ইন্দিরা: নিঃসঙ্গতা থেকে রাজনীতির শীর্ষে

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ইন্দিরা গান্ধী, ছবি: সংগৃহীত

ইন্দিরা গান্ধী, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাল ১৯১৭। ১৯ নভেম্বর। রাত ১১:১১ মিনিট। ব্রিটিশ ভারতের উত্তর প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর এলাহাবাদে জন্ম নেয় এক কন্যা শিশু। জন্মের অক্ষাংশ ২৫ ডিগ্রি ২৮ মিনিট। দ্রাঘিমাংশ ৮১ ডিগ্রি ৫২ মিনিট। লাহিড়ী অয়নাংশে ভোগ্য দশায় (balance of dasha) জন্ম নেয়া শিশু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও নেতৃস্থানীয় স্বাধীনতার সংগ্রামী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ও কমলা নেহেরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরা গান্ধী।

নিঃসঙ্গ বালিকা থেকে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শীর্ষে আরোহণ করে ইন্দিরা ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর দিল্লির সফদরজং রোডের বাড়ির লনে দেহরক্ষীর বুলেটে রক্তাক্ত হয়ে প্রাণ হারান। দিল্লির শান্তিবনের সবুজে আচ্ছাদিত সমাধিস্থলে শেষ ঘুমে থেকেও তিনি ভারতের রাজনীতির এক অপরিহার্য চরিত্র।

রবীন্দ্রনাথ যে ইন্দিরার নাম দেন প্রিয়দর্শিনী, তিনি ভারতের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র মহিলা সরকার প্রধান, প্রধানমন্ত্রী। ভারতের রাজনীতির পরিবারতন্ত্রের স্তম্ভ হয়ে শক্তিশালী অবস্থানে এখনো তিনি সমুজ্জ্বল।

ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী (১৯ নভেম্বর, ১৯১৭-৩১ অক্টোবর, ১৯৮৪)-এর জীবন সাধারণ খাতে বয়ে চলা আর-পাঁচটা শিশু-কিশোরের মতো সহজ-সরল নয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, পরিবার-পরিজন দেশের স্বাধীনতা-আন্দোলনে ডুবে রয়েছেন। মা অসুস্থ। বাবা বাড়িতে আসেন খুবই কম। বাবা থাকেন কখনও জেলে, কখনও দেশ বা দলের কাজে দেশের অন্য কোথাও।

এমনি এক নিঃসঙ্গ কন্যার একেলা বেড়ে ওঠার মধ্যেই জীবনকে জয় করেন তিনি। জীবনকে প্রসারিত করেন জনতার দরবারের লোকারণ্য থেকে ক্ষমতার উচ্চতর স্তরে। চরম একাকীত্ব ও পারিপার্শ্বিক-রাজনৈতিক বিরূপতার মধ্যেও প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের শিল্প, শিক্ষা আর সংস্কৃতিতে বড় হয়ে ওঠেন ইন্দিরা।

প্রথাগত স্কুলিং তাঁর হয় নি। কিশোর বয়সে ‘চরকা সংঘ’, ‘বানর সেনা’ দলের হয়ে কাজ করেছেন পরাধীন দেশের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্যে। পরিবার, আত্মীয়-পরিজন, বড় হয়ে ওঠা, সব কিছুই ইন্দিরা দেখেছিলেন একা একা। দেশ আর মানুষ ছিল তাঁর পরিবার ও পরিমণ্ডলের ধ্যান-জ্ঞান। কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক দলটি ছিল তাঁর পরিবারের লোকজনের কাছে নিঃশ্বাসের মতো। তিনিও তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।

মহাত্মা গান্ধীর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগদান করার জন্য জওহরলালকে প্রায়ই বাড়ীর বাইরে কাটাতে হত বা জেল খাটতে হত। মা ছিলেন যক্ষ্মা রোগে শয্যাশায়ী। ছোটবেলা ইন্দিরা গান্ধী মানসিক ভাবে খুবই একাকীত্বের শিকার হয়েছেন এবং স্কুলের পড়াশোনায় মাঝে মাঝেই ছেদ পড়েছে। ১৯৩৪ সাল থেকে ১৯৩৫ অবধি তিনি পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেন।

তারপর১৯৩৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সুইজারল্যান্ডে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মা কমলা নেহেরুর মৃত্যু ঘটে। জওহরলাল ইন্দিরাকে কোনও ব্রিটিশ স্কুলে পড়াতে রাজী ছিলেন না। তথাপি ১৯৩৭ সালে ইন্দিরা Oxford University-র Somerville College-এ ভর্তি হন। বাবার সঙ্গে নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে ছোটবেলা থেকেই ইন্দিরার রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে ওঠে।

কিন্তু কে জানতো, যে কংগ্রেস দলের সভাপতি ছিলেন তাঁর পিতামহ মতিলাল নেহেরু এবং পিতা জওহরলাল নেহেরু, সে দলেরই পরবর্তী কালের সভানেত্রীত্ব পালন করতে হবে তাঁকে। শুধু কি তাই? ভবিষ্যতে তাঁর পুত্র রাজিব, বিদেশি পুত্রবধূ সোনিয়া, পৌত্র রাহুল ও প্রিয়াংকাকে পর্যন্ত কংগ্রেসের চালিকা শক্তি হতে হবে তাঁরই জন্মশতবর্ষের মধ্যেই?

তিনি তো নয়ই, চরম ভবিষ্যতদ্রষ্টার পক্ষেও কল্পনা করা অসম্ভব ছিল যে, ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে নেহেরু-ইন্দিরা পরিবার পাঁচ প্রজন্ম নেতৃত্ব দেবে! ইতিহাস কিন্তু এভাবেই লিপিবদ্ধ হয়েছে।

ইন্দিরা গান্ধির রাজনৈতিক জীবনে স্পষ্ট হয়ে আছে সাফল্য ও ব্যর্থতার কয়েকটি অমোচনীয় অর্জন: নেহেরু মৃত্যু-পরবর্তী কংগ্রেসে নেতৃত্বদান ও পুনরুজ্জীবন সাধন; বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান; জরুরি অবস্থা জারির দুর্নাম; সাতদিনের জেলবাস; ক্ষমতা হারানো; ক্ষমতা ফিরে পাওয়া; গরিবি হটাও স্লোগান ও কর্মসূচি চালু; ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ; অপারেশন ব্লু স্টার; শিখ সম্প্রদায়কে বিক্ষুব্ধ করা এবং শেষে নিজের শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে মৃত্যু।

ইন্দিরার রাজনৈতিক জীবনে ঘাত-প্রতিঘাতের কোনও অভাব নেই। অভাব নেই ব্যক্তিগত জীবনেও: পরিবার ও সম্প্রদায়ের বাইরের অগ্নি উপাসক পার্শি সম্প্রদায়ের ফিরোজ নামের একজনের সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে, কনিষ্ঠ পুত্রের মৃত্যু, কনিষ্ঠ-পুত্রবধূর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি উত্তাল জীবনের ভেতরও ছিলেন পোড়-খাওয়া, ব্যথিত ও নিঃসঙ্গ। তথাপি অনড়। সাহসী। লড়াকু। লক্ষ্যে পৌছাতে অবিচল। শত বিরূপতার মধ্যেও সাফল্য তার ললাট চুম্বন করেছে। তিনি কষ্টের সমুদ্র বেয়ে এনেছেন অর্জনের মণিমাণিক্য।

ইন্দিরা গান্ধির জীবন ও কর্ম নিয়ে রচিত গ্রন্থের সংখ্যাও মোটেই কম নয়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটির মধ্যে প্রথমে আসে পরিমল দে প্রণীত ‘ইন্দিরা গান্ধি: প্রয়াগ থেকে শান্তিবন’। বইটি বাংলা ভাষায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন এ কারণে যে, বাংলায় ইন্দিরা গান্ধিকে নিয়ে বহুল প্রচলিত ও প্রচারিত যে বইগুলো রয়েছে, সেগুলো এক-একটা সময় ধরে লেখা বা তাঁর জীবনের ঘটনা সম্পর্কে খোদ ইন্দিরার বয়ান।

বরুণ সেনগুপ্ত রচিত ‘ইন্দিরা একাদশী’ বইয়ে ইন্দিরার প্রথম এগারো বছরের প্রধানমন্ত্রীত্ব কালকে ধরা হয়েছে। শুরু হয়েছে ভুবনেশ্বরে পিতা জওহরলালের অসুস্থ হওয়ার দিনে। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরার ক্ষমতা হারানো দিয়ে তা শেষ শেষ হয়।

নিমাইসাধন বসু প্রণীত ‘আমি: ইন্দিরা গান্ধী’ বইটি মোটামুটি ইন্দিরার বয়ানে তাঁর জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে। সাক্ষাৎকারভিত্তিক সেই বইয়ে ইন্দিরার নিজের মত প্রকাশ পেয়েছে তাঁরই ভাষ্যে।

নিখিল সেনের ‘ইন্দিরা দূরদর্শিনী’ শেষ হয়েছে ১৯৮০ সালে এসে। সেখানেও খাপছাড়াভাবে ইন্দিরার জীবনকে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

সরাসরি ইন্দিরা বিষয়ক গ্রন্থের বাইরে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আত্মকথা ও স্মৃতিচারণায় ইন্দিরার নানা প্রসঙ্গ ও মূল্যায়ন স্থান পেয়েছে। যদিও বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও তৎকালীন রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য, তথাপি ইংরেজি বা বাংলা ভাষায় ইন্দিরার কোনও জীবনী বা মূল্যায়ন কিংবা ইন্দিরা বিষয়ক গবেষণা বাংলাদেশে লেখা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।

ইংরেজিতে ইন্দিরাকে নিয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ বের হয়। যার মধ্যে Indira: India’s Most Powerful Prime Minister by Sagarika Ghose, Delhi: Juggernaut, 2017, Indira Gandhi: A Life in Nature by Jairam Ramesh, Delhi: Simon and Schuster, 2017, India’s Indira, A Centennial Tribute Anand Sharma (editor), New Delhi: Academic Foundation for the Indian National Congress, 2017 অন্যতম।

ইন্দিরা মৃত্যুর গর্ভ থেকে নিজের দলকে পুনরুজ্জীবন দান করেন এবং বংশ-পরম্পরায় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার মতো শক্তি ও সংহতির পথ দেখান এবং দল ও রাজনীতির জন্য নিজের জীবনকেও বিপন্ন করেন। ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে সাফল্য ও বেদনার আখরে লিপিবদ্ধ থাকবেন তিনি। তিনি স্মরণের আলোয় মৃত্যুদিনের পরও থাকবেন আলোকোজ্জ্বল।

আপনার মতামত লিখুন :