বাণিজ্যমন্ত্রী কবে যাবেন?

প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গত ২৩ নভেম্বর এই কলামে ‘গুজবের পেছনে ষড়যন্ত্র?’ শিরোনামে লিখেছিলাম, ‘পেঁয়াজের সঙ্কট কেটেছে, লবণের সঙ্কট সৃষ্টির চেষ্টা সফল হয়নি। তবে ষড়যন্ত্রকারীরা কিন্তু থেমে নেই। থেমে থাকবেও না। তারা পেঁয়াজ দিয়ে শুরু করেছে, লবণ দিয়ে চেষ্টা করেছে। এরপর চাল, আটা, তেল দিয়ে চেষ্টা করতে পারে।

শুধু ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করলেই হবে না; ষড়যন্ত্রকারীদের ধরতে হবে। সরকার নিশ্চয়ই জানে, ষড়যন্ত্রকারী কারা। তাদের ধরতে হবে। সাধারণ মানুষ রাজনীতি বোঝে না; তারা চায় নিশ্চিন্তে থাকতে। কারা লবণ নিয়ে ফেসবুকে গুজব ছড়িয়েছে, এটা চিহ্নিত করা কঠিন কিছু নয়। পরবর্তী সম্ভাব্য গুজব সামাল দিতে এদের চিহ্নিত করা ও ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’

কিন্তু বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম, সেই লেখার ৯ দিন পরও পেঁয়াজের সঙ্কট কাটে তো নাই-ই, বরং আরো প্রলম্বিত ও প্রকট হয়েছে। পেঁয়াজের সঙ্কটটা আসলে তিনমাসেরও বেশি সময়ের। মাঝে দুয়েকবার দাম কমেছে, তাই আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু আসলে সমস্যা কাটেনি।

বাজারে সরবরাহ না বাড়লে শুধু আশা দিয়ে তো আর সমস্যা মিটবে না। পেঁয়াজের সঙ্কট মেটাতে হলে সরবরাহ বাড়াতে হবে, বাজার মনিটর করতে হবে। এই কাজগুলো একদমই হয়নি। তিনমাস ধরে একটা সঙ্কট ঝুলে থাকবে, আর আমরা কিছুই করতে পারবো না; এটা হতে পারে না, হওয়া উচিত নয়।

ভাগ্য ভালো, পেঁয়াজ কোনো অপরিহার্য সবজি নয়। চাইলেই পেঁয়াজ ছাড়া দিব্যি চালিয়ে নেয়া সম্ভব। অন্তত পেঁয়াজের ব্যবহার কমিয়ে দেয়া যায়। আমি অনেককে চিনি, যারা কখনোই পেঁয়াজ খান না। দাম বাড়ার পর অনেকে পেঁয়াজের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে পেঁয়াজ না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অনেকে সে পরামর্শ মেনে পেঁয়াজ কেনা বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছেন। আমি নিজেও ন্যায্যদামে না আসা পর্যন্ত পেঁয়াজ কেনা বন্ধ রেখেছি। কিন্তু তাতে সমস্যার তো সমাধান হয়নি। পেঁয়াজের সঙ্কট জটিল হলেও অপরিহার্য না হওয়ায়, প্রভাব তেমন পড়েনি। আমার খালি ভয়, এটা যদি পেঁয়াজ না হয়ে কোনো নিত্যপণ্য হতো! কী ভয়ঙ্কর ভাবনা।

পেঁয়াজের সমস্যা কিন্তু আচমকা নাজিল হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ের মতো সাগরেও তৈরি হয়নি। আমাদের চোখের সামনে আমাদের উদাসীনতায় পেঁয়াজ সঙ্কট আজ জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। অনেকে পেঁয়াজ সঙ্কটের জন্য ভারতকে দায়ী করেন। আমিও করি। কারণ বাংলাদেশের পেঁয়াজ আমদানি পুরোটাই ভারতনির্ভর। তাই গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পরই বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার পাগলা ঘোড়ায় চড়ে বসে। কিন্তু আপনি যদি ১ ডিসেম্বর এসেও পেঁয়াজের দামের জন্য ভারতকে দায়ী করেন, তাহলে মানতেই হবে আপনি নাচতে জানেন না।

ভারত কিন্তু হঠাৎ করে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেনি। এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে সঙ্কটের একটা আগাম বার্তা দিয়েছিল। তাছাড়া বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও পেঁয়াজ সঙ্কটের আশঙ্কা করছিলেন। কিন্তু আমরা তাদের কথা আমলে নেইনি।

পেঁয়াজ সঙ্কটের দায় ভারতের কাঁধে চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। কারণ ভারত তো নিজেদের সমস্যা না মিটিয়ে আপনাকে পেঁয়াজ দেবে না। মহারাষ্ট্রে বন্যায় পেঁয়াজের উৎপাদন কম হওয়ায় এবার ভারতেই পেঁয়াজের সঙ্কট। ভারতেও পেঁয়াজের কেজি একশ টাকায় উঠেছে। তা নিয়ে সেখানকার সোশ্যাল মিডিয়ায় নানান ট্রল হচ্ছে।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যখন সঙ্কটের কথা বলছিলেন, তখনই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। অন্তত ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত যখন পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিল, তখনও হতে পারতেন। আর ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত রপ্তানি বন্ধ করার পরও যদি সরকার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতো, তাহলেও এতদিন দেশ পেঁয়াজে সয়লাব হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ১ ডিসেম্বরেও যখন বাণিজ্যমন্ত্রী ভারতের দোষ দেন, তখন বুঝি আসলে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বাণিজ্যমন্ত্রীর নেই। তিনি বসে আছেন কবে দেশি পেঁয়াজ বাজারে উঠবে সেই আশায়।

সঙ্কট সমাধান করতে না পারলেও সঙ্কট ঘনীভূত করার ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায় আছে। ৮ নভেম্বর তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকার নিচে নামবে না। এভাবে দাম বেঁধে দিয়ে তিনি দাম বাড়ার এক ধরনের উস্কানি দিয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রীর সেই কথার পর আর পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকার নিচে নামেনি। বরং তাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে পেঁয়াজ ডাবল সেঞ্চুরি করেছে। কথায় বলে, সময়ের এক ফোড়, অসময়ের দশ ফোড়। সেপ্টেম্বরে উদ্যোগ নিলে মিশর, উজবেকিস্তান নয়; মঙ্গল গ্রহ থেকেও পেঁয়াজ আনা যেতো। এখন বিমানে ২৫০ টাকা দামে পেঁয়াজ এনে ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করছে সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী আবার আমাদের সেই খোঁটাও দিচ্ছেন।

তবে ডিসেম্বরের ১ তারিখেও যখন বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, পেঁয়াজের বাজার কবে স্বাভাবিক হবে বলা মুশকিল। তখন আসলে বলতেই হয়, ব্যর্থতার দায় নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী কবে যাবেন, সেটা জানা জরুরি।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :