পেঁয়াজের দোষ



এরশাদুল আলম প্রিন্স
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার পরের দিনই আমার এলাকার মুদি দোকানে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেলো লাফিয়ে লাফিয়ে। পেঁয়াজের দাম এখন কমতে শুরু করেছে বৈকি। ভারতীয় পেঁয়াজের দাম কমে এখন ৮০/৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ১০০/১১০ টাকায়ও পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। দেশি পেঁয়াজের দাম আরও বেশি।

পেঁয়াজ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড়। পেঁয়াজের বহুবিধ ব্যবহার তথা রেসিপি এখন ফেসবুক খুললেই পাওয়া যায়। ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে পেঁয়াজ নিয়ে কূটনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতির নানা তত্ত্ব।

পেঁয়াজ এখন ফেসবুকে ভাইরাল-
পথচারী নারীকে ছুড়ি দেখিয়ে ছিনতাইকারী বলছে, চেইন না, পেঁয়াজ দে!
মানিব্যাগে এখন টাকার বদলে পেঁয়াজ নিয়ে চলাচল করছে মানুষ।
সোনার চেয়েও দামী এখন পেঁয়াজ দিয়ে বানানো গয়না।
সামনে একটি পেঁয়াজ ঝুলিয়ে পান্তা খাওয়ার ছবিও ফেসবুকে ভাইরাল।
এদেশে এখন ছেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হলেও লাভ নাই, বাবার পেঁয়াজের আড়ত থাকলে বর হিসেবে সেই ছেলেরই বিয়ের বাজারে কদর বেশি।

শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেন, দেশের পত্রপত্রিকা ও অনলাইন মিডিয়াগুলোও পেঁয়াজ নিয়ে পিছিয়ে নেই। পেঁয়াজ ছাড়া মজাদার রান্নার গণ্ডাখানেক রেসিপি দিয়ে ঘরের মা-বোনদের বুঝ দিল তারা। দেশ এখন পেঁয়াজ ডাক্তার, পেঁয়াজ ব্যবসায়ী, পেঁয়াজ টকশোজীবী, পেঁয়াজ সাংবাদিক, পেঁয়াজ গবেষক তথা পেঁয়াজ বিশেষজ্ঞে সয়লাব।

এ দেশে জিনিসের দাম বাড়তে সময় লাগে না। অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট ঘোষণা দেয় একদিকে আরেক দিকে মোড়ের চায়ের দোকানে বিড়ি, পাউরুটির দাম বাড়ে। সৌদি আরবে তেলের দাম বাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে নীলফামারীর ফুয়েল পাম্পে তেলের দাম বেড়ে যায়। সৌদি আরবে তেলের দাম বাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা শহরের সিএনজি চালিত বাসের ভাড়াও বাড়ে (তেলে না চললেও বাড়ে)। আর সিএনজির দাম বাড়লে তো কথাই নেই। আর এই দেশে একবার কোনো জিনিসের দাম বাড়লে তা আর কোনোদিন কমে না। কাজেই, এ দেশে শুধু ব্রিটিশরাই আমাদের ওপর দুইশ' বছর জুলুম করেনি। আজ আমরা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করছি। যে যেভাবে পারছে একে অপরের ওপর জুলুম চালিয়ে যাচ্ছি। কেউ পেঁয়াজ দিয়ে, কেউ চাল দিয়ে, কেউ পর্দা দিয়ে, কেউ বালিশ দিয়ে। আমরা আম জনতাও জুলুম করছি শুধু নালিশ দিয়ে।

ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। তা করতেই পারে। পেঁয়াজ যার সিদ্ধান্ত তার। ভারত তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজার ঠিক রেখেই অন্য দেশে পেঁয়াজ রফতানি করবে এটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে মান-অভিমানের সম্পর্ক নাই। আপনার ইলিশ আপনি দেবেন কিনা সেটা আপনার ব্যাপার। পড়শি ইলিশ মাছ খেতে পারে না বলে আপনার দরদ থাকতেই পারে। আপনি পড়শিকে ইলিশ মাছ দিলেই আপনাকে তার গরুর মাংস দিতে হবে একথা কোথায় লেখা আছে? গৃহস্থ তার গরু আপনাকে দেবে না গোয়াল ঘরেই রেখে দেবে সেটা গরুর মালিকের সিদ্ধান্ত। এটা শুধু কথার কথা নয়। এটাই বাস্তব। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি চিন্তা করলেও এটিই সত্য। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তার কথা আমরা আজ ভুলে গেছি বলেই এত সমস্যা। কূটনৈতিক সমস্যা পেঁয়াজ, ইলিশ আর শাড়ি দিয়ে সমাধান হয় না। তা হলে ভারতের সঙ্গে আমাদের পানি সমস্যার সমাধান বহু আগেই হতো। কূটনীতি একটা কৌশল। চানক্যের নীতি বা কৌটিল্যের শাস্ত্রই আসল কূটনীতি। ম্যাকিয়াভেলির ‘প্রিন্স’ই আসল রাজনীতি। মুখে মুখে সবাই লাস্কি আর আব্রাহাম লিঙ্কন, আসলে সবাই ম্যাকিয়াভেলি আর কৌটিল্যেরই ভক্ত।

কিন্তু কূটনীতি যা-ই হোক, আবদার বলতে তো একটা কথা আছে। আমরা বঙ্গসন্তানরা সবকিছুই আবদার দিয়ে সমাধান করতে চাই। তাই রাষ্ট্রের স্বার্থ, কূটনীতি, পররাষ্ট্রনীতিকেও মান অভিমানের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছি।

মাত্র সপ্তাহ খানেক পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রেখেছে ভারত। তাতেই ঘরে ঘরে বিবিদের হাপিত্যেশ। কিন্তু আমরা যে শুনেছি, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ সে কথা কি তবে মিথ্যা? শুনেছি, বাংলাদেশ খাদ্যে উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই না, বিদেশেও নাকি রফতানি করে। অথচ, ভারত থেকে শুধু পেঁয়াজ না, ক'দিন চাল আমদানি না করলে চালের দামও বেড়ে যায় হু হু করে।

তবে, আমরাও এক হাত নিয়েছি। কয়েক বছর কোরবানির গরু দেয়নি ভারত। ভেবেছিল আমরা বুঝি গরুর অভাবে কোরবানি দিতে পারব না। কিন্তু দেশ এখন গরু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। গরুর জন্য আর ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না আমাদের। আহা, এভাবে একদিন যদি আমরা পেঁয়াজ ও চালেও স্বনির্ভর হতে পারতাম!

একটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশকেই বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশকে অবশ্যই খাদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। এ কথা সত্য, কোনো দেশই পুরোপুরি স্বনির্ভর না। কিন্তু প্রাথমিক ধাক্কা সামলানোর মতো স্বনির্ভরতা না থাকা ভালো কথা নয়। দুই দিন পেঁয়াজ না এলে যদি বাজার চড়া হয় তবে বুঝতে হবে হয় মজুদ নেই না হলে বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। এখনই স্বনির্ভর না হলে ভবিষ্যতে হয়তো আরও বড় কোনো সংকটের মুখোমুখি হতে পারি আমরা। সেটি সামলানোর মতো সক্ষমতা আমাদের আছে কি? মৌলিক খাদ্য তালিকায় পেঁয়াজ না থাকলেও আমাদের চলে, কিন্তু চাল, ডাল ছাড়া ২০ কোটি মানুষের পক্ষে ক'দিন টিকে থাকা সম্ভব?

বাংলাদেশ যতদিন পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হবে ততদিন ভারতের ওপরই নির্ভর করতে হবে। কারণ, ভারত ছাড়া পেঁয়াজ রফতানি করে তুরস্ক, মিশর, মিয়ানমার আর চীন। ঠেকা চালানোর জন্য মিয়ানমারের কাছ থেকে পেঁয়াজ আনা যায়, কিন্তু ওদের সঙ্গে আমাদের স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কই যেখানে ভালো নেই, সেক্ষেত্রে পেঁয়াজ আমদানি করা তো পরের কথা। মিশর অথবা তুরস্ক থেকে যদি পেঁয়াজ আনতে হয় সে পেঁয়াজের ঝাঁজ (দাম) যে আরো বেশি হবে তাতে আর সন্দেহ কী?

পেঁয়াজ আসলে একটি মসলা জাতীয় শস্য। পেঁয়াজের অতি ব্যবহারের জন্য আমাদের খ্যাতি আছে। পেঁয়াজযোগে রান্না সুস্বাদু হয়। তাই এক কেজি গোমাংসে আধা কেজি পেঁয়াজ না দিলে আমাদের চলে না।

হালে পেঁয়াজ নিয়ে কথকতার শেষ নেই। কিন্তু পেঁয়াজ আর ফাঁকা মানিব্যাগের মধ্যে সময়ের সবচেয়ে বড় মিল হচ্ছে, পেঁয়াজ ছুললে চোখে পানি আসে, ফাঁকা মানিব্যাগ খুললেও চোখে পানি আসে। পেঁয়াজ ছুললেও চোখে পানি, কিনলেও চোখে পানি।

পেঁয়াজ নিয়ে কৌতুকের অভাব নেই। আমাদের পেঁয়াজের দোষ আছে তাতো সর্বজন স্বীকৃত। আমাদের দেশে ব্রাহ্মণরাও পেঁয়াজ খায়। এমনই এক ব্রাহ্মণ পাত্রীর জন্য ব্রাহ্মণ পাত্র খোঁজা হচ্ছে। পাত্রীর বাবা ঘটককে জিজ্ঞাসা করলেন, ছেলেটি কেমন? ঘটক: ছেলে খুব ভালো, এই মাঝে মাঝে একটু পেঁয়াজ খায়! বাবা: বলেন কী? ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে পেঁয়াজ খায়! ঘটক: আরে না না, ছেলে খুব ভালো। সে তো প্রতিদিন খায় না, ঐ যেদিন গরুর মাংস খায় সেদিনই একটু পেঁয়াজ খায়! বাবা: বলেন কী? ব্রাহ্মণের ছেলে আবার গরুও খায়! ঘটক: আরে না না, ও ছেলে খুব ভালো। সে তো গরুর মাংস প্রতিদিন খায় না, ঐ যেদিন মদ-টদ খায়, সেদিনই একটু আধটু গরু খায়। ছেলে খুব ভালো! বাবা: সে কী? আবার মদও খায়? ঘটক: আরে না না, ও ছেলে খুব ভালো। সে তো প্রতিদিন মদ খায় না, ঐ যেদিন পাশের গলিতে... যায়, সেদিনই একটু মদ খায়। ও ছেলে খুব ভালো। আপনার মেয়ে দিতে কোন অসুবিধা নেই তো?

যে পেঁয়াজ কিনতে গেলেও চোখে পানি, ছুলতে গেলেও চোখে পানি, তারপরও সে পেঁয়াজই আমাদের খেতে হয়। দোষ কি তবে পেঁয়াজের না আমাদের? নাকি আমাদেরই ‘পেঁয়াজের দোষ’?