মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কিছু কথা

নাহিদ হাসান
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সোয়া লাখের ওপর হতে পারে না। কিন্তু শোনা যায় ১২ লাখ থেকে ২০ লাখের মত সার্টিফিকেট বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১২ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ১১ জন ভুয়া। এই অবস্থা কখনই হতো না যদি সুপরিকল্পিতভাবে সার্টিফিকেটগুলো সেক্টর কমান্ডারদের মাধ্যমে বিলি হতো। জেনারেল ওসমানীর দুর্বল নেতৃত্বের ফলে সমাজে আজ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ছড়াছড়ি এবং সেই কারণে যে সামান্য কৃতিত্ব ও শ্রদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য ছিল সেটাও তারা আজ পাচ্ছেন না। কথাগুলো বলেছিলেন ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কাজী নূর-উজ্জামান।

তারপর সেই ওসমানীর স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেটগুলো সেক্টর কমান্ডার বা কোম্পানি কমান্ডারদের দ্বারা বিতরণ না করে করা হয় স্বাধীন জেলা প্রশাসকের দপ্তর বা দলীয় এমপিদের দ্বারা। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। তাই সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বেড়েছে।

একই ঘটনা ঘটেছে ২০১৩ সালের ২২ জুলাই। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীর নামে ২৩৬৭ জনের কথিত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে কোনো ধরনের সহযোদ্ধাদের দ্বারা যাচাই বাছাই তো দূরে থাক, শুধুমাত্র সাপ্তাহিক একতা পত্রিকা তালিকাটি প্রকাশ করে। যেখানে কারও নামে অভিযোগ থাকলে তা জানানোর আহ্বান জানানো হয়। মজার বিষয় হলো, কুড়িগ্রাম জেলাতে যার সার্কুলেশন হচ্ছে ২০-৩০ কপি। সেই পত্রিকায় প্রকাশিত তালিকা জেলার প্রত্যন্ত এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছানোর কোনও সুযোগ নাই। তারপর সেই তালিকাই গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

এই গেজেটের একটি ঘটনাকে নমুনা হিসেবে নেয়া যেতে পারে। কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী ও গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ পাশাপাশি লাগোয়া উপজেলা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের এক বাসিন্দা এই দুই উপজেলার মোট ৭২ জনকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন।

গেরিলা বাহিনীর গেজেট প্রকাশের আগে একতা পত্রিকায় তালিকা প্রকাশিত হলে সুন্দরগঞ্জের ৩০ জন তালিকাভুক্তি সম্পর্কে ১০.০৫.২০১২ তারিখে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা, গাইবান্ধা একটি রেজুলেশন করে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রেরিত ৩০ সদস্য বিশিষ্ট একটি বিশেষ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে আমরা পর্যালোচনা ও তদন্তে নিশ্চিত হই যে, উল্লেখিত ৩০ জনের তালিকায় একজনও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নাই।... আরও উল্লেখ্য যে, ৩, ৪ এবং ২৯ নম্বরের ১৯৭১ সালে বয়স ছিল অনূর্ধ্ব ৩ বছরের কাছাকাছি, বাকিরা কয়েকজন রাজাকার এবং অমুক্তিযোদ্ধা। এবং ওই তালিকার ১৯ নম্বর ব্যক্তি আহাদ আলীর ঠিকানা সুন্দরগঞ্জ দেওয়া হলেও তার প্রকৃত ঠিকানা চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এবং সে চলতি ইউপি সদস্য। এবং কুখ্যাত রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধার ভূমি দখলকারী। অভিযোগ পাওয়ার পরেও ওই তালিকায় আরও কিছু নাম যুক্ত হয় এবং গেজেটে স্থান পায়। এখানে সিপিবি-ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই অভিযুক্ত হয়ে পড়ে।

তেমনিভাবে চিলমারী উপজেলায় যে ৪২ জনের নাম গেজেটে তালিকাভুক্ত হয় তাদের কয়েকজন আঃ কুদ্দুস আকন্দের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়, কারণ এরা মূলত সুন্দরগঞ্জের অধিবাসী। গোপনে তালিকাভুক্ত হওয়া ও নজর এড়ানোর জন্যই ঠিকানা বদল। আর বাকি যারা চিলমারীর বাসিন্দা তাদের কারোরই বয়স মুক্তিযুদ্ধের সময় ৮-১০ বছরের বেশি ছিল না। তাদের ভোটার আইডি কার্ড দেখলেই সত্যতা টের পাওয়া যাবে।

এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে চিলমারী উপজেলার মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল মান্নান সরকার ও সেক্রেটারি আফতাব উদ্দীন সরকার এবং ন্যাপের সভাপতি ডাঃ সত্যেন্দ্রনাথ বর্মন ও সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন ২৫.০৯.২০১৩ তারিখে যৌথ বিবৃতিতে বলেন, 'এই ঘটনার মধ্যদিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ও পার্টির গড়ে ওঠা সম্মান ও বিশ্বাস ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা এই ঘটনাকে মেনে নেওয়াকে অপরাধ বলে গণ্য করি।' একই রকম বিবৃতি দেন কুড়িগ্রাম জেলা ও চিলমারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কম্যান্ডও।

উল্লেখ্য যে, এখানেও এ এস এম শামছুল আরেফিন কর্তৃক উদ্ধারকৃত 'বৃহত্তর রংপুর জেলার রাজাকারদের তালিকাভুক্ত রাজাকারও এখানে রয়েছে। আজ সেই রাজাকাররা ভাতা তুলছে, সন্তানের চাকরিও জুটিয়েছে। স্বভাবতই কথা উঠেছে, সর্বহারা পার্টিসহ দেশের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বামপন্থী দলসমূহে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করা হয়নি, তাও মানা গেল। তারপর নানা ঘটনা প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে ভারতীয় তালিকাভুক্ত সহযোদ্ধাদের সাক্ষ্য সাবুদের মধ্যদিয়েই বছর বছর মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা হলেন একজন ব্যক্তির পাঠানো একটি তালিকাতেই? কী সহজ মুক্তিযোদ্ধা হওয়া! গোটা তালিকাই যে এর বাইরে নয়, তা বোঝা যায় অভিযোগ অগ্রাহ্য করা থেকেই।

২.

কাজী নূর-উজ্জামান তাঁর 'নির্বাচিত রচনা'য় লিখেছেন, 'মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন সাধারণ যুবকেরা।' কিন্তু তারপর? তারপর সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে। বাড়তে বাড়তে রাজাকাররাও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেলেন। এবার ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টিও এই ব্যবসায় নেমে পড়ল। সম্প্রতি সরকার ৪৭ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও যেসব রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি দলীয় পক্ষপাতমূলক হলেও মন্দের ভাল।

বামপন্থী চিন্তাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যথার্থই বলেছেন, 'মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে, আসলে দরকার ছিল যুদ্ধবিরোধীদের তালিকা প্রস্তুত রাখা, কেননা মুষ্টিমেয় কিছু লোক বাদ দিলে দেশের সব মানুষই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক।

মুক্তিযোদ্ধারা পুরষ্কারের লোভে যুদ্ধে যাননি। তাদের সামনে একটা স্বপ্ন ছিল, সেটা হলো দেশের সব মানুষের মুক্তি ছিনিয়ে আনা। এই স্বপ্নটি বাস্তবায়িত হতে দেয়া হবে না, এই সিদ্ধান্ত নিয়েই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।...অনেকটা ঘুষ দেওয়ার মতো।' সিপিবি-ন্যাপ এই ঘুষের চক্রান্তে নতুনভাবে জড়িয়ে পড়ল। ইতিহাস ক্ষমা করবে কি? অবশ্য তারা ক্ষমাও চায়নি।

নাহিদ হাসান: সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ, রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি 

আপনার মতামত লিখুন :