পরিবহন মাফিয়াদের কাছে জিম্মি বাংলাদেশ!

মুফতি এনায়েতুল্লাহ
মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হঠাৎ করে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়েছে। কিন্তু কোন সংগঠন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে এটা নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই। পরিবহনখাত সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী সংগঠনের নেতাদের দাবি, এটা চালক ও শ্রমিকরা করছে; আমরা ‘কিচ্ছু’ জানি না।

কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো- ধর্মঘট হচ্ছে এবং চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন যাত্রীরা। বুধবার (২০ নভেম্বর) সকাল থেকে রাজধানীতে চলাচলরত বাস বন্ধ করে দিয়েছেন ধর্মঘটকারীরা। শুধু বাস নয়, মোটরসাইকেল, সিএনজি, রিকশা এমনকি ভ্যানও চলাচল করতে দিচ্ছেন না তারা। এগুলো চলতে দেখলেই চাকার হাওয়া বের করে দিয়ে যাত্রীদের জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন অফিসগামীসহ সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে পিএসসি পরীক্ষার্থীরা।

ধর্মঘটে সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে দাঁড়িয়ে থেকে বাস না পেয়ে ফিরে গেছেন বাসায়, অনেকে আবার পায়ে হেঁটে অফিসে গেছেন। অতিষ্ঠ হয়ে অনেক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। গাড়ী না পেয়ে কান্নাকাটি করতে দেখো গেছে নারীদের। সব মিলিয়ে একটা অসহায় অবস্থা। বিপদাপন্ন মানুষ, তাদের সাহায্যের জন্য কেউ নেই, অবলম্বন নেই, উপায় নেই।

প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে নতুন পরিবহন আইন প্রয়োগ করার ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই মালিক ও চালকসহ পরিবহনখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ধর্মঘটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। জাতীয় সংসদে পাস করা নতুন আইনটি চলতি মাস নভেম্বরের এক তারিখ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলোর আপত্তি, জনসচেতনতা সৃষ্টি, নতুন আইনে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগসহ নানা কারণে দু’সপ্তাহ পর্যন্ত নতুন আইনটি প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।

অবশেষে সোমবার (১৮ নভেম্বর) থেকে আইনটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে খবর জানার পর কোনো রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়া মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনগুলো ধর্মঘট শুরু করে। এর ফলে রাজধানীসহ সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের চলাচল অনেক কমে যায়। সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হতে থাকে। মঙ্গলবারের মধ্যে প্রায় সব জেলার সব ধরনের যানবাহন ধর্মঘটে অংশ নেয়। সে কারণে দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, নামে নতুন হলেও এবারের আইনে কিন্তু জরিমানার পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো ছাড়া এমন কোনো বিধান রাখা হয়নি, যাকে সম্পূর্ণ নতুন বলা যাবে। শাস্তি ও বিচারের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট নমনীয়তা দেখানো হয়েছে নতুন আইনে। যেমন, প্রথম দিনে রাজধানী ঢাকায় মামলা হয়েছে মাত্র ৮৮টি। এসব মামলায় জরিমানা করা হয়েছে মাত্র এক লাখ ২১ হাজার নয়শ’ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন আইন সম্পর্কে অবহিত করার এবং মালিক ও চালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নমনীয়তা দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা আশা করছেন, নমনীয়তার কারণে বিশেষ করে চালকরা অনেক বেশি সতর্ক হবেন এবং দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অনেক কমে আসবে।

অন্যদিকে মালিক ও চালকদের পক্ষ থেকে লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতির পুরনো অভিযোগ উত্থাপন করে বলা হচ্ছে, যথেষ্ট সময় নিয়ে আবেদন করা সত্ত্বেও মূলত ঘুষ-দুর্নীতির কারণে তারা সময়মতো লাইসেন্স হাতে পাচ্ছেন না। ফলে আইনের চোখে তারা অপরাধী হচ্ছেন এবং তাদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে।

বলা দরকার, জরিমানা শুধু লাইসেন্সের কারণে আদায় করা হচ্ছে না। গাড়ির ফিটনেস না থাকা, বাসের ভেতরে অতিরিক্ত সিট লাগানো এবং সিটিং সার্ভিস বাসে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়ানো যাত্রী নেওয়াসহ অন্য অনেক কারণে জরিমানা করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট বাস স্টপ ছাড়া যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং বেশি ভাড়া আদায় করার মতো বিভিন্ন অভিযোগও রয়েছে বাসগুলোর বিরুদ্ধে।

উল্লেখ্য, নতুন আইনে কোনো চালক ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ কাউকে হত্যা করলে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে চালকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো দুর্ঘটনা ‘ইচ্ছাকৃত’ কি না তা কীভাবে প্রমাণ করা হবে? কারণ, কোনো চালক তো ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ মানুষ দূরে থাক, হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগলকেও হত্যা করেন না। এজন্য আইনটি থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন চালক ও মালিকরা।

মানছি, মালিক ও চালকদের দাবি ও বক্তব্যের মধ্যে গ্রহণযোগ্য কিছু যুক্তি রয়েছে। কিন্তু তাই বলে জাতীয় সংসদে পাস করা কোনো আইনের বিরুদ্ধে ধর্মঘট করে দেশকে অচল করে দেওয়ার কর্মকাণ্ড সমর্থন করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া ধর্মঘটও আইনসম্মতভাবে করা হয়নি। কারণ, প্রচলিত শ্রম আইনে ধর্মঘটের মতো কোনো কর্মসূচি বা পদক্ষেপের আগে নোটিশ দেওয়ার এবং সরকারসহ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু এবারের ধর্মঘটের আগে মালিক ও শ্রমিকরা সে বিধান লঙ্ঘন করেছেন।

আমরা মনে করি, উভয় পক্ষের উচিত সমঝোতার মনোভাবকে প্রাধান্য দেওয়া এবং বিশেষ করে শ্রমিকদের বক্তব্যের আলোকে আইনে কিছু পরিবর্তন আনা। আইনের আড়ালে চালকদের যেমন হত্যার অঘোষিত লাইসেন্স দেওয়া যায় না, তেমনি হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করার জন্যও সুনির্দিষ্ট কিছু বিধি-বিধান থাকা দরকার। এজন্য সরকারের উচিত এমন আয়োজন নিশ্চিত করা যাতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি দু’টিই কমে আসে এবং পর্যায়ক্রমে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

এ উদ্দেশ্যে প্রথমে দরকার দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণসমূহের দিকে নজর দেওয়া। কারণ, লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে বাস চালকদের দায়িত্ব পাশ কাটানোর সুযোগ কম। তারা সাধারণত ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করেন না, মানুষের জীবনের ব্যাপারেও তারা খুব একটা মায়া-দয়া দেখান না। এজন্য যখন-তখন এবং যেখানে-সেখানে দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষ মারা যাচ্ছে এবং পঙ্গুত্ব বরণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

বিষয়টিকে অবশ্যই হাল্কাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, দেশে গাড়ির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং বাড়তেই থাকবে। সুতরাং দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বেশি জোর দিতে হবে যানবাহন ব্যবস্থাপনার বিষয়ে। এর শুরু হতে হবে বিআরটিএ থেকে, যেখানে ঘুষের বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল করার অনুমতি এবং গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এটা বন্ধ করতে হবে সর্বাগ্রে। চালকদের বয়স, লাইসেন্স এবং প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলোও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে নজর দেওয়া হলে কিশোরসহ প্রশিক্ষণহীন লোকজন যেমন চালকের আসনে বসতে পারবে না, তেমনি মৃত্যু ঘটবে না সাধারণ পথচারীদের।

বিভিন্ন মৃত্যুর ঘটনা থেকে আমাদের সবার উচিত শিক্ষা নেওয়া এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে জরুরিভিত্তিতে উদ্যোগী হওয়া জরুরি। মালিক ও চালকদেরও উচিত আকস্মিক ধর্মঘটের মতো বেআইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে সমস্যা দূরীকরণে সবাইকে বাস্তববাদী হওয়া।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য আমাদের জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতির অন্যতম অন্তরায়। একশ্রেণীর পরিবহন নেতা-মালিক-শ্রমিকের কাছে দেশের কোটি কোটি মানুষের জিম্মি দশা অবসানের প্রয়োজনেই নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। গত বছর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর সারাদেশে নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের জোরালো দাবি উঠে। এরপর পরিবহন মালিক শ্রমিকদের ধর্মঘটে দেশ অচল হয়ে পড়তে দেখা গেছে। সে অভিজ্ঞতার আলোকে এবার নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্টদের দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অন্যায্য চাপের কাছে নত হওয়া যাবে না। সেই সঙ্গে আইন প্রয়োগে বাড়াবাড়ি কিংবা অপপ্রয়োগ থেকেও বিরত থাকতে হবে।

এটা কে না জানে, দেশে লাখ লাখ গাড়ির ফিটনেস নেই, লাখ লাখ চালকের লাইসেন্স সার্টিফিকেট নেই। বেশিরভাগ চালক ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালায়। ট্রাফিক পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে এবং পুরনো আইনে সামান্য টাকা জরিমানা দিয়ে তারা বছরের পর বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছেন। এখন শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের সিদ্ধান্ত তাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে।

মূলত অবৈধ ও ভুয়া লাইসেন্সধারী চালক এবং ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ির মালিক, চালক ও শ্রমিকরাই ধর্মঘটের নামে জনগণকে জিম্মি করে নতুন আইন প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। তাদের সঙ্গে নরম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিছু হলেই গাড়ি বন্ধ করে দেশের মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের মানসিকতা অনৈতিক। কারা এবং কাদের ইন্ধনে এসব হচ্ছে এটা খুঁজে বের করতে হবে। তারা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি শক্তিধর নয়, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের চেয়ে তাদের লোভ-লিপ্সা ও অনৈতিক দাবি কখনও বড় হতে পারে না। আর বারবার এক অস্ত্র ব্যবহার করে সরকারের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মনোভাব মেনে নেওয়া যায় না। এভাবে পরিবহন মাফিয়াদের কাছে বাংলাদেশকে জিম্মি হতে দেয়া যায় না।

 

মুফতি এনায়েতুল্লাহ: বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আপনার মতামত লিখুন :