অব্যাহত থাকুক দুর্নীতি-বিরোধী শুদ্ধি অভিযান

এস এম মারুফ
এস এম মারুফ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

এস এম মারুফ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দুর্নীতি তিনটি পর্যায় বা লেভেলে সংগঠিত হতে পারে। প্রথম দু'টি হচ্ছে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের দুর্নীতি এবং তৃতীয়টি হচ্ছে Systemic Corruption বা পদ্ধতিগত দুর্নীতি। যখন একটি দেশের পুরো সমাজব্যবস্থাকে দুর্নীতি গ্রাস করে ফেলে তখন তাকে বলা হয় পদ্ধতিগত দুর্নীতি। এ পর্যায়ে সমাজে দুর্নীতি অনেকটা স্বীকৃত বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং ধরে নেওয়া হয়, সকল কাজের জন্যই দুর্নীতির আশ্রয় এবং সাহায্য নিতে হবে।

ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের দুর্নীতি ক্রমান্বয়ে পদ্ধতিগত দুর্নীতিতে পরিণত হয়। এ বিষয়টি বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশে দুর্নীতি Systemic লেভেল বা পদ্ধতিগত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। দুর্নীতির এ পর্যায় থেকে বের হয়ে আসার জন্য সমাজের সকল স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কোনো বিকল্প নেই।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় ছিল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা বা জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাড়াঁশি অভিযান শুরু করেছেন। তিনি নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান ও গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এটি অবশ্যই প্রশংনীয় উদ্যোগ এবং সাধুবাদ পাওয়ার মতো বিষয়। কিন্তু আমাদের নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রশংসার কোনো স্থান নেই; সবকিছুতেই সমালোচনা করা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত একটি সমাজে নিজদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এরকম সাঁড়াশি অভিযান শুরু করা খুব সহজ কাজ নয়। কারণ দলের ভেতর থেকে বহুমুখী চাপ আসতে পারে, এমনকি নিজদলের মধ্যে ষড়যন্ত্রও দানা বাঁধতে পারে। এজন্যই হয়তো বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পূর্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এরকম শুদ্ধি অভিযান কেউ শুরু করতে পারেননি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে এরকম কঠিন কাজটিও চলমান রাখা সম্ভব কারণ তাঁর শরীরে বঙ্গবন্ধুর রক্ত প্রবাহমান।

ক্যাসিনো বাণিজ্যের সুবাদে রাতের ঢাকাও জেগে থাকতো। ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের হাজার কোটি টাকার রমরমা ব্যবসা অনেকের কাছেই অজানা ছিল। তবে যারা এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং যারা ভাগ-বাটোয়ারা পেত তারা দীর্ঘ সময় ধরে পরমযত্নে লালন-পালন করে ক্যাসিনো ব্যবসাকে আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। কারণ বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে এটি পরিষ্কার যে রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় ক্যাসিনো ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে।

এখন প্রয়োজন এ ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত এবং লভ্যাংশ পেত দল-মত নির্বিশেষে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা।

ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ-এই তিন পর্যায়ের দুর্নীতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। কাজেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানে সফল হতে হলে প্রতিটি পর্যায়েই হাত দিতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের দুর্নীতি প্রণালীবদ্ধভাবে সংগঠিত হয় এবং অনেক ব্যক্তি জড়িত থাকে। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের সিন্ডিকেট থাকে, যাদের কাছে দলীয় আদর্শ বা জনগণের সেবা করার মানসিকতা গৌণ বিষয়। পারস্পরিক লাভ-ক্ষতি এবং পাওয়া-না-পাওয়ার হিসেবটাই তাদের কাছে মুখ্য।

দুর্নীতি যে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেই হয় তা নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও দুর্নীতি হচ্ছে। খাতভিত্তিক বলতে গেলে বাংলাদেশের অধিকাংশ খাত আজ দুর্নীতিগ্রস্ত। এদেশের প্রায় সব সেবাখাতই আজ দুর্নীতিগ্রস্ত খাতে পরিণত হয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ সেবা পাওয়ার পরিবর্তে হয়রানি এবং দুর্নীতির শিকার হয়। দুর্নীতির কারণে সরকার প্রদত্ত অনেক সুযোগ-সুবিধা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা হারানোর অন্যতম কারণ হচ্ছে দুর্নীতি।

সমাজ ও রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা এবং এর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। কারণ, দুর্নীতির বড় বড় ঘটনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতা এবং মন্ত্রীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন থাকে এবং সমর্থন দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে একধরণের সমঝোতা কাজ করে।

আবার অনেক ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন আমলারা রাজনৈতিক নেতা কিংবা মন্ত্রীদের প্রভাবিত করে দুর্নীতি করে থাকে। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তবায়ন হলে আমলাদের পক্ষে দুর্নীতি করা সহজ কাজ হবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রায়োগিকভাবে ক্ষমতায়ন করতে হবে, শুধু কাগজে-কলমে করলে হবে না।

দুর্নীতির প্রকৃত তথ্য উন্মোচনের জন্য সুশীল সমাজসহ দুর্নীতি নিয়ে যেসকল সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান কাজ করে তাদের মতামত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাদের দ্বারা প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাইপূর্বক গ্রহণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে চলমান উন্নয়ন আরো ত্বরান্বিত হবে। দুর্নীতি ভয়াবহতম পর্যায়ে পৌঁছেছে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বেপরোয়া দুর্নীতির লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরতে না পারলে উন্নয়নের সাফল্য ম্লান হয়ে যেতে পারে। কারণ দুর্নীতি প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সঙ্গে জনমতকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। তাই, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং দল ও সরকারের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের কথা চিন্তা করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

এস এম মারুফ: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :