স্বপ্ন দেখতে অন্যের সহায়তা প্রয়োজন



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গত পচিশ বছর বেসরকারি বিমানসংস্থাগুলো বাংলাদেশের এভিয়েশনে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে। এই লড়াইয়ে বাস্তবিক চিত্র কোনোভাবেই সুখকর নয়। ৮ থেকে ৯টি বেসরকারি এয়ারলাইন্স শুরু থেকেই ইতিহাস হয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অনেক দাবিই অপূর্ণ ছিলো।

অনেক দাবির মধ্যে বেসরকারি এয়ারলাইন্সের জন্য হ্যাঙ্গার সুবিধা ছিলো অন্যতম। দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর পর রেগুলেটরি অথরিটি সিভিল এভিয়েশন সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছে। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে পরিশেষে গুরুত্বারোপ করে এয়ারক্রাফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে সম্পাদনের জন্য যাত্রীবাহী এয়ারলাইন্সগুলোকে হ্যাঙ্গার সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু বিগত দিনে বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্সগুলোও হ্যাঙ্গার প্রাপ্তির জন্য বহুবার তাগাদা দিয়েছে কিন্তু দাবী পূরণ হওয়ার পূর্বেই সেই এয়ারলাইন্সগুলো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ। এই চার্জের মধ্যে সাধারণত ল্যান্ডিং, পার্কিং, রুট নেভিগেশন, সিকিউরিটি অন্যতম। ব্যবসায়িক গতিশীলতা বজায় রাখার জন্য বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো সিভিল এভিয়েশনের কাছে সবসময়ই চার্জ কমানোর জন্য যৌক্তিক দাবি তুলে আসছে। এইসব চার্জের কারনে সরাসরি অপারেশন খরচ বেড়ে যায়, যা যাত্রী ভাড়ার উপর প্রভাব পড়ে। যাত্রী ভাড়াকে সহনীয় রাখার জন্য চার্জ কমানোর কোনো বিকল্প নেই।

দেশীয় এয়ারলাইন্স এর ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা চার্জ সমহারে নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষ থেকে। বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের তুলনায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে প্রায় নয় থেকে দশ শতাংশ বেশী, যা একটি দেশীয় এয়ারলাইন্স কখনো প্রত্যাশা করে না।

সঠিক সময়ে চার্জ প্রদান না করতে পারলে মাসে ৬ শতাংশ হারে বাৎসরিক ৭২ শতাংশ হারে সারচার্জ প্রদান করতে হয়। যা পার্শ্ববর্তী যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশী। সারচার্জ ১২ শতাংশ হারে নির্ধারণ করার জন্য বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু সে দাবি পূরণ না করার কারনে এয়ারলাইন্সগুলো চার্জ ও সারচার্জ বকেয়া রেখেই ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। অধিক হারে চার্জ নির্ধারণ সময়মতো চার্জ প্রদান না করার প্রধান কারণ বলেই মনে হয়ে্ছে।

বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমে দেখা যায় বিভিন্ন এয়ারলাইন্স বিশেষ করে বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্সগুলো আর জাতীয় বিমান সংস্থার কাছ থেকে চার্জ আর সারচার্জ মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে সিভিল এভিয়েশনের। যৌক্তিক হারে চার্জ ও সারচার্জ নির্ধারণ করলে সিভিল এভিয়েশনকে বিশাল অংকের টাকার হিসাব বহন করতে হতো না।

বন্ধ হওয়া এয়ারলাইন্স জিএমজি, ইউনাইটেড ও রিজেন্ট এর কাছে প্রায় হাজার কোটি টাকার হিসাব আছে বকেয়া হিসাবে, যা আদৌ কোনোদিন আদায় করার কোনো সুযোগ আসবে কিনা সন্দেহ আছে। এছাড়া স্বল্প সময়ে অপারেশনে থাকলেও এ্যারো বেঙ্গল, এয়ার পারাবাত, বেস্ট এয়ার, এভিয়ানা এয়ারওয়েজ এর কাছেও বকেয়া হিসেবে পাওনা আছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের। যা অনেকটা ”জনম বাকী” হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। এছাড়া অনেক বিদেশি এয়ারলাইন্স এর কাছেও বিভিন্ন চার্জ বাবদ পাওনা রয়েছে সিভিল এভিয়েশনের।

নন- এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ বিমানবন্দরের ভিতরে কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য বিভিন্ন জায়গা ভাড়া নেয়ার সুযোগ আছে। ব্যবসা হোক কিংবা না হোক বছরান্তে ভাড়া বৃদ্ধির প্রবণতাও দেখা যায় কর্তৃপক্ষের। নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ সহনীয় পর্যায়ে রাখলে এয়ারলাইন্সগুলো টিকে থাকার জন্য সহজ হবে।

সময়কে বিবেচনা না করে অনেক সময়ই বিভিন্ন ধরনের চার্জ আরোপ করতে দেখা যায়। উদাহরণ স্বরূপ কোভিড কালীন সময়ে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম খাত বিশ্বব্যাপী চরমভাবে বিপর্যস্ত ছিলো, বিভিন্ন দেশ যেখানে এখাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য যারপর নাই চেষ্টা করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এভিয়েশনে এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ও সিকিউরিটি খাতে নতুন করে চার্জ আরোপ করেছে। যা সময়ের কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। কারন এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্টও যেমন দরকার তেমনি সিকিউরিটিও প্রয়োজন কিন্তু চার্জ আরোপের ক্ষেত্রে সময়কে বিবেচনায় রাখা খুবই জরুরি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন যাকে একনামে বিপিসি হিসেবে খুবই পরিচিত। সেবা ধর্মী একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিপিসির কার্যক্রম দেখলে মনে হয় যেন মনোপলিস্টিক বিজনেস-ই লক্ষ্য। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে দেশের এভিয়েশন খাতকে বিবেচনায় না রেখে লাভ-ক্ষতির হিসেবকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। জেট ফুয়েলের উচ্চ মূল্য বাংলাদেশ এভিয়েশনের অস্থিরতার পিছনে মূখ্য ভূমিকা রাখছে। কারন হিসেবে যেকোনো রুটের অপারেশনাল খরচের প্রায় ৫০ শতাংশই হচ্ছে জেট ফুয়েলের খরচ। জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন না করলে বাংলাদেশের এভিয়েশন কখনই বিদেশি এয়ারলাইন্সের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

অনেক সময়ই আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে মূল্য নির্ধারনে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। কোভিড কালীন ও কোভিড পরবর্তীতে বিদ্যূত গতিতে পূর্বের ক্ষতিকে কাটিয়ে উঠার জন্য ধারাবাহিকভাবে মূল্য বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিলো বিপিসি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের মূল্য কমলেও কচ্ছপ গতিতে লিটার প্রতি জেট ফুয়েলের মূল্য কমানোর হার দেখা যাচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম খাতে গ্রীষ্মকালীন সূচিতে যাত্রী বৃদ্ধির হার থাকে নিম্নমূখী, সেই সঙ্গে দেশে মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতু উদ্বোধনের কারণে দক্ষিণবঙ্গের যাত্রী হ্রাস পাওয়ায় বরিশাল ও যশোর রুটে ফ্লাইট সংখ্যার সাথে যাত্রী ভাড়া কমিয়ে সেবার মান ঠিক রাখার চেষ্টা করছে এয়ারলাইন্সগুলো।

দেশের আকাশ পথের গতিশীলতা বজায় রাখতে দেশের অভ্যন্তরে বন্ধ হওয়া বিমানবন্দরগুলোকে পুনরায় চালু রাখলে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো টিকে থাকার সুযোগ পাবে। সাথে সারাদেশকেই আকাশ পথে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।

নানারকম সুযোগপ্রাপ্তিতে এগিয়ে থাকা জাতীয় বিমানসংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর সাথে বেসরকারি বিমান সংস্থাসমূহের লেবেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবী শুরু থেকেই। জ্বালানি তেল প্রাপ্তিতে কিংবা সিভিল এভিয়েশন অথরিটির পাওনা পরিশোধে ”এক্সট্রা খাতির” বরাবরই দেখা যায়। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা না পরিশোধ করেই প্রায়ই লাভের হিসাব দেখা যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

দেশের এভিয়েশনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি কিংবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এর দ্বি-নীতি পরিহার করলে ভবিষ্যতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো সুসংহত হবে। বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর বন্ধ হওয়ার মিছিলের লাগাম টেনে ধরে এগিয়ে যাওয়ার মিছিল শক্তিশালী হবে।

বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো শুরু থেকেই আকাশ পরিবহনের ব্যবসায় টিকে থাকার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, সিভিল এভিয়েশন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি সেবা মূলক ও নীতি নির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার ওপর।

লেখক: মোঃ কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

স্বাগত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী



আদম তমিজী হক
আদম তমিজী হক

আদম তমিজী হক

  • Font increase
  • Font Decrease

দীর্ঘ ১৮দিন পর বাংলাদেশ ফিরে পাচ্ছে প্রাণপ্রিয় অভিভাবক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। মঙ্গলবার রাত করে যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরছেন বিশ্বনেত্রী । দেশের মানুষ তাদের প্রিয়নেত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ।

যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে ফের ঢাকা। বেশ লম্বা সফর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ১৮ দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববাসীর কাছে বেশ কিছু আহ্বান জানান দিয়ে এসেছেন। তার মূল মর্মবাণী হলো বিশ্বকে হতে হবে হানাহানিমুক্ত, বঞ্চনাহীন, বিশ্বকে হতে হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত। সবমিলিয়ে একটি মানবিক বিশ্ব ও সমান্তরালে মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বানই ছিল তার কণ্ঠজুড়ে। শেখ হাসিনার আহ্বান ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়কে এক সূত্রে গাঁথা যায়।

এদিকে পুরো সফরজুড়ে বিশ্ববাসীর কাছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ ও স্যাংশন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা নিষেধাজ্ঞার মতো বৈরীপন্থা কখনও কোনো জাতির মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না’ উল্লেখ করে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন তিনি।

বাংলাদেশ যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে বিশ্বাসী বাংলাদেশ সেটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া। তাই বিশ্ব দরবারে তার অবস্থান ছিল ‘আমরা ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের অবসান চাই।’

গত আড়ই বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারির ধকল সামলে উঠতে শুরু করেছে, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বিশ্বকে নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে নারী, শিশুসহ গোটা মানবজাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়। এর প্রভাব কেবল একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সকল মানুষের জীবন-জীবিকা মহাসংকটে পতিত হয়।

বিশ্ব বিবেকের কাছে তাই শেখ হাসিনার উদাত্ত আহ্বান অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ, স্যাংশন বন্ধ করুন। শিশুকে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা দিন। শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন। সেই সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করেছেন পারস্পরিক আলাপ-আলোচনাই সংকট ও বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোত্তম উপায়।

প্রসঙ্গত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিকারক বাংলাদেশ মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের শতকরা ৬৫ ভাগের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে তেল ও তরলীকৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে দশগুণের বেশি। বন্ধ হয়ে গেছে তরলীকৃত জ্বালানি (এলএনজি এর ফলে বাংলাদেশর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে চলছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। জ্বালানির দাম বাড়ায় অবধারিতভাবে বেড়েছে বাংলাদেশের পরিবহন খরচ ও প্রায় সকল নিত্যপণ্যের দাম।

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম হলেও দেশের বার্ষিক ৮০ লাখ মেট্রিকটন গমের চাহিদার প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিকটনই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়, যা মূলত মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আসে। কিন্তু গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর দেশগুলো থেকে গম আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে গম ও আটার সংকট শুরু হয়। এরইমধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় গম কেনা শুরু হয়েছে। অচিরেই দেশে পৌঁছাবে গমের বিশাল চালান।

বৈশ্বিক সমস্যার পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারে নির্যাতনে শিকার হয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেবার পাঁচ বছর পার হলেও প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো যায়নি। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ মেয়াদের উপস্থিতি অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এমনকি এ পরিস্থিতি উগ্রবাদকেও ইন্ধন দিতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট প্রলম্বিত হতে থাকলে উপমহাদেশসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ মনবিকতায় বিশ্বাসী বলেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের বুকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্য-সংহতির বাণী উচ্চারণ করেছেন। এ যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠে যেন বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন শান্তি ও ন্যায়ের প্রতীক যিনি সারা বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বপ্ন দেখেছেন- বিশ্ব শান্তিই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম মূলনীতি। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত বিশ্বের মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি মোটেই কুণ্ঠিত ছিলেন না, সে সংগ্রাম হোক আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা কিংবাএশিয়ার যে কোনো প্রান্ত। অস্ত্র দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম বন্ধ করা যায় না এ কথাতিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে শান্তির প্রতি জোরদেওয়া, যে কোনো ধরনের সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সর্বোত্তম উপায় হিসেবে সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজা- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। এই নীতির মাধ্যমেই সংঘাত এড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে মানবিক বিশ্ব, প্রতিষ্ঠিত হতে পারে মানবিক বাংলাদেশ।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ১৯ সেপ্টেম্বর যোগ দেন প্রয়াত রানির  অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে আয়োজিত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোসহ অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

যুক্তরাজ্য সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান শেখ হাসিনা। নিউ ইয়র্কে যোগ দেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে। ২৩ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেন জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে। এছাড়া তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

জাতিসংঘে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ নানাকারণে আলোচিত হয়েছে। বরাবরের মতো বাংলায় দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনা করোনা মহামারী আর ইউক্রেইন আর রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার বিষয়ে আলোকপাত করেন। পারমানবিক অস্ত্র বিস্তাররোধসহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের তাগিদে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল বিশ্বনেতাদের সামনে সোচ্চার। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহবান জানাতেও ভোলেননি।

বহুদিন ধরেই ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বিদেশীদের কাছে অপপ্রচার চালাচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের ধোঁয়া তুলে । ওয়াশিংটনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে মতবিনিময়কালে এই বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, দেশের মাটিতে বর্তমান সরকারের প্রকৃত উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি বিএনপি শাসনামলের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও বর্বরতার কথা তুলে ধরতে হবে।

এটা শুধু প্রবাসীদের দায়িত্ব না। দায়িত্ব সকল সচেতন বাংলাদেশি নাগরিকের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি নিশ্চিত থাকুন। আপনার অভিভাবকত্বে এই দেশে কোন অপশক্তিকে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেয়া হবে না। ব্যহত করতে দেয়া হবে না এই দেশের উন্নয়নের জোয়ারের ধারাবাহিকতাকে। আমাদের প্রয়োজন শুধু আলোকবর্তিকা হয়ে আপনার দিক-নির্দেশনা। আপনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।

লেখকঃ রাজনীতিক , সমাজকর্মী।

;

অগাস্ট কোঁত এর ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব ও বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা



মো: বজলুর রশিদ
অগাস্ট কোঁত এর ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব ও বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা

অগাস্ট কোঁত এর ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব ও বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা

  • Font increase
  • Font Decrease

 

মানব সমাজের শুরু থেকেই প্রতিটি সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আর সমাজ ও সংস্কৃতি সর্বদা পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না। পরিবর্তন হয় ধীর গতিতে, ক্রমান্বয়ে। আর এই ধীর লয়ের পরিবর্তনকে সমাজবিজ্ঞানীরা সামাজিক বিবর্তন হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তবে প্রতিটি সমাজে শত পরিবর্তনের পরও একটি বিষয় স্থির হয়ে থাকে আর তা হল সত্য।

সমাজবিজ্ঞানের জনক ইসিডোর ম্যারি অগাস্ট ফ্রাংকোসিস কোঁত সংক্ষেপে অগাস্ট কোঁত এর মতে, যে কোনো সমাজ চূড়ান্ত সত্যের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তিনটি পর্যায় অতিক্রম করে। প্রতিটি ধাপে মানুষ ধীরে ধীরে কল্পনা ও কুসংস্কারের জাল ছিন্ন করে আরও বুদ্ধিমান হয়। একদিকে যেমন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়, অন্যদিকে মানুষের মানসিক পরিবর্তনও ঘটে সমান্তরালভাবে। আর এই সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তনের তিনটি পর্যায় সম্পর্কে কোঁত যে তত্ত্ব প্রদান করেছেন তাকে ‘ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব’ (Law of Three Stages) বলা হয়।

সামাজিক বির্বতনে অগাস্ট কোঁত এর তত্ত্বের প্রথম স্তর হল ধর্মতাত্ত্বিক বা কাল্পনিক সমাজ। তেরো শতকের পূর্বের সামাজিক ব্যবস্থাগুলি প্রধানত এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সমাজে মানুষ সমস্ত ঘটনা এবং সমস্ত জীবন্ত বস্তু বা জড় বস্তুতে, তা সাধারণ, অতি সাধারণ বা অসাধারণ যাই হোক তাতে অতিপ্রাকৃত কিছুর স্পর্শ খুঁজে পেত। এই সমাজে সত্য আবিষ্কারের জন্য যৌক্তিকতা ও ন্যূনতম প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল না। এই সমাজের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার পেছনে অতিপ্রাকৃত কিছু জড়িত ছিল বলে ধারণা করা। মূলত, এই ধরনের বিশ্বাসগুলি আদিম সমাজে প্রচলিত ছিল, যেখানে সবকিছুর পিছনে অতিপ্রাকৃত শক্তির সম্পর্ক খোঁজা হত।

পুরোহিতদের দ্বারা শাসিত এই সমাজে, এমনকি মানুষের স্বাভাবিক আবেগও ঈশ্বরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে মনে করা হত। আর এই সমাজ নিয়ন্ত্রিত হতো সামরিক বাহিনী দ্বারা, যারা পুরোহিতদের আদেশ ও শৃঙ্খলা মেনে চলত। সেই সমাজে যুক্তির কোন স্থান ছিল না। সামাজিক বিবর্তনের এই ধর্মতাত্ত্বিক স্তরের আবার তিনটি উপ-স্তর রয়েছে যথা 'ফেটিসিজম' বা বস্তুবাদ, 'পলিথিজম' বা বহুদেববাদ এবং 'মনোথিজম' বা একেশ্বরবাদ।

ফেটিসিজম বা বস্তুবাদ হল এই বিশ্বাস যে অতিপ্রাকৃত শক্তিগুলি জড় বস্তুতে বাস করে। যখন এই বিশ্বাসের সূচনা হয়েছিল, তখন কোন যাজক বা পুরোহিতের প্রয়োজন ছিল না। কারণ মানুষ ভেবেছিল প্রকৃতির প্রতিটি জড় বস্তুর মধ্যেই কিছু অতিপ্রাকৃত শক্তি বিদ্যমান। কাঠের টুকরো হোক, বড় পাথর হোক, বিশাল বটগাছ হোক বা পাহাড় হোক, সবকিছুর ভেতরেই রয়েছে রহস্যময় ক্ষমতা। তাই তাদের পূজা করতে হবে এবং সেই মহান শক্তিকে সন্তুষ্ট করতে হবে। কিন্তু আর কতদিন? ধীরে ধীরে, মানুষ প্রচুর পরিমাণে বস্তুর সাথে পরিচিত হয়ে বিভ্রান্ত হয়। তাদের সবার মধ্যে কি একই পরাশক্তি বিদ্যমান?

এই বিভ্রান্তি থেকেই বহুদেববাদের সূচনা হয়। লোকেরা ধরে নিয়েছিল যে একই অতিপ্রাকৃত শক্তির সমস্ত জিনিসের মধ্যে তার অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। ফলে শুরু হলো সীমাহীন ও বাধাহীন 'দেবতা' বানানোর সমাজ! এই সমাজে মানুষ প্রতিটি ভিন্ন প্রাকৃতিক সত্তার জন্য আলাদা আলাদা দেবতা নিযুক্ত করে (বিশ্বাস করতে শুরু করে)। তদনুসারে, সমাজে পুরোহিত এবং পুরোহিতের উদ্ভব হয়েছিল, যারা দেবতাদের সান্নিধ্য লাভ করেছিল এবং সাধারণ মানুষের চেয়ে উচ্চে পৌঁছেছিল। কিন্তু দিনে দিনে দেবতাদের সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে মানুষ আবার বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল।

দ্বিতীয় বিভ্রান্তিটি ধর্মতাত্ত্বিক পর্যায় বা ধর্মতাত্ত্বিক সমাজের সমাপ্তির শুরুকে চিহ্নিত করে। পূর্ববর্তী দুটি উপ-স্তর ছিল মানুষের কল্পনা এবং অযৌক্তিকতার চরম উদাহরণ। এই স্তরে যুক্তি কল্পনাকে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করে। মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে সমগ্র বিশ্ব এক ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে এবং তিনিই সর্বশক্তিমান। এই বিশ্বাস থেকেই মানুষ সীমাহীন বিভ্রম পরিহার করে যুক্তি ও যুক্তির বিকাশ শুরু করে। ধর্মতাত্ত্বিক সমাজে ধর্মযাজক বা প্রচারক, রাজা, সামরিক বাহিনী জনগণের দ্বারা বিশেষভাবে সম্মানিত ও প্রিয় ছিল। পরিবারকেন্দ্রিক এই সমাজে স্থিতিশীলতার ভিত্তি ছিল সামরিক শক্তি।

অগাস্ট কোঁত এর মতে মেটাফিজিক্যাল স্টেজ বা আধিভৌতিক বা আধ্যাত্মিক বা বিমূর্ত স্তর শুরু হয় তেরো শতকে। ধর্মতাত্ত্বিক স্তরের তুলনায় এই স্তরটি দৈর্ঘ্যে খুব ছোট। মধ্যযুগ এবং রেনেসাঁর সময় সামাজিক বিবর্তনের এই স্তরটিকে অন্য কথায় বলা যেতে পারে ধর্মতাত্ত্বিক স্তরের বৃদ্ধি বা প্রসারণ। অনেকটা ধর্মতাত্ত্বিক সমাজের মতোই এই সমাজে চিন্তাধারা ছিল। তাই একে অনেকে ধর্মতাত্ত্বিক সমাজের বর্ণ সংকর বা সংক্রামক বলেও মনে করে থাকে।

আধিভৌতিক মানে এমন কিছু যা বস্তু দ্বারা বা কোনো বাহ্যিক রূপ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না। সেই অবর্ণনীয় জিনিস হল জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, নীতি, যুক্তি। এই স্তরে, মানুষ কল্পনাকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ যৌক্তিকতা এবং বিচারের সাথে চিন্তা করতে শুরু করে। সামাজিক বিবর্তনের এই পর্যায়ে মূর্ত ঈশ্বরের ধারণা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ঈশ্বর সম্পূর্ণ বিমূর্ত সত্তা

আধিভৌতিক স্তরে পাদ্রীদের স্বৈরাচারী বা একচেটিয়া ক্ষমতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বরং সমাজ পরিচালিত হতো আইন দ্বারা। কিন্তু পরোক্ষভাবে পুরোহিতরাই এই আইনকে প্রভাবিত করেছিল। এই সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালীদের মধ্যে রয়েছে চার্চের অধীনস্ত আইনজীবীরা এবং সমস্ত আইন রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সমাজের এই স্তর থেকে সবকিছু কঠোর নিয়ম-কানুন দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে।

ধর্মতাত্ত্বিক এবং আধিভৌতিক স্তরের বাইরে, সভ্যতার সবচেয়ে উন্নত সামাজিক ব্যবস্থা অবশেষে শুরু হয়। আর এটাই ইতিবাচক (Positive) বা বৈজ্ঞানিক সমাজ। এই সমাজের মূল ধর্মতাত্ত্বিক থেকে বিপরীত দিকে চলে, এমনকি অধিবিদ্যামূলক সমাজের যুক্তিগুলি এখানে খুব বেশি কাজ করে না। পরিবর্তে, একটি ইতিবাচক বা দূরদর্শী সমাজে সবকিছুর মূলে থাকবে বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান আসে অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্য এবং উপাত্ত থেকে।

শিল্পায়নের শুরু থেকেই সামাজিক কাঠামো বিজ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এবং মানুষ বিশ্বাস করে যে কোন ঐশ্বরিক বা অলৌকিক শক্তির কারণে নয়, প্রকৃতির সবকিছুই কিছু নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চলে। তাই কোনো বস্তুকে রহস্য না ভেবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এর পেছনের কারণ আবিষ্কার করা সম্ভব। আর এই বিশ্বাসকে বলা হয় পজিটিভিজম বা দৃষ্টবাদ।

উনিশ শতকের শুরু থেকে, ইতিবাচক বা আদর্শবাদী চিন্তা গতি পেতে শুরু করে। এ সময় সবকিছুর পেছনে প্রকৃত কারণ খোঁজার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় মানুষের মধ্যে। মানুষ সব বিষয়ে সম্পূর্ণ সন্দেহমুক্ত হতে চায়। ফলস্বরূপ, ঈশ্বরের ধারণাটি অদৃশ্য হয়ে যায়, কারণ একটি বিমূর্ত ঈশ্বরের অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা যায়নি। মানুষ সব তাত্ত্বিক বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার চেষ্টা করে। আর যেহেতু বিজ্ঞানে বিশেষ বিশ্বাস বা সংস্কারের কোনো স্থান নেই, তাই চিন্তার এই স্তরে মানুষ ধর্মকে একপাশে ঠেলে দেয়।

ইতিবাচক সমাজ, বিজ্ঞান দ্বারা পরিচালিত হয়। শিল্পপতি, প্রযুক্তিবিদ এবং সুবিধাবাদীরা এই সমাজে আধিপত্য বিস্তার করে। বোঝাপড়া-নৈতিকতা, এবং অনুভূতি ও আবেগ, সব ধরনের ধর্ম-বিশ্বাস এই সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটি সামাজিক বিবর্তনের পর্যায়। অনেক কিছুই রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই সমাজে এসেছে। আর এই পথেই মানুষের মনের মুক্তি হয় এবং বৈজ্ঞানিক যুক্তির মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এই সমাজ পরিবর্তিত হতে থাকবে, কিন্তু সমাজ ব্যবস্থায় বিজ্ঞান থেকে যাবে।

অগাস্ট কোঁত এর  ত্রি স্তর আইন তত্ত্বটি বিভিন্ন দার্শনিক এবং সমাজবিজ্ঞানীদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছে। তবে আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখনও দেখতে পাই অগাস্ট কোঁত বর্ণিত তিনটি পর্যায়ই বিদ্যমান। এখানে ধর্মতাত্ত্বিক সমাজের বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে, আধিভৌতিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি নির্ভর সমাজ সবই রয়েছে। অর্থাৎ অগাস্ট কোঁত এর ‘ত্রি স্তর আইন তত্ত্ব’ আমাদের সমাজে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।

মো: বজলুর রশিদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

;

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহালে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে



আদম তমিজী হক
আদম তমিজী হক

আদম তমিজী হক

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশব্যাপী বইছে নির্মল সম্প্রীতি থেকে উৎসারিত উৎসবের ফল্গুধারা। শারদীয় দুর্গোৎসব পালনের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও কল্যাণময় অবস্থানের বিকাশ আরও বিস্তৃত এবং বিকশিত হবে। পরাজয় ঘটবে অশুভ শক্তির- এই মর্মবাণী ধারণ করে শুরু হয়েছে দেবী দুর্গার বন্দনা।

এই শারদীয় উৎসব আমাদের শত শত বছরের ঐহিত্য। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ নানাভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যাবতীয় দুঃখ ভুলে গিয়ে হিংসা-বিদ্বেষের উর্ধ্বে উঠে প্রীতির মেলবন্ধন রচনার মাধ্যমে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। অসুরের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন দুর্গতিনাশিনী দুর্গা। সেই থেকে বিজয় ঘটে শুভশক্তির। দেবীর আগমন ঘটে অন্যায়ের বিনাশ ঘটিয়ে সজ্জনদের প্রতিপালনের অঙ্গীকার নিয়ে মানুষের মধ্যে নৈতিক আদর্শ জাগ্রত করার জন্য। মানুষের চিত্ত থেকে যাবতীয় দীনতা ও কলুষতা দূরীভূত করার জন্য।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দুর্গাপূজা উদযাপনে বিঘ্নিত করার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে বদ্ধ পরিকর।’

ধর্মীয় সূত্র অনুযায়ী বলা যায় যে,  প্রতি শরতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বর্গলোক কৈলাস ছেড়ে মর্তে আসেন দেবী দুর্গা। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে নির্দিষ্ট তিথি পর্যন্ত বাবার বাড়িতে কাটিয়ে আবার ফিরে যান দেবালয়ে। দেবীর অবস্থানকালে পাঁচদিন পৃথিবীতে ভক্তরা দেবী মায়ের বন্দনা করে। এই বন্দনাকে কেন্দ্র করে দেশবাসী মেতে ওঠে উৎসব আনন্দে। ধর্ম মানুষে মানুষে প্রীতি, প্রেম, সহিষ্ণুতা, ঐক্য ও শান্তির ডাক দিয়ে যায়। তারপরও অসুরের আকস্মিক উন্মত্ততা নষ্ট করে দেয় আবহমানকালের প্রীতিধন্য পারস্পরিক অবস্থানকে, ধ্বংস করে দেয় দীর্ঘকালীন হৃদ্যতাকে। প্রতিবছর মঙ্গলদাত্রী দেবী দুর্গার আগমন ঘটে কল্যাণ ও শান্তিকে সংস্থাপন করার জন্য এবং তা প্রতিবছরই। তিনি ন্যায়ের উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে যান সবাইকে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। প্রতিটি উৎসব নিরাপদ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে এমনটিই আমরা দেখতে চাই। পূজা মণ্ডপের নিরাপত্তার ব্যাপারে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে বাস্তবেও এর প্রতিফলন দেখতে চাই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার্থে নাগরিক দায়িত্বও কিন্তু কম নয়। এ ব্যাপারে সবাই আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসবেন-এমনই দেখতে চায় দেশের মানুষজন।

বর্তমানে এ দেশে দুর্গোৎসব কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচার-অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসব উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ সময়টাতে আগমনী সুর জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব বাঙালিকেই দোলা দিয়ে যায়। শরতের শুভ্র আকাশ, কাশফুলে হাওয়ার নাচন আর আগমনী ঢাক-শাঁখের আওয়াজ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। গ্রাম-নগরে ধনী-গরিব ছোট-বড় সবাই মিলিত হন শরতের মিলনোৎসবে। দেশের মিডিয়াগুলোও এটিকে সার্বজনীন উৎসব গণ্য করে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সাজায়। এটি অনুপম সম্প্রীতি চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।

এ উৎসব ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত থাকবে। যেন কোনো ধরনের অঘটন না ঘটে। পূজা বানচালের জন্য উগ্র সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় গোষ্ঠি সবসময় তৎপর থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্য নিয়ে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড নিতে দেখা যায়। গত বছর কুমিল্লায় পূজা মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরীফ রাখাকে কেন্দ্র করে বহু পূজা মণ্ডপে তাণ্ডব চালানো হয়। এর সঙ্গে ধর্মীয় উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি জড়িত ছিল। এবার যেন সে রকম কিছু না ঘটে তার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগেভাগে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করায় সাধুবাদ।

প্রতিবছরই আমরা দেখি, পূজা আসার আগে থেকেই শুরু হয় প্রতিমা ভাঙার উৎসব। আগে বুঝত ঋতু দেখে, এখন প্রতিমা ভাঙার খবর পড়তে পড়তেই বাঙালি বুঝতে পারে দুর্গা পূজা সমাগত। সেই গোষ্ঠী বাংলাদেশে পূজা উদযাপন বন্ধ করতে চায়। এটা বন্ধ করে তারা সেই এই সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করার আয়োজন করে। গতবার ছিল তার চূড়ান্ত রূপ। যারা এমনটা করে তারা এখন নারীর কপালের টিপ নিয়ে কথা বলে, পোশাক নিয়ে কথা বলে। সেক্যুলার রাজনীতির ব্যর্থতায় রাষ্ট্রকাঠামোই সেদিকে ধাবিত হচ্ছে এবং সেটি এমন এক সংস্কৃতির জাগরণ ঘটাচ্ছে যা আসলে সংখ্যাগুরুর ধর্ম ও সামাজিকতা আধিপত্য কায়েম করছে। সে এখন চায় এদের নীতিকেই জাতীয় রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।

রাজনীতি ও সমাজের নীতিপুলিশি এখন নিয়মিত নজরদারি করে সংখ্যালঘুর ওপর। এই রাষ্ট্রে সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুষঙ্গগুলো ক্রমে সংস্কৃতির উপাদান হয়ে উঠছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ, নারী হলে আরও বেশি করে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। সমাজের সব স্তরে সংখ্যাগুরুর ধর্ম, সংস্কৃতির অভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে, উদযাপিত হচ্ছে। রাষ্ট্রের বর্তমান নিয়ন্ত্রকরা তাকে অগ্রাধিকার দেওয়াকেই স্বাভাবিক বলে দেখান। আর সেই সংস্কৃতির দাপটে সংখ্যালঘুর অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। গতবারের কুমিল্লার ঘটনায় বোঝা গেল যেটুকু বা অধিকার সুরক্ষিত আছে, আজ তা লুণ্ঠিত হওয়ার পথে।

তবে উৎসব-পার্বণ পালনের মধ্য দিয়েই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় হোক। আমাদের মনের সব হিংসা, দ্বেষ, কালিমা দূর হয়ে যাক। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে আমরা সুখ ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাব- এই হোক প্রার্থনা। বাঙালির চিরায়ত এই উৎসব হোক আনন্দের, উৎসব হোক নিরাপদ। কোন রাজনৈতিক অপশক্তি এই সাংস্কৃতিক উৎসব কে ব্যহত করে ফায়দা নিতে চাইলে আমাদেরকেই সকলে মিলে দায়িত্ব নিয়ে তা প্রতিহতও করতে হবে।

লেখক: রাজনীতিক ও সমাজকর্মী।

;

পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা



ড. মতিউর রহমান
পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা

পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১ অক্টোবরকে প্রবীণ ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে মনোনীত করে। সেই থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর দিবসটির সামগ্রিক প্রতিপাদ্য বা থিম হল "পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা"। এই থিমটি নিউ ইয়র্ক, জেনেভা এবং ভিয়েনার এনজিও কমিটিগুলি দ্বারা উদযাপন করা হবে। সামগ্রিক থিমের  পাশাপাশি একটি অনন্য এবং পরিপূরক থিম নিয়েও আলোচনা হবে। নিউ ইয়র্কে গৃহীত পরিপূরক থিম টি হল: "বয়স্ক মহিলাদের সহনশীলতা এবং অবদান"।

যদিও বয়স্ক মহিলারা অর্থপূর্ণভাবে তাদের রাজনৈতিক, নাগরিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে অবদান রেখে চলেছেন; তাদের অবদান এবং অভিজ্ঞতাগুলি অনেকাংশে অদৃশ্য এবং উপেক্ষিত থেকে যায়। সারা জীবন জুড়ে জমা হওয়া লিঙ্গগত অসুবিধাগুলির দ্বারা সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বয়স এবং লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে বৈষম্যের মধ্যে নতুন এবং এবং বিদ্যমান বৈষম্যগুলিকে যুক্ত করে- যার নেতিবাচক প্রভাব বয়স্ক নারীদের প্রভাবিত করে।

জাতিসংঘ বলছে কোভিড-১৯ মহামারী বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত তিন বছরে বয়স্ক ব্যক্তিদের জীবনে, বিশেষ করে বয়স্ক মহিলাদের যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তাদের জীবনযাত্রার উপর আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত, স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু সম্পর্কিত প্রভাবকে তীব্র করেছে।

২০২২ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের থিম বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলি অতিক্রম করতে এবং সহনশীলতা এবং দৃঢ়তার সাথে তাদের সমাধানে অবদান রাখতে বয়স্ক মহিলারা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার একটি  অনুস্মারক হিসাবে কাজ করবে।

বিশ্বব্যাপী, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনসংখ্যা অন্যান্য সকল বয়সের জনগোষ্ঠীর তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। জনসংখ্যার আকার এবং বয়সের গঠন জনসংখ্যার তিনটি প্রক্রিয়া দ্বারা যৌথভাবে নির্ধারিত হয়: উর্বরতা, মৃত্যুহার এবং স্থানান্তর।

ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস: ২০১৯ রিভিশনের তথ্য অনুসারে, ২০৫০ সালের মধ্যে, বিশ্বের ছয়জনের মধ্যে একজনের বয়স ৬৫ বছরের বেশি হবে (১৬%), যা ২০১৯ সালে ছিল ১১ জনে ১ জন (৯%) ।

জাতিসংঘ বলছে সাম্প্রতিক দশকগুলিতে বিশ্ব জনসংখ্যার গঠন কাঠামোয় নাটকীয় পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে, বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু ৪৬ থেকে ৬৮ বছর বেড়েছে। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ৭০৩ মিলিয়ন মানুষ ছিল। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বয়স্ক ব্যক্তি (২৬১ মিলিয়ন) ছিল পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে। তারপরে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা (২০০ মিলিয়নেরও বেশি)।

পরবর্তী তিন দশকে, বিশ্বব্যাপী বয়স্ক ব্যক্তিদের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বা ২০৫০ সালে ১.৫ বিলিয়নেরও বেশি হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিশ্ব ২০১৯ এবং ২০৫০ এর মধ্যে বয়স্ক জনসংখ্যার বিপুল বৃদ্ধি দেখতে পাবে্। সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি (৩১২ মিলিয়ন) পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঘটবে বলে অনুমান করা হয়েছে, যা ২০১৯ সালে ২৬১ মিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে ৫৭৩ মিলিয়নে বৃদ্ধি পাবে।

উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ায় বয়স্ক ব্যক্তিদের সংখ্যা দ্রুততম বৃদ্ধির প্রত্যাশ্যা করা হচ্ছে, যা ২০১৯ সালে ২৯ মিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে ৯৬ মিলিয়নে উন্নীত হবে (২২৬ শতাংশ বৃদ্ধি)। দ্বিতীয় দ্রুততম বৃদ্ধি সাব-সাহারান আফ্রিকার জন্য অনুমান করা হয়েছে, যেখানে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনসংখ্যা ২০১৯ সালে ৩২ মিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে ১০১ মিলিয়নে বৃদ্ধি পেতে পারে (২১৮ শতাংশ)।

বিপরীতে, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে (৮৪ শতাংশ) এবং ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় (৪৮%), যেখানে বয়স্ক জনসংখ্যা ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যান্য অংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, এই বৃদ্ধি অপেক্ষাকৃত কম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বয়স্ক জনসংখ্যার দ্রুততম বৃদ্ধি স্বল্পোন্নত দেশগুলিতে ঘটবে বলে অনুমান করা হয়েছে, যেখানে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তির সংখ্যা ২০১৯ সালে ৩৭ মিলিয়ন থেকে ২০৫০ সালে ১২০ মিলিয়নে (২২৫%) বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১.৫ কোটিরও বেশি প্রবীণ নাগরিক রয়েছেন যা মোট জনসংখ্যর ৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে এটি ২ কোটিতে পরিণত হবে। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৪.৫ কোটিতে। তখন দেশে শিশুদের চেয়ে বয়স্কদের সংখ্যা আরও বাড়বে।

২০১৩ সালে, সরকার জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা প্রণয়ন করে, কিন্তু এই নীতিমালা এখনও পরিবার বা সমাজে কার্যকর হয়নি। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের বয়স্ক বলা হয়। তবে, বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলিতে, ৫৬ বছর বয়সী ব্যক্তিদের বয়স্ক হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

একটি বেসরকারি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি প্রবীণ মানুষ অসুস্থ, অসহায়, অবহেলিত, নিঃসঙ্গ এবং সেবাহীন জীবনযাপন করছেন। সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত অসহায় বৃদ্ধরা। কিন্তু বার্ধক্যের ক্রমবর্ধমান অসহায়ত্ব মোকাবেলা করার জন্য আমরা প্রস্তুত নই। এ কারণে প্রবীণদের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের নীতিনির্ধারকদের এগিয়ে আসা জরুরি।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বৃহত অংশ ক্রমাগত বৃদ্ধ হচ্ছে। কার্যত বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের জনসংখ্যার মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং অনুপাত বৃদ্ধির সম্মুখীন হচ্ছে। জনসংখ্যার বার্ধক্য একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামাজিক রূপান্তরগুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠতে যাচ্ছে, যার প্রভাব শ্রম ও আর্থিক বাজারসহ সমাজের প্রায় সকল ক্ষেত্রে পড়বে- যেমন আবাসন, পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা, পরিবহন এবং সামাজিক সুরক্ষা। সেইসাথে পারিবারিক কাঠামো এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় বন্ধন।

বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নে অবদানকারী হিসাবে দেখা হচ্ছে। সুতরাং, তাদের সুরক্ষার জন্য সব স্তরে নীতি ও কর্মসূচি থাকা উচিত। আগামী কয়েক দশকে, ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অনেক দেশই আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা অতীতের তুলনায় দ্রুত গতিতে বার্ধক্য পাচ্ছে এবং এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তন সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলবে। ইতিমধ্যে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১ বিলিয়নেরও বেশি লোক রয়েছে, যাদের অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করছে। অর্থ ও মর্যাদার জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সম্পদে অনেকেরই প্রবেশাধিকারের সুযোগ নেই। অন্য অনেকে একাধিক বাধার মুখোমুখি হন যা সমাজে তাদের সম্পূর্ণ অংশগ্রহণকে বাধা দেয়।

জাতিসংঘের স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের দশক (২০২১-২০৩০) হল একটি বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার দশক যা গত দশ বছরের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গঠিত, যা বয়স্ক মানুষ, তাদের পরিবার এবং সম্প্রদায়ের জীবনকে উন্নত করতে সরকার, সুশীল সমাজ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, পেশাদার, একাডেমিয়া, মিডিয়া এবং বেসরকারি খাতকে একত্রিত করে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই দশক বয়স্কদের জন্য স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের উপায় নিয়ে চারটি ক্ষেত্রে কাজ করবে।

বয়স-বান্ধব পরিবেশ: শারীরিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক এবং বার্ধক্যের অভিজ্ঞতা এবং বার্ধক্য যে সুযোগগুলি প্রদান করে তার উপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। বয়স-বান্ধব পরিবেশ হল আরও ভাল জায়গা যেখানে বসবাস, কাজ, খেলা এবং আবেগ ভাগাভাগির সুযোগ রয়েছে। এগুলি শারীরিক এবং সামাজিক বাধাগুলি অপসারণ করে যা স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের সামাজিক নির্ধারকগুলিকে মোকাবেলা করে এবং বয়স্কদের সক্ষম করে।

নেতিবাচক মনোভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করা: সমাজে বয়স্ক ব্যক্তিদের অনেক অবদান এবং তাদের বিস্তৃত বৈচিত্র্য সত্ত্বেও, বয়স্ক ব্যক্তিদের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সমাজ জুড়ে সাধারণ এবং খুব কমই চ্যালেঞ্জ করা হয়। স্টিরিওটাইপিং (আমরা কীভাবে চিন্তা করি), কুসংস্কার (আমরা কীভাবে অনুভব করি) এবং বয়স, বয়সের ভিত্তিতে মানুষের প্রতি বৈষম্য (আমরা কীভাবে কাজ করি), সমস্ত বয়সের মানুষকে প্রভাবিত করে তবে বয়স্কদের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার উপর বিশেষভাবে ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। সুতরাং, এই নেতিবাচক মনোভাবের বিরুদ্ধে কাজ করা।

ইন্টিগ্রেটেড কেয়ার: বয়স্ক ব্যক্তিদের ভাল মানের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলিতে অ-বৈষম্যহীন প্রবেশধিকার প্রয়োজন যাতে প্রতিরোধ অন্তর্ভুক্ত থাকে। নিরাময়মূলক, পুনর্বাসনমূলক, উপশমকারী এবং জীবন শেষের যত্ন; নিরাপদ, সাশ্রয়ী, কার্যকর, ভালো মানের প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং ভ্যাকসিন; দাঁতের যত্ন এবং স্বাস্থ্য এবং সহায়ক প্রযুক্তি, এই পরিষেবাগুলির ব্যবহার ও ব্যবহারকারীর আর্থিক অসুবিধার কারণ না হয় তা নিশ্চিত করা।

দীর্ঘমেয়াদী সেবা:  শারীরিক এবং মানসিক ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য হ্রাস বয়স্ক ব্যক্তিদের নিজেদের যত্ন নেওয়ার এবং সমাজে অংশগ্রহণ করার ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে। পুনর্বাসনের প্রবেশধিকার, সহায়ক প্রযুক্তি এবং সহায়ক, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারে; যাইহোক, অনেক লোক তাদের জীবনের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যখন তারা সমর্থন এবং সহায়তা ছাড়া আর নিজেদের যত্ন নিতে পারে না। এই ধরনের লোকেদের কার্যকরী ক্ষমতা বজায় রাখতে, মৌলিক মানবাধিকার উপভোগ করতে এবং মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার জন্য ভাল-মানের দীর্ঘমেয়াদী যত্নের প্রবেশধিকার অপরিহার্য।

কোভিড-১৯ মহামারী নীতি, সিস্টেম এবং পরিষেবাগুলিতে বিদ্যমান ফাঁকফোকরগুলি বন্ধের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছে। বয়স্ক ব্যক্তিরা যাতে মর্যাদা ও সমতা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাদের সম্ভাবনা পূরণ করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য নিয়ে এক দশকের সমন্বিত বিশ্বব্যাপী পদক্ষেপ জরুরিভাবে বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এভাবেই পরিবর্তনশীল বিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিদের সহনশীলতা আসতে পারে।

ড. মতিউর রহমান: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

;