপেক্ষা করতে পারছে।

পি ডি এফ ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র দলগুলোর সাথে সেনাবাহিনীর সংঘাত বেড়ে চলছে ভবিষ্যতে তাঁরা আরও সংগঠিত প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে এতে ক্ষয়ক্ষতি, সংঘাত আরও বাড়বে এবং শান্তি প্রক্রিয়া ও স্থিতিশীলতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে সংঘর্ষের ঘটনা ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যাবে। সব মিলিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও আধিপত্য এখন চালেঞ্জের সম্মুখীন। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য সংঘাত ও সংঘর্ষ পরিহার করে মিয়ানমারে জনগণকে সাথে নিয়ে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়াই এখন তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া দরকার।

ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।

;

স্বাগত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী



আদম তমিজী হক
আদম তমিজী হক

আদম তমিজী হক

  • Font increase
  • Font Decrease

দীর্ঘ ১৮দিন পর বাংলাদেশ ফিরে পাচ্ছে প্রাণপ্রিয় অভিভাবক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। মঙ্গলবার রাত করে যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরছেন বিশ্বনেত্রী । দেশের মানুষ তাদের প্রিয়নেত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ।

যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে ফের ঢাকা। বেশ লম্বা সফর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ১৮ দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববাসীর কাছে বেশ কিছু আহ্বান জানান দিয়ে এসেছেন। তার মূল মর্মবাণী হলো বিশ্বকে হতে হবে হানাহানিমুক্ত, বঞ্চনাহীন, বিশ্বকে হতে হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত। সবমিলিয়ে একটি মানবিক বিশ্ব ও সমান্তরালে মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বানই ছিল তার কণ্ঠজুড়ে। শেখ হাসিনার আহ্বান ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়কে এক সূত্রে গাঁথা যায়।

এদিকে পুরো সফরজুড়ে বিশ্ববাসীর কাছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ ও স্যাংশন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা নিষেধাজ্ঞার মতো বৈরীপন্থা কখনও কোনো জাতির মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না’ উল্লেখ করে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন তিনি।

বাংলাদেশ যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে বিশ্বাসী বাংলাদেশ সেটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া। তাই বিশ্ব দরবারে তার অবস্থান ছিল ‘আমরা ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের অবসান চাই।’

গত আড়ই বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারির ধকল সামলে উঠতে শুরু করেছে, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বিশ্বকে নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে নারী, শিশুসহ গোটা মানবজাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়। এর প্রভাব কেবল একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সকল মানুষের জীবন-জীবিকা মহাসংকটে পতিত হয়।

বিশ্ব বিবেকের কাছে তাই শেখ হাসিনার উদাত্ত আহ্বান অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ, স্যাংশন বন্ধ করুন। শিশুকে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা দিন। শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন। সেই সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করেছেন পারস্পরিক আলাপ-আলোচনাই সংকট ও বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোত্তম উপায়।

প্রসঙ্গত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিকারক বাংলাদেশ মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের শতকরা ৬৫ ভাগের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে তেল ও তরলীকৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে দশগুণের বেশি। বন্ধ হয়ে গেছে তরলীকৃত জ্বালানি এলএনজি এর ফলে বাংলাদেশর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে চলছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। জ্বালানির দাম বাড়ায় অবধারিতভাবে বেড়েছে বাংলাদেশের পরিবহন খরচ ও প্রায় সকল নিত্যপণ্যের দাম।

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম হলেও দেশের বার্ষিক ৮০ লাখ মেট্রিকটন গমের চাহিদার প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিকটনই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়, যা মূলত মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আসে। কিন্তু গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর দেশগুলো থেকে গম আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে গম ও আটার সংকট শুরু হয়। এরইমধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় গম কেনা শুরু হয়েছে। অচিরেই দেশে পৌঁছাবে গমের বিশাল চালান।

বৈশ্বিক সমস্যার পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারে নির্যাতনে শিকার হয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেবার পাঁচ বছর পার হলেও প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো যায়নি। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ মেয়াদের উপস্থিতি অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এমনকি এ পরিস্থিতি উগ্রবাদকেও ইন্ধন দিতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট প্রলম্বিত হতে থাকলে উপমহাদেশসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ মনবিকতায় বিশ্বাসী বলেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের বুকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্য-সংহতির বাণী উচ্চারণ করেছেন। এ যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠে যেন বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন শান্তি ও ন্যায়ের প্রতীক যিনি সারা বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বপ্ন দেখেছেন- বিশ্ব শান্তিই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম মূলনীতি। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত বিশ্বের মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি মোটেই কুণ্ঠিত ছিলেন না, সে সংগ্রাম হোক আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা কিংবাএশিয়ার যে কোনো প্রান্ত। অস্ত্র দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম বন্ধ করা যায় না এ কথাতিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে শান্তির প্রতি জোরদেওয়া, যে কোনো ধরনের সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সর্বোত্তম উপায় হিসেবে সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজা- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। এই নীতির মাধ্যমেই সংঘাত এড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে মানবিক বিশ্ব, প্রতিষ্ঠিত হতে পারে মানবিক বাংলাদেশ।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ১৯ সেপ্টেম্বর যোগ দেন প্রয়াত রানির  অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে আয়োজিত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোসহ অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

যুক্তরাজ্য সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান শেখ হাসিনা। নিউ ইয়র্কে যোগ দেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে। ২৩ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেন জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে। এছাড়া তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

জাতিসংঘে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ নানাকারণে আলোচিত হয়েছে। বরাবরের মতো বাংলায় দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনা করোনা মহামারী আর ইউক্রেইন আর রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার বিষয়ে আলোকপাত করেন। পারমানবিক অস্ত্র বিস্তাররোধসহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের তাগিদে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল বিশ্বনেতাদের সামনে সোচ্চার। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহবান জানাতেও ভোলেননি।

বহুদিন ধরেই ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বিদেশীদের কাছে অপপ্রচার চালাচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের ধোঁয়া তুলে । ওয়াশিংটনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে মতবিনিময়কালে এই বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, দেশের মাটিতে বর্তমান সরকারের প্রকৃত উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি বিএনপি শাসনামলের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও বর্বরতার কথা তুলে ধরতে হবে।

এটা শুধু প্রবাসীদের দায়িত্ব না। দায়িত্ব সকল সচেতন বাংলাদেশি নাগরিকের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি নিশ্চিত থাকুন। আপনার অভিভাবকত্বে এই দেশে কোন অপশক্তিকে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেয়া হবে না। ব্যহত করতে দেয়া হবে না এই দেশের উন্নয়নের জোয়ারের ধারাবাহিকতাকে। আমাদের প্রয়োজন শুধু আলোকবর্তিকা হয়ে আপনার দিক-নির্দেশনা। আপনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।

লেখকঃ রাজনীতিক , সমাজকর্মী।

;

অগাস্ট কোঁত এর ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব ও বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা



মো: বজলুর রশিদ
অগাস্ট কোঁত এর ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব ও বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা

অগাস্ট কোঁত এর ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব ও বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা

  • Font increase
  • Font Decrease

 

মানব সমাজের শুরু থেকেই প্রতিটি সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আর সমাজ ও সংস্কৃতি সর্বদা পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না। পরিবর্তন হয় ধীর গতিতে, ক্রমান্বয়ে। আর এই ধীর লয়ের পরিবর্তনকে সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক বিবর্তন হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তবে প্রতিটি সমাজে শত পরিবর্তনের পরও একটি বিষয় স্থির হয়ে থাকে আর তা হল সত্য।

সমাজবিজ্ঞানের জনক ইসিডোর ম্যারি অগাস্ট ফ্রাংকোসিস কোঁত সংক্ষেপে অগাস্ট কোঁত এর মতে, যে কোনো সমাজ চূড়ান্ত সত্যের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তিনটি পর্যায় অতিক্রম করে। প্রতিটি ধাপে মানুষ ধীরে ধীরে কল্পনা ও কুসংস্কারের জাল ছিন্ন করে আরও বুদ্ধিমান হয়। একদিকে যেমন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়, অন্যদিকে মানুষের মানসিক পরিবর্তনও ঘটে সমান্তরালভাবে। আর এই সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তনের তিনটি পর্যায় সম্পর্কে কোঁত যে তত্ত্ব প্রদান করেছেন তাকে ‘ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব’ (Law of Three Stages) বলা হয়।

সামাজিক বির্বতনে অগাস্ট কোঁত এর তত্ত্বের প্রথম স্তর হল ধর্মতাত্ত্বিক বা কাল্পনিক সমাজ। তেরো শতকের পূর্বের সামাজিক ব্যবস্থাগুলি প্রধানত এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সমাজে মানুষ সমস্ত ঘটনা এবং সমস্ত জীবন্ত বস্তু বা জড় বস্তুতে, তা সাধারণ, অতি সাধারণ বা অসাধারণ যাই হোক তাতে অতিপ্রাকৃত কিছুর স্পর্শ খুঁজে পেত। এই সমাজে সত্য আবিষ্কারের জন্য যৌক্তিকতা ও ন্যূনতম প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল না। এই সমাজের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার পেছনে অতিপ্রাকৃত কিছু জড়িত ছিল বলে ধারণা করা। মূলত, এই ধরনের বিশ্বাসগুলি আদিম সমাজে প্রচলিত ছিল, যেখানে সবকিছুর পিছনে অতিপ্রাকৃত শক্তির সম্পর্ক খোঁজা হত।

পুরোহিতদের দ্বারা শাসিত এই সমাজে, এমনকি মানুষের স্বাভাবিক আবেগও ঈশ্বরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে মনে করা হত। আর এই সমাজ নিয়ন্ত্রিত হতো সামরিক বাহিনী দ্বারা, যারা পুরোহিতদের আদেশ ও শৃঙ্খলা মেনে চলত। সেই সমাজে যুক্তির কোন স্থান ছিল না। সামাজিক বিবর্তনের এই ধর্মতাত্ত্বিক স্তরের আবার তিনটি উপ-স্তর রয়েছে যথা 'ফেটিসিজম' বা বস্তুবাদ, 'পলিথিজম' বা বহুদেববাদ এবং 'মনোথিজম' বা একেশ্বরবাদ।

ফেটিসিজম বা বস্তুবাদ হল এই বিশ্বাস যে অতিপ্রাকৃত শক্তিগুলি জড় বস্তুতে বাস করে। যখন এই বিশ্বাসের সূচনা হয়েছিল, তখন কোন যাজক বা পুরোহিতের প্রয়োজন ছিল না। কারণ মানুষ ভেবেছিল প্রকৃতির প্রতিটি জড় বস্তুর মধ্যেই কিছু অতিপ্রাকৃত শক্তি বিদ্যমান। কাঠের টুকরো হোক, বড় পাথর হোক, বিশাল বটগাছ হোক বা পাহাড় হোক, সবকিছুর ভেতরেই রয়েছে রহস্যময় ক্ষমতা। তাই তাদের পূজা করতে হবে এবং সেই মহান শক্তিকে সন্তুষ্ট করতে হবে। কিন্তু আর কতদিন? ধীরে ধীরে, মানুষ প্রচুর পরিমাণে বস্তুর সাথে পরিচিত হয়ে বিভ্রান্ত হয়। তাদের সবার মধ্যে কি একই পরাশক্তি বিদ্যমান?

এই বিভ্রান্তি থেকেই বহুদেববাদের সূচনা হয়। লোকেরা ধরে নিয়েছিল যে একই অতিপ্রাকৃত শক্তির সমস্ত জিনিসের মধ্যে তার অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। ফলে শুরু হলো সীমাহীন ও বাধাহীন 'দেবতা' বানানোর সমাজ! এই সমাজে মানুষ প্রতিটি ভিন্ন প্রাকৃতিক সত্তার জন্য আলাদা আলাদা দেবতা নিযুক্ত করে (বিশ্বাস করতে শুরু করে)। তদনুসারে, সমাজে পুরোহিত এবং পুরোহিতের উদ্ভব হয়েছিল, যারা দেবতাদের সান্নিধ্য লাভ করেছিল এবং সাধারণ মানুষের চেয়ে উচ্চে পৌঁছেছিল। কিন্তু দিনে দিনে দেবতাদের সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে মানুষ আবার বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল।

দ্বিতীয় বিভ্রান্তিটি ধর্মতাত্ত্বিক পর্যায় বা ধর্মতাত্ত্বিক সমাজের সমাপ্তির শুরুকে চিহ্নিত করে। পূর্ববর্তী দুটি উপ-স্তর ছিল মানুষের কল্পনা এবং অযৌক্তিকতার চরম উদাহরণ। এই স্তরে যুক্তি কল্পনাকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে। মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে সমগ্র বিশ্ব এক ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে এবং তিনিই সর্বশক্তিমান। এই বিশ্বাস থেকেই মানুষ সীমাহীন বিভ্রম পরিহার করে যুক্তি ও যুক্তির বিকাশ শুরু করে। ধর্মতাত্ত্বিক সমাজে ধর্মযাজক বা প্রচারক, রাজা, সামরিক বাহিনী জনগণের দ্বারা বিশেষভাবে সম্মানিত ও প্রিয় ছিল। পরিবারকেন্দ্রিক এই সমাজে স্থিতিশীলতার ভিত্তি ছিল সামরিক শক্তি।

অগাস্ট কোঁত এর মতে মেটাফিজিক্যাল স্টেজ বা আধিভৌতিক বা আধ্যাত্মিক বা বিমূর্ত স্তর শুরু হয় তেরো শতকে। ধর্মতাত্ত্বিক স্তরের তুলনায় এই স্তরটি দৈর্ঘ্যে খুব ছোট। মধ্যযুগ এবং রেনেসাঁর সময় সামাজিক বিবর্তনের এই স্তরটিকে অন্য কথায় বলা যেতে পারে ধর্মতাত্ত্বিক স্তরের বৃদ্ধি বা প্রসারণ। অনেকটা ধর্মতাত্ত্বিক সমাজের মতোই এই সমাজে চিন্তাধারা ছিল। তাই একে অনেকে ধর্মতাত্ত্বিক সমাজের বর্ণ সংকর বা সংক্রামক বলেও মনে করে থাকে।

আধিভৌতিক মানে এমন কিছু যা বস্তু দ্বারা বা কোনো বাহ্যিক রূপ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না। সেই অবর্ণনীয় জিনিস হল জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, নীতি, যুক্তি। এই স্তরে, মানুষ কল্পনাকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ যৌক্তিকতা এবং বিচারের সাথে চিন্তা করতে শুরু করে। সামাজিক বিবর্তনের এই পর্যায়ে মূর্ত ঈশ্বরের ধারণা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ঈশ্বর সম্পূর্ণ বিমূর্ত সত্তা

আধিভৌতিক স্তরে পাদ্রীদের স্বৈরাচারী বা একচেটিয়া ক্ষমতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বরং সমাজ পরিচালিত হতো আইন দ্বারা। কিন্তু পরোক্ষভাবে পুরোহিতরাই এই আইনকে প্রভাবিত করেছিল। এই সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালীদের মধ্যে রয়েছে চার্চের অধীনস্ত আইনজীবীরা এবং সমস্ত আইন রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সমাজের এই স্তর থেকে সবকিছু কঠোর নিয়ম-কানুন দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে।

ধর্মতাত্ত্বিক এবং আধিভৌতিক স্তরের বাইরে, সভ্যতার সবচেয়ে উন্নত সামাজিক ব্যবস্থা অবশেষে শুরু হয়। আর এটাই ইতিবাচক (Positive) বা বৈজ্ঞানিক সমাজ। এই সমাজের মূল ধর্মতাত্ত্বিক থেকে বিপরীত দিকে চলে, এমনকি অধিবিদ্যামূলক সমাজের যুক্তিগুলি এখানে খুব বেশি কাজ করে না। পরিবর্তে, একটি ইতিবাচক বা দূরদর্শী সমাজে সবকিছুর মূলে থাকবে বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান আসে অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্য এবং উপাত্ত থেকে।

শিল্পায়নের শুরু থেকেই সামাজিক কাঠামো বিজ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এবং মানুষ বিশ্বাস করে যে কোন ঐশ্বরিক বা অলৌকিক শক্তির কারণে নয়, প্রকৃতির সবকিছুই কিছু নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চলে। তাই কোনো বস্তুকে রহস্য না ভেবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এর পেছনের কারণ আবিষ্কার করা সম্ভব। আর এই বিশ্বাসকে বলা হয় পজিটিভিজম বা দৃষ্টবাদ।

উনিশ শতকের শুরু থেকে, ইতিবাচক বা আদর্শবাদী চিন্তা গতি পেতে শুরু করে। এ সময় সবকিছুর পেছনে প্রকৃত কারণ খোঁজার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় মানুষের মধ্যে। মানুষ সব বিষয়ে সম্পূর্ণ সন্দেহমুক্ত হতে চায়। ফলস্বরূপ, ঈশ্বরের ধারণাটি অদৃশ্য হয়ে যায়, কারণ একটি বিমূর্ত ঈশ্বরের অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা যায়নি। মানুষ সব তাত্ত্বিক বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার চেষ্টা করে। আর যেহেতু বিজ্ঞানে বিশেষ বিশ্বাস বা সংস্কারের কোনো স্থান নেই, তাই চিন্তার এই স্তরে মানুষ ধর্মকে একপাশে ঠেলে দেয়।

ইতিবাচক সমাজ, বিজ্ঞান দ্বারা পরিচালিত হয়। শিল্পপতি, প্রযুক্তিবিদ এবং সুবিধাবাদীরা এই সমাজে আধিপত্য বিস্তার করে। বোঝাপড়া-নৈতিকতা, এবং অনুভূতি ও আবেগ, সব ধরনের ধর্ম-বিশ্বাস এই সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটি সামাজিক বিবর্তনের পর্যায়। অনেক কিছুই রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই সমাজে এসেছে। আর এই পথেই মানুষের মনের মুক্তি হয় এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তির মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এই সমাজ পরিবর্তিত হতে থাকবে, কিন্তু সমাজ ব্যবস্থায় বিজ্ঞান থেকে যাবে।

অগাস্ট কোঁত এর  ত্রি স্তর আইন তত্ত্বটি বিভিন্ন দার্শনিক এবং সমাজবিজ্ঞানীদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। তবে আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখনও দেখতে পাই অগাস্ট কোঁত বর্ণিত তিনটি পর্যায়ই বিদ্যমান। এখানে ধর্মতাত্ত্বিক সমাজের বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে, আধিভৌতিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি নির্ভর সমাজ সবই রয়েছে। অর্থাৎ অগাস্ট কোঁত এর ‘ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব’ আমাদের সমাজে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।

মো: বজলুর রশিদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

;

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহালে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে



আদম তমিজী হক
আদম তমিজী হক

আদম তমিজী হক

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশব্যাপী বইছে নির্মল সম্প্রীতি থেকে উৎসারিত উৎসবের ফল্গুধারা। শারদীয় দুর্গোৎসব পালনের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও কল্যাণময় অবস্থানের বিকাশ আরও বিস্তৃত এবং বিকশিত হবে। পরাজয় ঘটবে অশুভ শক্তির- এই মর্মবাণী ধারণ করে শুরু হয়েছে দেবী দুর্গার বন্দনা।

এই শারদীয় উৎসব আমাদের শত শত বছরের ঐহিত্য। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ নানাভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যাবতীয় দুঃখ ভুলে গিয়ে হিংসা-বিদ্বেষের উর্ধ্বে উঠে প্রীতির মেলবন্ধন রচনার মাধ্যমে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। অসুরের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন দুর্গতিনাশিনী দুর্গা। সেই থেকে বিজয় ঘটে শুভশক্তির। দেবীর আগমন ঘটে অন্যায়ের বিনাশ ঘটিয়ে সজ্জনদের প্রতিপালনের অঙ্গীকার নিয়ে মানুষের মধ্যে নৈতিক আদর্শ জাগ্রত করার জন্য। মানুষের চিত্ত থেকে যাবতীয় দীনতা ও কলুষতা দূরীভূত করার জন্য।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দুর্গাপূজা উদযাপনে বিঘ্নিত করার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধ পরিকর।’

ধর্মীয় সূত্র অনুযায়ী বলা যায় যে,  প্রতি শরতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বর্গলোক কৈলাস ছেড়ে মর্তে আসেন দেবী দুর্গা। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে নির্দিষ্ট তিথি পর্যন্ত বাবার বাড়িতে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে। দেবীর অবস্থানকালে পাঁচদিন পৃথিবীতে ভক্তরা দেবী মায়ের বন্দনা করে। এই বন্দনাকে কেন্দ্র করে দেশবাসী মেতে ওঠে উৎসব আনন্দে। ধর্ম মানুষে মানুষে প্রীতি, প্রেম, সহিষ্ণুতা, ঐক্য ও শান্তির ডাক দিয়ে যায়। তারপরও অসুরের আকস্মিক উন্মত্ততা নষ্ট করে দেয় আবহমানকালের প্রীতিধন্য পারস্পরিক অবস্থানকে, ধ্বংস করে দেয় দীর্ঘকালীন হৃদ্যতাকে। প্রতিবছর মঙ্গলদাত্রী দেবী দুর্গার আগমন ঘটে কল্যাণ ও শান্তিকে সংস্থাপন করার জন্য এবং তা প্রতিবছরই। তিনি ন্যায়ের উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে যান সবাইকে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। প্রতিটি উৎসব নিরাপদ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে এমনটিই আমরা দেখতে চাই। পূজা মণ্ডপের নিরাপত্তার ব্যাপারে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে বাস্তবেও এর প্রতিফলন দেখতে চাই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার্থে নাগরিক দায়িত্বও কিন্তু কম নয়। এ ব্যাপারে সবাই আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসবেন-এমনই দেখতে চায় দেশের মানুষজন।

বর্তমানে এ দেশে দুর্গোৎসব কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচার-অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসব উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ সময়টাতে আগমনী সুর জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব বাঙালিকেই দোলা দিয়ে যায়। শরতের শুভ্র আকাশ, কাশফুলে হাওয়ার নাচন আর আগমনী ঢাক-শাঁখের আওয়াজ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। গ্রাম-নগরে ধনী-গরিব ছোট-বড় সবাই মিলিত হন শরতের মিলনোৎসবে। দেশের মিডিয়াগুলোও এটিকে সার্বজনীন উৎসব গণ্য করে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সাজায়। এটি অনুপম সম্প্রীতি চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।

এ উৎসব ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত থাকবে। যেন কোনো ধরনের অঘটন না ঘটে। পূজা বানচালের জন্য উগ্র সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় গোষ্ঠি সবসময় তৎপর থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড নিতে দেখা যায়। গত বছর কুমিল্লায় পূজা মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরীফ রাখাকে কেন্দ্র করে বহু পূজা মণ্ডপে তাণ্ডব চালানো হয়। এর সঙ্গে ধর্মীয় উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি জড়িত ছিল। এবার যেন সে রকম কিছু না ঘটে তার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগেভাগে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করায় সাধুবাদ।

প্রতিবছরই আমরা দেখি, পূজা আসার আগে থেকেই শুরু হয় প্রতিমা ভাঙার উৎসব। আগে বুঝত ঋতু দেখে, এখন প্রতিমা ভাঙার খবর পড়তে পড়তেই বাঙালি বুঝতে পারে দুর্গা পূজা সমাগত। সেই গোষ্ঠী বাংলাদেশে পূজা উদযাপন বন্ধ করতে চায়। এটা বন্ধ করে তারা সেই এই সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করার আয়োজন করে। গতবার ছিল তার চূড়ান্ত রূপ। যারা এমনটা করে তারা এখন নারীর কপালের টিপ নিয়ে কথা বলে, পোশাক নিয়ে কথা বলে। সেক্যুলার রাজনীতির ব্যর্থতায় রাষ্ট্রকাঠামোই সেদিকে ধাবিত হচ্ছে এবং সেটি এমন এক সংস্কৃতির জাগরণ ঘটাচ্ছে যা আসলে সংখ্যাগুরুর ধর্ম ও সামাজিকতা আধিপত্য কায়েম করছে। সে এখন চায় এদের নীতিকেই জাতীয় রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।

রাজনীতি ও সমাজের নীতিপুলিশি এখন নিয়মিত নজরদারি করে সংখ্যালঘুর ওপর। এই রাষ্ট্রে সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুষঙ্গগুলো ক্রমে সংস্কৃতির উপাদান হয়ে উঠছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ, নারী হলে আরও বেশি করে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। সমাজের সব স্তরে সংখ্যাগুরুর ধর্ম, সংস্কৃতির অভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে, উদযাপিত হচ্ছে। রাষ্ট্রের বর্তমান নিয়ন্ত্রকরা তাকে অগ্রাধিকার দেওয়াকেই স্বাভাবিক বলে দেখান। আর সেই সংস্কৃতির দাপটে সংখ্যালঘুর অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গতবারের কুমিল্লার ঘটনায় বোঝা গেল যেটুকু বা অধিকার সুরক্ষিত আছে, আজ তা লুণ্ঠিত হওয়ার পথে।

তবে উৎসব-পার্বণ পালনের মধ্য দিয়েই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় হোক। আমাদের মনের সব হিংসা, দ্বেষ, কালিমা দূর হয়ে যাক। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে আমরা সুখ ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাব- এই হোক প্রার্থনা। বাঙালির চিরায়ত এই উৎসব হোক আনন্দের, উৎসব হোক নিরাপদ। কোন রাজনৈতিক অপশক্তি এই সাংস্কৃতিক উৎসব কে ব্যহত করে ফায়দা নিতে চাইলে আমাদেরকেই সকলে মিলে দায়িত্ব নিয়ে তা প্রতিহতও করতে হবে।

লেখক: রাজনীতিক ও সমাজকর্মী।

;