ভাইরে, মোর জইন্যে একটা ঘর থুইস

নাহিদ হাসান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১.
ভাইরে, মোর জইন্যে একটা ঘর থুইস। বাড়িত যায়া সবজী আবাদ করিম। ঢাকা শহর ভালো নাগে না। ফ্ল্যাটত থাইতে থাইতে মেজাজ খারাপ হয়া যায়। কথাগুলো বলেছে ঢাকার খিলখেতের নামাপাড়া পানির পাম্প সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ছোট বোন মাকছুদা আখতার নিঝুম। নিজে শিক্ষিকা সে। এটা একটা নমুনা মাত্র। লাখ লাখ ফ্ল্যাট বাসিন্দাদের একজন। যারা বিলাসী ফ্লাটে হাঁসফাঁস করছে। এই হাহাকার সবার। সবাই গাঁয়ে ফিরতে চায়।

পুঁজিবাদ নাকি বড়ই দেখনদার। সে বাহির সাজায়। মানুষকে ঘর থেকে টেনে রাস্তায় দাঁড় করায়। বাইরেই তাই খাওয়া-দাওয়া, ঘুম। এমনকি যৌনতাও। এতে সে ঘর হারিয়েছে। বাড়ি বলতে যে ছায়া, সেটি আর নেই। তা এখন জেলখানাও। বাংলাদেশের মত দেশে হয়েছে না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থা।

একক পরিবারের বসতি এলাকা হিসেবে শহর গড়ে উঠেছে। আত্মীয়-স্বজন এখানে অনাহুত। কি বাংলাদেশ কি বিদেশ। ব্যক্তিগত সুবিধাকে কেন্দ্র করে গাড়ি নির্ভরতা বেড়েছে। রাস্তাও হয়েছে সেভাবে। ফলে শপিংমলগুলোই সামাজিকীকরণের স্থান। বহুতল ভবন আর বস্তির ভেদ এখানে নেই। দু জায়গাতেই বন্দি হয়ে মানুষ কাতরায়। মানুষ এখানে অসামাজিক, যান্ত্রিক, বিচ্ছিন্ন আর প্রতিহিংসাপরায়ণ। কিন্তু করোনার শিক্ষা হল জীবন প্রকৃতিময়। ভারতীয় স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম তার দাবি। করোনার মহামারি তাই নগরীময়। গ্রামে গ্রামে যাদের শনাক্তের খবর আসছে, তারাও শহর ফেরত।

২.
বাড়ির বাইরে মানুষ সাধারণত তিন ধরনের কাজ করে। ১. আবশ্যকীয়, ২. ঐচ্ছিক ও ৩. সামাজিক। যেসব কাজ মানুষকে করতেই হয়, সেগুলো আবশ্যকীয় কাজ। যেমন- স্কুলে যাওয়া, কর্মস্থলে যাওয়া, বাজার করা ইত্যাদি। এগুলো ছকবদ্ধ জীবনের অংশ। জীবিকার সাথে যুক্ত। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি যাই আসুক, করতেই হবে। কিন্তু ঐচ্ছিক কাজগুলো ইচ্ছা, সময় ও সুবিধার ওপর নির্ভরশীল। হাঁটা, রোদ পোহানো, ব্যায়াম, আড্ডা, খেলাধুলা ইত্যাদি হল ঐচ্ছিক কাজ।

মানেটা হল বাইরের পরিবেশ মানসম্মত হলে বাইরের কাজগুলো বেশি সময় সংগঠিত হয়। তখন একটু বেশি আড্ডা দেয়, গল্প করে, খেলাধুলা হয়। ইউরোপ বাহিরটাকে মোটামুটি মানসম্মত করেছে। সেখানে তাই সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বলা হয়, মানুষ যত বাইরে থাকে ততবেশি অন্যদের সাথে দেখা হয়, তত বেশি কথা হয়। দেখা-শোনা ও পরিচয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মত দেশে, শহর হয়েছে গ্রাসাচ্ছেদনের জায়গা। এখানে আবশ্যকীয় ও ঐচ্ছিক কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সংগঠিত না হওয়ায় সমাজ তৈরি হয়নি।

করোনা পরিস্থিতি বিষয়টিকে স্পষ্ট করেছে। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ শহর ছেড়েছে। কারণ শহর আশ্রয় দিতে অক্ষম। কিন্তু গ্রামে? যে বাড়িতে করোনার রোগী পাওয়া গেছে, সেই বাড়িতে গ্রামবাসীরা খাবার পৌঁছে দিয়েছে রুটিন মেনে। গ্রামে প্রবেশের রাস্তায় বাঁশ দিয়ে লক ডাউন সফল করেছে স্বেচ্ছাশ্রমে। অর্থাৎ মানুষের সামাজিক কার্যকলাপগুলো আকর্ষণীয় ও অর্থবহ করে তুলতে আবাসিক এলাকা গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকরা বলছেন, বিনয়ীভাব, সম্ভাব্য যোগাযোগের সূত্র, পূর্ব সম্পর্ক রক্ষার সুযোগ, সামাজিক তথ্যের উৎস এবং অনুপ্রেরণার উৎস-অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ যেখানে যত বেশি, আবাসিক এলাকা হিসেবে তা তত উন্নত।

খেলাধুলা মানুষের স্বভাবজাত ব্যাপার। ছোট-বড় সবার মধ্যেই তা আছে। যথেষ্ট পরিসর থাকা না থাকার ওপর খেলাধুলা নির্বাচন হয়। অর্থাৎ কোন ধরনের খেলাধুলা করা হবে, তা ঠিক হয় জায়গার ছোট-বড়'র ওপর। তারপর থাকে বসার জায়গা ও হাঁটার রাস্তা। মানে কিছু ঘটার পরিবেশ থাকলেই কিছু ঘটে। বাড়ির আঙিনায় যদি খেলাধুলা, বসা, আড্ডা দেওয়া, বাগান করার মত পরিবেশ থাকে, তখন সেখানে তা ঘটবে। করোনার এই ঘরবন্দিকালে পারিবারিক অশান্তির হার বৃদ্ধি খবর সকলেই জানি।

ঢাকার মত শহরগুলোতে আবাসিক এলাকাগুলো ফাঁকা ফাঁকা ও প্রাণহীন। অনেক কিছু করার থাকলেও কিছুই ঘটে না। মানুষ এখানে বাড়ি থেকে বের হয় আর প্রবেশ করে। বাড়ির সামনে নাগরিকদের স্থায়িত্ব খুবই কম। শিশুরা ঘরেই সময় কাটায় আর টেলিভিশনের বোকা বাক্সে বন্দি হয়। বৃদ্ধরাও তাই। ফলে জীবনে এক ধরনের শূন্যতা বিরাজ করে। বাড়ি বলতে যে বটবৃক্ষের মত ছায়া, তা এখানে নেই। তাই একটু ছুটি পেলেই মানুষ গ্রামে যায়।

বাড়ি বলতে আমরা যা জানি, তা কেমন? বাড়ি আর রাস্তার মাঝখানে কয়েকটা ধাপ থাকে। ঘরের জানালা থেকে সেগুলো দৃষ্টিগোচর হয়। অভিভাবকরা ঘর থেকেই শিশুদের ওপর নজর রাখতে পারতেন। ভেতরের আঙিনায় শিশুরা আর বাইরের আঙিনায় বড় শিশুরা খেলত। নির্দিষ্ট এলাকা ছোট-বড় ভাগে বিভক্ত থাকত। কোনও কোনও বাড়িতে গেইটও থাকত। গেইটগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, নিরাপত্তা বলয়ের জন্য থাকত। কয়েক বাড়ির লোক এক সাথে বাইরের আঙিনায় আড্ডা দিত। এতে পরস্পরের সম্পর্ক মজবুত হত। চুরিসহ ছোটখাটো অপরাধ কমে যেত। এটা অনেকটা একটা ভার্সিটির অধীনে অনেকগুলো বিভাগ ও অনুষদের মত। এই রকম স্থাপত্য না থাকার কারণে শহরের আবাসিক এলাকাগুলোতে করোনার সংক্রমণ অধিক হয়েছে। আর গ্রামগুলোতে চাইলেই লকডাউনের সার্থক প্রয়োগ সম্ভব হয়েছে। গ্রামে ঢোকার রাস্তায় পাহারা বসিয়েই হয়েছে। শিশুরা গ্রামের ভেতর খেলাধুলা করেছে নিশ্চিন্তে। স্কুল বন্ধ, তারা ইচ্ছেমত এগাছ ওগাছ চড়ে বেরিয়েছে। শুধু গাঁয়ের প্রবেশ মুখে হাত ধুয়ে ঢুকলেই হল। কিন্তু শহরের শিশুদের? এই করোনাকাল তাদের কাছে বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। সাধে কী আর মানুষ টাকা খরচ করে গ্রামে ফেরে?

জীবনে প্রাণের ছোঁয়া ও স্থাপত্যে প্রকৃতির স্পর্শ দিতে স্থাপত্য রীতিতে পরিবর্তন জরুরি। ইট-কাঠ কিংবা গাড়ি মানুষের জীবনে সমাধান যে নয়, করোনা কালের হাহাকার তা দেখিয়েছে।

নাহিদ হাসান: রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি।

আপনার মতামত লিখুন :