একাত্তরের গণহত্যার বৈশ্বিক স্বীকৃতি: যে লড়াইয়ে অবিচল থাকতেই হবে



প্রদীপ কুমার দত্ত
একাত্তরের ২৫ মার্চ কালোরাত্রিতে ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যা। -ফাইল ছবি

একাত্তরের ২৫ মার্চ কালোরাত্রিতে ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যা। -ফাইল ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ যে এখনও প্রাসঙ্গিক সেকথা আমাদের সদাসর্বদা মনে রাখতে হবে। যতদিন না ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালীন পাক সামরিক বাহিনী ও তাদের বিহারি ও বাঙ্গালী দোসরদের দ্বারা সংঘটিত জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় আমরা করতে পারব, ততদিন এই বিষয়ের কোনও গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি হবে না।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে এই স্বীকৃতি আদায় করতে পারলেঃ

১)পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বাধ্য হবে জেনোসাইডের অপরাধের জন্য সরকারিভাবে বাংলাদেশের কাছে মার্জনা চাইতে। তাতেই কেবল জেনোসাইড ভিকটিমদের ও পরিবারবর্গের ট্রমার কিঞ্চিৎ উপশম হবে। তাঁদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। এদেশের কুলাঙ্গাররা ‌‌‌‘গন্ডগোলের বছর’, ‘ভাইয়ে ভাইয়ে ভুল বোঝাবুঝি’ ইত্যাদি বলা থেকে আইনগত ভাবে বাধ্য থাকবে বিরত হতে।

২)পাকিস্তান বাধ্য হবে তাদের দেশের যেসব জেনোসাইডাররা এখনও বেঁচে আছে তাদের বিচারের মুখামুখি করতে। অন্ততঃ সেই ১৯৫ জনের তালিকা দিয়ে কাজটি শুরু করা যায়। এই তালিকা বঙ্গবন্ধুর আমলেই তৈরি হয়। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন ১৯৭৩ এর আই সি টি আইনে এদের বিচার করতে। পরবর্তীতে আটকে পড়া বাংলাদেশের নাগরিকদের দেশে ফেরৎ আনার স্বার্থে এবং পাকিস্তান কর্তৃক তাদের দেশে নিয়ে এদের বিচার করার অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে সন্মত হয়ে ৯৩০০০ যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের সাথে এদেরও পাকিস্তানে ফেরত দেয়া হয়। বলা বাহুল্য, পাকিস্তান তার প্রতিশ্রুতি রাখে নি।

৩) জেনোসাইডের ক্ষতিপূরণ দেওয়াও পাকিস্তানের ওপর বর্তায়।

৪)যুদ্ধপরবর্তী চুক্তি অনুযায়ী আমরা আমাদের সকল ইচ্ছুক নাগরিকদের ফেরত এনেছি। তারা তা করে নি। আংশিক প্রত্যাবাসন করে সেই কাজ বন্ধ করেছে। এখনও বেঁচে থাকা তাদের সেসব নাগরিকদের তারা ফেরত নিক।

৫)১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের স্থিতি অনুযায়ী দেশের সম্পদের আনুপাতিক হিস্যা আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে।

এই সমাপ্তি উভয় দেশের জনগণের জন্যই প্রয়োজন। কেবল তা হলেই আমরা উভয় দেশ এক সঙ্গে ভবিষ্যতে কাজ করতে ও এগিয়ে যেতে পারবো। শত্রুতা চিরস্থায়ী রাখা কোনও কাজের কথা নয়। আজকাল পাকিস্তানের নতুন প্রজন্মের এক ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে এইসব প্রশ্ন উঠেছে। তারা বুঝতে পারছে যে গত অর্ধ শতাব্দী তাদের শাসকশ্রেণি তাদের কাছে সত্য আড়াল করেছে।

একাত্তরে পাকি গণহত্যার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে

২০১৭ সালে আমাদের মহান সংসদে আইন পাশ করে ২৫ শে মার্চ তারিখকে বাংলাদেশ জেনোসাইড স্মরণ দিবস হিসাবে পালন করার সিদ্ধান্ত হয়। এই দিনটি যথাযথ সম্মান ও গুরুত্বের সাথে পালন করা অতি প্রয়োজন। এই দিনেই জেনোসাইডে নিহত ও অত্যাচারিত সকল মানুষ ও তাদের পরিবারবর্গকে আমরা যথাযোগ্য সন্মান দেখাতে ও জাতির মুক্তিতে তাঁদের আত্মত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞতা দেখাতে পারি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, জেনোসাইড কেবলমাত্র গণহত্যা নয়। এটা ১৯৪৮ এ জাতিসংঘ জেনোসাইড কনভেনশনে পাশ হওয়া একটি আন্তর্জাতিক ফৌজদারী অপরাধ। কোনও জনগোষ্ঠীকে (জাতীয়তাভিত্তিক, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয়, বর্ণভিত্তিক) আাংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা বা তা বাস্তবায়নই জেনোসাইড। গণহত্যা, শারীরিক বা মানসিক ভাবে আহত করা, অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু করা, নারী নির্যাতন, ধর্মান্তরিত করণ, জাতিগত পরিচয় বদলে দেয়ার প্রচেষ্টা, এই সব অপরাধ দিয়েই জেনোসাইড কার্যকর করা হয়। এর প্রতিটি অপরাধ পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের দোসররা আমাদের ওপর করেছে।

আমাদের জোরদার আওয়াজ তুলতে হবে, ১৯৭১ জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য। স্বস্তির ব্যাপার, ইতোমধ্যেই জেনোসাইড নিয়ে কাজ করা চারটি আন্তর্জাতিক সংগঠন আমাদের এই স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের সিভিল সমাজ, প্রচারমাধ্যম, প্রগতিশীল নাগরিক ও রাজনৈতিক শক্তি, প্রবাসী দেশপ্রেমিক শক্তি, সর্বোপরি দেশের সরকারকে এই বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী ভাবে তুলে ধরতে হবে। কষ্টকর পথ পাড়ি দিতে হবে। তবু সাফল্য আমাদের পেতেই হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতার যে সুফল আমরা আজ ভোগ করছি, তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭১ জেনোসাইড ভিকটিমদের আত্মবলিদানের মাধ্যমে।

আমরা এই মহান দিনে আমাদের সরকারের কাছে দাবি জানাতে চাই, দেশে একটি জেনোসাইড ডিনায়াল অ্যাক্ট (জেনোসাইড অস্বীকৃতির আইন) চালু করার। বহু উন্নত দেশে এই জাতীয় আইন চালু আছে। এই জাতীয় আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারি ভাবে গৃহীত তথ্য উপাত্তকে মেনে না নেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হয়।

একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে জাতিসংঘে চিত্রপ্রদর্শনী

সর্বশেষে বলতে চাই জেনোসাইড একটি ইংরেজি শব্দ, এমন কথা বলে এই শব্দটি ব্যবহার করতে অনেকের মাঝে অনীহা দেখা যায়। কিন্তু শব্দটি মোটেই ইংরেজি ভাষার নয়। ১৯৪৩ সালে জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ পোলিশ আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন তাঁর Axis rule in Occupied Europe বইয়ে গ্রিক শব্দ জেনোস (জনগোষ্ঠী) ও রোমান শব্দ সেডেরো (নিশ্চিহ্ন করণ) এই দুই শব্দের সমাহারে ‘জেনোসাইড’ শব্দ প্রথম ব্যবহার করেন। সমৃদ্ধ ভাষা ইংরেজি এই গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি ঠিকই আত্মীকরণ করেছে। পৃথিবীর অনেক ভাষাই জেনোসাইড শব্দ বিনা বাক্যব্যয়ে ব্যবহার করে আসছে। আমরা সবাই জানি যে বিভিন্ন বিদেশি ভাষার শব্দাবলী একটি ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও এর ব্যতিক্রম নয়। বহু ভাষার বহু শব্দ বাংলায় বহুদিন ধরেই বাংলায় ব্যবহার হয়ে আসছে। টেলিভিশন, টেলিফোন, চেয়ার, দলিল, দস্তাবেজ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারে আমাদের কোনোই অসুবিধা হয় না। সেক্ষেত্রে জেনোসাইড শব্দটিও একইভাবে আমরা ব্যবহার করতে পারি।

১৯৭১ সালের বাংলাদেশ জেনোসাইডের শিকার সকল হতাহত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারবর্গের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ সন্মান ও কৃতজ্ঞতা জানাই। জয় বাংলা!

লেখক: প্রাবন্ধিক, পরিব্রাজক

কোমলমতিদের পালস বুঝেও এত শক্তি প্রয়োগ কেন!



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

ছবি: বার্তা২৪, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

  • Font increase
  • Font Decrease

৮০-র দশকের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আমরা ঘুমাতে পারতাম না। কয়েকদিন পর পর পুলিশি রেইড হতো। ভোররাতে হাজার হাজার পুলিশ, বিডিআর হলপাড়া ঘিরে দম্ভ করে হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিতো- নিচে নেমে আসুন! দ্রুত হল ত্যাগ করে চলে যান। ছাত্ররা হৈ চৈ করে ছাদে উঠে সামরিক সরকারের পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়তো। নামতে না চাইলে টিয়ার শেল ছুড়ে চারদিক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে, গুলি করে আতঙ্ক তৈরি করে একসময় কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যেতো।

হল খালি করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হতো। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিলে তাদের ক্ষমতায় থাকা নিরাপদ হয়ে উঠতো।

শিক্ষার্থীরা সেসময় সামরিক সরকারকে মোটেও পছন্দ করতো না। জনগণ তো আরো পছন্দ করতো না। সেটা সেই সরকার জানতো। কিন্তু জেনেও বার বার হামলে পড়তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে শুরু হওয়া আন্দোলন দিয়েই দ্রুত সামরিক সরকারের পতন হয়েছিল।

চলতি বছরের (২০২৪) ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া যৌক্তিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৮ দিন পার হয়ে গেল। এর মধ্যে কতকিছু ঘটে গেল এবং যাচ্ছে সেটা প্রযুক্তির কল্যাণে দেশ-বিদেশের সব সচেতন মানুষ অবগত আছেন।

ক্ষুদ্র একটি আন্দোলন কীভাবে তিলে তিলে ‘তাল’ হয়ে গেল, তা জনগণ অপলক নয়নে দেখছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কথার মাধ্যমে বীজ থেকে বটগাছে পরিণত করার জন্য দায়ী যিনি বা যারা, তাদের আড়াল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো দায়িত্বশীল একটি দম্ভকারী গ্রুপ।

তারা অবহেলা, অতিকথন, বালখিল্যতা দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে ক্ষেপিয়ে তুললো। সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে শিক্ষার্থীসহ দেশের আপামর নিরীহ জনগণকে কেন আরো বেশী ক্ষ্যাপানো হচ্ছে- সেটাও অনেকের কাছে গভীর প্রশ্নের উদ্রেক করছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিলে পড়াশোনা, গবেষণা বন্ধ হয়ে যায়। নৈতিক চেতনা ঝিমিয়ে পড়ে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মগজগুলোকে দমিয়ে রেখে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা ও দুর্নীতিতে আড়াল করা সহজ হয়। দুর্বলদের পক্ষে হক কথা বলাটা সহ্য করে না স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দুষ্টু মানুষেরা।

যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজে এটাই ঘটে। তাইতো ডিজিটাল সভ্যতার যুগে এসেও ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছাত্র আন্দোলন দমন করা হচ্ছে। কিন্তু সেটা পেরিয়ে আমাদের সবুজ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে। তবে আমাদের ঢেউয়ের আছাড়টা ওদের চেয়ে একটু বেশি হয়ে সুনামি হয়ে গেছে। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে হঠাৎ করে স্কুল-কলেজ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! এটা খুবই মারাত্মক!

একটি দেশের সব শিক্ষাঙ্গন একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মনে হয়, এই ধরনের সর্বাত্মক ছুটি এটাই প্রথম। কিন্তু কেন এটা করা হলো! ইসরায়েলের মতো কেউ কি এদেশে বোমা ফেলতে চেয়েছিল নাকি কোনো বৈদেশিক শক্তি আক্রমণের ভয় দেখিয়েছে! দেশে কি কোনো সেরকম যুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ অর্ন্তদ্বন্দ্ব লেগেছে! শেষেরটা যদি সত্যি মনে করা হয়, তাহলে কী বা কার কারণে সেটা শুরু হলো, সেটাও দ্রুত খতিয়ে দেখা দরকার।

এটা শুরু হওয়ার ১৮ দিন পর একটি সংহিস আন্দোলনে পৌঁছে গেল কার সুবাদে! সেটা এখন বড় চিন্তার বিষয়!

জনগণের কষ্টের কথা বলে এই আন্দোলনকে ভিন্নদিকে সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু কষ্ট হলেও জনগণ সেই আনোদলনকে মেনে নিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করছেন। জনগণ কিছু লোভীদের কপটতা, উন্নাসিকতা ইত্যাদি ধরে ফেলেছে। ফলে, নিজেদের অনুভূতি ও বিবেক থেকে এটাকে মেনে নিয়েছে। এমনকী কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে আন্দোলনে শরিক হয়েছেন।

‘বাংলা ব্লকেড’ এবং তারপর!
তারা ‘বাংলা ব্লকেড’ থেকে ‘কমপ্লিট ব্লকেড’ শুরু করে আর কী কী আন্দোলন করতে থাকবে, তা এই মুহূর্তে বলা মুষ্কিল। কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করার কথা বার বার বলা হচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিটি কেন এত বড় করার সুযোগ দেওয়া হলো বা এখনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তা মোটেই বোধগম্য নয়।
এদিকে, ১৭-১৮ জুলাই বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর শক্তি প্রদর্শণের মাধ্যমে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, বেগম রোকেয়াসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আন্দোলন দমন করার প্রচেষ্টায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেনে নেওয়া কষ্টকর!

কর্তৃপক্ষের উন্নাসিকতা
কর্তৃপক্ষকে উন্নাসিকতার সুরে বলতে শোনা গেছে- ‘আন্দোলন করে করে ওরা ক্লান্ত হোক, তখন দেখা যাবে।’ এভাবে সরকারের তরফ থেকে অনেকদিন এই আন্দোলনকে গুরুত্ব না দেওয়ায় যে বিভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝি, তা পারস্পরিক আলাপ-আলোচনায় না গিয়ে শুধু হম্বিতম্বি ও দৈহিক শক্তি প্রদর্শন করাটা সবার জন্যই চরম ক্ষতিকর। বিভিন্ন অপবাদ শুনে বাচ্চাদের অভিমান, বুকে ‘কষ্টের শিখা’ বেড়ে যাওয়ার আন্দোলনকে যদি কেউ ভিন্ন পন্থায় বা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা চালাতে থাকে, তাহলে সেটা চরম ভুল হবে।

এই অসম লড়াই দেশের মধ্যে ভেদাভেদ আরো বৃদ্ধি করবে এবং সামাজিক ভাঙনকে গভীর করে তুলবে। তাই, আদালতের দোহাই দিয়ে কালক্ষেপণ করে আলোচনায় বসা যতই প্রলম্বিত হবে ততই দেশের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনতে থাকবে এবং দুর্নীতিবাজ, মেগা-জালিয়াত, সুবিধাবাদীরা এর সুযোগ গ্রহণে চেষ্টা করবে। এমনকী পানি বেশি ঘোলা হয়ে গেলে এটা বৈদেশিক আগ্রাসনকে আমন্ত্রণ করতে থাবে।

দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। বলা হয়, প্রায় ১০-১২ কোটি মানুষ এখন স্মার্ট মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারেন। এটা তাদের আর্থিক উন্নতির সঙ্গে নৈতিক উন্নতি ঘটাতে সহায়তা করছে। তারা মোবাইল ফোনের সুবাদে আত্মসচেতনতাবোধ থেকে নিজে এবং সমষ্টিগত প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্যায়কে অন্যায় বলতে শিখছে। ফলে, শুধু কয়েকটি পোষা টিভি চ্যানেলে বিবৃতি দিয়ে তাদের অবহেলা, বঞ্চনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা কঠিন। নানা উদাহরণে ‘আরব বসন্ত’-র কথা বলা হয়। কিন্তু কোটা আন্দোলন নিয়ে আমাদের দেশে ‘বাংলা বসন্ত’ সূচিত হচ্ছে, সেটা কি কেউ মাথায় রেখেছেন!

অনেকদিন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখাটা আমাদের জন্য শাঁখের করাতস্বরূপ। কারণ, এভাবে শিক্ষাসঙ্কোচন করলে আমাদের স্বকীয়তা ও জাতীয় মর্যাদা গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হতেই থাকবে। সুযোগ ও সক্ষমতা আছে বলেই সাধারণ রঙ্গ-ব্যঙ্গ, অভিমান ইত্যাদিকে আমলে না নিয়ে কাউকে শূলে চড়ানোর তৎপরতা খুবই বোকামি।

শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক আন্দোলনকে গুরুত্ব না দিয়ে- ‘এটা ফেসবুকের দোষ’ বলে উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করাটাও চরম বোকামি।

সাধারণত, সামরিক সরকারকে জনগণের পালস বুঝতে দেয় না তার আশেপাশের চাটুকাররা। তারা পানি বেশি ঘোলা করে নিজেদের সুবিধা আদায় করতে বেশ তৎপর থাকে। কোনো অঘটন আঁচ করলে বিদেশে পালিয়ে আত্মগোপন করতেও বেশ পটু। কিন্তু একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারের দাবিদারকে সেই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কেন! জনগণের পালস্ বুঝেও সেটা বুঝেও না বোঝার চেষ্টা করা বা শক্তি দেখানো বিপজ্জনক, সেটা গত কয়েকদিনের ঘটনায় অতি নেতিবাচকভাবে দৃশ্যমান হয়েছে, যা দেশ ও জনগণ উভয়ের জন্যই অকল্যাণকর। সাধারণ মানুষ এই কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে। অনেক মুক্তিযোদ্ধারাও এর পক্ষে! তবুও আলোচনায় এত দেরি কেন!

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন। E-mail: [email protected]

;

যে দাবির কেউ বিরোধী নয়, তবু রক্তপাত



কবির য়াহমদ
যে দাবির কেউ বিরোধী নয়, তবু রক্তপাত

যে দাবির কেউ বিরোধী নয়, তবু রক্তপাত

  • Font increase
  • Font Decrease

২০১৮ সালের ছাত্রআন্দোলনের পর সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিল। এটা ফিরে এসেছিল সাময়িক সময়ের জন্যে হাইকোর্টের এক রায়ের প্রেক্ষিতে। পুনর্বার আন্দোলন শুরুর আগে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছিল। আপিলের রায়ের আগে দানা বাঁধে আন্দোলন। এরপর আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে ছয় বছর আগের কোটা বাতিলে সরকারের পরিপত্র বহাল রাখে। সরকারের মন্ত্রীরা কোটা না রাখার পক্ষে কথা বলেন, নানা মহল থেকে একই কথা বলা হয়। খোদ প্রধান বিচারপতি বলেছেন, কোটা বাতিলের আন্দোলনকারীদের বক্তব্য শুনতে চান তিনি।

উপরের অনুচ্ছেদ বলছে, কোটার বাতিলের বিপক্ষে কেউ নন। ছাত্ররা যে আন্দোলন করছিল, সেখানে ছাত্রলীগের অংশগ্রহণ ছিল না যদিও, তবু তারা আন্দোলনকারীদের শুরুতে বাধা দেয়নি। বরং ছাত্রলীগের সভাপতি একাধিকবার বলেছেন, তারাও এর সমাধান চান। পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোন বাহিনীশুরুতে আন্দোলনকারীদের বাধা দেয়নি।

তবু ঘটে গেছে রক্তপাত। গত মঙ্গলবার একদিনেই ঝরেছে অন্তত ৬ প্রাণ, আহত অগণন। এখন মুখোমুখি আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগ। আছে পুলিশসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীর অংশগ্রহণ। আছে পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর। আছে ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যকার মুহুর্মুহু সংঘাতের খবর। পুলিশের অতি-উৎসাহী কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত শক্তি প্রয়োগের খবর। সরকারের একাধিক দায়িত্বশীলের হুঁশিয়ারির বার্তা, এর কিছুটা উসকানির পর্যায়েও। সঙ্গে আছে সরকার বিরোধী নানা মহলের অত্যধিক তৎপরতা, বিবৃতি, উসকানি, মাঠে নামার হুমকি, যা আদতে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করছে।

কোটা আন্দোলন হঠাৎ করে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মূলে কী—এনিয়ে আলোচনা জরুরি। বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলেছেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে সে প্রমাণ মেলে না। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এত ক্ষোভ কেন’ এমন প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতি কোটা পাবে না তাহলে কী রাজাকারের নাতি-পুতিরা কোটা পাবে? সেটা আমার প্রশ্ন। দেশবাসীর কাছে প্রশ্ন।’ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে সাম্প্রতিক সময়ের এবং নানা সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নানা মহলের ধারাবাহিক কটূক্তি, অশ্রদ্ধার জবাব হতে পারে। জাতির জনকের কন্যা হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার যে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং শ্রদ্ধা প্রকাশের যে ধারা সেটাই তার বক্তব্যে ওঠে এসেছে স্বাভাবিকভাবেই। এটা সরল উক্তি। একাত্তরকে শ্রদ্ধা করলে যে কারো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানে হৃদয় বিদীর্ণ হবেই।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার যে বিষয়টি আওয়ামী লীগ সরকার করে যাচ্ছে, তার স্বপক্ষে যুক্তি দিতে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা খেয়ে না খেয়ে কাদামাটি মাখিয়ে তারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল বলেই আজ দেশ স্বাধীন। আজ সবাই বড় বড় পদে আসীন। নইলে তো ওই পাকিস্তানিদের বুটের লাথি খেয়ে চলতে হতো।’ ইতিহাসের এই পাঠ পঞ্চাশের বেশি বছর সময়ের পুরনো হলেও এটা অসত্য নয়, এটা হারিয়ে যায় না। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে যথার্থই প্রশ্ন রেখেছেন। একজন নাগরিক হিসেবে আমরাও মনে করি, রাজাকারদের সন্তানেরা নয়, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরাই চাকরি পাওয়ার অগ্রাধিকার রাখে।

এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ ছিল না, এখানে ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ নাই। কিন্তু তাই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের একদিকে আন্দোলনকারীরা ভেবেছে এই বুঝি কোটা ফিরে এলো। অন্যদিকে তারা ভেবেছে তাদেরকে বলা হয়েছে ‘রাজাকারের সন্তান ও রাজাকারের নাতিপুতি’। এই ব্যাখ্যায় আছে দেশীয় সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আছে সরকারের প্রতি কিছুটা হলেও ‘অনাস্থার প্রকাশ’। সরকার যা ইচ্ছা তাই করতে পারে, কাউকে পাত্তা দেয় না—এমন একটা পরিবেশ ও বিশ্বাস আগে থেকেই প্রবল। এছাড়া কোটা আন্দোলনকারীদের নেতৃত্বদানকারী বেশিরভাগ সংগঠকেরই রয়েছে রাজনৈতিক পরিচিতি। তারা পূর্ব-ধারণা এবং সরকারের প্রতি অনাস্থা থেকে এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। এরবাইরে ছিল তৃতীয় পক্ষের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরের রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ‘তুমি কে আমি কে— রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান উচ্চারিত হয়। অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এই স্লোগান, কারণ এই স্লোগানের মাধ্যমে একাত্তরের ঘৃণিত রাজাকার শব্দকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা হয়েছে। যদিও আন্দোলনকারীদের কয়েকজন পরেরদিন বলেছেন, তারা স্লোগান দিয়েছেন ‘তুমি নও আমি নই— রাজাকার রাজাকার’; আবার সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই দাবি করেছেন অন্য স্লোগানের। তাদের দাবি স্লোগানের পুরোটা ছিল ‘তুমি কে আমি কে— রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে— স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। শেষের স্লোগানকে যদি সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় তবে বলা যায়, সরকারপ্রধানকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেওয়া তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য নয়, এটা রাজনৈতিক স্লোগান। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের জানাতে এসে সরকারকে রাজনৈতিক ভাষায় স্বৈরাচার আখ্যা এখানে দাবি আদায়ের ভাষা নয়, বরং তা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অপচেষ্টা।

এবার তবে দেখি এই আন্দোলনের নেতৃত্বে কারা? সমন্বয়কদের মধ্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম, আবদুল হান্নান মাসুদসহ বড় একটা অংশ সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে আগে থেকেই সম্পৃক্ত। এর মধ্য নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ নামে একটি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন এই সংগঠনটির সভাপতি। সংগঠনে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি শিবিরের রাজনীতি করতেন বলে অনেকেই বলে আসছেন। ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ নামের সংগঠনটি ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সামনে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে একটা ন্যায্য দাবির আন্দোলন, এবং এ আন্দোলনে সারাদেশের ছাত্রসমাজের অংশগ্রহণ থাকলেও নেতৃত্বের কারণে যখন সুযোগসন্ধানীর রূপ লাভের যে অভিযোগ এটাকে তাই উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কমে আসছে।

কোটা বাতিল চায় শিক্ষার্থীরা। দেশের আদালতও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল, সরকারও সহানুভূতিশীল। প্রধানমন্ত্রী বুধবার দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে আদালতের রায়ের জন্যে অপেক্ষা করতে বলেছেন। বলেছেন, আদালত থেকে নিশ্চয় শিক্ষার্থীরা হতাশ হবে না। এমন অবস্থায়ও চলছে আন্দোলন, এবং আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সারাদেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। এই শাটডাউন কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি, ১২-দলীয় জোট, গণতন্ত্র মঞ্চসহ সরকারবিরোধী প্রায় সকল রাজনৈতিক দল ও জোট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে উসকানি। কোনো অবস্থাতেই এখন এই আন্দোলনের শেষ দেখতে চাইছেন না উসকানিদের অনেকেই। কোটা বাতিলের আন্দোলন শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হলেও এই পথ ধরে অনেকেই সরকার পতনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, এবং সে পথেই আন্দোলনকে নিয়ে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠেছেন।

কোটা বাতিলের আন্দোলনের যে রূপ, সরকারের যে অবস্থান তাতে মনে হচ্ছে দাবি আদায়ের বিষয়টি কেবল সময়ের অপেক্ষা। বিষয়টি বিচারাধীন বলে আদালতকে টপকে এই মুহূর্তে সরকারের ঘোষণা দেওয়ার সুযোগও কম। শেষ পর্যন্ত আদালত হয়তো সরকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেবে, সরকারও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু যখন বিষয়টি বিচারাধীন তখন এই মধ্যবর্তী সময়ে অপেক্ষা করাই হবে যৌক্তিক। এই সময়টুকু নিয়েই এখন যত রাজনীতি, তৃতীয় পক্ষের চেষ্টা ফল নিজেদের পক্ষে নেওয়া। মাঝখানে এখানে কি বলির পাঁঠা হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের আবেগ?

কোটা বাতিল হবে—ধারণা করছি এটাই ভবিতব্য। কিন্তু দাবি আদায়ের মাঝে যে বিপুল প্রাণ আর সম্পদের অপচয় এর দায় কাউকে না কাউকে নিতে হবে। সরকারপ্রধান তার ভাষণে বলেছেন, বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা। তদন্ত ব্যবস্থায় এটা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা। এই বক্তব্যে অনাস্থা প্রকাশ করে উসকানি দেওয়া হবে অন্যায়। দাবি আদায়ের যে প্রক্রিয়া তন্মধ্যে আস্থাও অন্যতম। শেষ পর্যন্ত কারো না কারো ওপর আপনাকে আস্থা রাখতেই হবে। আর এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন রাজনৈতিক বিশ্বাসের ক্ষেত্র থেকে তাকে আপনার পছন্দ-অপছন্দ যাই হোক, তার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস রাখতেই হবে।

;

মৃত্যু মিছিলের ভার: বাংলাদেশের অব্যক্ত বেদনা



আবু মকসুদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এর কিছুরই দরকার ছিল না। ছয়টা লাশের ভার হয়তো বাংলাদেশ বইতে পারবে; আগেও অনেকবার অনেক লাশের ভার বয়েছে। কিন্তু আজকের এই লাশগুলো অত্যন্ত অকারণ। এই ভার বইবার কোনো দরকার ছিল না।

অনেক দিন আগে বদর আলী নামে এক বাসের ড্রাইভার মারা গেল। কিছু দিন পরে মারা গেল মনির নামের এক কিশোর। তখনও এই মৃত্যুগুলো ছিল অকারণ।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মৃত্যু অকারণেই ঘটে। মৃত্যুর যে মিছিল, সেটা আমরা থামাতে পারি না। থামাতে পারি না কথাটা সত্য নয়; আমরা থামাতে চাই না।

গাজায় যেভাবে বিনা পয়সায় মৃত্যু পাওয়া যায়, বাংলাদেশও গাজা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এখানেও অহরহ পয়সাবিহীন মৃত্যু হচ্ছে।

আজ যে রাস্তার পিচগুলো রক্তাক্ত হলো, কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে ছয় জন প্রাণবন্ত তরুণের জীবনের প্রদীপ নিভে গেল, এগুলোকে কি শুধুমাত্র নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে? এগুলো তো আসলে দুর্ঘটনা নয়; এই মৃত্যুগুলো নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি।

এই যে ছয়টি প্রাণ, এরা নিশ্চয়ই কারো সন্তান, কারো পিতা, কারো স্বামী, কারো ভাই। এই মৃত্যুতে কি শুধুমাত্র সন্তান মারা গেল? একজন স্বামী মারা গেল, একজন পিতা মারা গেল, না একজন ভাই মারা গেল?

আসলে মারা গেল সবাই; সন্তানের সাথেই পিতা-মাতা কিংবা উত্তরাধিকারের স্বপ্ন। স্বামীর সাথে স্ত্রী এবং তাদের দাম্পত্য সুখ-দুঃখ। পিতার সাথে পুত্রেরও মৃত্যু হলো। ভাইয়ের সাথে মারা গেল বোন; মারা গেল দুঃসময়ের নির্ভরতা।

একজন পিতা যত দিন বেঁচে থাকবে, তার কি আর বেঁচে থাকা হবে? একজন মায়ের জীবনে কি আর কোনো রং অবশিষ্ট থাকবে? একজন স্ত্রী, স্বামীর ভরসায় যে নতুন জীবন শুরু করেছিল, তার জীবন কি কোনো পার পাবে? বোনের জীবনে কোনদিন উৎসব ফিরে আসবে।

এই তরুণদের চাওয়া ন্যায্য ছিল কিনা, এ নিয়ে আমরা হয়তো তর্ক করতে পারতাম। তাদের উচ্ছ্বাসে যদি কোনো ভুল থেকে থাকে, আমরা দেখিয়ে দিতে পারতাম, সংশোধনের পরামর্শ দিতে পারতাম।

এই বয়সটা একটু আবেগী হবে। তারা হয়তো ভবিষ্যতের চিন্তায় অতিমাত্রায় আবেগী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এজন্য তাদের হত্যা করতে হবে—এটা যুক্তিবিদ্যার কোনো যুক্তিতে প্রয়োগ করা যাবে এমনটা মনে হয় না।

একটা স্লোগান! এই স্লোগানটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে হয়তো যায় না। আমাদের চেতনায় যে দেশ, চেতনায় যে যুদ্ধ, সেই যুদ্ধের সাথে হয়তো এই স্লোগানটা যাবে না। এই তরুণদের হয়তো হঠকারিতা ছিল। এই স্লোগানে বিবেচনাবোধের অভাব ছিল।

এই স্লোগানের কারণে তারা সবাই খারিজ হয়ে গেছে; তাদের বাঙালিত্ব মুছে গেছে—এমনটা ভাবনা বাড়াবাড়ি হবে। কখনো কখনো মানুষ খেদ থেকে কিংবা মনকষ্টে নিজেকে পতিতের জায়গায় ভেবে বসে।

আমরা যদি জাজমেন্টাল না হয়ে, অতি ক্রোধী না হয়ে একটু সময় নিয়ে এই তরুণদের বোঝার চেষ্টা করতাম। আমরা যদি জানতে চাইতাম, আসলেই এরা রাজাকার মানসিকতার কি না, তাহলে হয়তো এই অহেতুক প্রাণহরণ এড়াতে পারতাম। কিছু রাজাকার হয়তো ঝাঁকের কই হয়ে মিশে গেছে কিন্তু সবাইকে রাজাকার ভেবে নেওয়া ভাবনার শুদ্ধতাকে প্রমাণিত করে না।

বাংলাদেশে এমন মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়। আগেই বলেছি লাশ বইবার অলৌকিক শক্তি বাংলাদেশের আছে। কিছু দিন পরেই এই ছয়টি মৃত্যু আমরা ভুলে যাব। নতুন কোনো আবেদ আলীর আবির্ভাব হবে অথবা আমরা পরীমনির ডিম ফুটাবার প্রক্রিয়ায় নান্দনিকতা কতটুকু এই বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে যাব।

এই ছয়টি পরিবার অবশ্য বাকি জীবন আর স্বাভাবিক হবে না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা হয়তো বেঁচে থাকবে, কিন্তু প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত হিসেব করবে যে তাদের সন্তানের, তাদের স্বামীর, তাদের পিতার মৃত্যুর কারণটা আসলে কি। এই অহেতুক মৃত্যুর গ্লানি সারা জীবন তাদের বয়ে বেড়াতে হবে।

আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদী মানুষ। তিনি যে শোকের সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন, পৃথিবীর খুব কম মানুষের পক্ষে এমন সমুদ্র সাঁতরানো সম্ভব।

আমরা আশা করেছিলাম আমাদের এই সংবেদী প্রধানমন্ত্রী তার মহৎ হৃদয় নিয়ে কোটা সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হবেন। যে ছয় জন তরুণ মারা গেছে, তিনি তাদের মাতা হতে পারতেন। এগুলো তারই সন্তান হতে পারতো। তিনি চাইলে এই সন্তানগুলো হয়তো বেঁচে থাকতো।

হয়তো তিনি এখন অশ্রু ফেলছেন। হয়তো এই ছয়টি মৃত্যু তাকে সেই শোক মনে করিয়ে দিচ্ছে যে শোক তিনি মনে প্রাণে ভুলতে চাচ্ছেন।

যেকোনো কারণেই হোক, আমাদের সংবেদী প্রধানমন্ত্রী এই অহেতুক মৃত্যুগুলো রোধ করতে পারলেন না। এজন্য দুঃখবোধ থেকে যাবে।

রাজাকার শব্দটি বাংলা ভাষায় একটি ঘৃণিত শব্দ। এই শব্দটি নিয়ে কেউ খেলতে যাবেন না। কোনোভাবে এই শব্দের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করবেন না।

আমাদের শ্রদ্ধাভাজন একজন স্যার শুধুমাত্র এই শব্দ উচ্চারণের কারণে তার প্রাণপ্রিয় ছাত্রদের মুখ দর্শন করবেন না বলে ওয়াদা করেছেন। অনেক ছাত্র তাদের পিতা-মাতার চেয়ে এই স্যারকে বড় ভাবে। তাদের প্রতিটি স্বপ্ন এই স্যারকে ঘিরে আবর্তিত হয়। ঘৃণিত রাজাকার শব্দের কারণে স্যার তার প্রাণপ্রিয় ছাত্রদের ত্যাগ করেছেন।

রাজাকার শব্দটি অভিশপ্ত। আমি এখনো যেসব প্রাণ, অর্থাৎ এখনো যেসব তরুণ বেঁচে আছে তাদের কাছে করজোড়ে নিবেদন জানাচ্ছি, রাজাকার শব্দ থেকে দূরে থাকো। এই শব্দ প্রাণঘাতী। যতটুকু সম্ভব এই শব্দ থেকে দূরে থাকো। রাজাকার থেকে দূরে থাকো। রাজাকারী চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে থাকো।

রক্ত এবং প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ, হে প্রিয় তরুণেরা, দেশকে নিয়ে কোনো রকম ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে যেও না।

তোমরা যারা বেঁচে আছো, বেঁচে থাকার চেষ্টা করো। কারো কথায় প্রভাবিত হয়ে হঠকারী কিছু করে ফেলো না। রাজাকার সম্প্রদায় তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইবে, তোমাদের আড়ালে তারা তাদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইবে—তোমরা সতর্ক থেকো।

তোমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের চেষ্টা করো। কোনোভাবেই সশস্ত্র হওয়ার চেষ্টা করবে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই সংবেদী। হয়তো কোনো মন খারাপের কারণে তিনি তোমাদের থেকে দূরে আছেন, কিন্তু বেশিক্ষণ দূরে থাকবেন না। সন্তানের মনে কষ্ট একজন মা-ই বুঝতে পারেন। তিনি একজন সংবেদী মা, খুব তাড়াতাড়ি তিনি তোমাদের পাশে এসে হাজির হবেন।

তোমরা যদি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করতে পারো, তাহলে অহেতুক মৃত্যু এড়াতে পারবে। বাংলাদেশকে অহেতুক লাশের ভার বইতে দিও না। তাকেও একটু শান্তিতে থাকতে দাও।

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবসী, লিটলম্যাগ ‌‘শব্দপাঠ’ সম্পাদক

;

আমি রাজাকার: মুখের কথা শুনেছ দেবতা, মনের কথা শোনোনি জননীর



অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান
অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান

অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

আলাপ-আলোচনার স্পিরিট অনুযায়ী আমাদের সমগ্র ছাত্রজীবন কেটেছে রাজাকারবৃত্তের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের ‘সোল এজেন্টের’ দাবিদাররা তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল না। এমনকি শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই তখন বাংলাদেশের মধ্যে ছিল না। তারা আসতে পারেনি, তাদের আসতে দেওয়া হয়নি, আসার পরিবেশও ছিল না। তাদের জন্য পাতা ছিল মৃত্যুফাঁদ।

তারা যখন ছিল না তখন আওয়ামী লীগ ছিল। তারা যখন থাকবে না, তখনো আওয়ামী লীগ থাকবে। আওয়ামী লীগ একটা রাজনৈতিক দল। ফলে এখনকার মানুষগুলো একসময়ে থাকবে না কিন্তু দলটি থেকে যাবে। এই নেতৃত্ব আগামীতে থাকবে না, নতুন নেতৃত্ব এসে দলের হাল ধরবে। ফলে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনার বা কোনো ব্যক্তির দল নয়, আওয়ামী লীগ জনমানুষের দল।

আমাদের সময়ে মোবাইল আবিষ্কার হয়নি, ইন্টারনেট বলে কোনো শব্দ তখন আমরা শুনিনি। রেডিও-টিভিও পর্যাপ্ত ছিল না। ছাত্রজীবনের শেষদিকে এসে হোস্টেলে টিভি দিয়েছিল। সেখানে এখনকার মতো এভাবে মুক্তিযুদ্ধের কথা, স্বাধীনতার কথা বলা হতো না। যা বলা হতো তা খণ্ডিত, বিকৃত ইতিহাস। আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, শেখ মুজিবের নাম উচ্চারণ ছিল নিষিদ্ধ।

তখন পেপার-পত্রিকা তেমন ছিল না। যা-ও ছিল তা কেনার পয়সা আমাদের ছিল না। একদিনের পত্রিকা অনেকসময়ে পরেরদিন আসতো। পত্র-পত্রিকায়ও মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার কথা উপেক্ষিত ছিল, খণ্ডিত ছিল, বিকৃত ছিল। রাজাকার, আলবদর, আলশামস শব্দগুলি লেখা নিষিদ্ধ ছিল।

তখনকার বইপত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার কথা এখনকার মতো এতো ব্যাপকভাবে উল্লেখ ছিল না। যা ছিল তাও ছিল বিকৃত-খণ্ডিত।

সেই অবস্থার মধ্যে আমরা ছাত্ররাজনীতি করেছি। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ স্লোগান দিয়েছি, জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়েছি। “রাজাকার-আলবদর - এবার তোদের দেবো কবর”, “জামাত-শিবির, রাজাকার – এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়”, জামাত-শিবির, মৌলবাদ -ধর্মের নামে পুঁজিবাদ” স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাস-রাজপথ দাপিয়েছি, কাঁপিয়েছি।

আমরা স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের ছাত্র রাজনীতিকদের এড়িয়ে চলেছি। তাদের সাথে পারতপক্ষে এক রুমে থাকিনি। তাদের সাথে একত্রে কোনো কাজ করা থেকে পারতপক্ষে বিরত থেকেছি। আমাদের বন্ধুমহল ভিন্ন ছিল। একই ধারার ছাত্র রাজনীতিকদের সাথেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির সাথে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল কম। তাদেরকে কোনোকিছুতে ছাড় দিতাম না।

সেই রাজনৈতিক বিরূপ অবস্থায় স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো দৃঢ় মানসিক শক্তি ও বোধ আমরা কোথা থেকে পেয়েছি? সহজ উত্তর- কঠিন রাজনৈতিক অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জিত আদর্শিক চর্চা, ত্যাগ ও পূর্বপুরুষের রক্ত ত্যাগের অগ্নি-চেতনা থেকে। সুন্দর দেশ গড়ার একটা স্বপ্ন থেকে।

ওই সময়ে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি ও রাজাকার-শাসিত দেশেও সারাদেশের কোথাও কোনো শিক্ষার্থী, কোনো ছাত্রসংগঠন, কোনো ছাত্রজমায়েত কখনো নিজেকে ‘রাজাকার’ বলে স্বঘোষিত কোনো স্লোগান দেয়নি।

এখনকার সমস্ত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, পেপার মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া দিনরাত স্বাধীনতার কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা বিরামহীনভাবে বলে চলেছে।

এখনকার সকল বইপত্র-ক্রোড়পত্র, মানপত্র-দানপত্র, চুক্তিপত্র-ঋণপত্র, প্রেমপত্র-ছাড়পত্র স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর কথা ক্রমাগত বলে চলেছে।

স্বপক্ষ-বিপক্ষ, পুরুষপক্ষ-নারীপক্ষ, পাত্রপক্ষ-কন্যাপক্ষ সবাই স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে।

দেশের খালে, বিলে, নদীতে, সমুদ্রে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের জোয়ার চলছে। দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ডে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চাষ চলছে। এর মধ্যে তবে আজ কেন শিক্ষাঙ্গনে ‘আমি রাজাকার’ স্লোগান উচ্চারিত হয়? যখন হওয়ার কথা ছিল, তখন তো হয়নি। এ ব্যর্থতা কার?

মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রকৃত শুদ্ধচর্চা না করে, মিডিয়ায় অতিকথন হয়েছে। কথা ও কাজে এতোটাই ফারাক তৈরি হয়েছে যে, নিজেদের প্রচারটাই হয়েছে নিজেদের জন্য আত্মঘাতী। হরিষে বিষাদ।

অনুকরণীয় উদাহরণ তৈরি না করে, অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করে মানুষকে এতোটাই জ্বালিয়েছেন যে, মানুষ আজ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে এই স্লোগান উচ্চারণ করে? প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, এটা তাদের মনের কথা না, এটা আপনাদের প্রতি তাদের ধিক্কার, কটূক্তি, স্যাটায়ার। এটা শুধু কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া নয়, এটা তাদের সার্বিক অসন্তুষ্টির প্রতিক্রিয়া।

মুখে স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ ও আদর্শের কথা বলে বলে আপনারা এতোটাই অনাদর্শিক কাজ করেছেন যে, একটা আদর্শিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। আজকের এই স্লোগান সেই আদর্শিক শূন্যতার বাই-প্রোডাক্ট?

নীতি-নৈতিকতা, আদর্শের মানদণ্ডে কোথায় নিয়ে গেছেন দেশটাকে? আজকের এই স্লোগান বলে দেয়, স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মের যে সর্বনাশ করতে পারেনি, সে সর্বনাশ আপনারা করে ফেলেছেন!

‘আমি রাজাকার’ শ্লোগানের মধ্যে ওদের কতোটা ক্ষোভ, দুঃখ, জ্বালা লুকিয়ে আছে সেটা পড়ার চেষ্টা করেছেন? না, করেননি। করলে নিজেদের রাজনৈতিক পরাজয় হবে? নিজের ব্যর্থতা প্রকটভাবে প্রকাশ পাবে? এ জন্য মর্মবাণী না পড়ে, উচ্চারিত বাণীর ভুল ধরে রাজনৈতিক বিজয় নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন? কোনোকিছুরই মূলে যাবেন না, সবসময় ইফেক্ট নিয়ে সস্তা বয়ান দিয়ে যাবেন? আর কতো?

তথ্যমতে ৬ জন তরুণকে লাশ বানিয়েছেন। সব মেরে ফেলবেন? বোঝাবেন না? বোঝাতে পারেন না? সরকারি চাকরি ছাড়া তরুণদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন না? অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন না?

ছাত্রলীগকে কেন মাঠে নামিয়েছেন? প্রশাসনিক ব্যাকআপ ছাড়া এখানে ছাত্রলীগই ‘নাই’ হয়ে যাবে। প্রোটেকশন ছাড়া বেরিয়ে দেখুন তো আপনাদের কী অবস্থা হয়? জনসমর্থন কোথায়, কোনদিকে টের পাবেন।

পৃথিবীর কোনো সংবাদপত্রে রোল মডেলের কথা আসেনি। গতকাল পর্যন্ত আলজাজিরা, রয়টার্স, এএফপি-সহ সারা পৃথিবীর বড়ো বড়ো সংবাদপত্রে কোটা সংস্কারের দাবিতে ৫ জন তরুণের হত্যার খবর আজ এসেছে। দেশের জন্য সুনাম বটে!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতা পড়েছেন? বিরক্ত হয়ে জননী সন্তানকে মৃত্যুর অভিশাপ দেবার পর দেবতা জননীকে তার সন্তান সমুদ্রে ফেলে দিয়ে প্রতিজ্ঞা রাখতে আহ্বান জানায়। জননী তখন কেঁদে বলে- মুখের কথা শুনেছ দেবতা, মনের কথা শোনোনি জননীর। ‘আমি রাজাকার’ স্লোগানের মধ্যেও সেই মর্মবাণী, সেই আক্ষেপ, ক্ষোভ, জ্বালা, ব্যথা, স্যাটায়ার লুকিয়ে আছে। উদার বুদ্ধি খাটিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখুন।

মোক্ষদা কহিল, "অতি মূর্খ নারী আমি,
কী বলেছি রোষবশে--ওগো অন্তর্যামী,
সেই সত্য হল? সে যে মিথ্যা কতদূর
তখনি শুনে কি তুমি বোঝনি ঠাকুর?
শুধু কি মুখের বাক্য শুনেছ দেবতা?
শোননি কি জননীর অন্তরের কথা?'

বিষয়টির যৌক্তিক ও সুষ্ঠু সমাধান করুন, নতুবা প্রজন্ম আজ যেটা স্যাটায়ার করছে আগামীতে সেটা তাদের বিশ্বাসে পরিণত হবে। এমন অবস্থা তৈরি হবে যে, একসময়ে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হাসি-তামাশা হবে। দোহাই আপনাদের এভাবে বিভীষণের ভূমিকা নেবেন না। আপনারা একসময়ে আওয়ামী লীগে থাকবেন না, কিন্তু আওয়ামী লীগ থাকবে।

শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যারকে বলব- গোস্বা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাবার ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগকে খুশি করাটা আপনার জন্য জরুরি না, বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ওই তরুণদের ভুল ভাঙ্গানোটা আপনার জন্য বেশি জরুরি। ওদের বোঝানোটা জরুরি। ওরা আমাদের সন্তান, ওদেরকে সুপথে আনা আমাদের দায়িত্ব।

প্রধানমন্ত্রী রাজনীতি করেন, রাজনীতিক বিজয়ের জন্য তিনি এই বাচ্চাদের সাথে বাগযুদ্ধে নামতে পারেন, ঝগড়া করতে পারেন, পুলিশ দিয়ে মারতে পারেন, কিন্তু আপনি পারেন না। প্রধানমন্ত্রীদের উত্তরসূরি না থাকলে দেশের তেমন কিছু হয় না, কিন্তু জ্ঞানীদের উত্তরসূরি না থাকলে দেশের মস্ত বড় ক্ষতি হয়ে যায়।

এই ভূখণ্ডে মহাপ্রতাপশালী পাল বংশ, সেন বংশ, আর্য বংশ, মৌর্য বংশ, মোগল বংশ, খিলজি বংশ, বারো ভূঁইয়া সব শেষ হয়ে গেছে, তাদের কোনো উত্তরসূরি নাই। কিন্তু তখনকার জ্ঞানীদের উত্তরসূরি ঠিকই আছে। আপনি তাদের মহান উত্তরসূরি। এই দেশে অযোগ্য অপদার্থ রাজনীতিবিদদের উত্তরসূরির দরকার নাই কিন্তু আপনার মতো জ্ঞানী মানুষের উত্তরসূরির দরকার আছে। সন্তানদের ধারণ করুণ। ওরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।

লেখক: গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

;