বায়ু দূষণ: ঢাকার পর চট্টগ্রাম!

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.

ছবি: বার্তা২৪.

  • Font increase
  • Font Decrease

দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী শহরগুলোর মধ্যে দিল্লি, ঢাকা, চট্টগ্রাম অন্যতম। প্রাচীনত্ব ও গুরুত্বের দিক থেকে এই তিনটি শহরের অবস্থান সামনের কাতারে। শুধু রাজনৈতিক নয়, আর্থ-সামাজিক বিবেচনাতেও শহর তিনটির তাৎপর্য অপরিসীম।

শতশত বছরের যাত্রাপথে শহর তিনটি চরম সঙ্কটে নিপতিত হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। প্রধানত পরিবেশগত বিপর্যয়ের কুফল চেপে বসেছে শহরগুলোতে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভয়ঙ্কর বায়ু দূষণের মাধ্যমে। দিনে দিনে বিপদ অক্টোপাসের মতো ক্রমশই চেপে বসছে।

সবচেয়ে মারাত্মক যে তথ্য সবাইকে আতঙ্কিত করছে, তাহলো দিল্লির মতো ঢাকাও বায়ু দূষণে বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করেছে। বার্তা২৪.কম ভিডিও স্টোরি ও রিপোর্টের মাধ্যমে অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ বায়ু দূষণ পরিস্থিতি সরেজমিনে তুলে ধরেছে।

আরও পড়ুন: দূষিত শহরের শীর্ষে ঢাকা

বায়ু দূষণের আঘাত বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও আঘাত হেনেছে। চট্টগ্রাম শহরের বায়ু দূষণের মাত্রা প্রতিবছর বাড়ছে। বিভিন্ন মিডিয়া ও গবেষণা সংস্থার তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরের বায়ুর মানমাত্রা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি বস্তুকণা বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাতাসে উড়ছে। তার মানে হলো, দূষণ প্রক্রিয়া চট্টগ্রামে ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সুন্দর ও সবুজ নগরী চট্টগ্রামের বায়ু দূষণের পেছনে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, কলকারখানার বর্জ্য এবং পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটার আগ্রাসনকে দায়ী করা হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, চট্টগ্রাম শহরের দূষণ মাত্রা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে, যার পেছনে অপরিকল্পিত শিল্পকারখানার নেতিবাচক ভূমিকাও রয়েছে।

সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্য, বিভিন্ন প্রতিবেদন ও গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান দূষণ সমস্যাকে আরও তীব্র করছে বিভিন্ন সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি। বিশেষত শীতকালে ধুলায় ধূসর হয়ে যায় নগরীর অধিকাংশ এলাকা। তখন রাস্তায় চলতে নাক-মুখে মাস্ক পড়েও রক্ষা পায় না সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি তৈরি হয় নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যাও। দূষণে আক্রান্ত হয়ে নানা রোগে ভুগছে মানুষজন । বিশেষ করে বয়স্ক এবং শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

চট্টগ্রামে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, এখানে শুষ্ক মৌসুম মানেই ধূলার মৌসুম। এমনটি হয় বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত কাজের জন্য। একাধিক সংস্থা একসাথে নগরীর রাস্তা-ঘাট, খাল-নালা এবং ফুটপাত খোঁড়াখুঁড়ি করায় ভয়াবহ ধূলি দূষণের সৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে নগরীর মাঝখানে নাসিরাবাদ, বায়জিদ এলাকায় ভারি শিল্পকারখানা থেকে কালো ধুঁয়া উদগীরণ হচ্ছে সর্বদা। রড, সিমেন্টের কারখানা, রি-রোলিং ও রিফাইনারি থেকে গনগনে আগুনে পুড়ে রাসায়নিক ও ধাতব বর্জ্য মিশে যাচ্ছে চট্টগ্রামের বাতাসে।

পরিবেশ অধিদফতর ও বিভিন্ন দায়িত্বশীল সরকারি প্রতিষ্ঠানে কতটুকু উদাসীন ও বেখেয়াল হতে পারে, তার প্রমাণ চট্টগ্রাম। শহরের বুকের মধ্যে নাসিরাবাদ, বায়জিদ, অক্সিজেন এলাকায় অত্যন্ত বিপজ্জনক কলকারখানা দিব্যি চলছে। নামকরা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শত শত ছোট ও মাঝারি কলকারখানার তেল-মবিল পোড়া ধুঁয়া আর লৌহজাত কণিকা চট্টগ্রামের বাতাস ভারি ও বিষাক্ত করে তুলছে প্রতিমুহূর্তে।

চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ রুবি গেট, পলিটেকনিক এলাকায় বসানো হয়েছে ট্রাকস্ট্যান্ড। হাজার হাজার ট্রাকের ধুঁয়া অন্ধকার করে ফেলছে নগরীর আকাশ-বাতাস। মানুষের বুক ভারাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে দূষিত ও বিষাক্ত বাতাসে।

নগরীর চারপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইটভাটা। সেখানকার গনগনে আগুন থেকে বিষাক্ত কার্বন মিশছে বাতাসে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন কালো ধুঁয়া ছড়াচ্ছে। কলকারখানা রাসায়নিক বর্জ্য ও ধাতব কণিকা ছিটিয়ে দিচ্ছে। ফলে শুধু বাতাস নয়, কোনও কোনও এলাকার গাছপালা প্রাণহীন হয়ে মারা যাচ্ছে। পথে তো বটেই বহুতল ভবনের উপরের ফ্ল্যাটে থেকেও ধূলা দূষণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছেনা। দরজা-জানালা খোলা রাখলে কাপড় এবং আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিষাক্ত ও দূষিত ধূলার আস্তরণ পড়ছে ঘরে এবং মানুষের ফুসফুসে।

চট্টগ্রামের দূষণ পরিস্থিতি কত ভয়াবহ তা পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অফিসের পরিচালনাধীন কন্টিনিউস এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং স্টেশন’র ডাটা পর্যালোচনা করলেই টের পাওয়া যায়। দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রামের বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণা-১০ (চগ১০) এর পরিমাণ বছরের শুরুতে প্রথম তিন মাস জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ এবং বছরের শেষের দুই মাস নভেম্বর, ও ডিসেম্বর মাসে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ এর আদর্শমান ১৫০ ক্রম/স৩ অপেক্ষা বেশি । ২০১৮ সালে চগ১০ এর সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল জানুয়ারি মাসে ২৭৮ ক্রম/স৩। এবং ২০১৫ সাল থেকে চগ-১০ এর পরিমাণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রত্যেক বছর চগ-১০ এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৫ সালে ছিল ২০২ ক্রম/স৩ ২০১৬ সালে ছিল ২১৬ ক্রম/স৩ ২০১৭ সালে ছিল ২৩২ ক্রম/স৩ এবং ২০১৮ সালে ছিল ২৭৮ ক্রম/স৩ এবং ২০১৯ সালে নভেম্বরে ছিল ৩০৯.২৪ ক্রম/স৩ । একইভাবে চট্টগ্রামের বাতাসে অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা-২.৫ (চগ২.৫) এর পরিমাণ বছরের শুরুতে প্রথম তিন মাস জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ এবং বছরের শেষের দুই মাস নভেম্বর, ও ডিসেম্বর মাসে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ এর আদর্শমান ৬৫ ক্রম/স৩ অপেক্ষা বেশি। এবং প্রতিবছর তা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। সরকারি নথি ও মিডিয়ায় প্রকাশিত এসব তথ্যই প্রমাণ দিচ্ছে যে, মায়াবী-সুন্দর শহর চট্টগ্রাম দূষণের কবলে নিপতিত হয়ে নরককুণ্ডে পরিণত হচ্ছে।

দূষণের ক্রমবর্ধমান আঘাতে চট্টগ্রামের পরিবেশ ও বায়ু এতটাই আক্রান্ত হয়েছে যে, স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়াও কখনো কখনো কষ্টকর হচ্ছে। ধূলার কারণে বিবর্ণ হয়ে পড়ছে রাস্তার পাশের সব গাছপালা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, যক্ষ্মা, ব্রংকাইটিসের মতো রোগবালাই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ু দূষণের কারণে মানুষের শরীরে ক্ষতিজনক রোগ ছাড়াও ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজসহ (সিওপিডি) বিভিন্ন রোগ বাড়ছে।

দূষণের কারণে নাগরির জীবনে অস্থিরতা ও মানসিক হতাশাও বাড়ছে। বসবাসের সজীব শহর হয়ে যাচ্ছে মৃতপ্রায়। মানুষ হচ্ছে বিষণ্ণ ও রুগ্ন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান ও বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম শহর পরিবেশ অনুকূল ঐতিহ্য থেকে দূষণের ভীতিকর জনপদে পরিণত হচ্ছে। দিল্লি, ঢাকার পরপর চট্টগ্রামও ক্রমে ক্রমে পরিণত হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম দূষিত ও বিপজ্জনক শহর। এই বিপদ থেকে কে বাঁচাবে চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামবাসীকে?

ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম, প্রফেসর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :