আসুন শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াই

আসাদুজ্জামান কাজল
অধ্যাপক আবুল বারকাত ও ইনসেটে আসাদুজ্জামান কাজল

অধ্যাপক আবুল বারকাত ও ইনসেটে আসাদুজ্জামান কাজল

  • Font increase
  • Font Decrease

বর্তমানে আমরা প্রত্যেকেই চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন পার করছি। আমরা কেউই আমাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনে নেই; নেই স্বস্তিতে। শিক্ষার্থী-শিক্ষক যেমন শ্রেণিকক্ষে নেই, তেমনি অফিস-আদালতেও নেই স্বাভাবিক কর্মব্যবস্থা। করোনাভাইরাস আমাদের প্রত্যেকের জীবনের গতি কেড়ে নিয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই এক অস্থির সময় পার করছি।

এই কঠিন সময়ে, আমরা প্রত্যেকে যেমন নিজেকে নিয়ে ভাবছি, তেমনি ভাবছি অন্যকে নিয়েও। কিন্তু, এই পরিস্থিতিতে কি শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবছেন? শিক্ষকরা কি ভাবছেন তাদের শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবারের সঙ্গে কেমন দিন কাটাচ্ছে?

যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন অন্যজনকে সরাসরি সাহায্য করার সুযোগও কম তারপরও আমরা আমাদের পরামর্শ ও সহমর্মিতা দিয়ে একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়াতে পারি। কর্মক্ষেত্রের প্রত্যেকের প্রতি আমাদের কিছু নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে। যেমন, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়। এর বাইরেও শিক্ষার্থীর ভালো-মন্দ সকল সময়ে তাদের পাঁশে থেকে, তাকে আগ্রহী করা ও সাহস যোগানোও একজন শিক্ষকের অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব।

অবশ্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের বিষয়ে বর্তমানে নেতিবাচক ধারণাই বেশি। অভিযোগ করা হয়; শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক নন। ক্লাসরুমের বাইরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক বেশ শীতল। অভিযোগগুলো অনেকাংশেই সত্য এবং একজন শিক্ষক হিসেবেও আমি মনে করি, আমরা অনেকেই আমাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাসরুমের বাইরে সম্পর্ক রাখতে চাই না।

একজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুই হিসেবেই আমার কাছে মনে হয়েছে শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থেই শিক্ষকদের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু চায় না। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, খারাপ সময়ে তাদের সাহস দিবে, পাশে দাঁড়াবে এবং সঠিক সময়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দিবে; এটুকুই।

হয়তো আমরা এটুকুও দিতে ব্যর্থ হচ্ছি বলেই শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের বিষয়ে এই অভিযোগ করে যে, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খুব বেশি সম্পর্ক রাখতে চান না, শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবেন না।

এই পরিস্থিতিতে, গতকাল কয়েকটি অনলাইন পত্রিকায় একটি চিঠি পড়লাম; যেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান, গণমানুষের অর্থনীতিবিদ বলে খ্যাত ড. আবুল বারকাত তাদের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শুধু লিখেনই নি; তিনি তার বিভাগের সকল শিক্ষার্থীর ই-মেইল আইডি সংগ্রহ করে তাদের কাছে গতকাল চিঠিটি পাঠিয়েছেন। যেটি অবশ্যই একটি ব্যতিক্রম ঘটনা। এবং, যতটুকো জেনেছি; এতে শিক্ষার্থীরা যেমন আনন্দিত হয়েছে তেমনি শিক্ষার্থীরা এটা প্রত্যাশাই করেননি যে এই কঠিন সময়ে, ছুটির দিনে-যখন প্রত্যেকেই তার নিজেকে ও নিজের পারিবারকে নিয়ে অস্থির সময় পার করছে তখন তাদের বিভাগের চেয়ারম্যান তাদের প্রত্যেকের কাছে তাদের ও তাদের পরিবারকে স্মরণ করে চিঠি লিখবেন। চিঠিটিতে তিনি তার শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত না হয়ে, সাহসী হতে আহ্বান করেছেন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, স্বাস্থ্যবিধি নিজে মেনে চলা ও অন্যকে মানতে বলার পরামর্শ দিয়েছেন।

আবুল বারকাতের চিঠি

তিনি আরও লিখেছেন, যদিও বর্তমানে এ রোগমুক্তির কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি কিন্তু, অচিরেই মানুষ তার অসীম সক্ষমতা দিয়ে সেটা সম্ভব করবে এবং এর মাধ্যমে মানুষ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। তিনি তার চিঠিতে উল্লেখ করছেন, বংশ পরম্পরায় আমরা নানা সময়ে নানা বিপদের সম্মুখীন হয়েছি এবং প্রতিবারই মানুষ তার অসীম শক্তি ও সক্ষমতা দিয়ে সেই বিপদকে পরাস্ত করছে এবং এবারও করবে। তিনি এই চিঠিতে তার ব্যক্তিগত দুটি মোবাইল নম্বর দিয়ে লিখেছেন ‘‘আরও একটা কথা; তোমাদের শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখবে-প্রয়োজন যাই হোক না কেন কুণ্ঠাবোধ করবে না। কায়মনোবাক্যে আশা করি অতিদ্রুত আবার শ্রেণীকক্ষে ও শ্রেণীকক্ষের বাইরে তোমাদের সাথে দেখা হবে, কথা হবে।

নিঃসন্দেহে, এই চিঠি অধ্যাপক আবুল বারকাতের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশার আলো সঞ্চার করবে এবং তাদের সাহসী করবে। যেটি বর্তমানে খুবই প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, যখন শিক্ষার্থীরা বর্তমানে অভিযোগ করে যে, শিক্ষকরা তাদের সঙ্গে ক্লাসরুমের বাইরে কোনো সম্পর্ক রাখেন না তখন তিনি প্রমাণ করলেন আসলে তা নয়, শিক্ষার্থীরাই শিক্ষকদের প্রাণ। শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের ভুলে যান না।

এই চিঠিটি পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, আমাদের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের নিয়ে যে অভিযোগগুলো করে, তা পুরোপুরি সত্য নয়। আমাদের শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এখনও ভাবেন, তাদের অনুভব করেন, তাদের খারাপ কিছু হলে আমাদের শিক্ষকদের মন এখনও কাঁদে। বর্তমানে আমি যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়নরত। এখানে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আমাদের শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আমাদের কাছে ই-মেইল পাঠান। যেমন, বর্তমানে এখানে প্রায় মাস খানেক হলো সকল ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করোনাভাইরাসের জন্য এবং এই করোনাভাইরাসের নানা বিষয় নিয়ে আমাদের শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান ও ভিসি আমাদের কাছে মাঝে মাঝে ই-মেইল পাঠান। তাই, শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষকের চিঠি পড়ার একটা অভ্যাস আমার গত কয়েকমাসে তৈরি হয়েছে।

এখানে, আমার শিক্ষক, বিভাগের প্রধান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যে চিঠিগুলো পাঠান তার সঙ্গে অধ্যাপক আবুল বারকাতের চিঠির একটি বিশাল ব্যবধান আমার কাছে পরিলক্ষিত হয়েছে। সেটি হল, এখানকার শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান ও ভিসি যে ঠিঠিগুলো পাঠান; সেগুলোতে প্রাণ নেই, দরদ নেই এমনকি ভালোবাসারও ঘাটতি আছে। মনে হয়েছে, শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের লিখতে হবে; শিক্ষার্থীদের কিছু জানাতে হবে তাই তারা লিখেছেন। অন্যদিকে, অধ্যাপক আবুল বারকাতের চিঠি পড়ে মনে হলো; সত্যিকার অর্থেই তিনি শিক্ষার্থীদের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ব্যথিত ও তিনি তার শিক্ষার্থীদের এই খারাপ সময়ের জন্য কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি খুব দ্রুতই আবার তার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলিত হতে চান।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যেহেতু তিনি তারা শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি কিছু করতে পারছে না তাই একটি চিঠি দিয়ে তিনি তার শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তিনি তাদের পাশে আছেন; তিনি তাদেরকে ভুলে যাননি। যেটিই এখন শিক্ষার্থীদের কাছে অনেক বড় পাওয়া। কেননা আমরা এমনটি আমাদের দেশে লক্ষ্য করি না। পাশাপাশি, যেখানে অভিযোগ করা হয় শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাসরুমের বাইরে সম্পর্কই রাখেন না তখন এই কঠিন পরিস্থিতিতে তাদের স্মরণ করা ও তাদের জন্য কিছু লেখা অবশ্যই অপ্রত্যাশিত একটি বিষয়। এবং এই চিঠিতে তিনি তার ব্যক্তিগত দুটি মোবাইল নম্বর দিয়ে যে কোনো প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করেছেন।

নিশ্চয়ই, আমাদের প্রত্যেকেরই আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি দরদ ও ভালোবাসার কোনো ঘাটতি নেই। হয়তো আমরা সেগুলো প্রকাশ করি না বলেই শিক্ষার্থীরা মনে করে তাদের শিক্ষকরা তাদের অনুভব করেন না, বোঝেন না বা তাদের প্রতি আন্তরিক নন। আসুন, আমরা প্রত্যেকেই এই সময়ে, আমাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি অধ্যাপক আবুল বারকাতের মতো করে। তাদের আশ্বস্ত করি- তোমরা একা নও। তোমাদের শিক্ষকরা তোমাদের সঙ্গে আছেন। যে কোনো প্রয়োজনে তোমরা তোমাদের শিক্ষকদের পাশে পাবে। যেটি আমাদের শিক্ষার্থীদের মনোবল আরো বাড়িয়ে দেবে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য। তাদের সাথে এই যোগাযোগ, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অস্থিরতা দূর করতে যেমন ভূমিকা রাখবে তেমনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষকদের সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণার ও পরিবর্তন ঘটাবে।

আসাদুজ্জামান কাজল, প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :