বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যুযাত্রা কি শেষের পথে?

নাহিদ হাসান
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১.
কেপটাউন থেকে রিজাভিক, সিডনি থেকে সাও পাওলো- যে কোনো জায়গায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের এ রকম মৃত্যুযাত্রার আলোচনা কিউবা বিপ্লব বা ইরাকে মার্কিন আক্রমণের মতই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কথাগুলো বলেছেন অক্সফোর্ডের কৃতি অধ্যাপক টেরি ইগলটন।

সত্যই প্যারিস থেকে রংপুর কিংবা দিল্লি থেকে ঢাকা, সর্বত্রই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ কিছুদিন আগে উপাচার্যের অপমানে আত্মহত্যা করেছে, একজন শিক্ষার্থী ফেসবুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী লেখায় উপাচার্য তাকে ডেকে নিয়ে বাপ-মা তুলে গালিগালাজ করেছেন। মানে স্বয়ং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আজ প্রশ্নকে ভয় পাচ্ছে। মানে নিজে নিজের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত।

লাতিন universitas থেকে university তে আসার পথে যে অর্থ নিয়ে এসেছিল, সেগুলো হচ্ছে সমগ্র, যৌথ বা বিশ্ব। জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে তাই বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় সার্বিক জ্ঞান ও প্রচার কেন্দ্র। আর আইনিভাবে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় যে সার্বিক জ্ঞান উৎপাদন করবে, তা রাষ্ট্র, ধর্ম ও সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে হলেও তা প্রকাশযোগ্য।

বিশ শতকের গোড়ায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম, লিঙ্গ, অর্থনৈতিক বিষয়ে মত প্রকাশের কারণে অনেক শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করা হয়। তার প্রতিবাদ করার জন্য ১৯১৫ সালে জন হপকিন্সের উদ্যোগে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (AAUP) প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছরে এই শিক্ষক সমিতি একটি বিবৃতি প্রদান করে। যা Declaration of Principles নামে পরিচিত। ১৯৪০ সালে এটি আইনে পরিণত হয়। এতে বলা হয়, শিক্ষকগণ যে কোনো গবেষণালব্ধ ফল প্রকাশ করতে পারবেন। এমনকি তা সমাজ, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রবিরোধী হলেও। সেই বিষয়ে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে আলোচনা করতে পারবেন এবং সেই কারণে চাকুরিচ্যুত করা যাবে না। এই আইন পরে বিভিন্ন দেশে গৃহীত হয়। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে এই আইনের আংশিক গৃহীত হয়।

ইতিহাসে আমরা শিক্ষার্থীদেরও বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছি। সম্ভবত সেখান থেকেই ছাত্র সংসদের ধারণাটি এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, বেতন নির্ধারণ এবং চাকুরিচ্যুতির বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ছিল। ১১৫৮ সালে রোমান সম্রাট প্রথম ফ্রেডরিখ বারবাসা সাংবিধানিক রীতি নামে একটি আইন জারি করেন বোলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। যেখানে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষার্থীরা নগর আইনের আওতার অন্তর্ভুক্ত নয়। জ্ঞানের স্বাধীনতার জগতে এটিকে ম্যাগনাকার্টার সঙ্গে তুলনা করা হয়। তারপর এই আইনকে আরও বিকশিত করে বলা হয়, যে কোনো দেশ শিক্ষার্থীদের অবাধ বিচরণের অধিকার প্রদান করে। অবশ্য তারও আগে থেকে ভারতে ও বাংলায় এটি চালু ছিল।

১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনৈতিক সংগঠনে যোগদানের অধিকার দেয়া হয়। কিন্তু জ্ঞানতাত্ত্বিক কোনো স্বাধীনতা দেয়া হয় না। ভুল করে রাজনৈতিক স্বাধীনতাকেই আমরা জ্ঞানের স্বাধীনতা বলে ভেবেছি। তাই রাষ্ট্র, ধর্ম ও সামাজিক রীতির বিরুদ্ধে কোনো চিন্তা প্রকাশ করা যায় না। সেই স্বাধীনতা এখানে নেই। তার ওপর বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় আইয়ুব খানের ১৯৬৯ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশাসনের সমালোচনা করলে শিক্ষকদের চাকুরিচ্যুত করা হয়। ১৯৭৩ এর আইনে যেটুকু স্বাধীনতা ছিল, ২০০১ সালের ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সেইটুকুও নেই।

নতুন আইসিটি অ্যাক্টটি পড়লেই আমরা বুঝব কেন জ্ঞানের জগতে আমাদের ভাণ্ড শূন্য। সেখানে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইট বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ করেন বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার শঙ্কা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটা অপরাধ।

কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক ১০ বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

২.
সপ্তম শতকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন দুই হাজার আর শিক্ষার্থী ছিলেন ১০ হাজারের অধিক। কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, তুরস্ক থেকে শিক্ষার্থীরা আসতেন। রত্নসাগর, রত্নদধি ও রত্নরঞ্জক নামে তিনটি বিশাল গ্রন্থাগার ছিল। বলা হয়, রত্নদধি গ্রন্থাগারটি নয় তলা ছিল। ১০০ শ্রেণিকক্ষ, বিতর্ক ও সভার জন্য আলাদা ঘর, শিক্ষক-ছাত্রদের আবাসিক ব্যবস্থা ছিল। প্রায় একই অবস্থা ছিল সোমপুর, বিক্রমশীলা এবং ওদন্তপুরী মহাবিহারেও। আলেকজান্ডাট কানিংহাম ও জেমস ফার্গুনসনরাসহ সবাই এসবের ইট-পাথর নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের দরকার জ্ঞানজগত নিয়ে কথা বলা।

বড় বড় রাষ্ট্র বিপ্লবে প্রাতিষ্ঠানিক এইসব কেন্দ্রগুলো ধসে গেলেও ভারতীয়দের জ্ঞানচর্চা কখনও নেভেনি। এমনকি সেই জ্ঞানচর্চার অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে আবালবৃদ্ধবণিতা অংশীদার ছিলেন। কেমন করে ছিলেন? কেমন করে নতুন নতুন জ্ঞানের এখানে জন্ম ও বিকাশ ঘটল? ভারতে জৈনরা মনে করতেন, প্রতিটি তত্ত্বই আংশিক সত্যকে উপস্থাপন করে। অন্ধের হাতি দেখার মত। আর বৌদ্ধরা মনে করত, জগত ও জীবন সম্পর্কিত সব তত্ত্ব আংশিক সত্য নয়, বরং তা আপাত সত্য বা ব্যবহারিক সত্য।

এই যে সমাজের বিশাল একটি অংশের এই বৈপ্লবিক ধারণা পোষণ করা, এটিই নতুন জ্ঞান নির্মাণের রাস্তা। তাই নতুন জ্ঞান প্রকাশের আইনি ব্যবস্থা না থাকলে নতুন জ্ঞানের পথ হারিয়ে যাবেই।

তারই ধারাবাহিক ফল হিসেবে আজ যা দেখছি, তাই দেখতে থাকব। মানে বিশ্ববিদ্যালয় ট্রেনিং সেন্টার হয়ে উঠবে, জ্ঞান উৎপাদনকেন্দ্র হবে না। আমরা ট্রেনিং সেন্টার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় চাই, না তাকে মৃত ঘোষণা করতে চাই?

নাহিদ হাসান: রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি।

আপনার মতামত লিখুন :

এ সম্পর্কিত আরও খবর