নিরাপত্তার বিষফোঁড়া রোহিঙ্গা সমস্যা

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.)
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রধান দৈনিকের শেষ পাতার শিরোনাম ছিল 'রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড প্রাপ্তির তদন্তে দুদক'। প্রতিবেদনে প্রকাশ, চট্টগ্রামে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রাপ্তি নিয়ে কেলেঙ্কারির ঘটনা তদন্তে দুদকের দল নিশ্চিত চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসে বসেই ওই অপকর্ম চালিয়েছে একটি জালিয়াতি চক্র।

১৭ সেপ্টেম্বর আরেকটি দৈনিকের প্রথম পাতায় প্রধান হেডলাইন 'নানা কৌশলে ভোটার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা'। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর শুরুতে উল্লিখিত একই দৈনিকের শেষ পাতায় আরও একটি বড় উদ্বেগজনক খবর ছাপা হয়। তাতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন আবদার- অবাধ চলাফেরা, ফোন ও ইন্টারনেট সেবা দাবী। এ বিষয়ে সরব অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এইচআরডব্লিউ।

একটা জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল্য টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অথচ নির্বাচন কমিশনের কিছু দুর্নীতিবাজ লোক স্থানীয় দুর্বৃত্তদের সহায়তায় জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপকর্ম করে যাচ্ছে নিশ্চিত মনে।

উপরে উল্লিখিত খবরগুলো যে নতুন শুনছি তা নয়। ১৯৭৮ সালের পর থেকে অদ্যাবধি রোহিঙ্গাদের নিয়ে এরকম খবর প্রায়শই পত্র-পত্রিকায় আসছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বানের স্রোতের মতো রোহিঙ্গারা আসার আগ পর্যন্ত এর ভয়াবহ পরিণতি অনুধাবন করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি

২০১৭ সালের আগে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল দীর্ঘদিন ধরে। এদের ঘিরে এনআইডি ও পাসপোর্ট প্রদানের খবরসহ আরও মারাত্মক সব খবরের সচিত্র প্রতিবেদন পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পরেও রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের যতটুকু সতর্ক হওয়ার দরকার ছিল তা আমরা হইনি। সে সময়ে এসব ব্যাপারে যদি আমরা সতর্ক হতাম তাহলে হয়তো ২০১৭ সালের এত বড় দুর্যোগ আমাদের ঘাড়ে এসে পড়তো না।

ওই সাড়ে তিন-চার লাখ রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন ২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত করা হয়নি। ফলে সঠিক হিসাব তখন কেউ জানতেন না। তারা সেখানে কী করত সে খবর কেউ গুরুত্ব সহকারে ধর্তব্যের মধ্যে নিয়েছে বলে আমার অন্তত মনে হয় না।

২০১৭ সালের পূর্বে এই রোহিঙ্গা ইস্যু সম্পর্কে আমি বেশ কিছু লেখা লিখেছি, টেলিভিশনের টকশোতে একাধিকবার বলেছি, এই অবৈধভাবে নিবন্ধনহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা আমাদের রাষ্ট্রের জনগণের নিরাপত্তার জন্য বিষফোঁড়া।

তখন কক্সবাজারে জাতিসংঘের ক্যাম্পে রোহিঙ্গা সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০-৩২ হাজার। অবশিষ্ট সাড়ে তিন-চার লাখ এর কোনো হিসাব কারো কাছে ছিল না। এখনকার তুলনায় তখন সংখ্যা কম থাকায় স্থানীয় জনগণ আজকে যে রকম বিপদের সম্মুখীন সেটি তারা সে সময় বুঝতে পারেনি। তখন অনেক রোহিঙ্গা এনআইডি পেয়েছে, বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়েছে, অনেকে ভোটার হয়েছে, সে খবর পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে ছাপা হয়েছে।

এই সমস্ত পুরনো রোহিঙ্গারা আজ ক্যাম্পগুলোর নেতা হয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে এবং প্রত্যাবাসনের পথে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এ কাজে সহায়তা করছে স্থানীয় ক্ষমতাবান দুর্বৃত্ত চক্র যারা শুধু ক্ষমতা ও টাকা ছাড়া দেশ-জাতির ভালো-মন্দ চিন্তা করে না।

সে সময়ে রোহিঙ্গারা নিজেদের মতো করে মাদ্রাসা করেছে, স্কুল করেছে কেউ ভ্রুক্ষেপ করেনি। একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের নামে একটি মাদ্রাসা তখন হয়েছিল যার নাম সম্প্রতি পরিবর্তন করা হয়েছে। রামুতে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই মাদ্রাসাটি দেখিয়ে দিতে পারে। এই কয়েকদিন আগে উখিয়া উপজেলার ময়নাগোলা ক্যাম্প থেকে সাব্বির আহমেদ নামের এক রোহিঙ্গার কাছ থেকে অত্যাধুনিক একটি পিস্তল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই লেখাটি লিখতে বসে কক্সবাজারের কয়েকজন সাংবাদিক ও পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে যে বিষয়গুলো জানলাম তা সার্বিক নিরাপত্তার জন্য মোটেও ভালো খবর নয়।

তাই বিষয়গুলো একেক করে এখানে তুলে ধরছি।

১.

প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পঁয়ত্রিশটি ক্যাম্পের ভেতরে কোথাও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারের কোনো প্রতিনিধি থাকে না। শুধু তিন প্রধান প্রবেশপথে তিনটি পুলিশ পোস্ট থাকে। ক্যাম্পের ভেতরে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার বড় একটা অংশ নিরীহ হলেও হাজার হাজার দুর্বৃত্ত চক্র তৈরি হয়েছে। এই দুর্বৃত্ত চক্র কী করছে তার হদিস রাখার মতো ওই সময়ে ক্যাম্পের ভেতরে কেউ থাকে না। তার ভেতরে ফাঁড়ি নেই এবং রাতের বেলায় পুলিশের টহল দলও থাকে না।

গত দুই বছরে ক্যাম্পের ভেতরে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে ৩০ জনের ঊর্ধ্বে রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে।

২.

ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গারা শত শত দোকানসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের পসার সাজিয়েছে। ব্যবসা করে অনেক রোহিঙ্গা ইতোমধ্যেই কোটিপতি হয়ে গেছে।

৩.

ক্যাম্পের ভেতরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য জাতিসংঘসহ দেশি-বিদেশি এনজিও এর পক্ষ থেকে প্রায় ৫০,০০০ রোহিঙ্গাদের চাকরি দেয়া হয়েছে যাদের মাসিক বেতন ১০,০০০ টাকা থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত আছে।

৪.

জাতিসংঘসহ এনজিওদের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে দুই হাজার নেতা নির্দিষ্ট করা হয়েছে যারা ক্যাম্পের ভেতরে সবকিছুর মাতব্বরি-সর্দারি করে।

টেকনাফ, উখিয়া দুটি উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন রয়েছে। উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, মেম্বর এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাউকে কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়নি। কিন্তু অন্যদিকে স্থানীয় সাধারণ জনগণই আজ সবচাইতে বেশি নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে আছে।

৫.

একজন সাংবাদিক তথ্য দিলেন, তিনি একদিন দিনের বেলায় একটি ক্যাম্পে গিয়ে ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সহকারী পিয়ন, সিকিউরিটি- কাউকে দেখতে পাননি। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান ওই সাংবাদিক জানালেন, এতদিন অতিরিক্ত সচিব মর্যাদার কর্মকর্তা সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ভোগবিলাস এবং বিদেশি সংস্থা সমূহের গিফটের পর গিফট নিয়ে বাংলাদেশকে ২০০ বছরের ক্ষতির মধ্যে ফেলে গেছেন।

শোনা যায়, ২২ আগস্ট মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের অনেকেই আগের রাতে কিডন্যাপ হয়েছেন কথিত রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লার লোকজন দ্বারা।

৬.

একজন আরেকটি তথ্য দিলেন। তিনি জানালেন, বিভিন্ন সাহায্য সামগ্রী নিয়ে জাতিসংঘসহ বিদেশি এনজিওদের কার্গো বিমান ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবতরণ করে। সেখান থেকে কাভার্ড ট্রাকে সেগুলো সরাসরি জাতিসংঘ, বিদেশি এনজিওদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় চলে যায়। এই কার্গোতে কী আসে এবং কী পরিমাণ আসে তা দেখার জন্য বাংলাদেশি কোনো প্রতিনিধি থাকে না।

উপরে ক্রমিক নম্বর ১ থেকে ৬ পর্যন্ত বর্ণিত তথ্যাদির অর্ধেকও যদি সঠিক হয় তাহলে বুঝতে হবে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা- দুটো নিয়েই উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ আছে।

উদ্বাস্তু শরণার্থীদেরতো ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের অনুমতি পাওয়ার কথা নয়। তাহলে তারা কী করে জাতিসংঘ এবং এনজিওদের পক্ষ থেকে হাজার হাজার টাকা বেতনের চাকরি পেল? কী করে তারা হাটবাজার তৈরি করে ব্যবসা বাণিজ্য করছে? এই যদি হয় অবস্থা তাহলে রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক। আর নিরীহ রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে চাইলেও শক্তিশালী সিন্ডিকেট, ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতো ওই নিরীহ রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতে দেবে না

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে স্রোতের মতো বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তখন কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণ নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে ওইসব নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সবরকম সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। দুই বছরের মাথায় এসে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত।

স্থানীয় জনগণ এখন একটা ভীতিময় পরিস্থিতির মধ্যে আছে। অনেক স্থানীয়রা বলেন, স্কুল-কলেজে মেয়েদের পাঠিয়ে তারা সবসময় শঙ্কাতে থাকেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে শুধু স্থানীয় জনগণ নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে।

এটা সবাই জানেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কিছু ধর্মান্ধ উগ্রবাদী গোষ্ঠী হতাশাগ্রস্ত সাধারণ রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগে বহুরকম উস্কানিমূলক অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করেছে। সবসময় কক্সবাজারের স্থানীয় কিছু ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গ দুর্বৃত্ত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নিয়ে মানবপাচার ও অস্ত্র চোরাচালানের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে কিছুদিন আগে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা ড্রাগ ব্যবসার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে।

এতোক্ষণ যা লিখলাম সেগুলো নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের একটা সংক্ষিপ্ত ও সীমাবদ্ধ পর্যালোচনা মাত্র। বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখলে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো আরও বহু কারণ রয়েছে। গত দুই বছরে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হয়নি বা তারা ফেরত যায়নি। এটা বৈশ্বিক শরণার্থী সংকটের দীর্ঘসূত্রিতার তুলনায় হতাশ হওয়ার মতো কিছু নয়। হোস্ট কান্ট্রি বা শরণার্থী গ্রহণকারী দেশ হিসেবে সর্তকতার বিষয় হলো এই হতাশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেন দুরভিসন্ধি আটতে না পারে তার জন্য শুরু থেকে কড়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের দ্বন্দ্ব ও দৌড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত আছে যার পরিণতিতে বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ঝুঁকির সৃষ্টি হচ্ছে।

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.): কলামিস্ট এবং ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

আপনার মতামত লিখুন :