সবার আগে মনুষ্যত্বের উন্নয়ন জরুরি

মুফতি এনায়েতুল্লাহ
মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অবয়বের মানুষ আর আচার-আচরণের মানুষ এখন আর এক নয়। তাই মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষের আচরণ মানুষের মতো না হলেও কি তাকে মানুষ বলতে হবে? কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে মোটেও কার্পণ্য করছি না। দেদারসে অমানুষকেও মানুষ বলে যাচ্ছি, তাদের পেছনে ছুটছি, তাদের প্রশংসা করছি। এ কারণেই মানুষের সমাজে এখন অমানুষদের দৌরাত্ম্য বেড়ে চলেছে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মানুষরূপী অমানুষদের দৌরাত্ম্য।

মানুষ বড় অদ্ভুত জীব। প্রতি মুহূর্তে সে তার রঙ বদলায়। সাপের মতো খোলস পাল্টায়। সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানুষ হলো- সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং সুন্দরতম প্রাণী। সেজন্যই মানুষকে বলা হয়- ‘মায়ার প্রতিমা।’ তাইতো মানুষের জীবন নিয়ে ভাবতে গেলে বড় অবাক লাগে। ভেবে ভেবে কোনো কূলকিনারা করতে পারি না।

জীবন চলার পথে কত মানুষের সঙ্গেই তো আমাদের পরিচয় ঘটে। কিন্তু সব পরিচয় সুখের নয়, কিছু পরিচয় কষ্টের, লজ্জার, অপমানের। এই মনুষ্য সমাজে প্রত্যেক মানুষই আলাদা প্রকৃতির, আলাদা চেহারার, ভিন্ন আচরণের, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবের। রঙে-ঢঙেও তাদের রয়েছে বিস্তর ফারাক। একজনের চেহারার সঙ্গে আরেকজনের মিল নেই, একজনের স্বভাবের সঙ্গে অন্যজনের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু চরিত্রের কারণে মানুষকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়- সচ্চরিত্রবান ও দুশ্চরিত্রবান। এখন তো বলতে গেলে, সেই দুশ্চরিত্রদের রাজত্বই চলছে।

মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- সে নিজে যা নয় তা হতে চায়। অপরকে অনুসরণ করে চলে। সে হিসেবে মানুষ বড় প্রতিশোধ পরায়ণ। সে প্রতিশোধ নিতে ভালোবাসে। কাজে-কর্মে, কথা-বার্তায়, আচার-আচরণে অপরের ক্ষতি করে সে আত্মপ্রসাদ লাভ করে। তাতে কিন্তু তার লাভ থোড়াই। তারপরও মানুষ এটা করছে অবলীলায়। মনুষ্য স্বভাব বলে কথা। তাইতো মানুষ অপরের বাকস্বাধীনতাকে হরণ করে তৃপ্তির হাসি হাসে। অন্যের ক্ষতি করে আনন্দ পায়। সে একথা একবারও ভাবে না, মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। সে নিজেও তো ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, তবুও সে অপরের ভুলকে কিছুতেই ক্ষমার চোখে দেখে না। সে নিজে খারাপ হয়েও অপরের নিকট থেকে ভালো কিছুর আশা করে। এটা মানুষের চিরন্তন এক স্বভাব। কোনো জুয়াড়ি যেমন চায় না, তার ছোট ভাইটি কিংবা তার ছেলেটি জুয়াড়ি হোক। কোনো গাঁজাখোর চায় না তার ভাইটি কিংবা গাঁজায় আসক্ত হোক। কারণ সে জানে, মদপান, জুয়াখেলা কিংবা গাঁজা সেবন স্বাস্থ্য এবং কর্ম উদ্যমের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

আসলে মানুষের ভাবনাগুলো বড় অদ্ভুত প্রকৃতির। সুখের মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করে সে ভাবে, আহা! যদি সবকিছু পাল্টে দেওয়া যেত! যদি অতীতের সোনালি দিনগুলো আবার ফিরে পাওয়া যেত! এই ফিরিয়ে দেওয়ার অদ্ভুত মানসিকতা থেকে মানুষের রাজনৈতিক জীবন শুরু। প্রথাগত রাজনীতির মূল চেতনা এখান থেকে এসেছে। ওই চেতনায় বলিয়ান হয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের অধিকার রক্ষার মতো কঠিন অথচ মুখরোচক স্লোগান দিয়ে শুরু হয় রাজনীতি। কিন্তু আদতেই রাজনীতিবিদরা জানে না, মানুষ স্বাভাবিকভাবে পাল্টাতে পারে না, পারবে না। এসব ভাবা আর কল্পনার ফানুস ওড়ানো একই কথা। তবুও একদল মানুষ স্বপ্ন দেখায়, একদল তাদের সমর্থন দেয়; আর কিছু মানুষ হাপিত্যেশ করে সময় কাটায়। এভাবেই চলতে থাকে জীবনচক্র। এই জীবনচক্রের ঘূর্ণিপাকে সমাজ বন্দী শতাব্দীর পর শতাব্দী।


আমরা জানি, আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্রের উন্নয়নের সংজ্ঞায় অনেক ভারী ভারী কথা বলা আছে। এর কিছুটা সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা বুঝি, কিছুটা বুঝি না। আমরা আম জনতা, আমাদের সবটা বুঝতে হবে এমন কোনো বাধ্য-বাধ্যবাধকতা নেই। যেমন বিশ্বায়ন, রোল মডেল, আধুনিকীকরণ, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স, দারিদ্র দূরীকরণ, মাথাপিছু আয় ইত্যাদি। তবে এটা বুঝি এতসব আয়োজন শুধু ‘মানুষের জন্য।’


কিন্তু মানুষ মানে কি একটা অবয়ব মাত্র? শুধু আহার নিদ্রায় যিনি বাঁচেন? মানুষ তো তাকেই বলা হয়, ‘যিনি ব্যক্তিত্ব থেকে বিকশিত ব্যক্তিত্বে, ক্ষুদ্র আমিত্ব থেকে বৃহৎ আমিত্বে উত্তীর্ণ হন।’ মানব চরিত্রের এই প্রসারের কথা তো উন্নয়নের সংজ্ঞায় কিছুই বলা নেই। থাকলে কী আর বেধড়ক পিটুনি খেয়ে আবরারকে মরতে হয়, অধ্যক্ষকে দিন-দুপুরে পুকুরে ভিজতে হয়? কাড়ি কাড়ি টাকা, সোনা-দানাসহ রাজনৈতিক নেতারা ধরা খায়? মৃত্যুর সংবাদ গোপন রেখে নীতিবাগিশরা নাচ-গানের উৎসবে মেতে থাকে?

আমাদের বিভক্ত পাঠ্যসূচিতে আমরা কি আমাদের সন্তানদের মনুষ্যত্ব শেখাই? শেখাই কি সামাজিকতা, পরার্থপরতা কিংবা অহংশূন্যতার কথা? আমাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা থাকে, পয়সা খরচ করে সার্টিফিকেট জুটিয়ে তাদের করপোরেট দুনিয়ার কর্মী বানানোর!

শিক্ষা যেখানে মানুষকে মহান করে, সেখানে আমার তাদের ক্ষুদ্রতা শিক্ষা দিচ্ছি। আমরা তাদের শেখাই না, অধস্তনদের সঙ্গে কী করে কথা বলতে হয়, কী করে রাস্তা পার হতে হয় অথবা কাউকে রাস্তা পার করিয়ে দিতে হয়! আমাদের পাঠ্যসূচিতে নেই, কীভাবে সুজন এবং স্বজন হয়ে ওঠা যায়! আমাদের সন্তানদের বিজ্ঞান বইয়ে আছে আগুনের দাহিকাশক্তির কথা। কিন্তু যে ঘর-সমাজ আর রাষ্ট্রে বাস করছি, সেখানকার মূল ভিত্তিসমূহে আগুন লাগলে কীভাবে বাঁচবে সেটা লেখা নেই।

অবস্থাদৃষ্টে একথা বললে বেশি বলা হবে না, উন্নয়নের সংজ্ঞায় চরিত্রের বিকাশের কথা ব্রাত্য। এই ব্রাত্যতা কোনো শুভ লক্ষণ নয়! এটা আমাদের ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা স্বীকার করে আমাদের যাবতীয় উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে হবে। শুধু নিজে ভালো থাকা, আনন্দে থাকা কোনো উন্নয়ন নয়, এটা শিক্ষা দিতে হবে আমাদের সন্তানদের। এই ছোট্ট বাক্যের মাঝে রয়েছে সব কিছু। আমি ভালো থাকবো, আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজ ও রাষ্ট্রের সবাইকে নিয়ে। তা না করে, শুধু আমার ভালো থাকা, ভালো মানুষি সমাজের কোনো উপকারে আসবে না। পদে পদে ব্যাহত হবে তথাকথিত উন্নয়ন, শিক্ষার আধুনিকীকরণ থেকে শুরু করে সবকিছু।

উন্নয়নের হাজারো প্রজেক্ট, স্কিম, মিটিংয়ের পর মিটিং, নতুন নতুন রাস্তা, সেতু, উড়াল সেতু, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা তৈরি হচ্ছে সত্য- কিন্তু সমাজের মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। নৈতিকতা ভুলে গেছে মানুষ। গর্ব করার মতো কিছু আর নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অজানা কিছুর নেশায় বুঁদ হয়ে ঝিমোচ্ছে অসুস্থ মুরগির মতো। আদর্শহীনতার রোগে হাবুডুবু খেতে হারিয়ে যাচ্ছে যুব সমাজ। বলি, এ কোন সমাজ আমাদের? আমরা তো এই সমাজ পাইনি। আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে যে মানবিক সমাজ পেয়েছিলাম, সেটা কোথায় হারালাম? তাহলে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কী রেখে যাবো? আমরা তো পেয়েছিলাম মানবিক সমাজ, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবার। আর রেখে যাচ্ছি অবক্ষয়ে পূর্ণ সমাজের খোলস। যেহেতু আমাদের লোকান্তরই শেষ কথা নয়, সেহেতু এটা ভাবার এখনই সময়। না হলে পরে আফসোস করে কোনো লাভ হবে না।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আপনার মতামত লিখুন :

এ সম্পর্কিত আরও খবর