ছুটি শেষে গ্রাম থেকে কী নিয়ে আসছেন?

মনোয়ার রুবেল
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

এ মাসের আট তারিখে যখন প্রথম করোনা রোগী ধরা পড়ে, তিনি ছিলেন একজন ইতালি প্রবাসী। কার্যত, তখন তা নিয়ে এত উৎকণ্ঠা সরকারের ছিল না।

তখন রাজউক ভবনের ঘড়িটি টিকটিক করে ঘুরছিল, শাহবাগে মুজিব শতবর্ষের কাউন্টডাউন ঘড়ি স্বাভাবিক নিয়মে লাল হয়ে জ্বলছিল এবং পল্টনের প্রেসগুলোয় একদল শ্রমিক মুজিব বর্ষের পোস্টার, ফেস্টুন, ডেংলার আঠা দিয়ে সেঁটে তৈরি করছিল।

দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকাকে স্থবির ঘোষণা করতে হয়েছে। ঢাকা দশ দিনের ছুটিতে চলে গিয়েছে। এখন এ শহরে চারজন মৃত ও জন চল্লিশেক করোনায় অসুস্থ।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে যখন ইতালি প্রবাসী ব্যক্তি আক্রান্ত হলেন তখন সরকারের তরফে বলা হলো সরকার করোনা মোকাবেলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তখন জনগণ কিছুটা নিশ্চিন্ত ছিল।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুরুতেই এর গুরুত্ব বুঝতে পেরে তিনি পরদিনই তাঁর পিতার জন্ম উৎসব সংকুচিত করার ঘোষণা দেন। কিন্তু তাঁর সহকর্মী মন্ত্রীগণ এর তাৎপর্য বুঝতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠে।

মার্চের শেষে এসে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা, বাস্তবায়নে ধীরগতি ও অদক্ষতা জন অসন্তোষের কারণ হয়েছে৷ জনগণ এতটাই আতঙ্কিত হয়েছেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়ার দুই বছর পরে কারামুক্তি তার কর্মী সমর্থকদের আন্দোলিত করেনি। তারা নিঃস্পৃহ।

দিন দশেক আগেও ঢাকার বাইরে ময়দানগুলো মাওলানারা ধর্মীয় জলসা করে মাতিয়েছিলেন, সৌদি আরবে আতঙ্কে মসজিদ বন্ধ করে দেয়া নিয়ে তারা সমালোচনা করছিলেন, লক্ষ্মীপুরে লাখ খানেক লোকের সমাগম নিয়ে অনলাইনে বিস্তর আলোচনা হচ্ছিল এবং সিলেটে শাহজালালের দরগায় তখনো ভিড় করে মাছেদের খাওয়ানো হচ্ছিল।

ঢাকার বাইরের এই চিত্র এখন বিরল। লক্ষ্মীপুর ও সিলেট প্রায় একঘরে। ছুটিতে বাসায় থাকার বদলে গ্রামে ছুটে যাওয়া মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে সড়কে সেনাবাহিনী নামছে প্রচার হচ্ছে। মাহফিল বন্ধ করা দেয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী এই মহামারিতে মারা গেছেন ২১২৯৫ জন, আক্রান্ত ৪,৭১,৪১৭ জন। চীন, ইতালি, স্পেন, ইরান, আমেরিকায় মৃত্যুর হার ব্যাপক। এসব রাষ্ট্রে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার।

বাংলাদেশে সরকারি তৎপরতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। পর্যাপ্ত টেস্ট কিট নেই। নেই চিকিৎসা কর্মীদের সুরক্ষা উপকরণ- পিপিই। গণমাধ্যমে সংবাদ বেরিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশে পিপিইর অতো দরকার নেই।

নেটিজেনরা বলছেন, তিনি সামগ্রিক পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না। সরকারের আরও কিছু মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে স্তুতিমূলক বক্তব্য দেয়ার, যেগুলো অপ্রয়োজনীয়। মূল সমস্যাকে গুরুত্বায়িত করেনা। বরং প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টাকে তারা জনগণের কাছে তুলে না ধরে উল্টো ভীত নাগরিকদের বিরক্ত করছেন।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত অসুস্থের সংখ্যা ৪০ জন। মৃতের সংখ্যা ৫ জন। শতকরা হারে ১২.৫০। এ হার ইতালি, স্পেন, চীনের চেয়ে অধিক।

দশদিনের ছুটিতে অর্ধকোটির মতো লোক ঢাকা ছেড়েছে। কোয়ারেন্টিন, যেটাকে বাংলা অনুবাদে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে 'সঙ্গরোধ" হিসেবে বর্ণনা করেছেন, মূলত তা বাস্তবায়নে ছুটি ঘোষণার পূর্বে কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। তার ফলে গ্রাম ও শহরে বিশাল সংখ্যক মানুষ গমনাগমনে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।

সরকার ঘটনার পূর্বাপর চিন্তা ও পরিকল্পনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বোধ করছে। টকশোগুলোতে বারবার প্রশ্ন আসছে সমন্বয়ের শূন্যতা আছে কিনা। থাকাটাও অবান্তর নয়। বিশ্বব্যাপী এমন দুর্যোগে উন্নত রাষ্ট্রগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। এ সমস্যায় জনগণের উচিত রাষ্ট্রকে সহায়তা করা।

ঢাকা ঈদের ছুটির মতো কার্যত এখন ফাঁকা। যারা শহরে আছেন তারা বাসায় থাকছেন। কিন্তু দশদিন পর গ্রাম ফেরত মানুষগুলো ঢাকার জন্য শরীরে কী পরজীবী নিয়ে আসেন তা-ই এখন বড় আশঙ্কা।

মনোয়ার রুবেল, কলামিস্ট

 

আপনার মতামত লিখুন :