জেল হত্যাকাণ্ড: কুশীলব যারা

শুভ কিবরিয়া
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসে কুখ্যাত ঘটনাগুলির অন্যতম হচ্ছে জেল হত্যাকাণ্ড। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দী আওয়ামী লীগের শীর্ষ চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এই এইচ এম কামরুজ্জামানকে হত্যা করে এক পৈশাচিক ও বর্বর ইতিহাসের সূচনা করে তৎকালীন সরকার।

ক্ষমতাসীন সর্বোচ্চ ব্যক্তির নির্দেশে, একদল সামরিক অফিসারের ব্যবস্থাপনায়, সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের একদল কুচক্রির জ্ঞাতসারে, জেলখানা কর্তৃপক্ষের সরাসরি আয়োজনে একদল খুনি অস্ত্র নিয়ে জেলখানায় ঢোকে এবং কোনো বাধা ছাড়াই বন্দী জাতীয় চার নেতাকে খুন করে নির্বিঘ্নে বের হয়ে আসে। এরকম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসেও বিরল।

কুখ্যাত জেল হত্যাকাণ্ডের বিষয়ের একজন গবেষক সিমিন হোসেন রিমি, যার পিতা এই হত্যাকাণ্ডের একজন ভিক্টিম, পরবর্তীতে এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘কত সহজে বলতে গেলে একেবারে বিনা বাধায়, খুনিরা অস্ত্রসহ জেলের ভেতরে ঢুকে চারজন মানুষকে গুলি করে হত্যা করল, আর মাত্র কয়েক গজ দুরে দাঁড়িয়ে জেল কর্তৃপক্ষ হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করল- এই বিষয়টি মনে মনে আমাকে প্রচণ্ড বিচলিত করেছে। টেলিফোনে একজন বলল, আমি রাষ্ট্রপতি, অস্ত্রধারিরা যা করতে চায় তাদেরকে তাই করতে দাও, অর্থাৎ হত্যা করতে দাও। আর জেল কর্তৃপক্ষ সুরক্ষিত কারাগারের ভেতরে খুনিদের ঢুকতে দিয়ে হত্যা করতে দিল। জেল কর্তৃপক্ষের এই দায়িত্বহীনতা, কাপুরুষ ভীরু আচরণ আমাকে হতবাক করেছে।’ 

০২.

আজ ইতিহাসের পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয় এই জেল হত্যাকাণ্ড দীর্ঘদিনের পরিকল্পনারই অংশ ছিল। এই হত্যাকাণ্ডে যাদের হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের তৎকালীন মন্ত্রীসভার সদস্য। শুধু তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন মন্ত্রীসভার বাইরে। ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করতে হয় তাজউদ্দীন আহমদকে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাকশাল গঠিত হলে তার কেন্দ্রীয় কমিটির কোথাও ছিলেন না তাজউদ্দীন আহমদ। যখন এই হত্যাকাণ্ড ঘটে তখন তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন শুধুমাত্র একজন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের একজন সাধারণ সদস্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর প্রধানমন্ত্রীত্বে গঠিত সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের হত্যাকাণ্ড তাই এক গুরুতর ঐতিহাসিক প্রশ্নেরও অবতারণা করে? কেনো তাজউদ্দীন আহমদকে টার্গেটে পরিণত করলেন তৎকালীন সরকারের প্রধান খন্দকার মোশতাক আহমদ। 

০৩.

এই কুখ্যাত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে পরবর্তীতে বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় নথি উদ্ধার করা হয়েছে। বেশ কিছু নতুন বিষয় উঠে এসেছে যা এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে কৌতুহলি পাঠককে উৎসাহিত করতে পারে।

এক.

ওই হত্যাকাণ্ডের সময়ে ঢাকার সেন্ট্রাল জেলের জেলার ছিলেন আমিনুর রহমান। পরবর্তীতে তিনি জানান, ‘জেল হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু আগে কিন্তু একটা ঘটনা ঘটেছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব মঞ্জুরুল করিম সাহেব আমাকে একদিন অফিস টাইমে ফোন করে বললেন, আজকে আর্মিরা জেলখানায় যাবে, তুমি একটু দেখিয়ে দিও। তখন আমি আইজি সাহেবকে ফোনে বললাম বা আইজি সাহেবই একই বিষয়ে বলতে আমাকে ফোন করল। আমি বললাম, কখন আসবে ওরা। উনি বললেন, রাতে। আমি বললাম, কত রাতে। উনি বললেন, রাত ১১-১২ টার দিকে। দুইদিন এসেছিল আর্মির লোক। মোট তিনজন করে। মার্শাল বা এই জাতীয় কিছু লেখা ছিল ব্যাজে। ওরা এসে সেই গভীর রাতে হসপিটাল থেকে শুরু করে নিউ জেলসহ সম্পূর্ণ জেলখানাটা ঘুরে দেখল।আমি ওদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, স্যার, আপনারা এখানে কী দেখতে এসেছেন, কী ব্যাপার? ওরা বলেছে, ঢাকা জেলের ভেতরে কোনো ছোট বিমান বা হেলিকপ্টার ল্যান্ড করতে পারে কিনা এটা দেখছি। এটা প্রথমবার। দ্বিতীয়বারও এসে একই কারণ বলেছে। পরেরবার আগের একজন ছিল, দুইজন নতুন। এছাড়া আমার অবর্তমানে আর কেও ভেতরে গেছে কিনা আমি জানি না, কিন্তু অফিসে আর্মির লোক এসেছে।’ 

দুই.

জেল হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন আইজি প্রিজনস নূরুজ্জামান সরকারিভাবে যে নথি দাখিল করেন তা দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে উৎঘাটিত হয়। এবং বাংলাদেশের মিডিয়ায় তা প্রকাশিত হয়। সেখানে আইজি প্রিজনস এই হত্যাকাণ্ডের আনুপূর্বিক ঘটনাসমূহের দাপ্তরিক বিবৃতির এক জায়গায় লেখেন,‘ … মেজর রশিদের আরেকটি ফোন পাই। তিনি আমাকে জানান, কিছুক্ষণের মধ্যেই জনৈক ক্যাপ্টেন মোসলেম জেলগেটে যেতে পারেন। তিনি আমকে কিছু বলবেন। তাকে যেন জেল অফিসে নেয়া হয়। এবং ১।জনাব তাজউদ্দীন আহমদ ২।জনাব মনসুর আলি ৩।জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম ৪।জনাব কামরুজ্জামান-এই চারজন বন্দিকে যেন তাকে দেখানো হয়।

এ খবর শুনে আমি প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলতে চাই এবং টেলিফোন প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়। আমি কিছু বলার আগেই প্রেসিডেন্ট জানতে চান, আমি পরিষ্কারভাবে মেজর রশিদের নির্দেশ বুঝতে পেরেছি কিনা। আমি ইতিবাচক জবাব দিলে তিনি আমাকে তা পালন করার আদেশ দেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চারজন সেনাসদস্যসহ কালো পোশাক পরা ক্যাপ্টেন মোসলেম জেল গেটে পৌঁছান। ডিআইজি প্রিজনের অফিস কক্ষে ঢুকেই তিনি আমাদের বলেন, পূর্বে উল্লিখিত বন্দিদের যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে তাকে নিয়ে যেতে বলেন। আমি তাকে বলি, বঙ্গভবনের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি আমাকে কিছু বলবেন। উত্তরে তিনি জানান, তিনি তাদের গুলি করবেন।’

তিন.

এই কুখ্যাত হত্যাকাণ্ডের সময় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের ডিআইজি প্রিজন ছিলেন জনাব কাজী আবদুল আউয়াল। গবেষক সিমিন হোসেন রিমির কাছে বহু পরে তিনি এই ঘটনার একটি ভাষ্য দেন। তার বয়ানের এক জায়গায় আছে,‘ … ওরা ভেতরের দিকে রওয়ানা দিল। কিন্তু ভেতরের গেটে গিয়ে আমার অস্থির লাগল। অস্ত্র নিয়ে ভেতরে যাওয়া এটা ঠিক না। এই ধরনের একটা ঘটনা জেলখানার ভেতরে হতে পারে না। আমি তখন বাধা দিলাম। ভয় পাইছেন, ভয় পাইছেন-এই বলে মুসলেম আমাকে ধাক্কা দিল। আমাকে বলল, যান যান , আপনি চলে যান। আপনি ভয় পাইছেন। আমি বললাম, এটা ভয়ের প্রশ্ন না। আমার ৩০ বছর চাকরি হয়েছে, কোনোদিন জেলের ভেতেরে এমন ঘটনা হয়নি। এখানে মানুষকে আশ্রয়ে রাখা হয়। এখানে এই জেলখানার ভেতরে এমন ধরনের হত্যাকাণ্ড চলতে পারে না। এই বলে আমি ফিরে চলে আসছিলাম। আইজি সাহেব আমার হাত ধরে বললেন, না না ওনাকে থাকতে হবে। তখন ওরা আগে আগে গেল, আমরা আস্তে আস্তে পেছনে পেছনে গেলাম। তবে আমি জানি না, আমি যে রকম বাধা দিয়েছিলাম, সমস্ত স্টাফ যদি আর্মির সামনে আমাকে সাপোর্ট করতো, কো-অপারেট করতো, তাহলে কী হতো বলা মুশকিল।’

০৪.

ইতিহাসের নানা নথি ঘেঁটে, সময়ের পরিক্রমার পথ বিশ্লেষণ করে এ কথা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জেল হত্যাকাণ্ড ছিল একটি সুপরিকল্পিত ঘটনা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক গং এবং তাদের দেশি-বিদেশি মুরুব্বিরা এটা নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের কোনো রকমের প্রত্যাঘাত বা রাজনৈতিক অভিঘাত যেন বাংলাদেশে না আসে।

 

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কোনো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া যাতে না আসে সেটা নিশ্চিত করতেই খুনীচক্রের প্রথম টার্গেট হন তাজউদ্দীন আহমদ। কেননা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর যে নৈতিক, সাহসী, প্রজ্ঞাবান, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক দৃঢ়চিত্ত নেতৃত্ব দরকার ছিল, সেই গুণাবলীর মানুষ ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। খোন্দকার মোশতাক সেটা জানতেন। তাই বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পরই প্রথমে গৃহবন্দী ও পরে গ্রেফতার করা হয় তাজউদ্দীন আহমদকে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল অংশটি খোন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটতে থাকে উল্টো ঘটনা। সরকার ও দলে আওয়ামী লীগের মধ্যে থাকা প্রগতিশীল অংশকে দুর্বল করে ফেলা হয়। এমনকি এক সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ মন্ত্রিসভা থেকেও অপসারিত হন। দল ও সরকারের কোথাও আর বড় কোনো জায়গা ছিল না তখন তাজউদ্দীন আহমদের। ফলে, আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী অংশ খোন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সবল হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরেই তাই এই অংশের নিধনযজ্ঞের লক্ষ্যে পরিণত হন তাজউদ্দীন আহমদ। পরবর্তীতে জাতীয় চার নেতার বাকিদেরও একই রকম শত্রুজ্ঞান করে তাদের নিশ্চিহ্ন করাকে কর্তব্য মনে করে খুনীচক্র।

জেলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে আরেকটি বিষয় খুব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, জেলখানার দায়িত্বে যারা ছিলেন, এই হত্যাকাণ্ড সংগঠনের বিরুদ্ধে তারা কোনো আইনি-প্রশাসনিক এমনকি নৈতিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারেননি। এসব দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা বঙ্গবন্ধু সরকারের আস্থাভাজন ও দলীয় আনুগত্যপ্রবণ লোক হিসেবে নিয়োগ পেলেও যোগ্য ও নৈতিক মানুষ ছিলেন না। সংকটকালে তারা কেউই নিজের দায়িত্ব পালনে ন্যূনতম সাহসও দেখাতে পারেননি। বিশেষ করে আইজি প্রিজনস নূরুজ্জামান ছিলেন খোন্দকার মোশতাকের খাতিরের লোক। আওয়ামী লীগের বহু নেতার সাথে ছিল তার সখ্য। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি হত্যাকারীদের সহযোগিতাই করেছেন। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল একথা যেমন সত্যি তেমনি সত্যি হচ্ছে খুনিরা রাষ্ট্রযন্ত্রের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের দায়িত্বশীলদের কোনোরকম বাধা বা প্রতিরোধের সম্মুখিন হননি কোথাও। বরং সহায়তাই পেয়েছেন সর্বত্র। সেটাও এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের পথকে মসৃণ করেছিল।

তথ্যসূত্র: বই-আমার ছোটবেলা ১৯৭১ এবং বাবা তাজউদ্দীন আহমদ। লেখক- সিমিন হোসেন রিমি। প্রকাশক-প্রতিভাস। ফেব্রুয়ারি ২০০১।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

আপনার মতামত লিখুন :