ক্যাসিনোর অন্ধকার জগতে বাংলাদেশ, ভয়াবহতা কতদূর?

মুফতি এনায়েতুল্লাহ
মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ক্যাসিনো। হ্যাঁ, ক্যাসিনো। ক্যাসিনো মানেই টাকা ওড়ানোর জায়গা। বিশ্বজুড়ে রয়েছে অসংখ্য ক্যাসিনো, যেখানে জুয়া, মদ ও নারীর নেশায় মেতে থাকেন জুয়াড়িরা। পৃথিবীর বহু দেশে চলে জুয়া খেলার রমরমা ব্যবসা। অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি খেলার ছলে মনোরঞ্জনের জন্য এসব ক্যাসিনোতে আসেন। তবে বাংলাদেশে ক্যাসিনোর ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। আড়ালে-আবডালে ক্যাসিনোর কার্যক্রম চললেও র‌্যাবের অভিযানের প্রেক্ষিতে সামনে এলো এই অন্ধকার জগতের কথা। বাংলাদেশে জুয়া-হাউজি পরিচিত খেলা হলেও ক্যাসিনোর ধারণা একেবারেই নতুন। নাটক কিংবা সিনেমায় দেখা, গল্পে পড়া ক্যাসিনো উন্নত দেশগুলোর মনোরঞ্জনের রসদ কিংবা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হলেও বাংলাদেশের আইনে ক্যাসিনো পরিচালনা অবৈধ। তার পরও বাংলাদেশের অভিজাত এলাকাগুলোতে চলছে ক্যাসিনো।

বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদ ক্লাব, মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামক ক্যাসিনোতে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে সিলগালা করে দিয়েছে। এসব ক্যাসিনো থেকে ২০১ জনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য ও নগদ লাখ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬০টিরও বেশি ক্যাসিনো রয়েছে। যেখানে জুয়ার পাশাপাশি নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।

এ দিকে বৃহস্পতিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে নিজ কার্যালয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘রাজধানীতে অবৈধ জুয়ার আড্ডা, ক্যাসিনো চলতে দেওয়া হবে না। এসব জুয়ার বোর্ড, ক্যাসিনো পরিচালনার ক্ষেত্রে যতো প্রভাবশালীরাই জড়িত থাকুক না কেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কঠোর হবে। র‍্যাব অভিযান শুরু করেছে পুলিশও করবে। ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার জুয়ার বোর্ড ও ক্যাসিনোর তালিকা করা শুরু হয়েছে।’

ইয়ংমেন্স ক্লাবে পুলিশের অভিযানে জব্দ করা হয় বিপুল পরিমাণ মাদক
ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযানের সময় জব্দ করা হয় বিপুল পরিমাণ মাদক, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

উন্নত দেশগুলোতে ক্যাসিনোকে ‘অভিজাতদের জুয়া’ মনে করা হলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বেশ উদার। এখানে নিম্নআয়ের মানুষও অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। মূলত বাজার সৃষ্টির জন্য এমন সুযোগ রাখা হয়েছে। অনেকে তো হাতের ঘড়ি-মোবাইল, স্ত্রীর কানের দুল, নাক ফুল ইত্যাদি বেচে ক্যাসিনোতে আসেন। প্রয়োজনে চুরি-চামারি ও ছিনতাই শুরু করেন। কথাগুলো বলছিলেন, মতিঝিলের এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী।

তিনি আফসোস করে বলেন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত বলে কথা নেই। এখানে এসে একবার দু’বার টাকা জেতার পর হারতে হারতে সর্বহারা হয় মানুষ। তার পরও জেতার নেশায় প্রতিদিন নতুনভাবে শুরু করে। শুনেছি, এখানে নাকি বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা আছে। টাকা খুইয়ে অনেককে পাগল হয়ে ঘুরতেও দেখি এদিক-সেদিক।

আপন ছেলে জুয়ায় আসক্ত জেনে, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে এক বাবা নিজ অনুসন্ধানে রাজধানীর বেশ কিছু ক্যাসিনোর তালিকা দিয়ে এসব বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগে বলা হয়, ‘রাজধানীর মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় অবস্থিত ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, গুলশানের ফুয়াং ক্লাব, ধানমন্ডি ক্লাব, কলাবাগান ক্লাব, মালিবাগ মৌচাক মোড়ে ফরচুন মার্কেটের বিপরীতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চতুর্থ তলার সৈনিক ক্লাব, উত্তরায় র‌্যাব-১ এর বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার উত্তরা ক্লাব, এলিফ্যান্ট রোডের এজাজ ক্লাব, পুরানা পল্টনের জামান টাওয়ারের ১৪ তলায় অবস্থিত ক্যাসিনোতে শুধু জুয়া নয়, দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থানে অবৈধ মাদক বিক্রি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে।’

ইয়ংমেন্স ক্লাবে র‌্যাবের অভিযান
ইয়ংমেন্স ক্লাবে র‌্যাবের অভিযান, ছবি: সংগৃহীত

আর ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ১৩টি অভিজাত ক্লাবে জুয়া খেলা ৩ মাসের জন্য বন্ধ করতে আদেশ দেয়। ওই ক্লাবগুলো হলো- ঢাকা ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, ধানমন্ডি ক্লাব, বনানী ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব ঢাকা, ঢাকা লেডিস ক্লাব, ক্যাডেট কলেজ ক্লাব, চিটাগাং ক্লাব, চিটাগাং সিনিয়রস ক্লাব, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, সিলেট ক্লাব ও খুলনা ক্লাব।

কিন্তু এর ১ দিন পর ৬ ডিসেম্বর ঢাকা ক্লাবের আবেদনের প্রেক্ষিতে চেম্বার জজে জুয়া খেলার বিরুদ্ধে ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়। ৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ফের ৩ মাসের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারির আদেশ বহাল করে। কিন্তু ১১ ডিসেম্বর ফের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা সেই আদেশ স্থগিত করে এই অভিজাত ক্লাবগুলোতে জুয়া খেলা জারির পক্ষে আদেশ দেন।

এই দু’টি ঘটনা এখানে উল্লেখ করার কারণ হলো, জুয়া বন্ধের আবেদন ও প্রচেষ্টা বরাবরই ছিল। কিন্তু বন্ধ হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক ক্যাসিনোর বিষয়টি জানতে পেরে সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রশাসনিক তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে বুধবার অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার ক্যাসিনো চলতে দেবেন না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘আমরা দেশে ক্যাসিনোর কোনো অনুমোদন দেইনি। এতোদিন অবৈধভাবে এ ব্যবসা তারা করে এসেছেন। ক্যাসিনো ব্যবসা করতে হলে অনুমোদন লাগবে। আমাদের এ বিষয়ে জানাতে হবে, পরে আমরা অবস্থা বুঝে অনুমোদন দেব। প্রয়োজন হলে নীতিমালা করা হবে। কিন্তু আমাদের না জানিয়ে লুকোচুরি করে ক্যাসিনো ব্যবসা করবেন অবৈধভাবে সেটা হতে পারে না।’

ইয়ংমেন্স ক্লাবে জুয়ার বোর্ড
ইয়ংমেন্স ক্লাবে জুয়ার সরঞ্জাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ঢাকা মহানগর পুলিশ ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ এবং পাবলিক গ্যাম্বলিং আইন অনুসারে টাকার বিনিময়ে জুয়া খেলা অবৈধ। স্বাভাবিকভাবে আমাদের সমাজে যেকোনো পর্যায়ের জুয়া খেলাকে ঘৃণিত ও গর্হিত কাজ হিসেবে দেখা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতেও তা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ হারাম।

জুয়াকে আরবিতে ‘মায়সির’ ও ‘কিমার’ বলা হয়। মায়সির ও কিমার এমন খেলাকে বলা হয়, যা লাভ ও ক্ষতির মধ্যে আবর্তিত থাকে। অর্থাৎ যার মধ্যে লাভ বা ক্ষতি কোনোটাই স্পষ্ট নয়। জুয়ার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। হজরত নবী করিম (সা.)-এর আগমনের সময় তৎকালীন মক্কায় নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন ছিল। বর্তমানে প্রাচীন পদ্ধতি ছাড়াও জুয়ার ক্ষেত্রে আরও বহু নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে; এগুলোর সবই হারাম।

জুয়া হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, শুধু নাম পরিবর্তনের কারণে বস্তু ও মূল প্রকৃতি এবং হুকুম পরিবর্তন হয় না। কাজেই প্রাচীনকালে প্রচলিত জুয়া সম্পর্কে যে হুকুম প্রযোজ্য ছিল, আধুনিককালের জুয়ার ক্ষেত্রেও সেসব হুকুম প্রযোজ্য।

ইসলামি শরিয়তে জুয়া হারাম। একাধিক কোরআনের আয়াত ও হাদিসে এ সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো, তাহলেই তোমরা সফলকাম হতে পারবে। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও নামাজ আদায়ে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না।’-সূরা মায়িদা: ৯০-৯১

পৃথিবীতে আশ্চর্য ধরণের দু’টি পাপ আছে, যা মানুষ না করেই পাপী। তার একটি হলো- কাউকে জুয়া খেলার প্রতি আহ্বান করা। সহিহ বোখারির এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি অপরকে জুয়া খেলার প্রতি আহ্বান করবে, তার উচিত কিছু সদকা করে দেওয়া।’ হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধু জুয়াকেই হারাম করেননি, বরং জুয়ার ইচ্ছা প্রকাশকেও গোনাহ সাব্যস্ত করেছেন। যে ব্যক্তি অপরকে জুয়া খেলার জন্য ডাকবে তাকেও গোনাহের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে কিছু সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাহলে জুয়া খেললে কী পরিণতি হতে পারে সে সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত।

ইয়ংমেন্স ক্লাবে জুয়ার সরঞ্জাম
ইয়ংমেন্স ক্লাবে জুয়ার সরঞ্জাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

জুয়াকে অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করা যেমন কোনো মুসলমানের জন্য জায়েজ নেই, তেমনি একে খেলা ও অবসর বিনোদনের উপায়রূপে গ্রহণ করা বৈধ নয়।

আমাদের সমাজে প্রচলিত লটারি, হাউজি, ক্রিকেটে বাজি ধরা, চাক্কি ঘোরানো ও রিং নিক্ষেপ থেকে শুরু করে প্রভৃতি নামে নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন রয়েছে। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও বসছে জুয়ার আসর। কৃষক, তরুণ, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছেন মরণনেশা জুয়ায়। এসব আসরে উড়ছে লাখ লাখ টাকা। সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেকেই। মাদকের মতোই জুয়ার ছোবল এখন দৃশ্যমান। এমতাবস্থায় দেশের সচেতন অভিভাবকদের প্রত্যাশা, অনৈতিক এসব জুয়ার আসর বন্ধে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

আরেকটি কথা, সব ধরনের জুয়াবাজি অবৈধ এবং এর থেকে প্রাপ্ত সম্পদ হারাম। আর হারাম সম্পদ ভোগ করে ইবাদত-বন্দেগি করলে আল্লাহতায়ালার দরবারে তা কবুল হয় না। তাই মুসলমান হিসেবে সব ধরনের জুয়াবাজি থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আপনার মতামত লিখুন :