রাঙ্গার বিচার চাই

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

প্রভাষ আমিন, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি বিস্মিত, ব্যথিত, ক্ষুব্ধ, লজ্জিত। আমি ভেবেছিলাম ১১ নভেম্বর সকাল হওয়ার আগেই জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যাবেন। তার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে মামলা হবে। তার বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছিলাম। আশা করেছিলাম, এই দাবি আমাদের করতে হবে না। কারণ এখন ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। ভেবেছিলাম সোচ্চার প্রতিবাদে উত্তাল হবে রাজপথ। কারণ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মাঠের নেতাকর্মীরা এখনও মরে যায়নি। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম, বর্তমানে বাংলাদেশের ‘প্রধান বিরোধী দল' ফেসবুক ছাড়া আর কোথাও তেমন প্রতিবাদ হয়নি। সাবেক বিরোধী দল বিএনপিরও কোনো আওয়াজ শুনিনি। সদা বিদ্রোহী বামদেরও প্রতিবাদ দেখিনি।

হতে পারে, জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙা এতই ভয়ঙ্কর, তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারো নেই অথবা সে যেটা বলেছে সেটা সত্যি। আসলে দু’টির কোনোটিই সত্যি নয়। আসলে আপসের চোরাবালিতে বারবার হারিয়ে যায় আমাদের অনেক মহৎ অর্জন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের নেতারা আজ সব দলে নেতৃত্বে, তারপরও নূর হোসেনের অপমানের বিচার চাইতে রাজপথে অবস্থান নিতে হয় তার মাকে, তার ভাইকে, তার বোনকে!

আরো পড়ুন: নুর হোসেনকে ইয়াবাখোর বললেন জাপা মহাসচিব

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করেন এইচ এম এরশাদ। ১৯৮৩ এর মধ্য ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারপর সামরিক সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছাত্র-শিক্ষক-জনতা-পেশাজীবী ঐক্যবদ্ধভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। প্রথমে ১৫ দল ও সাত দল এবং পরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দল এবং বামদের নেতৃত্বে পাঁচ দল- এই তিন জোট মিলে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিল ছাত্রদের প্রতিরোধ। এরশাদের নয় বছরের শাসনামলেই রাজপথ ছিল প্রতিবাদে উত্তাল। তবে আন্দোলনের দু’টি পর্যায় চূড়া স্পর্শ করেছিল। একটি ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে, আর অপরটি ১৯৯০ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর।

আরো পড়ুন: রাঙ্গাকে ক্ষমা চাইতে বললেন নূর হোসেনের মা

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ছিল। সেই মিছিলে বুকে ‘স্বৈরাচার নীপাত যাক’, পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে জীবন্ত পোস্টার হয়ে মাঠে নামেন পরিবহন শ্রমিক ও যুবলীগ নেতা নূর হোসেন।

তার এই অভিনব প্রতিবাদে অন্য মাত্রা পায় আন্দোলন। তখনকার আট দলীয় জোটের নেত্রী শেখ হাসিনার গাড়ির কাছে চলে আসেন নূর হোসেন। শেখ হাসিনা তার মাথায় হাত বুলিয়ে শার্ট গায়ে দিতে বলেন। তার আশঙ্কা ছিল, এমন জীবন্ত পোস্টার পুলিশের সহজ টার্গেটে পরিণত হবে। কিন্তু শেখ হাসিনা মাথায় হাত রেখেছেন, এতেই বর্তে যান নূর হোসেন। নতুন উৎসাহে স্লোগানে কাঁপান রাজপথ। শেখ হাসিনার আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। স্বৈরাচার এরশাদের পুলিশের গুলি বিদীর্ণ করে দেয় নূর হোসেনের বুক। সেই থেকে নূর হোসেন সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনন্ত অনুপ্রেরণার প্রতীক।

আরো পড়ুন: রাঙ্গাকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

প্রতিবছর বিভিন্ন সংগঠন ১০ নভেম্বর নূর হোসেন দিবস পালন করে। ১৯৮৭ এর ১০ নভেম্বর নূর হোসেন জীবন দিয়ে আন্দোলনে যে গতি এনেছিলেন, তা চূড়ান্ত পরিণতি পায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পতন ঘটে এরশাদের।

নূর হোসেনের আত্মাহুতির ৩২ বছর পর এসে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা আবিষ্কার করলেন, নূর হোসেন মাদকাসক্ত ছিলেন, ইয়াবাখোর ছিলেন। মসিউর রহমান রাঙ্গা নিছক একজন তৃতীয় শ্রেণীর রাজনীতিক। নামে জাতীয় পার্টি হলেও কার্যকলাপে ‘যাত্রা পার্টি’র ধরন বলেই রাঙ্গার মত রুচিহীন লোক এই পার্টির মহাসচিব হতে পেরেছে। ৩২ বছর পর স্বৈরাচারের সহযোগী রাঙ্গার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, সেই আসলে নেশা করে বক্তৃতা করতে এসেছেন। রাঙ্গার এই রুচিহীন কথার একটাই জবাব, মামলা ও বিচার। তবুও একটাই কথা, রাঙ্গা হয়তো এখন ইয়াবা খেয়ে বক্তৃতা করেন, কিন্তু ১৯৮৭ সালে ইয়াবা ছিল না। পেটানো পেশীবহুল শরীরের পরিবহন শ্রমিক নূর হোসেন ছিলেন প্রতিবাদী মানুষের প্রতীক। কোনো মাদকাসক্তের শরীর এমন হতে পারে না।

মসিউর রহমান রাঙ্গা যে আজ বাংলাদেশে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেয়ার সাহস পান এবং দিলেও কিছু হয় না; তার দায় আমাদের। ১৯৯০ সালে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পতনের পর বছর পাঁচেক কারাগারে থাকতে হয় এরশাদকে। এরপর প্রথমে আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা করে মুক্তি পান তিনি। বছর দু’য়েকের মধ্যে খালেদা জিয়ার সাথে মিলে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন।

পতনের মাত্র সাত বছরের মধ্যে এরশাদকে রাজনৈতিক দোসর করে নেয় তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর কেউ কি ভেবেছিলেন, এরশাদ আবার এই দেশে রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন, মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হবেন, বিরোধী দলীয় নেতা হবেন?

মৃত্যুর সময় এরশাদ সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন। তার দল জাতীয় পার্টি এখনও সংসদে গৃহপালিত বিরোধী দল। রাজনীতির এই আপসকামিতার সুযোগেই রাঙার মত চাঁদাবাজ মন্ত্রীসভায় ঠাঁই পান, রাজনীতিতে বড় বড় কথা বলার সুযোগ পান। অথচ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জনগণ রাজপথে পেলে রাঙ্গার হাড়ও খুঁজে পাওয়া যেত না।

আমি নিজে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের একজন অতি ক্ষুদ্র কর্মী ছিলাম। কিন্তু এখনও নিজের যৌবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে রাজপথে কাটাতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত। কিন্তু রাজনীতির মারপ্যাঁচে হারিয়ে যায় আমাদের সেই অর্জনগুলো। আমরা যাদের নেতৃত্বে রাজপথে আন্দোলন করেছি, তারা আজ মুখে কুলুপ এটে বসে আছেন। এটাই লজ্জার। এই দেশে স্বৈরাচারের দোসররা আজ শহীদদের অপমান করার স্পর্ধা দেখান। নিজেদের প্রতারিত মনে হয়।

নূর হোসেন ছিলেন যুবলীগের কর্মী। তিনি নেতা হতে মাঠে নামেননি। নেমেছিলেন সত্যিকার অর্থেই গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য, স্বৈরাচারের পতনের জন্য। মৃত্যুর আগে সর্বশেষ শেখ হাসিনা নূর হোসেনের মাথায় হাত রেখেছিলেন। শেখ হাসিনার স্নেহের পরশকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েই নূর হোসেন বুক পেতে দিয়েছিলেন পুলিশের গুলির সামনে। সেই নূর হোসেনকে যারা আজ অপমান করেন, তাদের বিচারের দাবি আজ শেখ হাসিনার কাছেই করছি।

মসিউর রহমান রাঙার গ্রেপ্তার, বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।


প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :

এ সম্পর্কিত আরও খবর