কেন ফিরতে হচ্ছে ওদের?  

এরশাদুল আলম প্রিন্স
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সৌদি আরব থেকে প্রবাসী শ্রমিকরা ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক দেশে ফিরেছে। তাও আবার শূন্য হাতে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এক সময় পুরুষরাই শ্রমিক হিসেবে যেত। কিন্তু গত প্রায় এক দশক ধরে নারীরাও জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে পারি জমাচ্ছে।

আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার জন্যই এই বিদেশযাত্রা। অনেক সময় আমাদের সরকার অনেক কিছু যাচাই-বাছাই না করেই নারী শ্রমিকদের বিদেশ যাওয়ার অনুমোদন দিচ্ছে। ফলে দুই-তিন বছরের মধ্যেই তাদের ফিরে আসতে হচ্ছে।

সংসারে সচ্ছলতা আনতে, আর একটু ভালো থাকতে, অনেকেই জমিজমা, এমনকি ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করে বিদেশে গিয়েছিল। কেউ কেউ করেছিল ধারকর্জ। আশা ছিল, বিদেশে গিয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা উপার্জন করতে পারবে, অল্প সময়েই কিনতে পারবে জমি, শোধ করতে পারবে ধারদেনা। কিন্তু হায়! তাদের বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে দেশে। ফিরে আসার এ হার এখন অনেক বেশি। কিছু টাকা নিয়ে ফিরলেও না হয় হতো, কিন্তু শ্রমিকরা ফিরছে শূন্য হাতে, সবকিছু খুইয়ে, সঙ্গে নিয়ে একরাশ হাতাশা।

অনেকে ফিরে এসেও ফিরতে পারে না স্বজনদের কাছে। কোনোভাবেই আর টিকতে না পেরে, কোনোমতে জীবন নিয়ে দেশে ফিরে আসছে আমাদের নারী-পুরুষ শ্রমিকরা। সরকার ও প্রশাসন থেকে মাঝে মাঝেই বলা হচ্ছে, প্রবাসী শ্রমিকরা ফিরে এসে বানিয়ে বানিয়ে নির্যাতনের গল্প বলছে। এটা বানানো গল্প হলেই আমরা খুশি। কিন্তু শুধু গল্প হিসেবে আখ্যা দিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে, তা দুঃখজনক। তাদের অভিযোগগুলোর তদন্ত হওয়া দরকার। সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে সে সমস্যার সমাধান করা যায়। কিন্তু সমস্যাকে অস্বীকার করলে সমস্যা বেড়েই যাবে।

আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি শক্ত করতেই এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। বিপুল সংখ্যক শ্রমিক বিদেশে কর্মরত। তারা সবাই ফিরে আসতে শুরু করলে, তা হবে আমাদের জন্য উভয় সংকট। দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল আছে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানের জন্য। তারা ফিরে আসতে শুরু করলে, রেমিটেন্সের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশের শ্রম বাজারে যে এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সে কথা বলাই বাহুল্য। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও তেমন জো নেই। তাই বিদেশে আমাদের শ্রমিকদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে নতুন নতুন বৈদেশিক শ্রম বাজারের অনুসন্ধানও জরুরি।

দেশের হতদরিদ্র মানুষগুলো অনেক অর্থকড়ি খরচ করে বিদেশে যায়। কিন্তু বাধ্য হয়ে তারা নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে আসছে। তারা যে ধারকর্জ করে বিদেশে যায়, ফিরে এসে তাও শোধ করতে পারে না। ফলে, অনেক ক্ষেত্রে স্বজনরাও তাদের প্রত্যাবর্তনে খুশি হতে পারে না।

সৌদি আরব বর্তমানে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য কঠোর শ্রমনীতি অনুসরণ করছে। শুধু সৌদি আরব নয়, অন্যান্য দেশও কমবেশি একই নীতি অনুসরণ করতে যাচ্ছে। ফলে, সৌদি আরবে ফ্রি ভিসায় গিয়ে কাজ করার আর সুযোগ নেই। হয়তো এক সময় অনেকেই করত। কিন্তু এখন আর সে দিন নেই। যে কোম্পানির নিয়োগপত্র নিয়ে শ্রমিক হিসেবে সৌদি আরব যাবে, সে কোম্পানিতেই কাজ করতে হবে। অন্য কোথাও কাজ করার সুযোগ নেই। যারা ফিরে আসছে, তাদের একটি অংশ ফ্রি ভিসাধারী।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেই বাড়ি ফিরে আসতে হয়। অতিরিক্ত সময় থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু এখানেও সমস্যা। অনেক কোম্পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চাকরি খেয়ে ফেলে, চুক্তি বাতিল করে। নতুন কোম্পানিতে কাজ পাওয়াও সহজ কিছু না। ফলে অতিরিক্ত দু'টা পয়সা রোজগার তো পরের কথা, খরচও ওঠে না। তার আগেই বাড়ি ফিরে আসতে হয়।

নারী শ্রমিকদের বড় একটি অংশের অভিযোগ, তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। রয়েছে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও। তাদের ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। নির্যাতনের কারণে অনেক শ্রমিকের মারা যাওয়ার অভিযোগও গণমাধ্যমে দেখেছি। এসবের তদন্ত হওয়া জরুরি।

এসব বিষয়ে আমাদের দূতাবাসকে আরও সক্রিয় হতে হবে। পাল্টা অভিযোগ করে দায়িত্ব এড়ানো যায় না। উচিতও না। তা করলে সমস্যা আরও বাড়ে বৈ কমে না। আমাদের শ্রমিকদেরও সদুপদেশ দিতে হবে। কিন্তু সৌদি সরকারের সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। নির্যাতনের অভিযোগ এমনকি সন্দেহ থাকায় ফিলিপাইনসহ পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ সৌদিতে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের এ রকম কঠোর সিদ্ধান্ত যাতে নিতে না হয়, সেজন্য আগেই সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। শুধু সৌদি কেন, কোথাও আমাদের একজন শ্রমিকও নিগৃহীত হলে, সেখানে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়াই সঙ্গত। বৈদেশিক শ্রম বাজারের গুরুত্ব আমাদের জন্য অনেক। গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরটির সুরক্ষা জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন :