এতো মেধা রাখি কোথায়?

শিমুল সুলতানা
শিমুল সুলতানা, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

শিমুল সুলতানা, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের মানুষ অনেক সৃষ্টিশীল, বুদ্ধিমান ও মেধাবী। মেধা ও সৃষ্টিশীলতার জন্য শুধু দেশের গণ্ডি নয়, বিদেশেও সুনাম অর্জন করছে এ দেশের নাগরিকরা। তারা যে শুধু মেধাবী তা-ই নয়, তারা গবেষকও বটে। কিন্তু সেই মেধা ও সৃষ্টিশীলতার ভিন্নধর্মী বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় আমাদের দেশে। এ প্রবণতা ক্রমে যেনো বেড়েই চলেছে। কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে ভেবে দেখুন তো, অন্য কোন দেশ বা জাতি আছে, যেখানে সরিষার তেল, হাইড্রোজ আর খাবার সোডা দিয়ে খেজুর গুড়ের চাকচিক্য বাড়ানো হয়? বা তারা জানে যে ফিটকারী, পাথর চুন এবং বন ঢেঁড়সের নির্যাসে পরিষ্কার হয় খেজুরের রস?

অন্য কোনো দেশের মানুষের গবেষণা জ্ঞান এতদূর না এগোলেও আমরা ঠিকই এসব জানি। আমরা জানি, কেজি পাঁচেক খেজুর রসে এক কেজির মতো গুড় হয়, এ পরিমাণ রসে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনি মিশিয়ে জ্বাল দিলেই হয়ে যায় দৃষ্টিনন্দন ‘গুড়’।

কেউ কেউ তো একটু খানি রসে কাপড়ের রঙ, আটা আর চিনি মিশিয়েও দিব্যি গুড় বানিয়ে ফেলে। এসব ক্রিয়েটিভ ব্যবসায়ীদের কল্যাণে নাকি এরই মধ্যে কাপড়ের এ রঙ বাজারে গুড়ের রঙ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এমনতর গুড় তৈরিতে কোনো কোনো ‘গবেষক’ আবার সুগারমিলের চিটাগুড় দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।

ছানার পানি বা ননী তোলা দুধে (স্কিম মিল্ক) একটু কস্টিক সোডা (সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড), খাবার সোডা (সোডিয়াম বাই কার্বোনেট), গুড়া সাবান, তেল আর চিনি মিশিয়ে আমরাই তৈরি করতে পারি খাঁটি দুধ। কেউ কেউ আটা, চিনি আর তেলের সঙ্গে নানা পদের কেমিক্যাল (রাসায়নিক) দিয়েও দুধ তৈরি করে ফেলে। আর ফরমালিন নামক রাসায়নিক দিলে যে এ খাঁটি দুধ দীর্ঘক্ষণ ঠিক থাকে, তা-ই বা আমাদের মতো আর কে জানে? যারা এমন করছে, তাদের অনেকেই হয়তো প্রাথমিকের গণ্ডিই পার হয়নি। এমন প্রতিভাধর ও সৃষ্টিশীল মানুষ বিশ্বে বিরল বৈকি।

আবার আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ পর্যন্ত বিদ্যার দৌড় না থাকলেও আম, আতা, আনারসসহ বিভিন্ন ফল দ্রুত পাকানোর কারিশমা ঠিকই জানা আছে অনেকের। ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন বা রাইপেন নামক রাসায়নিকে যে চটজলদি ফল পাকানো যায়, তা-ও জানা আছে এদের। আর তাপ দিলে যে কাঁচা কলা পাকে, তা জানাও কিন্তু কম কথা নয়?

শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি যে আমরাই জানি, সিঁদুর, পটাশ, শ্যাম্পু, ফরমালিন, স্প্রিরিটসহ বিভিন্ন রাসায়নিক স্প্রে করলে আনারস দ্রুত পাকে। সেই সঙ্গে দেখতেও সুন্দর হয়। তরমুজ, টমেটো লাল টুকটুকে হয় কৃত্রিম রঙের গুণে। আর দেশের বেশিরভাগ ফল-সবজিতে নাকি অর্গেনোফসফেট ব্যবহার করা হয়। এতো গবেষক মানুষ নিয়ে আমাদের তো গর্ব করাই উচিত।

নরম, তুলতুলে পরোটা বা রুটি খেতে কার না পছন্দ? তাই তো এ দেশের গুণধরেরা আটা-ময়দার খামিরে ইউরিয়া অ্যামোনিয়াম সালফেট ও ইউরিয়া সার মেশান। এতে সাধের রুটি, পরোটা, নান, তন্দুর হয় তুলতুলে। আবার অ্যামোনিয়াম সালফেট ও ইউরিয়া সারের মিশ্রণকে আদর করে ডাকা হয় সাল্টু। আহা! কতো সৃষ্টিশীল।

মাছ, সবজি, ফলসহ নানা পদের খাবারের পচন রোধে ফরমালিন ব্যবহারের কথা না হয় বাদই দিলাম।

মাছ সতেজ দেখাতে ফুলকায় রঙ লাগানোর বুদ্ধিটাও কিন্তু বেশ। মাছ কাটলে বের হয় পাথর। চিংড়ির গায়ে সুকৌশলে পুশ (ইনজেক্ট) করা হয় জেলি। হাঁস, মুরগি, কবুতরের পেট ভরা থাকে পাথরে। এসবের ওজন বাড়াতে কতো অভিনব আয়োজন!

চাষের মাছ আর মুরগিকে যা খাওয়ানো (পোল্ট্রি ফিড) হয়, তা নাকি তৈরি হয় ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্যে। যার মধ্যে ক্লোরাইড সালফেট, ক্রোমিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সালফিউরিক অ্যাসিড, ফর্মালডিহাইড, সোডিয়াম ও ক্লোরাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক রয়েছে, যা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর।

আবার একটুখানি স্পিন্ডল ওয়েলে সালফার মাস্টার্ড গ্যাস, পেঁয়াজের ঝাঁজ, মরিচ গুঁড়া মিশিয়ে তৈরি করা হয় খাঁটি ঘানি ভাঙা সরিষার তেল। স্পিন্ডল ওয়েল আর সালফার মাস্টার্ড গ্যাসের এমন ব্যবহার উদ্ভাবন করতে কিন্তু রসায়নে অনার্স, মাস্টার্স বা উচ্চতর কোনো ডিগ্রি প্রয়োজন হয়নি। অন্যান্য ভোজ্য তেলেও নাকি নিজেদের ‘গবেষণালব্ধ ভেজাল জ্ঞান’ প্রয়োগ করা হয়।

মোটা চালকে কেট ছেঁটে পলিশ করে নাজিরশাইল, জিরাশাইল, মিনিকেটের মতো চিকন চাল বলে চালিয়ে দেওয়া তো কোনো ব্যাপারই না। আমাদের গবেষকেরা এর জন্য বানিয়ে ফেলেছে রাইস পলিশিং মেশিনও। কতো বুদ্ধি!

ঘাসের বীজ, রং, পচা চাল ও ডালের গুঁড়া, ধানের তুষ এমনকি ইট-কাঠের গুড়া পর্যন্ত মেশানো হয় হলুদ, মরিচ, জিরা, ধনিয়া আর গরম মসলায়।

আমাদের চারপাশে এমন হাজারো গবেষণাধর্মী আর সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞ চলছে, চলুক! মন্দ কি?

এতোসব রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাবে নাকি মানবদেহে বাসা বাঁধতে পারে ক্যানসার। হতে পারে কিডনির অসুখ, হতে পারে করোনারি ডিসঅর্ডার, থ্রম্বোসিস বা ইডিমাসহ বিভিন্ন জটিল রোগ। ডায়রিয়া, আমাশয় ছাড়াও হতে পারে হৃদ ও চর্মরোগ। এ জ্ঞানও কিন্তু আমাদের ঠিকই আছে। তবে আমাদের বেচারা ভোক্তাদের বিশ্বাস, এসব বিষে তো আর এখনই মৃত্যু হচ্ছে না, হলেও কয়েক বছর পরে হবে। তো এনিয়ে এখনই চিন্তা করার দরকার কী? আর চিন্তা করেই বা লাভ কী? আর এই মেধাবী গবেষক শ্রেণী মনে করেন, তাদের গিনিপিগগুলো (ভেজাল পণ্যের ভোক্তা) এসব খাওয়ার সাথে সাথেই তো মরছে না, বছর কয়েক পরে কোনো রোগে ভুগলে বা মারা গেলে তো আর তাদের দায় থাকে না। এভাবেই এগিয়ে চলছে আমাদের সৃজনশীলতা, গবেষণা ও উৎপাদন। এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশ, এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। কারণ আমরাই শুধু জানি, কী করে ট্রেনের অটোগিয়ারে ইট রেখে ঘুমানো যায়! এমন সব ভয়ঙ্কর মেধার প্রশংসা না করলেই নয়।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন উদ্ভট গবেষণার খবর প্রচার করা হয় ফলাও করে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে করা হয় জেল-জরিমানাও। কিন্তু প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে শত ‘প্রতিবন্ধকতার’ মধ্যেও চলে লোক ঠকানোর অভিনব এসব আয়োজন। এসব দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, এতো মেধা রাখি কোথায়?

শিমুল সুলতানা: আউটপুট এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আপনার মতামত লিখুন :

এ সম্পর্কিত আরও খবর