হেগে কি রোহিঙ্গারা ন্যায়বিচার পাবে?

এরশাদুল আলম প্রিন্স
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আগামীকাল থেকে মামলার শুনানি শুরু হতে যাচ্ছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে হত্যা, নির্যাতন, ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে তাদের দেশছাড়া করতে বাধ্য করেছে। একটি জনগোষ্ঠীকে দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে বর্ণিত সবগুলো জঘন্য অপরাধই তারা সংঘটিত করেছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোনো দেশই সেভাবে জোরালো কোনো প্রতিবাদ করেনি। প্রকারান্তরে বিশ্বমোড়লরা মিয়ানমারের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত ওআইসির হয়ে গাম্বিয়া আইসিজেতে এর বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে। আগামীকাল থেকে এর শুনানি শুরু।

গত মাসে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেছে। এখন এ মামলার তদন্ত ও শুনানি হবে। মিয়ানমার এ মামলাকে বেশ গুরুত্ব সহকারেই দেখছে। ইতোমধ্যে মিয়ানমারের নোবেল শান্তি কন্যা সু চি নেদারল্যান্ডের হেগে অবস্থান করছেন। গণমাধ্যমে দেখলাম নেদারল্যান্ডে সু চির সমর্থনে কিছু লোকজন সমাবেশ করছে। এটিও মিয়ানমারের এক কূটনীতি। কূটনীতির খেলায় মিয়ানমার বরাবরই এগিয়ে ছিল। সে তুলনায় আমরা প্রথম থেকেই কোনো কার্যকর বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে পারিনি।

যাই হোক- মামলার প্রক্রিয়া হিসেবে গাম্বিয়া অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপের জন্য আবেদন করেছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আরাকান রাজ্যে বিদ্যমান অবস্থা বজায় রাখার জন্য গাম্বিয়া আদেশ চাইবে। যদিও আমরা আগেই জানি, মিয়ানমার সেনা কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে তাদের ভিটেমাটিতে আগুন দিয় পুড়িয়ে দিয়েছে বহু আগেই। বুলডোজার দিয়ে অপরাধের সব আলামত মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের কোনো চিহ্নই আজ আর সেভাবে নেই। অন্তত গণমাধ্যমে সে রকম তথ্যই আসছে। সেখানকার সব আলামত নষ্ট করার সর্বত চেষ্টা করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করেছে আজ দুই বছরের বেশি। এর মধ্যে প্রাকৃতিক কারণেই বহু আলামত মাটিতে মিশে গিয়েছে। কাজেই গাম্বিয়ার আবেদন গ্রহণ করলেও খুব একটা লাভ নেই। কারণ, মিয়ানমার বহু আগেই সব আলামত নষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু তারপরও চাইলেই সেখানে বসবাসের ইতিহাস ও নির্যাতনের ঘটনাপ্রবাহ গণমাধ্যম তথা সবার জানা আছে। সেসব আলামত প্রকাশ করা জরুরি। গাম্বিয়াকে সে ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে। কারণ গাম্বিয়া এ মামলার বাদী হলেও স্বার্থসংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপক্ষ মূলত বাংলাদেশ। সেকারণেই গাম্বিয়াকে সব রকম তথ্য প্রমাণ দিয়ে সাহায্য করতে হবে। বাংলাদেশ সে কাজটি করতে পারে। হাত-পা গুটিয়ে শুনানির সাক্ষী গোপাল হয়ে বসে থেকে কোনো লাভ নেই। বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধিদল নেদারল্যান্ডে গিয়েছেন। তারা কী ভূমিকা পালন করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এ মামলার সুরাহা কবে হবে তা বলা মুশকিল। আইনে এ বিষয়ে কিছু বলা নেই। অতীতে যেসব মামলা দায়ের হয়েছে তার আলোকে বলা যায় হয়তো চার পাঁচ বছর লেগে যেতে পারে। তবে এটি নির্ভর করে গাম্বিয়া ও মিয়ানমার কী কী তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তিতর্ক তুলে ধরে তার ওপর। ঐতিহাসিক, আইনি ও ঘটনাপ্রবাহের জটিল বিশ্লেষণে অনেক সময় লেগেও যেতে পারে। যদি কোনো জটিল বিষয়ের অবতারণা হয় তবে আরও সময় লেগে যেতে পারে।

আদালতের রায়ে মিয়ানমার শেষ পর্যন্ত দোষী হবে কি না সেটি আইন ও ঘটনার প্রশ্ন। তবে আপাত আদালতের এখতিয়ারকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সু চি এখন হেগে। অভিযুক্ত মিয়ানমার। চিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার গিয়ে সু চির পাশে দাঁড়িয়েছেন। চীন সু চিকে কৌশলগত পরামর্শ দিয়েছে।

এখানে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এর বিচারের এখতিয়ার ও প্রক্রিয়া ভিন্ন। সু চি হেগে গিয়েছেন কোনো আসামি হিসেবে নয়। কারণ আইসিজেতে কোনো ব্যক্তিগত আসামি থাকে না। গাম্বিয়ার অভিযোগ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। মিয়ানমারই আন্তর্জাতিক গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। তাই বিচার হবে মিয়ানমারেরই। তবে মিয়ানমারের অপরাধ যদি প্রমাণিত হয় তবে এর দায়ভারতো সে রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। রাষ্ট্র দায়ী হতে পারে, কিন্তু অপরাধের দায়ভার নিতে হয় রাষ্ট্রের নেতা-নেত্রীকেই। কিন্তু সে দায়ভার কোনো ফৌজদারি দণ্ড নয়। আদালত ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্ট কিছু নির্দেশনা দিতে পারে। হতে পারে রোহিঙ্গাদের তাদের বসতবাড়ি ফিরিয়ে দেয়ার আদেশ দিতে পারে আদালত। কিন্তু এখানে সু চি কোনো ফৌজদারি আসামি হিসেবে হেগে যাচ্ছেন না, এটি মনে রাখা দরকার।

সু চি হেগে গিয়েছেন মিয়ানমারের কয়েকজন প্রতিনিধি নিয়ে। শুনানিতে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগ করবে এটাই স্বাভাবিক। আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করবে।

এ মামলাটি আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) করা হলে সু চিকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা যেতো। কিন্তু আইসিসিতে মিয়ানমার এখনও স্বাক্ষর করেনি। তাই এর এখতিয়ার মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য না। তবে আইসিসিতে একটি তদন্ত চলমান আছে। এর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বলা কঠিন আইসিসিতে সু চিকে দায়ী করা যাবে কি না।

আইসিজের এই মামলায় কোনো দণ্ড হবে না, কারণ আইসিজে ফৌজদারি আদালত বা অপরাধ আদালত (ক্রিমিনাল কোর্ট) নয়। এই মামলায় অভিযুক্ত আছে, কিন্তু কোনো ব্যক্তিগত বিবাদী নেই। রাষ্ট্র নিজেই এখানে বাদী ও বিবাদী। এখানে কোনো ব্যক্তির অপরাধ বিচার করা হয় না, বিচার হয় রাষ্ট্রের দায় নিয়ে। যদি প্রমাণিত হয় যে মিয়ানমার গণহত্যা কনভেনশনের অধীনস্থ কোনো বাধ্যতামূলক বিধান ভঙ্গ করেছে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় তার অর্থ হবে মিয়ানমার দায়ী।

মিয়ানমার দায়ী হলে হয়তো তাকে ক্ষতিপূরণ (রেপ্যারেশন) দিতে হবে। সে ক্ষতিপূরণ কী তা এখনও পরিষ্কার নয়। হতে পারে রোহিঙ্গাদের আর্থিক, জায়গাজমি, ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি ফেরত দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারকে দোষী প্রমাণ করা গেলে আদালত রোহিঙ্গাদের একটা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করবে এটা বলাই যায়।

আপনার মতামত লিখুন :