অথঃ উপাচার্য সমাচার!

ড. মাহফুজ পারভেজ
ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে বিরাজমান নানাবিধ সমস্যা, সংকট, নিরাপত্তাহীনতার ইস্যুতে উপাচার্যগণের কার্যক্রমের বেশ কিছু সমালোচনা সামনে চলে এসেছে। এমন কিছু কথা ও আচরণ তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা উপাচার্যের মতো দায়িত্বশীল পদের জন্য বেমানান। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থের বদলে তাদের কেউ কেউ আত্মস্বার্থের কাছে নিজেকে বিসর্জন দিচ্ছেন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারে পরিণত হচ্ছেন যেন কোনো কোনো উপাচার্য। শিক্ষাঙ্গনের শান্তি আর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নয়, নিজের পদ আঁকড়ে থাকা ও আখের গোছানোই যেন এখন কোনো কোনো উপাচার্যের প্রধান কাজ। ক্যাম্পাস জাহান্নামে যাক, আমি টিকে থাকলেই হলো, এমনই তাদের মনোভাব।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাসের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনার কারণে উপাচার্যগণ তোপের মুখেও পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসাবে তাদের দায়িত্ব পালনের শৈথিল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভয়ঙ্কর নানা ঘটনা ক্যাম্পাসে ঘটলেও তারা থাকছেন নির্বিকার। কখনো পাওয়া যাচ্ছে তাদের সংশ্লিষ্টতা ও ইন্ধন।

যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে উপাচার্যদের প্রসঙ্গে, তার মধ্যে চরম দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগবাণিজ্য, কর্তব্যে অবহেলা, ক্যাম্পাসে না যাওয়া, নানাবিধ অনিয়মের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। কোথাও কোথাও চলছে উপাচার্যের পক্ষ ও বিপক্ষের স্নায়ুযুদ্ধ। জাহাঙ্গীরনগরের পরিস্থিতি বেশ বিগড়ে গেছে। সেখানে মনে হয় প্রকাশ্যে লড়াই চলছে। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে, সব কিছু বাদ দিয়ে উপাচার্যকে রাখা বা না-রাখা একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে উপাচার্যের পদ গ্রহণ করা যত না সম্মানের, তারচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আত্মসম্মান ও মর্যাদা রক্ষার তাগিদে একাডেমিক ও নীতিনিষ্ঠ শিক্ষকগণ উপাচার্য হওয়ায় আগ্রহী নন। উপাচার্যের পদের অবক্ষয় ও পতনের চিত্র সকলের কাছেই স্পষ্ট।

এমতাবস্থায় অতি রাজনৈতিক ও অতি উৎসাহী অনেকেই উপাচার্য হওয়ার জন্য পরম আগ্রহী। অর্থ, তেল, হাত, পা ধরে উপাচার্য হতেও অনেকে পিছপা নন। ফলে অত্যন্ত সম্মানজনক উপাচার্য পদটি আর আগের মতো উজ্জ্বল নেই।

নানা কসরতের মাধ্যমে যারা উপাচার্য হচ্ছেন, তাদের কাজকারবার কেমন হবে তা বলাই বাহুল্য। এ ব্যাপারে যত কম বলা যায়, ততই ভালো। তবুও বলাবলি আর লেখালেখি তো থেমে থাকে না। সজাগ মিডিয়াও চুপ থাকে না। ভয়ঙ্কর সব ব্যক্তিগত, আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক স্খলনের বিরাট বিরাট ফিরিস্তি বের হচ্ছে তাদের সম্পর্কে।

বহু আগে, লেখক আহমদ ছফা উপাচার্যের হালহকিকত নিয়ে 'গাভি বৃত্তান্ত' নামে উপন্যাস রচনা করেছিলেন। দিনে দিনে বছরে বছরে সে কাহিনী শুধু গাভিতে সীমাবদ্ধ নেই। তা এখন চোর বৃত্তান্ত, আত্মীয়তা বৃত্তান্ত, স্বৈরতান্ত্রিক বৃত্তান্ত, লীলা-লাস্যের বৃত্তান্তে পরিণত হয়েছে।

মাছের মাথা, সমাজের মাথা, প্রতিষ্ঠানের মাথা খুবই নাজুক। এখানেই পচন ধরে সবচেয়ে আগে। আর মাথায় পচন ধরলে মোটেও রক্ষা নেই। পতন ও বিনাশ অনিবার্য। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাথা স্বরূপ উপাচার্যের কাজেকর্মে পচন ধরলে উদ্বিগ্ন হওয়াই স্বাভাবিক।

শুধু বিনাশ ও পতন নয়, ভয়ানক দুর্গন্ধ ও বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয় পচন থেকে। পচা মাছের গন্ধের সঙ্গে যারা পরিচিত কিংবা পচা মাছ খেয়ে পেটের পীড়ার মারাত্মক অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে, তারা তা জানেন। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় যে ভয়াবহ অধঃপতন, ধস, নৈরাজ্য, নিরাপত্তাহীতার আভাস মাঝে মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে, তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চস্তরের পচনের সম্পর্ককে অবহেলা বা অবজ্ঞা করা যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশ, সমাজ ও সরকারের জন্য অত্যন্ত নাজুক ও স্পর্শকাতর জায়গা। সেখানে অচলাবস্থা ও অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হলে তা সবাইকে তাড়িত ও বিব্রত করে। ফলে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কড়া নজর দিতে হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাথা থেকে পা পর্যন্ত তল্লাশি করে ক্ষতিকর ব্যক্তি ও উপাদানগুলোকে টেনে বের করতে হবে। নইলে বার বার সংকট সৃষ্টি হতেই থাকবে।

 

ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর
বার্তাটোয়েন্টিফোর. কম, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :