কবে থামবে এ মৃত্যুর মিছিল?



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ নদীকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ ছাড়াও দেশের অধিকাংশ মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম নৌপথ। তুলনামূলকভাবে কম খরচ এবং আরামের কারণে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ যাতায়াতের জন্য নদী পথ বেছে নেয়। কিন্তু যাতায়াতের সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক এই পথটি এখন সড়ক পথে যাতায়াতের মতোই অনিরাপদ হয়ে ওঠেছে। একের পর এক ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা । এসব দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছে।

সম্প্রতি ঘটে গেল আরো একটি হৃদয়বিদারক নৌ দুর্ঘটনা। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ডুবে মারা গেলেন প্রায় ৪১ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। গত রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মহালয়া উপলক্ষে পাঁচপীর,বোদা, মাড়েয়া, ব্যাঙহারি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নৌকায় করে বদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন পূজা দিতে। এ সময় নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী ছিল। এ কারণে মাঝ নদীতে পৌঁছানোর পর যাত্রীর চাপে নৌকাটি ডুবে যায়। এ সময় কিছু মানুষ সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও বেশির ভাগ যাত্রীই এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এর তথ্য মতে, দেশে গত সাত বছরে ৪,৭৯১টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৪,২৩৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২,৭১৪ জন। নৌপথে দুর্ঘটনাগুলোর প্রায় ৫৪ শতাংশই অন্য নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাক্কা লেগে হয়েছে। বাকি দুর্ঘটনার কারণ বৈরী আবহাওয়া, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, লঞ্চের তলা ফেটে যাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি, আগুন লাগা ও বিস্ফোরণ। সবচেয়ে বেশি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৌ দুর্ঘটনা রোধে নৌপরিহনের চালক ও যাত্রী সবাইকেই সচেতন হতে হবে। চালকরা সাবধানে নৌযান চালালে অনেক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। নৌযান দুর্ঘটনার বিশেষ করে লঞ্চ দুর্ঘটনার যে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত হয়েছে তার মধ্যে অন্য নৌযানের সঙ্গে ধাক্কা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, বৈরী আবহাওয়ায় লঞ্চ চালনা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এছাড়া আগুন ও বিস্ফোরণ, মানবসৃষ্ট ভুল, নৌরুট ও বন্দরের দুর্বল ব্যবস্থাপনাও রয়েছে৷।

এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চে সার্ভে সনদ ও রুট পারমিট প্রদান, অতিরিক্ত যাত্রী ও অদক্ষ চালকসহ নানা কারণে নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটে। বাসের মতো লঞ্চেও মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিন বা বডি নিয়ে অসংখ্য যাত্রীর জীবন নিয়ে খেলছেন নৌযান মালিক ও চালকরা।

দেশে একেকটি দুর্ঘটনা ঘটে। তদন্ত কমিটি হয়। প্রতিটি তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার কারণ, দায়ী ব্যক্তি চিহ্নিতকরণ, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধের উপায় বা প্রতিকার এবং কিছু সুপারিশ করলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখে না।

জানা যায় ‘অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল আইন, ২০২১’ নামে একটি খসড়া আইন প্রণয়নের মধ্যেই তা আটকে রয়েছে। এই খসড়া আইনটির ৭৩ ধারায় অপরাধ ও দণ্ডের বিষয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ৮০ ধারায় কোম্পানির পরিচালকদেরও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়ী করে শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি আইনটি।

নৌ দুর্ঘটনাসহ সবধরনের দুর্ঘটনা বন্ধে বিশেষজ্ঞরা যেসব সুপারিশমালা বিভিন্ন সময়ে প্রদান করেছেন সেসবের যথাযথ বাস্তবায়ন করে মানুষের জীবন রক্ষা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা নাহলে এ মৃত্যুর মিছিল থামবে না বলেই প্রতীয়মান হয়। সুতরাং যথাযথ কর্তৃপক্ষ এদিকে আশু নজর দিবেন বলে মনে করি।

ড. মতিউর রহমান: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

 

অল্প সময়ে অনেক ধর্মঘটের ধকলটা কার?



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বহুদিন দেশে হরতাল-ধর্মঘট ছিল না। আবার শুরু হয়ে গেছে এসবের ধকল। মজার ব্যাপার হলো এবারের ধর্মঘট অভিনব। একজনের দায় আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে ঘন ঘন ধর্মঘট ডেকে দেয়া হচ্ছে নির্দ্বিধায়। পরিবহন ধর্মঘটের নামে স্থল, জল, হাঁটাপথ সবকিছুতেই বাধা দেয়া হচ্ছে হঠাৎ করেই। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে- যেদিন বিরোধী দল বা বিএনপি বিভাগীয় সমাবেশের ডাক দিচ্ছে সেই দিনকে উপলক্ষ্য করে শাসক দল সেই বিভাগে তিনদিন আগে থেকেই সব পরিবহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে দিচ্ছে। পরিবহন সমিতির উপর দায় চাপিয়ে শুধু সেই বিভাগের জেলা-উপজেলা, গ্রাম-গঞ্জ থেকে নয়- ভিন্ জেলা বা দেশের ভিন্ন কোন এলাকা থেকে সমাবেশমুখী যানবাহন চলাচল করতে বাধা দেয়া হচ্ছে।

যে উদ্দেশ্যে এসব ধর্মঘট ডেকে আড়ালে থেকে কৌতুক করা হচ্ছে ধর্মঘটীদের সে উদ্দেশ্য কি আসলে সফল হচ্ছে? এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক শুরু হয়েছে। সাধারণ জনগণ এর জন্য খুবই বিব্রত ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছে। অথচ এ ব্যাপারে সরকার বা প্রশাসনের কোন বিকার নেই।

ঘন ঘন ধর্মঘটের ফলে বিরোধী প্রতিবাদের ভাষার সাথে আরো বেশি তেজ ও জেদ লক্ষ্য করা গেছে। দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে ছয়টিতে ইতোমধ্যে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ শেষ হয়েছে। ছয়টি সমাবেশে ধর্মঘটের কোন সুফল না থাকা সত্ত্বেও সিলেটের বিভাগীয় সমাবেশ ১৯ নভেম্বরের দুদিন আগে হবিগঞ্জসহ সব জেলা থেকে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে। পথের সকল বাঁধা বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে বিএনপি সমর্থকরা সেসব সমাবেশে বহু আগে থেকে হাজির হয়ে সমাবেশগুলোকে উচ্ছল প্রাণসঞ্চালণা দিয়েছে। কুমিল্লা বিভাগীয সম্মেলনে একই ঘটনা দেখা গেছে। এমনকি ৪ ডিসেম্বর রাজশাহী বিভাগীয সম্মেলনের দুদিন আগেই সমর্থকরা এসে হাজির। এখানে একসঙ্গে দুই-তিন হাজার মোটর সাইকেলের র‌্যালি নিয়ে নওগাঁ, চাপাই নবাবগঞ্জ ও নাটোর থেকে হুইসেল বাজিয়ে সমর্থকরা আগের দিন এসে উপস্থিত হয়েছে। আগের রাতে জড়ো হওয়া সমর্থকরা সময় কাটানোর জন্য যাতে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে যাতে না পারে সেজন্য বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে বাধা দেয়া হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ধীরগতি করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধর্মঘটের ফলে তারা আগেই সমাবেশস্থলে আসায় তাদের উপস্থিতি ও গণমাধ্যমে ভরপুর প্রচারণা দেখে যারা শুধু নির্দিষ্ট দিনে আসতো বা আসতে চাইতা না তারাও যে কোন প্রকারে সমাবেশে হাজির হয়েছে।

অর্থাৎ, সমাবেশের একদিনের প্রচারণা এবার তিনদিন আগে থেকেই প্রচারিত হয়ে বিরোধী শক্তিকে আরো বেশি উজ্জীবিত করে তুলেছে। অর্থাৎ, শাসক দলের ধর্মঘট ডাকার প্রয়াস একটি ছলনা হিসেবে প্রতীয়মান হয়ে যাওয়ায় সাধারণ ও ভুক্তভোগী মানুষ আরো বেশি উৎসাহী ও কৌতুহলী হয়েছে বিভাগীয় সমাবেশগুলির প্রতি। তারা বলছেন, যেমন ঠাকুর, তেমন মুগুর। পথে পথে তল্লাশি, হোটেলে অভিযান ইত্যাদির জন্য সমর্থকগণ সমাবেশস্থলের মাঠে তাঁবু গেড়ে একসঙ্গে অবস্থান করছেন। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাইতো তারা তিন-চারদিন আগে থেকেই পুটলিতে চিড়া-মুড়ি, নাড়ু বেঁধে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে সমাবেশস্থলে হাজির হয়ে পিকনিক করে গান গাইতে সুযোগ পেয়েছে। সেখানে তারা সারি সারি চুলা জ্বালিয়ে রান্নাবান্না করে খাওয়ারও সুযোগ পেয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- এটা ঘটতো না যদি শাসক দলের অহেতুক ভুল নীতি ব্যবহারের বাস্তব প্রতিচ্ছবির জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কথা জানা থাকতো।

এভাবে বার বার জনসভাকে কেন্দ্র করে এধরণের হঠকারীতামূলক পরিবহন ধর্মঘট ডাকা শাসক দলে উন্নয়ন কাজ করার জনপ্রিয়তা যতটুকু ছিল সেটুকুও ম্লান করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। জনসভার বিরুদ্ধে ডাকা এসব ধর্মঘট তাদের জনভীতিকে আরো প্রামাণ্য করে তুলছে এবং এটা তাদের জন্য আরো বুমেরাং হচ্ছে বৈ কিছু নয়।

আর সরকারের ভয়ে পরিবহন সমিতিগুলো উপায়ন্তর না দেখে নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য ধর্মঘট ডেকে আড়ালে থেকে মজা করছে। প্রশাসনযন্ত্র তাদের চাকুরী বাঁচানোর জন্য ধর্মঘটে দায়সারা দায়িত্ব পালন করছে। সবাই এসব উদ্ভট সিদ্ধান্তের কাজকে ছলনা ও এক ধরণের প্রতারণা মনে করে মনক্ষুন্ন হয়ে যেনতেন কাজ মনে করছে। ফরিদপুর বিভাগের মহাসমাবেশকে ঘিরে গণপরিবহন ধর্মঘটের পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ শোনা গেছে। এতে একদিক এসব ধর্মঘট বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জনসমাগমকে আরো বেশি বেগবান করে সফল সমাবেশ করে চলেছে। বিশ্লেষকগণ মনে করেন, দেশের সব মানুষ তো আর রাজনীতি করে না। জনভোগান্তি সৃষ্টিকারী এসব ধর্মঘট না ডাকলে বিভাগীয় সমাবেশগুলো এত প্রাণ পেত না।

খুলনা সমাবেশের আগে সেখানকার বিরোধী নেতারা বলেছেন, যানবাহন বন্ধ করে কোন লাভ নেই। ‘মনে চাইলে মানুষ পায়ে হেঁটেও মক্কা যেতে পারে।’ ফরিদপুরের জনসভায় বক্তারা বলেন, পরিবহন ধর্মঘট সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের দুর্গে লক্ষ মানুষ জমায়েত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানাচ্ছে। তবুও সরকার খেলার নামে অরাজনৈতিক কথাবার্তা বলে অবজ্ঞা করছে। এবার নির্বাচন নিয়ে যেনতেন খেলা খেলতে দেয়া হবে না। মানুষ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তাই সব বিভাগীয় সমাবেশের বহু আগেই ধর্মঘট ডাকা হলেও জনসমাগম ঠেকানো যায়নি। গত কয়েকদিন ধরে নেতাদের মধ্যে বাকযুদ্ধ ও পাল্টা বাকযুদ্ধ চলছেই। জনভোগান্তির কথা ভাবনায় নেই কারো।

দেশের বাকী জনগণতো ‘ওয়াচডগ’। তারা গণমাধ্যমে ধর্মঘটের নামে নিরীহ ভুক্তভোগী মানুষের দুর্দশা দেখে সহানুভূতি প্রকাশের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছে। কারণ, এসব ধর্মঘট তো আর একটি-দুটি নয়। অনেক হবে। হয়তো সামনে আরো অনেক হতে থাকবে। তবে এসব পরিবহণ ধর্মঘট কি কোন জনসমাবেশ ঠেকাতে সক্ষম? নাকি শুধু জনভোগান্তি সৃষ্টির কারণ?

আরেকটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঢাকায় একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের সূবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানের মহাসমাবেশকে ঘিরে লক্ষ্যণীয় ছিল। সেটা হলো- বিআরটিসি বাসে দলীয় ব্যানার টাঙ্গিয়ে আসা। উন্মুক্ত মাঠে ফটক বানিয়ে পুলিশি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দলীয় সমাবেশ করাকে অনেক গণমাধ্যম আওয়ামী লীগের ভয় পাবার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া ডলারের রিজার্ভ সংকট ঠেকাতে আইএমএফ-এর ঋণ গ্রহণকে অথর্নীতিবিদগণ প্রথম কিস্তি পাবার পর কঠিন প্রেসক্রিপশণ হাতে ধরিয়ে দেবার আশঙ্কা করছেন। যার মূল মিটিং আইএমএফ এখনও করেনি এবং বিদেশী সাংবাদিকরা দেশের অর্থনীতিকে আইসিইউ-এ থাকার সংগে তুলনা করেছেন। তা-না হলে এই সময়ে আইএমএফ-এর ঋণ গ্রহণ এত প্রয়েজনীয় মনে হলো কেন?

একটি দলীয় অনুষ্ঠান বা কর্মসূচির জন্য সরকারি পরিবহন ব্যবহার করা যায় না। এমনকি সেজন্য সরকারী পরিবহন বা যানবাহন ভাড়া করারও বিধান নেই। এটা দেশবাসীর দৃষ্টিকটু লাগায় সমালোচনার উদ্রেক করেছে।

একদিকে বিরাধী দলের সমাবেশকে পন্ড করার মানসে পরিবহণ ধর্মঘট চালু থাকা এবং সরকারের নির্লিপ্ত থাকার ভূমিকা অন্যদিকে সরকারী যানবাহনে দলীয় ব্যানার লাগিয়ে ঢাকায় সমাবেশস্থলে সমর্থক নিয়ে আসাটা বড় ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। নিজেরটা সরকারী নিরাপত্তার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও অনেকটা যান্ত্রিক কিন্তু বিরোধীদেরটা হচ্ছে স্বত:স্ফুর্ত ও প্রাকৃতিক। আজকাল গণমাধ্যমের কল্যাণে এসবের কোনটাই সাধারণ মানুষের চোখ এড়ায় না। প্রবাদে আছে- ‘নিজের বেলা আটিসাঁটি, পরের বেলা চিমটি কাটি’- অহেতুক নিষ্ফল পরিবহন ধর্মঘট ডেকে এমন ভাব প্রদর্শণ করছি কেন?

আর এগুলোই কোন শাসনকালের ইতিহাসের প্রতিপাদ্য হিসেবে লেখা হয়ে থাকে। নাগরিকদের কল্যাণের জন্য গৃহীত যে কোনকিছুই একদিন মহান হয়ে ভেসে আসে। হযরত ওমর রাতের বেলা দু:খী প্রজাসাধারণের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে একা একা চুপি চুপি দেখতে যেতেন। দরিদ্র মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এক রাতে তিনি শুধু পানির পাত্র উনুনে জ্বাল দিতে দিতে অভুক্ত সন্তানদেরকে সান্তনা দিতে দেখা এক অসহায় মায়ের সন্ধান পেয়েছিলেন। তাদের জন্য নিজেই গাধার পিঠে করে খাবার বহন করে এনে দিয়ে মানব কল্যাণে ইতিহাসের এক উজ্জল অংশ হয়ে আজও বেঁচে আছেন। আমরা গণতন্ত্রের জন্য নূর হোসেনের বুকের লেখা শ্লোগানকে বুলি করছি, নিজের অবস্থান খেয়াল না করে অপরের কথা বলা নিয়ে বার বার উপহাস করছি। কিন্তু নিজেরা ভাল হতে চেয়েও ভাল হতে পারছি কই?

ঢাকায় লক্ষ কর্মী-সমর্থকের সমাবেশের দিনেও নিজের ভিটা ও দুর্গে যখন আরো ভিন্ন লক্ষ লক্ষ প্রতিবাদী মানুষ গণতন্ত্র, ভোটাধিকার প্রয়োগ, জ্বালানি সংকট, উচ্চদ্রব্যমূল্য নিয়স্ত্রণের দাবি জানাতে জড়ো হয় তখন সেটাকেও গুরুত্ত্ব দিয়ে ভাবার বিষয়। এগুলোকে নিছক খেলার সংগে তুলনা করাটাও ঠিক নয়। ‘পুকুরে বাচ্চারা ঢিল ছুঁড়ে খেলায় মত্ত হলে অগভীর জলে বাস করা ব্যাঙদের অকালমৃত্যু ঘটতে পারে’-একথা ভুলে গেলে চলবে কি করে? এজন্য দায়িত্বরত থাকা সবাইকে আরো দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে হয়। কারণ দ্রব্যমূল্য সন্ত্রাসের এই সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষেরা সেই অসহায় ব্যাঙের মতো অতি অগভীর পুকুরে বাস করছে।

বার বার সরকারি ইঙ্গিতের সমর্থনে পরিবহন ধমর্ঘটের ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ঝান্ডা যখন লোভী ব্যবসায়ীরা আরো অগ্নিমূল্যের দিকে তাড়া করে নিয়ে যায় এবং ছা-পোষা, দরিদ্র মানুষকে পরিবারসহ পেটের ক্ষুধায় কাতর করে নির্ঘুম রাখতে বাধ্য করে তখন বড় বড় সমাবেশের নামে প্রতিযোগিতা করে অর্থ ব্যয় করা ও জৌলুষ দেখানোর নামে মানুষের কষ্ট বাড়ানো কি সমীচিন মনে হয়? এত অল্প সময়ে এসব অনেক বেশি ধর্মঘটের ধকলটা আসলে কার?

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

 

;

শান্তিচুক্তির ২৫ বছর: পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়নের শত্রু কারা?



ড. মাহফুজ পারভেজ
২৫ বছর আগে শান্তিচুক্তির দিন অস্ত্র সমর্পণে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা। ছবি : মনজুরুল আলম মঞ্জু

২৫ বছর আগে শান্তিচুক্তির দিন অস্ত্র সমর্পণে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা। ছবি : মনজুরুল আলম মঞ্জু

  • Font increase
  • Font Decrease

এই ছবিটি ২৫ বছর আগে ধারণ করেছিলেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলোকচিত্র সাংবাদিক, দৈনিক পূর্বকোণ-এর মনজুরুল আলম মঞ্জু। মারাত্মক অস্ত্র সজ্জিত আত্মসমর্পণ করতে আসা সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত শান্তি বাহিনীর একটি অংশের ছবিটি এতো বছর পরেও প্রাসঙ্গিক। কারণ পাহাড়ে এখনও বন্ধ হয় নি অস্ত্রবাজ সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর দৌরাত্ম্য।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পূর্তিতে পাহাড়ে যখন পালিত হচ্ছে রজত জয়ন্তী, তখন তৎপর শান্তির প্রতিপক্ষ। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক চেষ্টায় আস্থা ও বিশ্বাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন গতিশীল হয়েছে। তারপরেও নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে প্রশ্ন উঠেছে, পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়নের শত্রু কারা? কারা রাজনৈতিকভাবে এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদী পন্থায় শান্তির অব্যাহত ধারায় বিভেদ ও অশান্তির বীজ বপন করছে?

এসব প্রশ্নের পাশাপাশি সবার মধ্যেই তৈরি হয়েছে বড় আকারের সংশয়। আর তা হলো, চুক্তির আওতায় সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণরূপে অস্ত্রগুলো আদৌ জমা পড়েছে কিনা? যদি হয়ে থাকে, তাহলে কেন অস্ত্রের মহড়া এখনও বন্ধ হয়নি পাহাড়ে? কেন এই সশস্ত্র সন্ত্রাস? কেন পাহাড়ে প্রতিদিন হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি অবাধে চলছে?

গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান অস্ত্রধারীরা উপজাতি রাজনীতির ছত্রছায়ায় লালিত-পালিত। তারা নিজস্ব স্বার্থে বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসমূলক অপকর্ম করছে। এতে বাধা দিতে গিয়ে অনেক উপজতি ও বাঙালি হত্যার শিকার হচ্ছে। সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করছে সাধারণ মানুষদের। এসব কারণে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের দুই যুগ পার হলেও চলছে টানাপড়েন। আর এর ফলে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি আজো।

শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে পাহাড়ে যুগান্তকারী অবকাঠামোগত ও মানবিক উন্নয়ন সাধিত হলেও হানাহানি আর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে পার্বত্য অঞ্চল অশান্ত। সরকারের পক্ষ থেকে অধিকাংশ শর্ত পূরণের কথা বলা হলেও পার্বত্য আঞ্চলিক সংগঠনগুলো তাদের শর্তগুলো পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করে আসছে। এহেন বিরোধিতার ধারায় শক্তি পাচ্ছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। অন্যদিকে, বাড়ছে হতাশা। পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিরাও ক্ষুব্ধ। চুক্তির কিছু বিষয় বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে প্রবল বিরোধিতা।

সবকিছু ছাপিয়ে প্রধান সমস্যা এখন সন্ত্রাস ও অস্ত্রবাজি। অভিযোগ রয়েছে যে, সশস্ত্র পার্বত্য আঞ্চলিক সংগঠনগুলো তাদের অবৈধ অস্ত্রই এখনও জমা দেয়নি বরং তাদের বহরে ধীরে ধীরে যুক্ত হয়েছে এসএমজি, এলএমজি, রাইফেল, স্নাইপার রাইফেলসহ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। আর এই সব অস্ত্র ব্যবহার করে তারা পুরো পার্বত্য এলাকায় একের পর এক হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে এলাকায় শান্তির পরিবর্তে অশান্তি সৃষ্টি করে চলেছে।

ফলে শান্তিচুক্তির ২৫ বছরেও পাহাড়ে থামেনি অস্ত্রের ঝনঝনানি। এখনো গোলাগুলির শব্দে গভীর রাতে ঘুম ভাঙে বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষের। সশস্ত্র সংঘর্ষে পড়ছে লাশের পর লাশ। অব্যাহত রয়েছে পাহাড়ি আঞ্চলিক দলগুলোর সন্ত্রাসী বাহিনীর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। থেমে নেই পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন (সন্তু লারমার গ্রুপ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, (মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা গ্রুপ) পার্বত্য জনসংহতি সমিতি সংস্কারপন্থি ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামের সংগঠনগুলোর সশস্ত্র কর্মকাণ্ড।
এছাড়া পাহাড়ে নতুন করে জন্ম নিয়েছে ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (কেএনএফ) নামে সশস্ত্র গোষ্ঠী। তারা বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি বিলাইছড়ি সীমান্ত ঘেঁষা দুর্গম পাহাড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা কিছু তরুণকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

অথচ একথা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে,
পার্বত্য শান্তিচুক্তি একটি ঐতিহাসিক চুক্তি, যা পাহাড়ে জাতিগত সংঘাত ও ভ্রাতৃঘাতী রক্তপাতের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটিয়েছে। এটি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত একটি চুক্তি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও শান্তির পক্ষে তার যে অবস্থান সেটিই তিনি প্রমাণ করেছেন এই পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে।

এই চুক্তির ফলে ২৫ বছরের মধ্যে সরকার তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠায় সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি দেখায়নি। এরই মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি কমিশন, আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে অন্তত ৭০ ভাগ বাস্তবায়িত করছে, যার স্পষ্ট প্রমাণ পার্বত্য জনপদ ও পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পার্বত্য-বাঙালিদের জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির ফলে সৃষ্ট অনুকূল ও ইতিবাচক পরিবেশে-পরিস্থিতিতে প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি ক্ষেত্রে অনেক পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা চাকরি পেয়েছেন। উচ্চশিক্ষা ও রাজনৈতিকভাবে তারা বেশ এগিয়েছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি বাতাবরণ তৈরি হয়েছে এর মাধ্যমে। এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়।

তবে এখনো যেসব সমস্যার সমাধান হয়নি সেজন্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব পাহাড়ি রাজনৈতিক দল বা সংগঠন রয়েছে তাদেরও আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের মধ্য দিয়েই এগুতে হবে সমস্যা সমাধানের জন্য। সরকারসহ অন্যান্য যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে তারা সবাই যদি আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে চুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আন্তরিকভাবে বসে সমাধানের চেষ্টা করেন তাহলে চুক্তির বাস্তবায়ন কঠিন নয়।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক নয়- জনসংহতি সমিতির এমন অভিযোগ সর্বাংশে সত্যি নয়। এসব অভিযোগের রাজনীতির অংশ এবং সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করার অপচেষ্টা স্বরূপ। বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ও দেশের সব রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এ ব্যাপারে গঠনমূলক সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে হবে। শুধু পরস্পরেকে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আলোচনাই একমাত্র পথ।

এটাও মনে রাখা জরুরি যে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় মূল বাধা সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদ। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো যেসব সন্ত্রাসী ৬/৭টি গ্রুপ রয়েছে তাদের সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী পথ ছেড়ে পাহাড়ি জনপদে শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের উন্নয়নে সহযোগিতা করার রাজনীতি করলেই শান্তি, উন্নয়ন, সম্প্রীতি আসবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে অস্ত্রের কোনও স্থান নেই, এই বাস্তব সত্য সংশ্লিষ্টদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে। তবেই বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

শান্তি ও উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তার সম্পর্ক নিবিড়। ফলে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে নিয়ে একসূত্রে সবাইকে কাজ করতে হবে। দুঃখজনকভাবে পাহাড়ের অনেক উগ্র রাজনীতিক দল ও নেতা সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিচ্ছে এবং শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে নিয়ে একসূত্রে কাজ করছে না। যেমন, 'পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক বাহিনীর অবস্থানগুলো সরিয়ে নেয়া হয়নি বলে জেএসএস বা অন্য পাহাড়ি সংগঠনের পক্ষ থেকে যে অভিযোগ করা হচ্ছে', তার মধ্যে রয়েছে পার্বত্যাঞ্চলের নিরাপত্তার প্রতি উদাসীনতা ও বিদ্বেষ। কারণ, তিন পার্বত্য জেলা সীমান্তবর্তী অবস্থান অত্যন্ত নাজুক ও বিপদজনক। বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে সেখানে। সীমান্তের অপর পাশে ভারতের উত্তপ্ত সাতটি রাজ্যে রয়েছে। পাশেই সামরিক জান্তা-শাসিত মিয়ানমারের অবস্থান সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। আবার, পাহাড়ের অস্ত্রধারী গ্রুপগুলোর পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের বিষয়টিও নিরাপত্তার নানামুখী বিপদ বাড়িয়েছে। অতএব, সকল ধরনের নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলো নিয়েও ভাবতে হচ্ছে সরকার ও নীতি নির্ধারদের। জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বদলে মহল বিশেষ কর্তৃক বিদ্বেষ ছড়ানো হলে তা হবে আত্মঘাতী এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বিপদের কারণ।

আবার এটাও বিবেচনায় নিতে হবে যে, পার্বত্য অঞ্চলটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল রূপে পরিগণিত হচ্ছে। তাই নিরাপত্তার অগ্রাধিকারমূল সকল দিক বিবেচনায় সামরিক স্থাপনাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি অত্যন্ত সন্দেহজনক ও জাতীয় স্বার্থের বিরোধী। অবশ্যই জাতীয় নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়গুলোকে দেখতে হচ্ছে সরকারকে। পাহাড়ের সকল রাজনৈতিক পক্ষকেও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারকে সহযোগিতা করা কর্তব্য। এবং শান্তিচুক্তির ২৫ বছর পূর্তিতে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমেই পাহাড়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক সমস্যাগুলোর সমাধান করে পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে অব্যাহত রাখতে হবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

ভারতের জি-২০ সভাপতিত্ব: একটি যুদ্ধেরও প্রয়োজন নেই



নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

  • Font increase
  • Font Decrease

এর আগের জি-২০-এর সভাপতিত্ব ও অন্যান্য অর্জনের মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থা, কিছু দেশের ওপর করের বোঝা কমানো—এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া গেছে, যা থেকে নিঃসন্দেহে আমরা লাভবান হবো এবং এগুলোর ওপর ভর করেই আরও মজবুত ভিত্তি তৈরি করব।

আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছি—এখন জি-২০-এর আর কী অগ্রগতি হতে পারে? সামগ্রিকভাবে মানবসভ্যতার উপকারের জন্য একটি মৌলিক মানসিকতার পরিবর্তনকে কি আমরা অনুঘটক বানাতে পারি?

আমার বিশ্বাস—আমরা পারি। পরিস্থিতিই তো আমাদের মানসিকতা তৈরি করে। ইতিহাসজুড়ে মানবসভ্যতার বাস ছিল অভাবের মধ্যে। সীমিত সংস্থানের জন্যই আমরা লড়াই করেছিলাম। আমাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করত অন্য কেউ সেই সংস্থানের ওপর অধিকার ছাড়ছে কিনা তার ওপর। তখন ভাবনা, আদর্শ এবং ব্যক্তি পরিচয়ের মধ্যে সংঘাত ও প্রতিযোগিতাই ছিল আদর্শ।

দুর্ভাগ্যবশত আজও আমরা সেই একই শূন্য মানসিকতার ফাঁদে আটকে আছি। যখন দেশগুলো ভূখণ্ড ও সম্পদ নিয়ে লড়াই করে, আমরা তখন এর নজির দেখি। এটা লক্ষ করি যে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্ত্র। এটাও দেখি, যখন কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত, তখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন প্রতিষেধক মজুত রাখছে।

কেউ কেউ বিরোধিতা করতে পারেন এই বলে যে, সংঘাত ও লোভ মানুষের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। আমি একমত নই। মানুষ যদি সহজাতভাবেই স্বার্থপর হতো, তাহলে আমাদের মৌলিক এককত্ব প্রচার করে চলেছে যে বিপুলসংখ্যক পারলৌকিক ঐতিহ্য এবং সেটার যে দীর্ঘস্থায়ী আবেদন, সেটার ব্যাখ্যা কী?

পঞ্চতত্ত্ব—ভারতে জনপ্রিয় এমন এক মতবাদ, যা বিশ্বাস করে—সব জীবিত সত্তা এমনকি সব নির্জীব পদার্থও মাটি, পানি, আগুন, বাতাস ও স্থান (স্পেস)—এই পাঁচ মৌলিক উপাদানে নির্মিত। শারীরিক, সামাজিক ও পরিবেশগত মঙ্গলের জন্য আমাদের প্রত্যেকের অভ্যন্তরে ও সবার মধ্যে এ উপাদানগুলোর সমন্বয় অপরিহার্য। ভারতের জি-২০ সভাপতিত্ব এই বিশ্বে একতার ভাবনা প্রচারে কাজ করবে। এ কারণেই আমাদের মূল ভাবনা—‘এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ।’

এটি শুধু বুলি বা স্লোগান নয়। এটি মানব পরিস্থিতির সাম্প্রতিক যে পরিবর্তন তাতে একটি বিবেচ্য বিষয়, যা আমরা সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি।

আজ আমাদের কাছে পৃথিবীর সব মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর যথেষ্ট উৎপাদন করার সংস্থান রয়েছে। আমাদের টিকে থাকার জন্য এখন লড়াইয়ের দরকার নেই। আমাদের এ যুগে আর একটি যুদ্ধেরও প্রয়োজন নেই। আজ আমরা যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি তা হলো—জলবায়ুর পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ ও অতিমারি, যার সমাধান যুদ্ধ করে সম্ভব নয়। বরং সবার সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্ভব। সৌভাগ্যবশত, আজকের প্রযুক্তি আমাদের বড় পরিসরে মানবজাতির সমস্যাগুলো মোকাবিলার পথ দেখাতে পারে।

মানবজাতির ছয় ভাগের এক ভাগ ভারতে। এখানে বসতি, ভাষা, ধর্মগত, প্রথা ও বিশ্বাসগতভাবে প্রচুর বৈচিত্র্য আছে। ভারত হলো বিশ্বের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাচীনতম প্রথাসহ গণতন্ত্রের ডিএনএ প্রদানে ভারতের অবদান রয়েছে। গণতন্ত্রের জননী হিসেবে ভারতের জাতীয় সচেতনতা কঠোর নির্দেশ দিয়ে নয়; বরং লাখো স্বাধীন কণ্ঠের সমন্বয়ে চালিত।

বর্তমানে ভারত একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অগ্রগতির দেশ। আমাদের নাগরিককেন্দ্রিক শাসনের রূপকল্প, আমাদের বুদ্ধিদীপ্ত তারুণ্যের সৃজনশীল প্রতিভাকে লালন করার পাশাপাশি একেবারে প্রান্তিক নাগরিকদেরও খেয়াল রাখে।

আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের জাতীয় বিকাশের মধ্যে একটি আপাদমস্তক শাসন পরিচালনার অনুশীলন না করে; বরং নাগরিক নেতৃত্বাধীন ‘গণআন্দোলন’ গড়ে তুলতে।

ডিজিটাল পণ্য তৈরির জন্য আমাদের শক্তিশালী প্রযুক্তি রয়েছে, যেগুলো উন্মুক্ত, ব্যাপক। সুরক্ষা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং ইলেকট্রনিক পেমেন্টের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নতি দিয়েছে এগুলো। যে কারণে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে সবাইকে একটা অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারে ভারতের অভিজ্ঞতা।

আমাদের জি-২০ প্রেসিডেন্সি চলাকালে, আমরা ভারতের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও মডেলগুলোকে অন্যদের জন্য, বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য সম্ভাব্য টেমপ্লেট হিসেবে উপস্থাপন করব। আমাদের জি-২০ অগ্রাধিকারগুলো শুধু শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই গঠিত হবে তা নয়, দক্ষিণের সহযাত্রীদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। যাদের কণ্ঠস্বর প্রায়ই অশ্রুত থাকে। আমাদের অগ্রাধিকারগুলোর নজর কেন্দ্রীভূত থাকবে ‘এক পৃথিবী’র নিরাময় সাধন, ‘এক পরিবার’-এর মধ্যে সম্প্রীতি আনয়ন ও ‘এক ভবিষ্যৎ’-এর প্রতি আশা দেওয়ার দিকে।

আমাদের এই গ্রহটির নিরাময়ের জন্যই আমরা ভারতের ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে স্থিতিশীল এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রায় উৎসাহ জোগাব। মানব পরিবারের মধ্যে সমন্বয়ের প্রচারের জন্য আমরা খাদ্য, সার ও ওষুধের বৈশ্বিক সরবরাহকে রাজনীতিমুক্ত করব। যাতে ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ মানবিক সংকটে পরিণত না হয়। যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারা অবশ্যই আমাদের চিন্তাভাবনায় প্রথম সারিতে থাকবে, ঠিক একটা পরিবারের মতোই।

আগামী প্রজন্মের আশাকে অনুপ্রাণিত করতে আমরা ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে একটি সৎ আলোচনা; গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হুমকি প্রশমিত করা এবং বৈশ্বিক শান্তি বৃদ্ধিতেও উৎসাহ জোগাব। ভারতের জি-২০ এজেন্ডা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কর্মভিত্তিক ও সিদ্ধান্তমূলক। আসুন আমরা ভারতের জি-২০ সভাপতিত্বকে একযোগে নিরাময়, সমন্বয় এবং আশার সভাপতিত্ব হিসেবে তৈরি করি। মানবকেন্দ্রিক বিশ্বায়নের একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে আসুন আমরা একযোগে কাজ করি।

;

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চলমান কার্যক্রম



ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রোহিঙ্গা সমস্যা একটি আঞ্চলিক ইস্যু এবং সময়মত রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিশ্চিত করা না গেলে এই সমস্যা আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলবে বলে চীন আশঙ্কা করছে। চীন এই সংকট সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভুমিকা পালন করছে যদিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় যে, বর্তমানে অনেকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন চায় না এবংবিভিন্ন কারণে তারা পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছে যে, চীনের মূললক্ষ্য হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা এবং এজন্য চীন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। চীন দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আগ্রহী এবং দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই চীনের লক্ষ্য।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৬ নভেম্বর, প্রথমবারের মতো 'মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি' শীর্ষক রেজুলেশনটি সর্ব সম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। জাতিসংঘ সদর দফতরে ওআইসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ই ইউ) যৌথভাবে এই রেজুলেশনটি চালু করেছে।এই বছরের রেজুলিউশনটি ১০৯টি দেশ স্পন্সর করেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। রেজুলিউশনটি রোহিঙ্গাসহ ও মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর আলোকপাত করে। এতে রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতসহ জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় পূর্ণ সহযোগিতা প্রদানের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এই রেজুলেশনে মিয়ানমারে নবনিযুক্ত জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতকে স্বাগত জানিয়ে মিয়ানমারকে সম্পৃক্ত করে তার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে মিয়ানমার, ইউএনএইচসিআর ও ইউএনডিপির মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকটির পুনঃনবায়ন পূর্বক সেটার কার্যকর বাস্তবায়নের জন্যবলা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সৃষ্টি করেছে যা কখনোই কাম্য ছিল না। ওআইসি ও ই ইউ এই গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার ইস্যুতে সর্বাত্মক সহযোগিতার পাশাপাশি নেতৃস্থানীয় ভুমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে বিধায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন দ্রুত কার্যকর করা যাচ্ছে না। এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার করতে প্রস্তাবটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলায় গাম্বিয়াকে সমর্থনের জন্য স্পেনকে অনুরোধ করেছে। স্পেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের নেয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করে এই সংকট মোকাবেলায় সম্মিলিত আন্তর্জাতিক প্রয়াসের গুরুত্বের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে এ সংক্রান্ত তথ্য বিস্তারিতভাবে যাচাই করে এই মামলায় গাম্বিয়াকে সমর্থন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানায়।

জাপানের রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গাদেরকে সহায়তা দানে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক পদক্ষেপের প্রশংসা করে। রোহিঙ্গা সমস্যাসহ যেকোনো দুর্যোগে জাপান সরকার বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দেয়।মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপান বাংলাদেশকে সমর্থন করে বলে জানিয়েছেন জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তাকেই শুনসুকে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে এবং প্রতিবছর ক্যাম্পে নতুন শিশুর জন্মের ফলে তাদের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের অনেকেই মাদক ও অস্ত্রপাচারের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রমিয়ানমারের ভেতরে ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দানকারী গোষ্ঠীর জন্য ১৭০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মানবিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে চলমান কর্মসূচিগুলোর জন্য প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন ডলার দেয়া হবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে মিয়ানমারে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জাতিগত নির্মূল অভিযান থেকে বেঁচে যাওয়া ৯ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গার জীবনরক্ষামূলক উদ্যোগ এবং বাংলাদেশে তাদেরকে আশ্রয়দানকারী ৫ লাখ ৪০ হাজার সদস্যের জন্য সহায়তাদেয়া হবে। এই নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট সহায়তার পরিমান প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই সহায়তার মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ৯৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং ইউএসএআইডির মাধ্যমে ৭৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ করেছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রএই সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকার, রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরের জনগণের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

ই ইউ ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য ৩ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ই ইউ রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকে মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে যা প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ ই ইউ’র কাছে এই মানবিক সাহায্য কার্যক্রম চালানোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের সব ধরনের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে সহিংসতা ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

নেদারল্যান্ডস মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও কক্সবাজার জেলায় তাদের আশ্রয় প্রদানকারী স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে সাড়ে ৭ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে আইওএম রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দানকারী গোষ্ঠীগুলোর জন্য জীবন রক্ষাকারী সহায়তা দেবে যা উভয় সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ও দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তায় অবদান রাখবে।

রোহিঙ্গা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে চলমান মামলা পরিচালনায় ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আইসিজেতে মামলা পরিচালনার জন্য স্বেচ্ছাসেবী তহবিলে এরই মধ্যে পাঁচ লাখ ডলার দিয়েছেএবং আরও দুই লাখ ডলার দিচ্ছে। এছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশে অবস্থানরত ১২ লাখ রোহিঙ্গার সহায়তার পাশাপাশি নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদেরএকাংশকে স্বেচ্ছায় সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গাম্বিয়ার দায়ের করা এ মামলার প্রতি সবার পূর্ণ সংহতি, সমর্থন ও সহযোগিতা প্রয়োজন।বাংলাদেশ, রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং মিয়ানমারে মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়ার জন্য আইনি সহায়তা প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার এবং মানবতার উন্নতির জন্য দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানায়।

রোহিঙ্গাইস্যুতেফিনল্যান্ডবাংলাদেশেরপাশেথাকবেবলেজানিয়েছে। ফিনল্যান্ডরোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেছে। যুক্তরাজ্য রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তারঅঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে সৌদি আরবের অব্যাহত সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করেছে বাংলাদেশ।বর্তমানে এই এই সংকটের কারনে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে সৌদি আরবকে অবহিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়াসহ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এই প্রস্তাবগুলো হলোঃ রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে আইসিজেতে গাম্বিয়াকে সমর্থন ও আদালতের কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহায়তা করা।জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অব্যাহত দমন-পীড়ন বন্ধে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। আসিয়ানের পাঁচ-দফা ঐক্যমত মেনে চলার অঙ্গীকার পূরণে মিয়ানমারকে দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানানো। মিয়ানমার যাতে বাধাহীন মানবিক প্রবেশাধিকারে রাজি হয় সেজন্য উদ্যোগ নেওয়া। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শক্তিশালী মানবিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এই চলমান সংকট নিরসন হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সংহতির আহ্বান জানায়।

গত ২৩ নভেম্বর থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোয় বিজিপি ও বিজিবি মহাপরিচালক পর্যায়ের অষ্টম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।সম্মেলন ও সম্মেলনের বাইরে মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে বিজিবি।দুই বাহিনী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করার বিষয়েও একমত হয় এবং বাংলাদেশ এই প্রেক্ষিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বিষয়টিতে গুরুত্ব আরোপ করে। সীমান্তের দুই পাশের অপরাধী চক্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অবস্থান চিহ্নিত হলে তাদের অপতৎপরতা রোধে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানসহ একে অপরকে কার্যকরভাবে সহযোগিতা করতে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে।দুই দেশের মধ্যে খেলাধুলা, প্রশিক্ষণ কর্মকাণ্ড বিনিময় এবং বিজিবি ও বিজিপির মধ্যে শুভেচ্ছা সফরসহ আস্থা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণে সম্মত হয়েছে উভয়পক্ষ, যা আশাব্যঞ্জক।

চলমান এই সমস্যা মোকাবেলায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র, ই ইউ এবং নেদারল্যান্ডসের অর্থায়ন এ ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর পাঁচটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চুক্তি ও বহুমুখী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দু’দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক উভয়ের মধ্যেকার মতপার্থক্য দূর করে শান্তিপূর্ণ সহবস্থান ও আস্থার জায়গা তৈরি করবে। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এর অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করে এর ফলপ্রসূ সমাধানের জন্য তাদের সহযোগিতার চলমান রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।বাংলাদেশ এই সংকট সমাধানে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও আন্তরিক ও সক্রিয় হলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আলোর মুখ দেখবে।

ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।

;