করোনা মোকাবিলায় চীন আমেরিকার বন্ধু না শত্রু?

মো. হাসান তারেক
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাস আতঙ্কে রাতের ঘুম হারিয়ে গেছে বিশ্বনেতা, সাধারণ জনগণ, চিন্তাবিদ, ডাক্তার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে প্রথম করোনার উপস্থিতি ধরা পড়ে। এরপরে, করোনা ছড়িয়েছে সারাবিশ্বে, মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে জ্যামিতিক গতিতে।

তবে, চীন থামিয়ে দিয়েছে এই মৃত্যুর মিছিলকে। নতুন করে করোনার উপকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে পৃথিবীর শক্তিশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন করোনাভাইরাস এক দুঃস্বপ্নের নাম। কিন্তু, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি পারবে চীনকে সঙ্গে নিয়ে করোনামুক্ত আমেরিকা বা বিশ্ব উপহার দিতে? কেননা, চীনই হচ্ছে, এখন পর্যন্ত করোনা মোকাবিলায় প্রথম সফল দেশ।

চির বৈরী এই দুই দেশ যদি শুভ বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে এক সঙ্গে কাজ করে, তবে দ্রুততম সময়ে করোনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। করোনা হচ্ছে এমন এক ভয়ানক ভাইরাস যার লাগে না কোনো পাসপোর্ট, না আছে কোনো আদর্শ। করোনা ছড়িয়ে পড়ে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, দেশ থেকে দেশে। সংক্রমণের সময় করোনা যাচাই করে না সে ব্যক্তি আমেরিকান, চীনা না ইতালিয়ান।

যখন কোনো সংকট আমাদের সামনে চলে আসে তখন আমাদের অনেকেই অন্যকে এর জন্য দোষারোপ করি। করোনা সংকটকালেও তেমনি আমরা চীনকেই উপযুক্ত ভিলেন ভাবছি। কোথা থেকে প্রথম করোনা ছড়িয়ে ছিল? উত্তর চীন। এই করোনা সংকটকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে পারেনি কে? এই প্রশ্নের উত্তর সমালোচকরা নিঃসন্দেহে দিবে চীন। তবে, চীনও পারে না একদমই দায়ভার এড়িয়ে যেতে। এ কারণে, শুরু থেকেই সন্দেহের তীর ছিল চীনের দিকেই।

ইতালির ন্যাশনালিস্ট লীগ পার্টির নেতা মাত্তেও সালভিনি এজন্য অভিযোগ করেছিলেন, চীনই বিশ্বে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ছড়িয়েছে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস। একই সময়ে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও করোনাভাইরাসকে "চাইনিজ ফ্লু" নামে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাহলে, কি সামনের দিনে এটি "আমেরিকান ফ্লু" নামে পরিচিতি পেতে যাচ্ছে? তবে, ভাগ্যিস এই যাত্রায় ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এই বক্তব্য থেকে সরে এসে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। দিন যতই গড়িয়েছে ততই দেখা যাচ্ছে, নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা জাতি এর জন্য দায়ী নয়। এ কারণে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে, বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

চীনকে দোষারোপ করে আমেরিকা যেমন তার ব্যর্থতা এড়িয়ে যেতে পারে না, তেমনি ব্যর্থতা এড়াতে পারে না অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলোও। আমেরিকার নিজের ব্যর্থতা হচ্ছে যে, তারা এটিকে গুরুত্ব দেয়নি। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া যখন জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে সংক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করলো তখন আমেরিকা কী করেছিল? আমেরিকা তাহলে নিঃসন্দেহে ২০১২ সালের মার্স, ২০০৯ সালের সোয়াইন ফ্লু, ২০০৩ সালের সার্সের সংক্রমণ থেকে শিক্ষা নিতে পারেনি।

দক্ষিণ কোরিয়া যেখানে প্রথম দিনে ১০,০০০ নাগরিক, পরে ২০,০০০ নাগরিকের করোনা পরীক্ষা করল তখন আমেরিকা কী করেছিল? তাই অন্যকে দোষারোপ না করে নিজেদের ব্যর্থতাগুলো নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে অন্যের সফলতাকে সাধুবাদ দেওয়া উচিত।

চীনকে যতই দোষারোপ করা হোক না কেন, চীনের ডাক্তার লি ওয়েনলিয়াং প্রথম ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৯ এই ভাইরাসের কথা বলেছিলেন। তাছাড়া, ২০ জানুয়ারি, ২০২০ চীনই পৃথিবীকে প্রথম এই ভয়ানক ভাইরাস কীভাবে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় তা বলেছিল।

চীনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে এই ভাইরাসের জীনোম, অসুস্থতার ধরন জানিয়েছিল। চীনের দেওয়া তথ্য মতে, বোস্টন ভিত্তিক কোম্পানি ম্যাডোনা দুই মাসের কম সময়ে এর ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করে এখন মার্কিন সংস্থা এফডিএয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায়। চীন এই ভাইরাস ঠেকাতে সারা উহান, হুবেই প্রদেশে ২১ জানুয়ারি থেকে কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছিল। সব জায়গায় চীন সরকার চেকপোস্ট, টেস্টের ব্যবস্থা করেছিল। চীন সরকার হোটেল, স্টেডিয়াম, স্কুলগুলোকে মেডিকেল সেন্টারে রূপান্তরিত করেছিল। তাছাড়া, চীন সরকার দশ দিনে এক হাজার শয্যার জরুরি হাসপাতাল নির্মাণ করেছিল দ্রুততার সঙ্গে এবং চিকিৎসার সামগ্রী সরবরাহ করেছিল সর্বত্র।

এই বিশাল প্রচেষ্টার সঙ্গে জনগণের সহায়তার কারণে চীন এখন সফল। এই কারণে, এখন আমেরিকার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপল, স্টারবাকস ও ম্যাকডোনাল্ডস তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার খুলতে যাচ্ছে চীনে।

অন্যদিকে, আমেরিকায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা। এজন্য, আমেরিকার উচিত হবে শি চিন পিং যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তাকে সাধুবাদ জানিয়ে হার্ড ডিপ্লোম্যাসি থেকে সরে গিয়ে সফট ডিপ্লোম্যাসি শুরু করা। নতুবা, দীর্ঘমেয়াদে পিছিয়ে পড়বে আমেরিকা। নিঃসন্দেহে তাই বলা যায়, মানব সভ্যতার এই দুঃসময়ে এই দুই পরাশক্তির শুভ বুদ্ধির উদয় অত্যন্ত জরুরি।

মো. হাসান তারেক: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ডক্টর মালিকা কলেজ, ঢাকা।

আপনার মতামত লিখুন :