মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সংঘের সমঝোতায় শান্তি নিরাপত্তা



ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রিটিশদের কাছে থেকে স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকে মিয়ানমারের সুদীর্ঘ পথচলা কখনই মসৃণ ছিল না। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতার জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী গঠনকরা হয়। এর আগে তিনটা যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশরা ধাপে ধাপে মিয়ানমার দখল করে ও রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে, এতে রাজকীয় বর্মীসেনবাহিনী বিলুপ্ত হয়। ব্রিটিশদের মিয়ানমার দখলের বহু আগে থেকে বার্মিজ সংঘ এবং বার্মার রাজারা একটি পারস্পরিক সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। রাজারা সংঘকে সুরক্ষা এবং সমর্থন দিত এবং এর ফলে গ্রামবাসীরা শাসকদের প্রতি অনুগত থাকত। মিয়ানমারে একই গ্রাম থেকে তরুণরা সৈনিক এবং ভিক্ষু হিসেবে যোগ দেয় এবং বৌদ্ধধর্ম ও সামরিক শাসনের সহাবস্থান বহু যুগ ধরে চলমান রয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বার্মিজরা অং সান এবং তার দলকে তাদের প্রথম সংসদীয় গণতন্ত্রের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করে। ১৯৪৭ সালে অং সানকে হত্যা করা হয়, পরবর্তীতে অং সানের উত্তরসূরি, উ নুচৌদ্দ বছর বার্মা শাসন করেছিলেন। ২ মার্চ ১৯৬২ সালে নে উইন এবং তার মিত্ররা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী উ নু-এর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ইউনিয়ন রেভুলুশনারী কাউন্সিল (ইউ আর সি) এর মাধ্যমে বার্মিজ ওয়ে অব সোশ্যালিজম চালু করে। নে উইন বার্মা সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি (বিএসপিপি) প্রতিষ্ঠা করে। নে উইনের শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৮৮ সালে বিদ্রোহ হয় এবং এই সময় জনগণ ও ভিক্ষুরা রাজপথে নামে। মিয়ানমারের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সামরিক একনায়কত্ব পতনের আন্দোলনে সব সময় সক্রিয় ছিল। এই আন্দোলনে নে উইনের একচ্ছত্র ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং অং সান সু চি মিয়ানমারের রাজনৈতিক প্রবেশ করে। নে উইন পদত্যাগ করে এবং সামরিক জান্তা স্টেট’ল অ্যান্ড অর্ডার রিস্টোরেশন কাউন্সিল (এস এল ও আর সি) প্রতিষ্ঠা করে ক্ষমতা দখল করে।

১৯৯০ সালে মিয়ানমারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সে নির্বাচনে অং সান সুচির নেতৃত্বে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ৮০ শতাংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়। এনএলডি’র প্রতিপক্ষ বার্মা সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি (বিএসপিপি) থেকে নতুন ভাবে সংগঠিত ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি (এনইউপি) সেই সময়ে মাত্র ২শতাংশ আসন জিতেছিল। ১৯৯০ সালের নির্বাচনের পর, সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে, এবং একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের কাজ শুরু করে। নতুন সংবিধানটি ২০০৮ সালের মে মাসে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়। ২০০৭ সালের সেফ্রন বিপ্লবে ভিক্ষুরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। এই আন্দোলনের পর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা চাপের মুখে পড়ে ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়। ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর মিয়ানমারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এই নির্বাচন ২০০৮সালের সংবিধানের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৫ সালের নির্বাচনে এন এল ডি ক্ষমতায় আসে এবং বহু বছর পর মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২০ সালের নির্বাচনে একই দল নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। সেনাবাহিনী এই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ২০২১ সালে সামরিক অভুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে।

ক্ষমতা গ্রহণের পর মিন অং হ্লাইং নিজেকে যোদ্ধা-রাজাদের মত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বৌদ্ধধর্মের রক্ষক হিসাবে নিজের একটি ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করে। অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি সামরিক সমর্থন প্রদর্শনকারী রাষ্ট্রীয় সংবাদ সম্প্রচার বহুগুনে বেড়ে যায়। সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মিয়ানমারের সেনাশাসন তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিয়ানমার সামরিকবাহিনী বর্তমানে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের পাশাপাশি এন ইউ জি এর সশস্ত্র শাখা পি ডি এফ এবং সংখ্যা গরিষ্ঠ বামার জনগোষ্ঠীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে।

২০২১ সালে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে বৌদ্ধভিক্ষুরা অনেকাংশে অনুপস্থিত ছিলো। সামরিকবাহিনী শক্তি প্রয়োগ করে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সেনাবাহিনী এবং সেনাশাসকদের সমর্থনকারী ভিক্ষুদের অনুসারী সশস্ত্র মিলিশিয়ারা গণতন্ত্রপন্থী যোদ্ধাদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সামরিক শাসকরা সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে জাতিগত সংখ্যালঘু এবং অনেক ভিক্ষুদের বিরুদ্ধেও অস্ত্র ব্যবহার করছে। চলমান প্রেক্ষাপটে ভিক্ষুরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে, জেলে যাচ্ছে, সামরিক বাহিনী থেকে ভিক্ষা গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে, তাদের নিজস্ব অহিংস প্রতিরোধ গড়ে তুলছে এবং বার্মার সীমান্তবর্তী জঙ্গলে ছাত্রদের সাথে অল বার্মা ইয়াং মঙ্কস ইউনিয়ন নামে সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধে অংশনিচ্ছে। সামরিক বাহিনী তার বিরোধীদের বৈধতা নষ্ট করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেছে এবং প্রতিরোধ আন্দোলন এবং এর নেতাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। ভিক্ষুরা জানায় যে তারা রাস্তায় সেনাদের মুখোমুখি হলে তাদের উপরও গুলি চালানো হয় এবং অনেককে গ্রেফতারও করা হয়। এই পরিস্থিতিতে সামরিক সরকার তাদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনের দিকে মনযোগ দিয়েছে। সেনাবাহিনীর কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়ার জন্য সামরিক সরকার বৌদ্ধ ভিক্ষু সংগঠন ও কট্টর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের শরণাপন্ন হয়েছে বলে অনেকে মনে করে।

বর্তমানে অনেক ভিক্ষু সামরিক সরকারের সমর্থক। সামরিক শাসকরা পরিকল্পিতভাবে ও সক্রিয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে মূল্যবান উপহার দিয়ে, উগ্রজাতীয়তাবাদী এবং ইসলাম বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার জন্য বৌদ্ধ নেতাদের একাংশের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলে। অতি-জাতীয়তাবাদী ভিক্ষুরা মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উস্কে দিয়ে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে হামলা পরিচালনা সমর্থন করেছিল। সামরিক বাহিনী প্রভাবশালী ভিক্ষুদের একটি অংশের পৃষ্ঠপোষকতা করে তাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে।ভিক্ষুরা বিক্ষোভে যোগদানের পরসামরিকবাহিনীসতর্কতামূলকব্যবস্থানেয়এবংএরপরতারাধর্মীয় নেতাদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিতে শুরু করে।সামরিক অভুত্থানের পর সামরিক বাহিনীর সাথে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করা ভিক্ষুদেরকে জমি, গাড়ি এবং মঠের মতমূল্যবান উপহার দেয়াহয়।

গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে যারা জান্তাকে সমর্থন করছে সিতাগু সায়া দাও তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি মিয়ানমারে বেশ জনপ্রিয় একজন ভিক্ষু ছিলেন এবং ১৯৮৮ সালের বিদ্রোহে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। বর্তমান জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং কে তিনি হিতৈষী রাজা মনে করেন। ২০১৭ সালে সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের সময়তিনি একটি ধর্মোপদেশে অ-বৌদ্ধদের জীবনের মূল্য কম এবং তাদেরকে হত্যা করার বিষয়ে মত দিয়েছিলেন। সিতাগু মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তাতে গভীরভাবে দুঃখিত, তিনি কোন দলের পক্ষেনন এবং জনগণ ও জাতির উন্নতিই তার কাম্য বলে জানায়।

মিয়ানমারের ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব ও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য আলোচিত–সমালোচিত বৌদ্ধ ভিক্ষু আশিন উইরাথুকে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘থাইরি পিয়ানছি’ পদক প্রদান করে। ভিক্ষু উইরাথু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘৃণা ছড়িয়ে আসছিল। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মালিকানায় থাকা ব্যবসা বর্জন করা এবং মুসলিমদের সঙ্গে বৌদ্ধদের বিয়ে নিষিদ্ধ করার দাবি উত্থাপন করে উইরাথু আলোচনায় আসে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো উইরাথুকে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতি সাধারণ জনগণের ঘৃণা ও বিদ্বেষ বাড়াতে জান্তাকে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করে। তারা জানায় যে উইরাথুর মুসলিম বিদ্বেষী ভূমিকা ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর জান্তার দমনপীড়ন চালাতে সহায়তা করেছে।এন এল ডি মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতা বন্ধে আগে থেকেই কাজ করছিল। উগ্রবাদী বৌদ্ধ সংগঠনের কাছে রোহিঙ্গাদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে এন এল ডির সহ প্রতিষ্ঠাতা উইন টিন ২০১৪ সালে মান্দালে শহরে অসিন উইরাথুর মঠে এসে তাঁর সাথে দেখা করেন, তবে তাঁদের আলোচনায় সমস্যা সমাধানে কোন অগ্রগতি হয় নাই। ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গা নির্মূলের সময় সু চি তাদের পাশে দাঁড়ালেও পরবর্তীতে তার সরকার প্রকাশ্যে সহিংসতাকে সমর্থনকারী অতি-জাতীয়তাবাদী মা বা থা ভিক্ষুদের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করেছিল। মা বা থা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উস্কে দেয়া ভিক্ষু উইরাথু কে জেলে পাঠিয়েছিল।২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর উইরাথু সহ মা বা থা ভিক্ষুদেরকে সামরিক সরকার মুক্তি দেয়।

মিয়ানমারের ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে জান্তা প্রধান মিন অংশ হ্লাইং চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, লাওস ও বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বলে জানায় এবং একই সাথে চাপ প্রয়োগ, সমালোচনা ও আক্রমণ সত্ত্বেও যে সব আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক দেশ, সংগঠন ও ব্যক্তিরা মিয়ানমারকে সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রেখেছে তাদেরকে ধন্যবাদ জানায়। বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে বাংলাদেশ এবং আশা করছে যে মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরু করবে।

মিয়ানমারের সব ভিক্ষু সেনাশাসন সমর্থন করে না। নজরদারি এবং ক্র্যাকডাউন সত্ত্বেও, মান্দালয়ের বৌদ্ধ মঠগুলিতে প্রতিবাদের সময় অনেক মানুষ জড়ো হয় এবং সেখান থেকে অনেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীতে যোগ দেয়। সেফ্রন বিপ্লবের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দানকারী নির্বাসিত এক ভিক্ষু জানায় যে, যেসব ভিক্ষুরা জান্তাবিরোধীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় অংশ নিয়েছিল তারা তাদের ধর্মের প্রথম নীতি লঙ্ঘন করছে। তিনি জানান যে,জীবন্ত বস্তুকে হত্যা করা বৌদ্ধ ধর্মে একটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। মা বা থা ভিক্ষুরা উগ্রজাতীয়তাবাদ ও ঘৃণা না ছড়িয়ে রাখাইনের উন্নয়নের জন্য সক্রিয় হলে জনগণের জীবনমানের উন্নতি হতো ও দেশে শান্তি বিরাজ করত যা বৌদ্ধধর্মের লক্ষ্য। মিয়ানমারের শীর্ষ বৌদ্ধ কর্তৃপক্ষ, মা হা না নামে পরিচিত। অভ্যুত্থানের পরপরই এর চেয়ারম্যান সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তবে তারা এই সঙ্কটের বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করছে।

কয়েক শতাব্দী ধরে মিয়ানমারের ভিক্ষুরা সাহসী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার আদায়ে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেছে। ব্রিটেন থেকে মিয়ানমারের স্বাধীনতার দাবিতে অনশন থেকে শুরু করে ১৯৮৮ সাল এবং ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় তারা বিক্ষোভ করে। অভ্যুত্থান বিরোধী আন্দোলন রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সামরিক বাহিনীকে দুর্বল অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ধর্মীয় নেতারা এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে যা মিয়ানমারে টেকসই শান্তির ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করবে।

প্রায় ছয় বছর ধরে মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত ও নৃশংস দমন পীড়নের মুখে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অবস্থান করছে ও এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ ও অন্যান্য সাহায্য সংস্থার সাথে একত্রে তাদের মানবিক সাহায্য দিয়ে আসছে। মিয়ানমার কর্তৃক সৃষ্ট এই সমস্যা চলমান থাকা স্বত্বেও বাংলাদেশ মিয়ানমারের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সুপ্রতিবেশী সুলভ আচরন দেখিয়েছে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের সমস্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। মিয়ানমারের ইসলাম ভীতির স্বপক্ষে বাংলাদেশের দিক থেকে কোন ধরনের যে সমর্থন নেই তা এই দীর্ঘ সময়ে দৃশ্যমান ওপ্র মাণিত। বাংলাদেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যেকোন ধরনের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে।

ভিক্ষুরা সংঘাত ও সংঘর্ষের পক্ষে না থেকে শান্তি ও ঐক্য গড়ে তুললে মিয়ানমারের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। এতে সাধারণ জনগণের ভাগ্যন্নোয়নের পাশাপাশি চলমান রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ সুগম করবে বলে আশা করা যায়।

ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।

বই হোক নিত্যসঙ্গী



সোহেল মিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অন্তহীন জ্ঞানের উৎস বই। আধুনিক সভ্যতায় মানব জীবনে বইয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষের অনন্ত জিজ্ঞাসা, অসীম কৌতুহল তার এই সকল প্রশ্নের সমাধান আর অন্তহীন জ্ঞান ধরে রাখে বই। শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে মানুষের সকল জ্ঞান জমা হয়ে রয়েছে বইয়ের ভেতর। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার এই যুগে বই যেন রঙিন মোলাটে কাঠের চার দেওয়ালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

আমাদের প্রিয় স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য কি ছিল সেটা আমরা বেমালুল ভুলে যেতে বসেছি। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় ছিল আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। কিন্তু বাস্তবতা আজ ভিন্ন। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান উৎকর্ষে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। প্রযুক্তির অপব্যবহার আজ আমাদের গ্রাস করেছে তরুণ প্রজন্মকে। যাদের হাতে নির্ভর করছে বঙ্গবন্ধুর আগামীর সোনার বাংলা। আমাদের প্রজন্মকে আমরা যদি জ্ঞান অর্জনের অন্যতম বাহন বইয়ের প্রতি মনোনিবেশ করাতে না পারি তাহলে আমাদের অদূর ভবিষ্যৎ খুব একটা সুখকর হবে না।

বর্তমানে জাতিকে উন্নত করার লক্ষ্যে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে কাজ করছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে আলোর মুখ দেখতে হলে অবশ্যই বইকেই প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্বের ইতিহাস, দেশের ইতিহাস, নিজ দেশের মক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সামাজিক, রাজনৈতিক, দর্শন, বিজ্ঞান, ভাষা, শিল্প, সাহিত্য সম্পর্কিত জ্ঞান যত বেশি অর্জিত হবে তত মনন জগত সমৃদ্ধ হবে। একটি ভালোমানের বই পারে সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটাতে। আর সামাজিক ও মানসিকভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারলেই মূল লক্ষ্য তথা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।

আমাদের মধ্যে এখনো ধারণা রয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে- মোবাইল, কম্পিউটার ব্যবহার আর ইন্টারনেট। বর্তমান সরকার ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যা অত্যন্ত আনন্দদায়ক এবং খুবই প্রশংসনীয় উদ্যােগ। তবে শুধুমাত্র জাতীয় দিবস ঘোষণা করলেই হবে না। এক্ষেত্রে সবাইকে গ্রন্থাগারমুখী করে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে গ্রন্থাগারের সার্বিক উন্নয়ন তথা ডিজিটালাইজেশন এবং পেশাজীবী গ্রন্থাগারিক সৃষ্টি ও তাদের জীবন মানোন্নয়ন বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রশিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবী গ্রন্থাগারিক সৃষ্টি করতে পারলে তবেই স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়ন সম্ভব।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ২০২৩ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন। যা আশার আলো দেখায়।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে বই পড়ার চর্চা বাড়াতে হবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, কালের পরিক্রমায় সভ্যতার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে গ্রন্থাগার। তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষে বই সংরক্ষণ ও পড়ার অভ্যাস ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। সে- প্রেক্ষিতে মানুষকে বই পড়ায় উৎসাহিত করতে ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস’ পালন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গ্রন্থাগার হলো তথ্যের অফুরন্ত ভান্ডার। সরকার সর্বসাধারণের জন্য আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধাসম্পন্ন গ্রন্থাগার নির্মাণে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ফলে পাঠক, গবেষক ও তথ্য সংগ্রহকারীদের কাছে গ্রন্থাগারের ভূমিকা আরো আকর্ষণীয় ও কর্মপোযোগী হয়ে উঠবে। তিনি প্রত্যাশা করেন, গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার হয়ে উঠুক সকলের পথ চলার পাথেয়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দেশের গ্রন্থাগারগুলো তথ্য-প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আন্তর্জাতিকমানের গ্রন্থাগারের মতো উন্নত এবং সমৃদ্ধ হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রন্থাগারগুলোকে ডিজিটালাইজেশন করার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, গণগ্রন্থাগার অধিদফতরসহ সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি-সম্বলিত এবং অত্যাধুনিক ও নান্দনিক গণগ্রন্থাগার ভবনে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের বহুতল ভবন নির্মাণ’ প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সরকারপ্রধান বিশ্বাস করেন, ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস’ পালন গ্রন্থাগার ব্যবহারে দেশের মানুষকে আরো উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে এবং জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ তথা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলায় সহযোগী ভূমিকা রাখবে।

আমরাও বিশ্বাস রাখি- সমাজ পরিবর্তনে বই হবে হাতিয়ার। বই হবে সবার জীবনের নিত্য সঙ্গী। বইয়ে বইয়ে ভরে উঠবে আমাদের আগামি প্রজন্মের সম্ভাবনাময় কোমল হাত। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে তৈরি হবে স্মাট গ্রন্থাগার ও স্মার্ট পাঠক।

লেখক: সোহেল মিয়া, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম ও সহকারি শিক্ষক, বালিয়াকান্দি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, রাজবাড়ী

;

স্বপ্নযাত্রায় স্বপ্নের বিস্তৃতি আকাশ সমান



মো. কামরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা সবাই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি, ঘুম ভাঙলে চিমটি কেটে দেখি ঘুমিয়ে আছি নাকি জেগে আছে। ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্ন ক্ষণিকের মধ্যে বাতাসে ভেসে ভেসে দূর আকাশে হারিয়ে যায়। বাংলাদেশ এভিয়েশনে একজন স্বপ্নবাজ ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখায় অভ্যস্ত। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

আজ থেকে ১০ বছর পূর্বে কোনো এক নিরব নিস্তব্ধ শব্দহীন আবহে বাংলাদেশ এভিয়েশন, কন্টকাকীর্ণ আকাশ ভ্রমণ, প্রায় ১০ মিলিয়ন প্রবাসী শ্রমিক ভাই বোন, শত সহস্র ছাত্র-ছাত্রীদের আকাশ পরিবহনের যাত্রা, আর সারা বছরের পর্যটন পিপাসু পর্যটকবান্ধব পরিবেশ সব কিছু নিয়ে যখন অসামঞ্জস্যতা, তখনই স্বপ্নযাত্রায় এয়ারলাইন্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। শুধু সিদ্ধান্ত নয়, বাংলাদেশ এভিয়েশনে নতুন সূর্য হয়ে উদিত হয় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। এক বছরের মধ্যেই ড্যাশ ৮-কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে ঢাকা-যশোর রুটে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেন।

প্রতি মুহূর্তে স্বপ্নের ভেলায় ভাসতে থাকেন ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। দুইটি ড্যাশ ৮-কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে শুরু, বছর ঘোরার আগেই তিনটিতে রূপান্তর। এক বছরের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে সকল চালু বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। যে স্বপ্ন জেগে দেখা হয় তা কি করে থেমে থাকবে। দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পূ্র্বেই দেশের গন্ডি ছেড়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে ডানা মেলেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

সময় পেরিয়ে যায় স্বপ্ন বড় হতে থাকে। স্বপ্নের ডালপালা বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। স্বল্প আসনের এয়ারক্রাফটে স্বপ্নগুলোর পূর্ণতা দিতে পারছে না। তাই তিন বছরের মধ্যেই নিয়ে আসে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে অসংখ্য রেমিট্যান্স যোদ্ধা। দেশীয় এয়ারলাইন্স এর স্বল্পতা তাদের আকাশ ভ্রমণকে করে তুলেছে দূর্বিষহ। সেই অসহনীয় অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য জাগ্রত স্বপ্নবাজ ইউএস-বাংলাকে ধারাবাহিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইন্সগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত করে মাস্কাট, দোহা, দুবাই. শারজাহ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।

বাংলাদেশী কমিউনিটি পৃথিবীর যেসব দেশে অবস্থান করছে, তাদেরকে সেবা দেয়ার মানসে সেসব দেশে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ় চিত্তে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে মানবিক এয়ারলাইন্স এর রূপ দিতে গিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছরে প্রথমবারের মতো চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য গমণকারী যাত্রীদের জন্য ভারতের কলকাতার পাশাপাশি চেন্নাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে।

বাংলাদেশে প্রাইভেট এয়ারলাইন্স এর শুরুর পর থেকে চালু কিংবা বন্ধ হওয়া সকল এয়ারলাইন্স এর উড়োজাহাজগুলোর গড় বয়স প্রায় ১৯ বছর কিংবা তার চেয়েও পুরাতন। যা যাত্রীদের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে পারে। সেখানে ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজগুলোর গড় বয়স হবে ১০ বছরের নিচে। যার ফলে বাংলাদেশী এয়ারলাইন্স হিসেবে ইউএস-বাংলা আস্থার প্রতীক হয়ে উঠছে। স্বপ্ন ছিলো অভ্যন্তরীণ রুটে ব্র্যান্ডনিউ এয়ারক্রাফট দিয়ে যাত্রীদের সেবা দেয়া। আর সেই স্বপ্ন পূরণে ইউএস-বাংলায় যোগ করেছে ৭টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট।

২টি ড্যাশ ৮-কিউ ৪০০ এয়ারক্রাফট নিয়ে যাত্রা শুরু করা ইউএস-বাংলার বহরে রয়েছে ১৮টি এয়ারক্রাফট। যার মধ্যে তিনটি ড্যাশ৮-কিউ৪০০, ৭টি এটিআর৭২-৬০০ এবং ৮টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট। অনিন্দ্য সুন্দর মায়াবী মালদ্বীপে প্রায় লক্ষাধিক বাংলাদেশী বাস করে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সই প্রথম দেশীয় এয়ারলাইন্স হিসেবে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে।

থাইল্যান্ডের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ইউএস-বাংলা ঢাকা থেকে ব্যাংকক ফ্লাইট পরিচালনা করছে পর্যটকদের ভ্রমণকে আনন্দময় করার জন্য। আর চীনের গুয়াংজুতে ফ্লাইট পরিচালনা ছিলো অনেকটা স্বপ্নযাত্রার পথে একধাপ নিজেকে এগিয়ে রাখার জন্য। সেই যাত্রাকে সফলভাবে সম্পন্ন করেছে ঢাকা থেকে গুয়াংজু রুটে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে।

স্বপ্ন দেখার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন আকাশ সমান পরিধি নিয়ে। পবিত্র মক্কা-মদিনাতে হজ্জ্ব ওমরাহ পালন করার সুবিধার্থে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার স্বপ্ন বুনছে। সেই স্ব্প্নকে বাস্তবে রূপ দিতে আগামী মে মাসে ইউএস-বাংলার বহরে দুইটি এয়ারবাস ৩৩০ যোগ করতে যাচ্ছে। যা দিয়ে ঢাকা থেকে জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মাম রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করবে ইউএস-বাংলা।

স্বপ্ন আর বাস্তব, পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন যেন একটি আরেকটির পরিপূরক হয়ে উঠছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনের স্বপ্নযাত্রায়।

দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে, এশিয়ার গন্ডি পেরিয়ে, প্রত্যাশার পাহাড়ে বিশ্বময় দ্যূতি ছড়িয়ে দিক ইউএস-বাংলার অগ্রযাত্রা।

লেখক: মো. কামরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

;

গণজাগরণের ১০ বছর: ‘ফিকে’ হতে যাওয়া স্বপ্ন আমার!



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

৫ ফেব্রুয়ারি; বাংলাদেশের তারুণ্যের অগ্নিঝরা দিন। ২০১৩ সালের এই তারিখে জেগেছিল দেশ, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে। মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের দুঃখজনক গণহত্যা অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশীদার মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ জনতার প্রকাশ ঘটেছিল, গণজাগরণে।

এই গণজাগরণ সফল হয়েছিল, যার পথ ধরে আইনের সংশোধনী আনা হয় সংসদে। মানবতাবিরোধী অপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায় উচ্চ আদালতে গিয়ে ফাঁসির দণ্ডে পরিণত হয়। এরপর আইনি পথ ধরে একে একে সর্বোচ্চ দণ্ড ঘোষিত হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের। অনেকের দণ্ড কার্যকর হয়েছে, অনেকের বিচার উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। কেবল বিচারই নয়, দেশের মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজ একাত্তরকে কতটা ধারণ করে তার প্রকাশ ঘটেছে। যুদ্ধাপরাধে সরাসরি জড়িত জামায়াতে ইসলামি ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবিরের প্রতি মানুষের ঘৃণার প্রকাশ ঘটেছে। দাবি ওঠেছে নিষিদ্ধের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই দাবি পূরণ হয়নি।

দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম শেষে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশ, এই যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহিদের আত্মত্যাগ, দুই লাখ নারীর প্রতি সহিংসতা- বিশ্বের ইতিহাসে এত বেশি আত্মত্যাগ ও সহিংসতার নজির না থাকলেও এই দেশ মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরে এগোয়নি। মুক্তিযুদ্ধকে ভুল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা নিয়ে অযাচিত বিতর্ক তোলা হয়েছে, একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার নসিহত দেওয়া হয়েছে; যা স্পষ্টত একাত্তরকে অস্বীকার করা, তবু জাগেনি দেশ এতদিন। নব্বই দশকে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়েছে, সেই আন্দোলন দমাতে অসম সাহসী এই বীরমাতার বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম নির্বিঘ্নে রাজনীতি করে গেছে, তার দলের একাধিক নেতা পেয়েছে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব। মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদ নামের এ দুজনও ছিল শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী, বাংলাদেশের সরাসরি শত্রু; তাদের গাড়িতেও তুলে দেওয়া হয়েছে লাল-সবুজের পতাকা। অপমানিত পতাকার বাতাসের দুলুনিতে নড়তে দেখেছি আমরা অথচ চাপা কান্নার আওয়াজ শুনিনি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-সরকার এ দুজনকে মন্ত্রী করেছে। কেবল মন্ত্রিত্ব দানই নয়, আদর্শিক মোহনায় মিলিত হয়েছিলে তারা; একই সঙ্গে অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দেশকে ঠেলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি ভাবধারার দিকে। একাত্তরের পরাজিতদের স্বাধীন দেশে এমনতর বিজয়ে সংক্ষুব্ধ হয়েছিল ঠিক একাত্তরধারী প্রজন্ম, তবে এর প্রকাশ আগে সেভাবে হয়নি; হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর অনুকম্পার রায়ে। ইতিহাস তো এমনই, এক ঘটনা ধরে টান দিতে জানে পুরো শেকড়। তেরোর গণজাগরণ তেমনই এক!

একাত্তরকে ভুলে যাওয়ার সেই সে নসিহত, একাত্তরের গণহত্যাকারীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন সত্ত্বেও এই দেশের মানুষের মধ্যকার দেশপ্রেম, একাত্তর-সংযোগের যে ধারাবাহিকতা সেটাকে সফল করতে ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার করে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তারুণ্য আওয়ামী লীগের সেই অঙ্গীকারে আস্থা স্থাপন করে তাদেরকে এনে দেয় ভূমিধ্বস বিজয়। ক্ষমতায় যাওয়ার পর শেখ হাসিনা অঙ্গীকারকে ভুলে না গিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পথ রচনা করেন। তারপর ২০১৩ সালে আসে প্রথম রায়, যে রায়ে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সে রায়কে মানেনি তারুণ্য। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানায়, নেমে আসে রাজপথে। যাবজ্জীবন দণ্ড পেয়ে ভি-সাইন দেখানো কাদের মোল্লার ঔদ্ধত্য তাদেরকে বিক্ষুব্ধ করে। তারুণ্যের সেই গণজাগরণে সরকার অপরাধের ব্যাপকতা বুঝতে পেরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তিকে প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ শাস্তির সমান করে, যাতে খুলে যায় দণ্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহারের সুযোগ। গণজাগরণ সফল হয়।

গণজাগরণ কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির নিশ্চয়তার পথ খুলেনি, এটা একাত্তরবিরোধীদের রাজনীতির সুযোগের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে যা অসাম্প্রদায়িক একটা দেশের কথা বলছিল। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের বিরুদ্ধে বলেছে, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি করার অধিকারের জায়গায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকেছে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়েছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত রাজনৈতিক দলগুলো। জামায়াত-শিবির, বিএনপি, হেফাজতে ইসলামের আদর্শে টান দেওয়ায় তারা এই গণজাগরণের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নামে। এরপর ব্যাপক শো-ডাউনে দেশকে অচল করে দেওয়ার স্পর্ধা দেখায়। রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতের শো-ডাউন, সহিংসতায় প্রকাশ্যে-গোপনে সহায়তা করে বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে থাকা সুযোগসন্ধানীর দল। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবির গণজাগরণের বিরুদ্ধে নামতে তারা আশ্রয় নেয় ধর্মের। গণজাগরণের সঙ্গে জড়িতদের ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে তারা প্রচার চালায়, হামলে পড়ে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার শহিদ মিনারে। গণজাগরণ রুখতে ধর্মের এই অপব্যবহারে বিভ্রান্ত হয় একাত্তর নিয়ে দোদুল্যমান জনগোষ্ঠী, তাদের অনেকেই গলা মেলায়।

তেরোর সেই সে গণজাগরণে একাত্তরের পর দেশ ফের জেগেছিল একাত্তরের চেতনায়, হয়েছিল ঐক্যবদ্ধও। সরকারও শুরুতে বাধা দেয়নি। তবে যে-ই না ধর্মের ব্যবহার হয়েছে তখন থেকেই সরকারের ভেতরে থাকা আদর্শিক চেতনার দোদুল্যমান গোষ্ঠীও বিভ্রান্ত হয়েছে। গণজাগরণ ইসলামবিরোধী, গণজাগরণে অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণীরা ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত- এমন প্রচারণা জোরদার হওয়ায় শুরু আদর্শিক স্খলনের। এটা রুখে দেওয়া সম্ভব ছিল সরকার-দলের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ জনগোষ্ঠীর আধিক্য থাকলে। হতাশার কথা এই সংখ্যা খুব বেশি অবশিষ্ট নেই। ফলে গণজাগরণের রাজনৈতিক সুফল ভোগ করলেও গণজাগরণের আদর্শিক ফল ঘরে তুলতে আগ্রহ দেখায়নি সরকার। তারুণ্যের কাঁধে চড়ে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অংশগ্রহণহীন পরের নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছে। তারুণ্য এখানে নির্বাচনী গণতন্ত্রকে মুখ্য না ভেবে একাত্তরের চেতনাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার বাসনায় হয়ে পড়েছিল নীরব দর্শক।

তবু কি গণজাগরণের দাবিগুলো পূরণ হলো? না, হয়নি। এখানে রাজনৈতিক যে প্রতারণার অধ্যায় সূচিত হলো তাতে অনুঘটক হয়েছে ‘বিকল্প কোথায়’ শীর্ষক সস্তা স্লোগান! এই ‘বিকল্প কোথায়’ সস্তা স্লোগান হলেও সত্যি কথা বলতে কী এটাও ছিল তখনকার বাস্তবতার একটা অংশও। কারণ সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি দলীয়ভাবে এই গণজাগরণের বিরোধিতা করেছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন নিজেই গণজাগরণের আন্দোলনকারীদের ‘নষ্ট ছেলে-মেয়ে’ বলে কটূক্তি করেছিলেন। বিএনপির এই বিরোধিতা মূলত তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামির প্রতি অন্ধ পক্ষাবলম্বনের পাশাপাশি তাদের নিজেদের দলের একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বাঁচাতে।

আওয়ামী লীগ তারুণ্যের এই আন্দোলনের চেতনাকে ধরে রাখতে চায়নি মূলত দলটির আদর্শিক রূপান্তরের কারণে। শহিদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অংশগ্রহণ ছিল, ছিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতার অংশগ্রহণও। সে অংশগ্রহণ যতটা না ছিল রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের নিমিত্তে তারচেয়ে বেশি ছিল আদর্শিক। তেরোর গণজাগরণে আওয়ামী লীগের সমর্থনকে অস্বীকার করার উপায় নাই, কিন্তু এই সমর্থনের পাশাপাশি তারা এটাকে রাজনৈতিকভাবেই ক্যাশ করতে চেয়েছে, করেছেও। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও দলটি আদর্শিকভাবে কতটা ধারণ করে সেটা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ রাষ্ট্রধর্মের ধারণার নির্বাসন এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দলটি ওই পথে হাঁটছে না, এড়িয়ে যাচ্ছে। একাত্তরের গণহত্যার অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামির রাজনীতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। বরং এর জন্যে তারা আদালতের দোহাই দিচ্ছে। অথচ জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়, এর আগেও বাংলাদেশে এমনকি পাকিস্তানেও নিষিদ্ধ হয়েছিল গণধিকৃত বিতর্কিত এই দল।

তেরোর গণজাগরণ সফল হয়েছিল, তবে সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা আমরা ধরে রাখতে পারিনি; সরকারও ধরে রাখতে চায়নি। ফলে শীর্ষ কজন যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকরের পর গতি-মন্থরতায় ভুগছে এই বিচার প্রক্রিয়া। এখনও বেশ ক’জন যুদ্ধাপরাধীর আপিল উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায়। গত পাঁচ-ছয় বছরে একজন যুদ্ধাপরাধীরও শাস্তি কার্যকর হয়নি। বিচারের অপেক্ষায় থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অনেকের স্বাভাবিক মৃত্যুও হচ্ছে। গণজাগরণের সকল দাবির যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ অনেক, তবে মূল কারণ নিজেদের স্বার্থে একটা সময়ে ব্যবহারের পর দাবির প্রতি ক্ষমতাসীনদের অনীহা। এছাড়া আছে আদর্শিক স্খলনের পথে অনেকের অনেক দূর হেঁটে যাওয়া হয়ে গেছে যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। ধর্মকার্ড এখানে শক্তিমান হয়েছে যেখানে গণজাগরণকে সমর্থন দেওয়া মানে ধর্মবিরোধী হয়ে যাওয়ার অপপ্রচারে বিশ্বাস অনেকের। এছাড়া আছে সেই তারুণ্য যারা নিজেদের দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরে গেছে, পুনর্বার মাঠে নামার তাগিদ অনুভব করছে না। তবে মাঠে নামার তাগাদা না থাকুক তবে সচেতনতা থাকার দরকার ছিল সেই সে তারুণ্যের। এখানে দলীয় বিভাজনের সংকীর্ণতা আছে, আছে হতাশাও। এর সুযোগ যারা নেওয়ার নিয়েছে, নিয়ে চলেছে।

তেরোর গণজাগরণের তারুণ্যের বড় অংশ এখনও স্বপ্ন দেখে একাত্তরের সেই চেতনার সফল বাস্তবায়নের। স্বপ্ন দেখে সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির, স্বপ্ন দেখে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের। তাদের নিজেদের গড়া ইতিহাস নিয়ে তারা গর্বিত। তাদের এই গর্ব ব্যক্তিগত অর্জনই থেকে যাচ্ছে সকল দাবির বাস্তবায়ন না হওয়ায়।

তেরোর গণজাগরণের এক দশক পূর্ণ হয়েছে আজ। এই দশ বছরে যুদ্ধাপরাধীমুক্ত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ আর বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার আমাদের স্বপ্ন ‘ফিকে’ হতে যাওয়ার বাস্তবতা টের পাচ্ছি!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

বাংলায় রায়: এখনও ‘প্রতীকী’ কেন হবে?



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে বাংলা ভাষায় রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ভাষা শহিদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভাষার মাসের শুরুর দিনে এই রায় ঘোষণা করেছেন বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায় ঘোষণার সময়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি নাইমা হায়দার বলেছেন, ‘আজ ১ ফেব্রুয়ারি। ভাষার মাস আজ থেকে শুরু। ভাষা শহিদদের আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতি সম্মান জানিয়ে আজকের প্রথম রায়টি বাংলায় ঘোষণা করছি।’

দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে রায় ও আদেশ অধিকাংশ বাংলায় দেওয়া হলেও উচ্চ আদালতে প্রাধান্য পায় ইংরেজিই। আইনি প্রতিশব্দের বেশিরভাগই বাংলায় না থাকা এর অন্যতম কারণের পাশাপাশি আছে দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ব্যাপারও। তাই প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উচ্চ আদালতে রায়ের প্রধান ভাষা বাংলা হতে পারেনি। কিংবা এই দিকটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই বাংলায় দেওয়া যেকোনো রায়কে এখনও প্রতীকী হিসেবে দেখতে হচ্ছে। আজকের এই রায়ও তাই। তবে উচ্চ আদালতে এটাই প্রথম বাংলায় দেওয়া রায় নয়, এরআগে অতিব গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো মামলার রায় বাংলায় দিয়েছেন বেশ ক’জন বিচারপতিরা।

ভাষার প্রচলন নিয়ে আইনও আছে দেশে। কিন্তু এই আইন সকল জায়গায় সমানভাবে কার্যকর কিনা এনিয়ে প্রশ্ন আছে। বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭-এর ‘প্রবর্তন ও কার্যকরী’ অংশের ৩(১) বলছে, “এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে.” এবং (২) “৩(১) উপ-ধারায় উল্লেখিত কোন কর্ম স্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।”

আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে একটি রিটও হয়েছিল হাইকোর্টে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দের সেই রিটের প্রেক্ষিতে রুল জারি করা হলেও এখনও ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি হয়নি। ফলে এনিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি উচ্চ আদালত থেকে। এদিকে, সংবিধান যখন বলছে প্রজাতন্ত্রের ভাষা হবে বাংলা, যখন বাংলা ভাষা প্রচলন নিয়ে একটা আইন আছে দেশে তখন কি উচ্চ আদালত এটাকে এড়িয়ে যেতে পারেন? এখানে বাংলায় আইনের প্রতিশব্দের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা আসতে পারে, কথা আসতে পারে সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতিরা স্বাধীন এই কথাও তবে উচ্চ আদালত নিশ্চয়ই সংবিধান ও দেশের আইনের বাইরে নয়।

বিচারপতিরা স্বাধীন, এই যুক্তিতে তারা সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রভাষার বাইরে থাকতে পারেন? এখানে রাষ্ট্রভাষা, সরকারের ভাষা বা নির্বাহী ভাষা, আদালতের ভাষা হিসেবে ভাষার প্রকারভেদ নিয়ে যে কথা সামনে আসে সেটা কতখানি যৌক্তিক? প্রশ্ন আমাদের।

বাংলাবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়তে সমস্যা কোথায়? রাষ্ট্রভাষা বাংলার দেশে ইংরেজিতে দেওয়া রায় কতজনইবা বুঝতে পারেন, ক’জন বিচারপ্রার্থী বুঝতে পারেন? অথচ আদালতের এই রায় বিচারপ্রার্থীদের জন্যেই। মানুষ আদালতে আসেন আইনি প্রতিকার পেতে। যারা আসছেন তাদের কাছে অবোধগম্য ভাষায় রায়-আদেশ দেওয়া হলে সেখান থেকে বিনাভোগান্তিতে কীভাবে তারা উপকৃত হবেন?

ইংরেজি ভাষার আন্তর্জাতিক উপযোগিতা রয়েছে। উচ্চ আদালতের অনেক রায় অনেক ক্ষেত্রে সীমান্ত ছাড়িয়ে দেশে-দেশে উদাহরণ হয়, এটাও স্বীকৃত। তবে বিচারপ্রার্থীদের কাছে কতখানি বোধগম্য এবং সেখান থেকে কতখানি উপকৃত হলো তারা সেটাও নিশ্চয়ই কম জরুরি নয়। বাংলাকে অগ্রাহ্য করে কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে এখানে ভিন ভাষায় দেওয়া রায়গুলো বিচারপ্রার্থীর কাছে বোধগম্য হচ্ছে কিনা সেটাও দেখা কি জরুরি নয়?

ইংরেজিতে দেওয়া রায় দীর্ঘদিনের অনুশীলন। এটা যতখানি আন্তর্জাতিক রূপের তারচেয়ে বেশি ঔপনিবেশিক আমলের ধারা বলেই ধারণা। বেশিরভাগ আইন ও আইনের প্রতিশব্দ বাংলায় নেই এটা একটা কারণ হতে পারে, তবে এই ধারা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত বলে মনে করি। এনিয়ে যে কাজ হয়নি তাও না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের সকল রায় বাংলায় রূপান্তরের জন্যে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু হয়েছে। এরআগে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইন কমিশন বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭ বাস্তবায়নে কতিপয় সুপারিশমালা পেশ করেছে। কমিশন উচ্চ আদালতসহ সব আদালতের বিচারকার্যে বাংলাভাষা চালু করার সুবিধার্থে ইংরেজিতে রচিত বিদ্যমান আইনগুলো বাংলায় অনুবাদের সুপারিশ করে। এটা সম্ভবত বিবিধ কার্যাবলী শেষে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে।

আজ ভাষা শহিদদের সম্মানের হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বাংলায় যে রায় দিয়েছেন সেটাকে প্রতীকী হিসেবে এখনও দেখতে হচ্ছে আমাদের। অথচ এমনটা হওয়া উচিত হবে না। বাংলায়ই হোক সকল রায়। যে সকল বিচারপতি ইতোমধ্যে কিছু রায় বাংলায় দিয়েছেন তারা এ ক্ষেত্রে হতে পারেন অনুকরণীয়। বিবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলা ভাষাতেই রায় দেওয়া সম্ভব বলে তারা প্রমাণ করেছেন।

সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন কেবল সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন এবং গৎবাঁধা বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সত্যিকার অর্থে এর যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হইবে বাংলা” যখন সংবিধান দিচ্ছে এ ঘোষণা তখন দেশের সকল আদালতও এর আওতায় আসতে হবে। আদালতকে এর বাইরে রাখা কিংবা রাখতে চেষ্টা করা সমীচীন হবে না!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;