আওয়ামী লীগের আসন্ন কাউন্সিল: পরিবর্তন না পুনরাবৃত্তি?

শুভ কিবরিয়া
শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তা২৪.কম

শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আগামী ২১ ও ২২ ডিসেম্বর ২০১৯ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ত্রিবার্ষিক এ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নতুন কমিটি গঠন করা হবে। এর আগে ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনাকে অষ্টমবারের মত সভাপতি ও ওবায়দুল কাদেরকে প্রথমবারের মত সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।

এই সম্মেলনে অতীতের মতই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উভয় পদে একজন করে প্রার্থী থাকায় দু’জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ টানা ১১ বছর ধরে ক্ষমতায়। এই সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলে ও সরকারে শুদ্ধি অভিযানের নামে এক ধরনের দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চলছে। চলমান আছে এই অভিযানের আতঙ্ক। আগামী বছর পালিত হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। দেশের রাষ্ট্রনৈতিক কাঠামোতে তো বটেই রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোতেও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতা এখনো অনুপস্থিত। দেশে রয়েছে সুশাসনের নানাবিধ সংকট। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পরিবারতন্ত্র এবং একক কর্তৃত্বের আবহের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগও একটা বড় ট্রান্সফরমেশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগে এক ধরনের নতুন প্রজন্মের অনুপ্রবেশ ঘটছে। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই নতুন কমিটিতে আরও বেশি সংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বাধ্যকাধকতা আছে। শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত কথা। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা কিংবা তার রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এবারের কেন্দ্রীয় কমিটির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে যাচ্ছে।

সভাপতি পদে শেখ হাসিনাই থাকবেন। এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী যদি তার পরিবারের কাউকে এই পদে অভিষিক্ত করতে চান, সেটা ভিন্ন কথা। সাধারণ সম্পাদক পদে সাম্প্রতিক অতীতে নির্বাচন হয়নি, হয়েছে সমঝোতা। এ ক্ষেত্রে দলীয় সভাপতির পছন্দের ব্যক্তি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবার সুযোগ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরই থাকবেন, নাকি নতুন কেউ আসবেন, সেটা বলা কঠিন। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী আছেন দলের বেশ কয়েকজন নেতা। ওবায়দুল কাদেরের শারীরিক অবস্থা এই দায়িত্ব পালনের পক্ষে কতটা উপযোগী, সেটাও একটা প্রশ্ন। দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনে শেখ হাসিনা এসব বিবেচনাকে প্রাধান্য দেবেন নিশ্চয়ই।

সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া ১৭ সদস্যের সভাপতি মণ্ডলীতে তিনটি পদ এখন ফাঁকা। বর্তমান কমিটির চারজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে তিনজন প্রায় ১০ বছর ধরে একই পদে আছেন। আট সদস্যের সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে ছয়জন গত তিন মেয়াদে একই পদে আছেন। বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকদের পদ ১৯টি ও কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ২৮ জন। এসব পদে কারা আসবেন, তা নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর নানাবিধ বিবেচনার ওপর।

০২.

গত ৬ ডিসেম্বর ধামন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন মন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগের আসন্ন কেন্দ্রীয় সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদে কি পরিবর্তন আসবে কি না জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের অবশ্য বলেছেন, সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসবে কি না, তা সভাপতিই ঠিক করবেন। পরিবর্তন হলেও আমরা স্বাগত জানাব আর তিনি যদি রাখেন, সেটাও তার ইচ্ছা। পার্সোনালি আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড।

এরই মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতৃত্বে যে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তাতে অনেক নতুন মুখ এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরাতনদের প্রমোশনও ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে একদম নতুন কাউকে শীর্ষপদে বসিয়েও দেয়া হয়েছে। আবার ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সিটিং এমপিদের বাইরে নতুন নেতা আনা হয়েছে। কাউন্সিল অধিবেশন করে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের নেতার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছেন শেখ বজলুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন মান্নান কচি। আর দক্ষিণের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন যথাক্রমে আবু আহাম্মদ মান্নাফি ও হুমায়ুন কবির। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মান্নাফি ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির গত কমিটিতে সহ-সভাপতি ছিলেন। আর উত্তরের সভাপতি বজলুর ছিলেন গত কমিটির সহ-সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক কচি ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এই ট্রেন্ড এবারের কাউন্সিল অধিবেশনে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মনোনয়নে অনুসরণ করা হতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

একদল নতুন মুখ আসতে পারে। মন্ত্রী পদে যারা আছেন, তাদের অনেককে দলের শীর্ষ পদ নাও দেয়া হতে পারে। এবারও সভাপতি মণ্ডলী থেকে কাউকে কাউকে উপদেষ্টা পরিষদে যেতে হতে পারে। উপদেষ্টা পরিষদ থেকে সভাপতি মণ্ডলীর সদস্যও হতে পারেন কেউ কেউ। সব পদে পরিবর্তন আসতে পারে। আসতে পারে নতুন মুখও।

গত সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও বোন শেখ রেহানা কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসতে পারেন বলে আলোচনা ছিল। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এবার আলোচনায় আছেন প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা হোসেন পুতুল। এছাড়া এবার সর্বোচ্চসংখ্যক নারীকে স্থান দেয়া হতে পারে। ওদিকে ৪৪ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদে খুব বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

০৩.

এবার টঙ্গী পৌরসভার সাবেক মেয়র আজমত উল্লা খান জেলা থেকে কেন্দ্রে আসতে পারেন। দুর্নীতির অভিযোগে দলীয় পদ ও মন্ত্রিত্ব হারানো সৈয়দ আবুল হোসেনও ফিরিতে পারেন। রাজশাহী, নরসিংদী ও খুলনার কোনো কোনো নেতা কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেতে পারেন।

কমিটিতে নতুন অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম, সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বোন সংসদ সদস্য সৈয়দা জাকিয়া নূর, সংসদ সদস্য আকবর হোসেন পাঠান (চিত্রনায়ক ফারুক), সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মাইনুদ্দীন হাসান চৌধুরী, বাহাদুর বেপারী, অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার প্রমুখ।

২০০৮ সালের পর আড়ালে চলে যাওয়া কিছু নেতাকে ফিরিয়ে আনা হতে পারে কেন্দ্রীয় কমিটিতে।

সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আনা হলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সুযোগ রয়েছে। দীপু মনি সাধারণ সম্পাদক হতে না পারলেও সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য হতে পারেন। আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হতে পারেন খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।

০৪.

১৯৮১ সালে দলকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দলের সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। অনেক দুর্দিন আর চড়াই উৎরাই পার হয়ে এখন দলের নিয়ন্ত্রণ শক্ত হাতে নিজের হাতে নিয়েছেন নিজ যোগ্যতায়। তার নেতৃত্বেই দল টানা ১১ বছর ধরে ক্ষমতায়। দলের সাফল্য যেমন আছে, চ্যালেঞ্জও এখন বহুমুখী। শেখ হাসিনার হাত ধরেই আওয়ামী লীগ এখন রূপান্তরের পথে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে আরও যোগ্যতার সঙ্গে সামনে টানতে দরকার দূরদর্শী সাহসী নেতৃত্ব। এবার সেই নেতা নির্বাচনের কাজটাই করবেন শেখ হাসিনা। এরই মধ্যে দলের বর্ষীয়ান নেতারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে পড়েছেন। এখন একদল নতুন নেতার সামনে এগিয়ে আসার সময় সমাগত। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে কি কাউকে এবার দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হবে? নাকি আবার ওবায়দুল কাদেরকেই বহাল রাখা হবে? এ প্রশ্নের উত্তর জানেন একমাত্র শেখ হাসিনা। সে কারণেই প্রশ্ন উঠছে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, নাকি বড় পরিবর্তন আসবে দলের কেন্দ্রিয় কমিটিতে। শেখ হাসিনা কি কোনো বড় চমক দেবেন, নাকি দলের এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে বর্তমান ধারাকেই চলমান রাখবেন? আপাতত এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

আপনার মতামত লিখুন :