বাংলাদেশের নদ-নদী বাঁচবে তো?  

ড. তুহিন ওয়াদুদ  
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদীর পানি বাধাহীন করার ঘোষণা দেওয়ার বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই ঘোষণা এখনো দেশের অসংখ্য নদীকে বাধাহীন করার কাজে লাগানো হয়নি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন অর্ধ লক্ষাধিক দখলদারকে চিহ্নিত করলেও তাদের বিরুদ্ধে আজও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

হাইকোর্ট চলতি বছরের ১ জুলাই নদী রক্ষায় ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। সেই রায়ে দেশের সব নদীকে জীবন্ত সত্ত্বা ঘোষণাসহ ১৭টি নির্দেশনাও রয়েছে। সেগুলো পালনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ফলে নদী দখলের কিংবা নদীর দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার চেষ্টা বাধাহীন আছে। আর বাধা পড়ে আছে নদীর পানি প্রবাহে।

নদী রক্ষা করার জন্য দেশের সব জেলা এবং উপজেলায় নদী রক্ষা কমিটি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উপজেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা, জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকেন। ফলে তারা নদী রক্ষায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। সেজন্য নদী রক্ষার চেষ্টা এখনো ঘোষণা আর নির্দেশনার মধ্যেই রয়েছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, সরকার নদী রক্ষায় যথেষ্ট না হলেও অনেক মনোযোগ দিয়েছে। আশা করা যায়,দেশের নদীগুলো প্রাণ ফিরে পাবে।

আমাদের দেশে কখনো নদীর সর্বনাশ করেছে ব্যক্তি, কখনো সরকার নদীর সর্বনাশ করেছে। দখল-দূষণ আর ভরাট হওয়ার মধ্য দিয়ে নদীগুলো মৃত্যুপথযাত্রীতে পরিণত হয়েছে। অনেক নদী আছে যেগুলোর ওপর প্রস্থের চেয়ে অনেক ছোট করে ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। সরকারি এমন সেতু, বক্স কালভার্ট নদীর অনেক বড় সর্বনাশ করছে। সরকার দলীয়রা নদীর দখলে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। অনেক সময় বড় নদীর পাড় রক্ষা বাঁধ দিয়ে অসংখ্য শাখা নদীকে মেরে ফেলা হয়েছে। নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ নদী রক্ষায় এগিয়ে আসছে না। নদীপাড়ের মানুষ যদি নদীর প্রাণ রক্ষায় অবদান রাখত,তাহলে নদীর সর্বনাশ রচিত হতো না।

২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে দেশে অনেকগুলো নদী খনন করা হয়েছে। যদিও এ নদী খনন বিজ্ঞানসম্মতভাবে করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে খনন নদীর স্থায়ী ক্ষতিরও কারণ হয়েছে। নদীর মাটি খনন করে আবার নদীর ভেতরেই ফেলা হচ্ছে। নদীর প্রকৃত প্রস্থ কমিয়ে নদীকে নালায় পরিণত করা হচ্ছে। বিএডিসি এবং বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তো অনেক নদীর নামই দিয়েছে খাল হিসেবে।

এতোকিছুর পরও সরকার নদী খননে কাজ করছে, সেটি নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রধানত নদীগুলো খনন করছে। বিআইডব্লিউটিএ নির্দিষ্ট কিছু নদীর কাজ করছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ৪৭টি নদী নিয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা করছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দেশের ছোট-বড়-মাঝারি সব রকম নদী, খাল, বিল, জলাশয় নিয়ে একটি মাস্টার প্ল্যান করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই লক্ষ্যে সরকার আট বিভাগে আটটি কমিটির মাধ্যমে কাজগুলো এগিয়ে নিতে চায়।

আমি রংপুর বিভাগের মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা বিষয়ক কমিটির একজন সদস্য। ঢাকাস্থ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কার্যালয়ে রংপুর বিভাগের জন্য মাস্টার প্ল্যান তৈরির প্রথম সভায় উপস্থিত ছিলাম। কমিশন পূর্ণ আন্তরিকতায় কাজ করার চেষ্টা করছে।

গত ১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের সব নদীর অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করেছে। কমিশন যদি প্রকৃত অর্থে দেশের নদীগুলো নিয়ে একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করতে পারে, তাহলে সেটি প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নদী নিয়ে সবচেয়ে বড় একটি কাজ হবে।

নদী গবেষণা কেন্দ্রকে বড় কোনো কাজ করতে দেখা যায় না। বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা কত,এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান বলতে পারে না। দেশে আন্তঃসীমান্তীয় নদীর সংখ্যাও এখনোপর্যন্ত বলতে পারেনি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান। নদী গবেষণা কেন্দ্র, পানি উন্নয়ন বোর্ড, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর বা অধিদপ্তরই দেশের নদীর প্রকৃত সংখ্যা বলতে পারে না। মাস্টার প্ল্যানের কাজ যথাযথভাবে হলে দেশের নদীগুলোর সংখ্যাও জানা যাবে। যদি নদী চিহ্নিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে এ কমিটি পূর্ণাঙ্গ কাজ করতে পারবে না।

বাংলাদেশের নদ-নদী বাংলাদেশের জীবনরেখা। এই জীবনরেখা মুছে গেলে, মানুষের জীবন রেখাও ক্ষীণ হয়ে আসবে। আমাদের ব্যর্থতা এবং ভারতীয় পানি বিষয়ক সাম্রাজ্যবাদের কারণে বাংলাদেশের নদীগুলো যাতে আর ক্ষতির শিকার না হয়, সেজন্য দেশের আপামর জনতাকেই জেগে উঠতে হবে।

ড. তুহিন ওয়াদুদ: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ ও পরিচালক রিভারাইন পিপল।

আপনার মতামত লিখুন :