আমাদের কন্যা সন্তান

ড. মো. কামাল উদ্দিন
ড. মো. কামাল উদ্দিন, ছবি: বার্তা২৪.কম

ড. মো. কামাল উদ্দিন, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বর্তমানে বাবা-মা, পরিবার ও সমাজে কন্যা সন্তানের কদর কিছুটা বাড়লেও কন্যা সন্তানকে খাটো করে দেখার প্রবণতা ঐতিহাসিক। প্রাচীন কালের দার্শনিকদের দর্শন চর্চায় পুরো নারী জাতিই নিগ্রহের শিকার ছিল। সমস্ত মধ্য যুগ, যাকে অনেকে অন্ধকার যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করে, সে যুগে কন্যা সন্তান জন্মদান ছিল পাপ। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার ঘটনা প্রচলিত ছিল বলে কথিত আছে।

বর্তমান আধুনিক যুগে, নারীর অধিকারের যুগে, সুশাসনের ও মানবাধিকারের যুগে কন্যা সন্তানের প্রতি অবহেলা আগের তুলনায় অনেক কমলেও তা যে একেবারে নেই, তা বলা যাবে না। এ ধরনের মানসিকতা এখনো আমাদের সমাজ থেকে পুরোপুরি দূর হয়নি। ক্ষেত্র বিশেষে কন্যা সন্তানের প্রতি আগ্রহ বাড়লেও সামাজিকভাবে কন্যা সন্তানের অভিভাবকরা কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে থাকেন।

কারণ গোটা সমাজের মানসিকতা, পুত্র সন্তানের প্রতি মা-বাবার আগ্রহ, দাদা-দাদি ও নানা-নানিদের আকাঙ্ক্ষা এখনো বিদ্যমান। দু’টি সন্তানের একটি কন্যা ও অন্যটি পুত্র হলে সবাই খুশি। যদিও ধর্মীয় ও বাস্তবতার নিরিখে কন্যা সন্তান লালন পালনে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে মা-বাবারা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে কন্যা সন্তান লালন পালন করতে অনেক চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন হতে হয়। অজানা এক ভয় কাজ করে। কন্যা সন্তান লালন পালনে সুবিধা ও চ্যালেঞ্জসমূহ বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।

আমাদের এখানে সামাজিক বিপর্যয় হয়েছে অনেকভাবে। দেশে শিক্ষিতের হার বেড়েছে অনেক এবং দেশ উন্নত হয়েছে বিভিন্নভাবে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবস্থায় মাদক ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অনুসর্গ যুক্ত হয়েছে। শিক্ষিত এ জনগোষ্ঠীর দেশে মানবাধিকার বিশেষ করে কন্যা সন্তানের অধিকার বিপর্যস্ত হচ্ছে বিভিন্নভাবে। আমরা শিক্ষিত ও উন্নত হয়েছি বলে দাবি করছি, কিন্তু আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। মানসিক ও মানবিকভাবে আমাদের অবনয়ন হয়েছে বহু। ফলে শিশুদের বিশেষ করে কন্যা শিশুদের অধিকার হয়েছে সীমিত। কন্যা সন্তানদের অভিবাবকরা আছে একটু বাড়তি টেনশনে। দেশে যতটা ধর্ষণ বেড়েছে, তার প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে আমাদের কোমলমতি শিশুরা। সম্প্রতি শিশু ধর্ষণের হার অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। শিশু অধিকার ফোরামের হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালের প্রথম ৩ মাসে ১৬৪টি শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু পরের ৩ মাসে অর্থাৎ এপ্রিল, মে ও জুন মাসে তা বেড়ে ৩৩২টি হয়েছে। যা প্রথম ৩ মাসের তুলনায় ১০২ শতাংশ বেশি। গত ৬ মাসে মোট শিশু ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৪৯৬টি। এ ছিল রিপোর্টেড শিশু ধর্ষণের সংখ্যা। কিন্তু বাস্তবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি। কারণ অনেক শিশু ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ করা বা রেকর্ড করা হয়নি।

এ ধরনের ঘটনার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এসব ঘটনার সঙ্গে জড়তি। ৬ মাসের শিশুও ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পায়নি। গৃহ শিক্ষক, প্রতিবেশী, স্কুল শিক্ষক, দারোয়ান, ড্রাইভার, স্কুলের গার্ড এমনকি আত্মীয়-স্বজনও এ ধরনের হীন কাজের সঙ্গে জড়িত। ধর্ষণের পর শিশু হত্যার ঘটনাও অনেক।

তাই যাদের মেয়ে আছে, তাদের সতর্কতা একটু বেশি। আমাদের সমাজ কন্যা শিশু লালন পালনের অনুপযোগী। কাউকে যেন বিশ্বাস করা যায় না। সমাজে মানুষরূপী হায়েনাদের থেকে আমরা কন্যা সন্তানদের রক্ষা করতে পারছি না। আমাদের তেমন কোনো সামাজিক জীবন থাকে না। বাড়ির বাইরে বের হওয়া কঠিন। কার কাছে রেখে যাব কন্যাদের, এনিয়ে বাড়তি টেনশন। আমাদের মেয়েদের পাহারা দেয়াই আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।

সমাজ এভাবে চলতে থাকলে কন্যা সন্তানদের অধিকার আরো সীমিত হবে। কন্যা লালন পালনে অভিভাবকের বাড়তি কষ্টের কথা চিন্তা করে কন্যা সন্তানের প্রতি সেকেলে মনোভাব আরো কঠিন আকারে সমাজে জেঁকে বসবে। কন্যা সন্তানদের প্রতি সামাজিক কুসংস্কার কিছুটা দূর হতে না হতে শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যার মতো অনুসর্গ নতুন করে যুক্ত হওয়ায় আরো ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে যুবকদের পাশাপাশি শিশুরাও।

আমাদের সমাজে এক ধরনের অপ্রাপ্তি কাজ করে। এ অপ্রাপ্তি ও পরাজয় সমাজে নাগরিক ও সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত করছে। এছাড়া আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও আমাদের রক্ষা করতে পারছে না। আমাদের বিনোদন ও শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে অনেক ধরনের ত্রুটি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গতানুগতিক সমাজ থেকে আধুনিক সমাজে রূপান্তরের প্রতিযোগিতা। আমাদের মানসিকতা পরিবর্তনের আগে আধুনিক সমাজের উপকরণ আমাদের সমাজে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মূল্যবোধের জায়গায় পশ্চিমা মূল্যবোধ ও ধারণার সংমিশ্রণ হয়েছে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার উপযোগী না হয়েও আমরা আধুনিকতার দোহাই দিয়ে তা ব্যবহার করছি। যার বাড়তি চাপ ও নানা রকমের বিকৃতি আমরা সইতে পারছি না। ফলে আমাদের মধ্যে এ ধরনের মানসিকতা তৈরি হয়েছে।

গতানুগতিক চিন্তাধারা ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বে আজ আমাদের শিশুরা, বিশেষত কন্যা সন্তানরা ভিকটিম। আমরা মনে-প্রাণে, চিন্তায়, মূল্যবোধে ও শিক্ষা-দীক্ষায় আধুনিক না হয়েও আধুনিকতার লেবাস পরছি।

উচিত ছিল, আগে মনে-মননে আধুনিক হওয়া। কিন্তু তা আমরা হইনি। আমরা অনেক অনাধুনিক ও পশ্চাৎপদ নীতি ধারণ করছি। যেমন শিশু ধর্ষণের মতো অপরাধ বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি, যা অত্যন্ত পশ্চাৎপদ একটি আচরণ। এসব অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব ও বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা ও বিলম্ব অপরাধ বাড়ার পেছনে প্রণোদনা দিচ্ছে। এখনই এসব অবস্থার অবসান হোক। অন্তত পদক্ষেপ নেয়া হোক এসব থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে।

তথাকথিত আধুনিক না হয়ে চিন্তা ও মননে আধুনিক হওয়া জরুরি, এ কথাটি বিবেচনায় নিয়ে তৎপরতা চালানো হোক মানুষের পিছিয়ে থাকা মন ও মানসিকতাকে উন্নত করার জন্য। লোক দেখানো শিক্ষা আর তথাকথিত উন্নত না হয়ে মানবিক হওয়া আবশ্যক। শিশুদের, বিশেষত কন্যা শিশুদের উপযোগী সমাজ নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। নইলে কন্যা সন্তানদের অভিভাবকদের কষ্ট আরো বাড়বে। তাদের সুখে এসে হতাশা ও আতঙ্ক মিশবে। এক সময় কন্যা সন্তানদের লালন পালনের সুখও দুঃখে রূপান্তরিত হবে। যা হবে আমাদের সমাজের জন্য বড় কলঙ্ক ও অপুরণীয় ক্ষতি এবং পিছিয়ে পড়ার কারণ।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

আপনার মতামত লিখুন :