বিশ্ব শিক্ষক দিবস এবং বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

মাছুম বিল্লাহ
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের সব শিক্ষকের অবদান স্মরণ করার জন্য জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কোর ডাকে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়ে থাকে। ১৯৯৪ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

এ বছর (২০১৯) দিবসটির স্লোগান হচ্ছে ‘Young Teachers: The future of the Profession’। এটিকে কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। শিক্ষকতায় নতুনদের আগমন এবং তাদের জন্য ক্যারিয়ার পাথ তৈরিকরণ। আবার এভাবেও বলা যেতে পারে যে তরুণরাই শিক্ষকতায় প্রবেশ করবেন, তারাই এ পেশাকে পেশাগত মর্যাদায় উন্নীত করবেন। এটি এ কারণেই নির্ধারণ করা হয়েছে যে শিক্ষকতা পেশায় এখন তরুণরা, বিশেষ করে মেধাবীরা আসছেন না। আবার কোনো কারণে কেউ এলেও তাড়াতাড়ি চাকরি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। দু-চারটি ব্যতিক্রমী দেশ ছাড়া বিশ্বের সর্বত্রই-ধনী, দরিদ্র, অতি দরিদ্র--- প্রায় একই চিত্র।

মেধাবীদের এ পেশায় ধরে রাখা যাচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা একজন শিক্ষার্থী ৩৪তম বিসিএসের ক্যাডার পদে উত্তীর্ণ না হয়ে নন-ক্যাডার দ্বিতীয় শ্রেণিতে গাইবান্ধার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি মনপ্রাণ দিয়ে কাজ শুরু করেন। স্কুলের উন্নতি সবার চোখে পড়ার মতো। কারণ একজন মেধাবীর মেধার স্বাক্ষর সব জায়গাতেই পড়ে। কিন্তু ছয় মাস পর তিনি জানতে পারেন, তিনি যে পদে যোগদান করেছেন, সে পদেই তার চাকরি শেষ করতে হবে। যুবকটি তার সব উদ্যম হারিয়ে চুপসে গেলেন মানসিকভাবে, হাতাশায় ছেয়ে গেল তার চারদিকে।

এভাবে কিছু দিন পার করে তিনি চাকরিটা ছেড়ে দেন এবং একটি সরকারি ব্যাংকের দ্বিতীয় শ্রেণির পদে যোগদান করেন। তিনি তার মতামত প্রকাশ করে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চেয়ে তিনি এ পদেই বেশি সন্তষ্ট। শুধু তিনি নন, ৩৪তম ও ৩৬তম নন-ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া শতাধিক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

একইভাবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যারা চাকরি শুরু করেন, শুরুর পর থেকেই চাকরি ছাড়ার চিন্তায় থাকেন। তার মূল কারণ হচ্ছে তাদের সামনে কোনো ক্যারিয়ার পাথ নেই।

আমাদের দেশে এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা সোয়া চার লাখ। প্রায় লাট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য ২৭টি ক্যাডার সার্ভিস থাকলেও সোয়া চার লাখ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য কোনো ক্যাডার সার্ভিস নেই। আর ক্যাডার পদ না থাকায় তেমন কোনো পদোন্নতিরও সুযোগ নেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষায় আসছেন না।

প্রতি উপজেলায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, উপজেলা মৎস কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আছেন। তারা নবম গ্রেডে চাকরি শুরু করলেও কিছু দিনের মধ্যে ষষ্ঠ গ্রেডে চলে যান। এগুলো অবশ্যই প্রশংনীয় উদ্যোগ। কিন্তু দেশের মানবসম্পদ যারা তৈরি করছেন, দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক শিশুদের যারা লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের জন্য কোনো ক্যাডার থাকবে না কেন? এটি একটি বিস্ময়ের বিষয়।

প্রাথমিক শিক্ষায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা, ইনস্ট্রাকটর ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি করেন। আর সহকারী শিক্ষকরা এখনও তৃতীয় শ্রেণির। প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণির হলেও তারা এখনো ১১তম গ্রেডে চাকির করেন। প্রধান শিক্ষকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত পদমর্যাদা ও বেতনক্রম পেলেও সহকারী শিক্ষকদের চাওয়া পূরণ হচ্ছে না। তারাও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়ে থাকতে চান না। তারা চান দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা ও ১১ তম গ্রেডে বেতন।

স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে থাকার কথা ছিল এলাকার প্রকৃত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষিত ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গ। তাদের অংশগ্রহণ শিক্ষা কার্যক্রমকে তরান্বিত করবে, উন্নত করবে। কমিউনিটির সরাসরি অংশগ্রহণে শিক্ষা কার্যক্রম হবে আরও বেগবান, বাস্তবধর্মী ও অংশগ্রহণমূলক। তাদের সহযোগিতায় এক নতুন শিক্ষাবন্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হবে, শিক্ষকরা তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। তাদের এলাকার প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য তারা থাকবেন নিবেদিতপ্রাণ। এসব উদ্দেশেই স্থানীয় জনসাধারণের সম্পৃক্ত থাকতে হয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু হয়েছে পুরো উল্টো (দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া)।

তাই বহুদিন যাবত সরকার চেষ্টা করছে, এখানে কিছু একটা করার। কারণ শিক্ষার মান তলানীতে গিয়ে যে পড়েছে, তার কয়েকটি কারণের মধ্যে এটি হচ্ছে মুখ্য একটি কারণ।

এখন এনটিআরসি শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে এসব কমিটি কোনোভাবেই ভালো মনে করে না, তবে আমরা ভালো মনে করি, শিক্ষিত সমাজ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। এনটিআরসি নয়, প্রয়োজন আলাদা শিক্ষা কমিশন গঠন করা।

২০১০ সালের পর কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়নি। অথচ এ সময়ের মধ্যে দেশে সাত হাজারেরও অধিক বেসরকারি মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়েছে। ২০১০ সালের পূর্বে একাডেমিক স্বীকৃতি পাওয়া ননএমপিও প্রতিষ্ঠানও আছে প্রায় তিন হাজার। সব মিলিয়ে ১০ হাজারেরও বেশি সরকার স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান আছে। এগুলো এমপিও পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুণছে।

বেসরকারি হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তি থাকতে পারবেন না আর শিক্ষকদের অর্থনৈতিক চিন্তায় দিনযাপন করতে না হয় সে ব্যবস্থা সরকারকে নিতে হবে। ব্যবস্থাপনা কমিটিতে থাকবেন সরকারি কর্মকর্তা ও দু-একজন প্রকৃত বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি।

শিক্ষকদের যেমন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকতে হবে, তেমনি শিক্ষার মানের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপোস করা যাবে না। বেসরকারি শিক্ষকরা চান অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন আচরণ ও শিক্ষার মান উন্নীতকরণ। সরকার শিক্ষকদের এসব চাহিদা পূরণ করলে শিক্ষার মানের ওপর ধণাত্মক প্রভাব পড়বে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

যে কোনো পর্যায়ের শিক্ষকদেরই সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে হবে। সেজন্য শিক্ষকদের নিজেদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ দায়িত্ব যত সঠিকভাবে পালিত হবে, সমাজ ও দেশও সেভাবে পরিচালিত হবে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেল্টা)

 

আপনার মতামত লিখুন :