শিক্ষাঙ্গনে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর. কম
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মেরি শেলি রচিত উপন্যাস 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইন: অর দ্য মর্ডান প্রমিথিউস' বহুল পঠিত ও জগদ্বিখ্যাত। এক জার্মান বিজ্ঞানির সৃষ্ট দানবের ঘটনা নিয়ে আবর্তিত উপন্যাসের বীভৎস কাহিনি ও করুণ পরিণত সকলের জানা।  

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে বার বার এমন দানবের ভয়ঙ্কর পদধ্বনি শোনা গেছে। সর্বশেষ শোনা গেলো, বুয়েটে, আবরার হত্যাকাণ্ডের সময়।

পাকিস্তান আমলে স্বৈরাচারী আয়ুব-মোনেম চক্র শিক্ষাঙ্গনে সদলবলে পাঁচপাত্তুকে নামায়। সাপ হাতে সরকারি দল এনএসএফ'র দানবগণ রক্তপাত ও সন্ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করে। শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সমাজ এইসব সন্ত্রাসী-হন্তারক ও তাদের প্রভুদের উৎখাত করে।

স্বাধীনতার পর সরকারি দলের ক্ষমতাকে পুঁজি করে শুরু হয় সন্ত্রাস, যার পরিণতি ছিল শোচনীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে কোহিনূর ও সাত জনের রক্তে মিশে আছে সেসব ইতিকথা।

আরও পরে, শিক্ষাঙ্গনে বাবলু, অভি, পাগলা শহিদ ইত্যাকার বহু দানবীয় চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে, যাদের শেষ পরিণতি ছিল করুণ ও মর্মন্তুদ।

আরও পড়ুন: আবরার হত্যায় জিয়নের শাস্তি চান রংপুরবাসী

পরিতাপের বিষয় হলো, হন্তারক-দানবদের নিকৃষ্ট পরিসমাপ্তি থেকে কেউ শিক্ষা নেয় নি। ক্ষমতা ও সুযোগ পেলেই সাপের মতো ফুঁসে উঠেছে। সহপাঠীদের হত্যা ও নির্যাতন করেছে। টেন্ডারের টাকা, মদ ও রক্তের উন্মত্ততায় ভেসে গেছে একদার মেধাবী তরুণের মুখচ্ছবি। বদলে তারা পেয়েছে হন্তারকের বদনাম ও মানুষের ঘৃণা। বুয়েটের আবরার হত্যায় জড়িতদের সম্পর্কে তেমনই তথ্য উন্মোচিত হয়েছে বার্তাটোয়েন্টিফোর'র অনুসন্ধানে।                     

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবরূপী হত্যাকারী কে বা কারা তৈরি করে? নাকি পরিবেশ ও পরিস্থিতির কুফলে মেধাবী, ভদ্র, সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য দানব বনে যায়? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জাতির প্রতিটি সদস্য জানতে চায়।

মানুষ এমন দানব তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ হোক, সেটাই কামনা করে। ছাত্রের পরিচিতির ছদ্মাবরণে হত্যাকারী, দানব, টেন্ডারবাজ, মদ্যপ, ধর্ষক শিক্ষাঙ্গনে দাপিয়ে বেড়াবে, এমনটি কেউই চান না। সমগ্র ছাত্রসমাজ এবং দেশবাসী এসব দাবি ও প্রত্যাশায় উচ্চকিত।

আশার কথা হলো, সরকারের শীর্ষতম অবস্থান থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে নির্দেশ এসেছে। দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষাঙ্গনে অবস্থানরত সন্ত্রাসী ও বিপথগামীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গৃহীত হচ্ছে। জ্ঞান, মেধা ও যোগ্যতা ভিত্তিক একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপযুক্ত মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সমাজের এইসব আগাছা ও হানিকরদের উৎপাটন জরুরি। সভ্য, সুন্দর, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষাঙ্গনে অবস্থানরত ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব চক্রকে নিধন ও নির্মূল করা অপরিহার্য।

বুয়েটে নির্মমতা ও নৃশংসতায় প্রাণ হারিয়ে আবরার বাংলাদেশে শুদ্ধতম শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠার লেলিহান শিখা প্রজ্জ্বলিত করেছেন। বাংলাদেশের  শিক্ষাঙ্গনে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব মুক্ত করার অনির্বাণ মশাল জ্বালিয়েছেন আবরার। আবরারের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। আলোকিত ও শুভ্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শাশ্বত সংগ্রামের চিরন্তন অংশ হয়ে প্রতিটি মানুষের অন্তরে আছেন তিনি।  

আরও পড়ুন:আবরার হত্যাকাণ্ড: আসামি জেমির বাবা-মা কারও সঙ্গে কথা বলছেন না

আপনার মতামত লিখুন :