ছুটির পরে প্রধান চ্যালেঞ্জ গণপরিবহন

আমীন আল রশীদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনায় মৃত এবং শনাক্তের সংখ্যা প্রতিদিন যেভাবে বাড়ছে এবং বিভিন্ন স্থানে করোনার উপসর্গ নিয়ে যেভাবে মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে, তাতে পুরো মে মাস এবং আগামী মাসে মৃত আর শনাক্তের সংখ্যা ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা আন্দাজ করাও কঠিন।

গড়ে প্রতিদিন যদি এক হাজার লোকের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়, তাহলে আগামী মাসের মাঝামাঝি দেশে করোনা শনাক্তের সংখ্যা অর্ধ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে। আবার যেহেতু অগণিত আক্রান্ত মানুষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে থাকবেন, ফলে বাস্তবে এই সংখ্যা কত, তা জানা যাবে না। তবে অধিকাংশই সুস্থ হয়ে উঠবেন। আবার অনেকের মৃত্যুও হবে। ফলে জুন মাসের শেষ নাগাদ যে পরিসংখ্যানটা দাঁড়াবে, তা ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় যথেষ্ট কম হলেও সেটি আমাদের জন্য খুব একটা স্বস্তির বিষয় হবে না। অথচ অর্থনীতির কথা চিন্তা করে আমাদের জীবন-যাপন স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক দুর্বল অর্থনীতির দেশের পক্ষে মাসের পর মাস সবকিছু বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ছুটির পরে যে নতুন বাস্তবতার ভেতরে আমরা ঢুকে যাব, সেই দিনগুলোর জন্য আমাদের প্রস্তুতি কী এবং সেই প্রস্তুতি আমরা শুরু করেছি কি না?

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গত মার্চের আগেও যে বাংলাদেশে আমরা বসবাস করেছি, ছুটির পরে সেই বাংলাদেশ আমরা ফিরে পাব না। মার্চপূর্ব বাংলাদেশ ফিরে পেতে আমাদের কত মাস অপেক্ষা করতে হবে, তা আমরা জানি না। ফলে সেই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে অনেক কসরত করতে হবে। অনেক কিছু ত্যাগ করতে হবে। অনেক নতুন বিষয় যুক্ত করতে হবে।

এতদিন আমরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির প্রসঙ্গে ‘অ্যাডাপটেশন’ বা অভিযোজনের কথা বলে এসেছি। যে অভিযোজন বা খাপ খাইয়ের নেয়ার প্রক্রিয়ায় আমাদের কৃষি বেশ সফলও হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে উপকূলের মানুষের জানমাল রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এবার সে ধরনের অ্যাডাপটেশন বা অভিযোজন/খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রশ্ন আসবে চলমান ছুটি শেষ হবার পরে।

ছুটি শেষ হলে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসবে গণপরিবহনে মানুষের চলাচল। অস্বীকার করার উপায় নেই, করোনার থাবা থেকে বাঁচতে যে ধরনের ফিজিক্যাল ডিসট্যান্স বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেটি পালন করা রীতিমতো অসম্ভব। ছোট দেশ, জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। রাস্তায় বেরোলে মানুষের গায়ে মানুষের ধাক্কা লাগে। ঘরের ভেতরেও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়। শহরাঞ্চলে অধিকাংশ মানুষই দুই আড়াই রুমের বাসায় থাকেন। যেখানে ৪ থেকে ৫ জন লোক বসবাস করেন। ফলে তাদের মধ্যে কারো করোনার উপসর্গ দেখা দিলে তিনি কী করে বাসার ভেতরে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলবেন? অধিকাংশের বাসায় টয়লেট একটা। আরেকটু নিম্নবিত্ত এলাকায় গেলে একাধিক পরিবারকে একটি টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। মানুষে মানুষে গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি। ফলে কাউকে সঙ্গরোধে নিতে হলে বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রশ্ন দেখা দিলে তার ভরসা হাসপাতাল। কিন্তু করোনা এসে আমাদের হাসপাতাল তথা পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার যে ভয়াবহ দৈন্য আর অমানবিক চেহারাটা উন্মোচিত করে দিয়েছে, তাতে মানুষ এখন হাসপাতালের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হয়।

সুতরাং ছুটির পরে গণপরিবহন চালু হলে করোনা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হবে—যদি এই সময়ের মধ্যে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হয়। কিছুটা উন্নতি হলেও ঝুঁকি থাকবে। কারণ গণপরিবহনে প্রচুর মানুষ উঠবে, গাদাগাদি করে বসবে, রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে, একজনের গায়ে আরেকজনের ধাক্কা লাগবে। ফলে একটি বাসে যদি একজনও করোনায় আক্রান্ত রোগী থাকেন, তাহলে তার মাধ্যমে ৫০-৬০ জনের আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে। সবাই হয়তো মুখে মাস্ক পরেই বাসে উঠবেন। কিন্তু সেইসব মাস্ক কতটা কার্যকরভাবে তাদের সুরক্ষা দেবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ অনেকে সঠিকভাবে মাস্ক পরবেন না। অনেকে ভালো মানের মাস্ক কিনতে পারবেন না। সব মিলিয়ে আমাদের গণপরিবহনগুলো, যেমন বাস-লেগুনা-লঞ্চ-ট্রেন করোনার ঝুঁকি নতুন করে বাড়িয়ে দেবে। বেশি ঝুঁকি তৈরি হবে বয়স্ক এবং বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্তদের জন্য। কারণ এখন অধিকাংশই গৃহবন্দি।

ছুটি শেষ হলে সবাইকে কাজে দৌড়াতে হবে। অনেক বয়স্ক মানুষও কর্মজীবী বা ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে অনেক অসুস্থ লোকও থাকবেন। তাদেরকেও যেতে হবে। ফলে একজন সুস্থ মানুষ যদি করোনার বাহক হন, তাহলে তিনি নিজে হয়তো বেঁচে যাবেন, কিন্তু একজন বয়স্ক বা অন্য রোগে অসুস্থকে আক্রান্ত করে তার জীবন বিপন্ন করে তুলবেন।

তাহলে এই পরিস্থিতি আমরা কীভাবে মোকাবেলা করব? আমাদের দেশে কি সেই বাস্তবতা আছে যে, গণপরিবহনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সবাই বসবেন? এটা হয়তো সুইডেন বা ডেনমার্কের মতো দেশে সম্ভব, যেখানে লোকসংখ্যা এবং জনঘনত্ব কম এবং যাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বেশি। আবার বাংলাদেশের বাস্তবতা এমনও নয় যে, কর্মক্ষেত্রে যেতে সবাই ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করবেন কিংবা সবাই রিকশায় যাতায়াত করবেন। নিজের শহরে হয়তো মানুষের পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে যাওয়া আসার প্রবণতা বাড়বে। কিন্তু এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে হলে তাদেরকে কোনো না কোনো গণপরিবহনে উঠতে হবে। সেখানে কীভাবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে?

এক্ষেত্রে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারলে বাঁচার কিছুটা সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ করোনার ভয়ে ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষ যেভাবে স্বাস্থ্যসচেতন হয়েছে, সেটি ধরে রাখাই হবে প্রধান কাজ।

বাইরে বের হলে সবার মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পকেটে স্যানিটাইজার রাখতে হবে। গণপরিবহনে উঠতে গেলে সবাই যাতে সঠিক নিয়মে মাস্ক পরেন, সে ব্যাপারে সরকারিভাবে একটি নির্দেশনা জারি করতে হবে। পারতপক্ষে পাবলিক বাসে যাতে মানুষ গাদাগাদি করে না যায়, সেজন্য সব বাসকে সিটিং করে অর্থাৎ নির্ধারিত সিটের বাইরে কেউ বসবেন না, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এতে সকাল-সন্ধ্যায় অফিসে যাওয়া-আসার সময় একটা বাড়তি চাপ তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি বুঝে রাজধানীর রাস্তায় পাবলিক বাসের সংখ্যা হয়তো বাড়াতে হবে। তখন আবার যানজটের প্রশ্নও সামনে আসবে।

আমাদের দেশের পাবলিক পরিবহন, বিশেষ করে বাস ও লেগুনার চালক-হেলপার-কন্ডাকটররা ততটা স্বাস্থ্য সচেতন নন। সুতরাং এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। যানবাহনকে নিয়মিত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সেজন্য পরিবহনের মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোকে যুক্ত করতে হবে। সারা বছর তারা নিজেদের দাবি দাওয়া নিয়ে রাস্তায় সোচ্চার থাকেন। কিন্তু এখন মানুষের জীবন বাঁচাতে তাদেরও সচেতন হতে হবে।

সবচেয়ে ভালো হয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যদি তাদের কর্মীদের বহনের জন্য নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারে। তাতে ওই যানবাহনগুলো পরিচ্ছন্ন তথা জীবাণুমুক্ত রাখা সহজ হবে। আর দুই তিন কিলোমিটার পর্যন্ত মানুষকে হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। অর্থাৎ পারতপক্ষে গণপরিবহনে না ওঠাই যে নিরাপদ, সেই বোধটি সবার মধ্যে তৈরি হতে হবে।

ব্যক্তিগত সুরক্ষার কথা ভেবে হয়তো ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল বেড়ে যাবে। ফলে সেটি বড় শহরগুলোর রাস্তায় নতুন করে সংকট তৈরি না করবে কি না, সেদিকেও সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেকেই বাইসাইকেলের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, বাইসাইকেল না হয় অনেকেই কিনলেন। কিন্তু রাজধানীর অধিকাংশ সড়কই বাইসাইকেল চলাচলের উপযোগী নয়। ফুটপাতগুলো যদি মানুষের হাঁটার উপযোগী থাকতো তাহলে কম দূরত্বে যেতে মানুষের যানবাহন ব্যবহারের প্রবণতা কমে যেতো। ফলে এই বিষয়গুলোর দিকে সরকারের আন্তরিকভাবে নজর দিতে হবে এবং ছুটি শেষ হলেই যাতে অন্তত এই খাতগুলোয় একটা পরিবর্তনের সূচনা করা যায়, সেজন্য সরকারের সবগুলো দপ্তরকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

বেসরকারি পর্যায়ে যারা পরিবেশ ও গণপরিবহন নিয়ে কাজ করে, তাদেরকে এখনই সরকারের কর্মকাণ্ডে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত করতে হবে। এমনকি এটা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেও হতে পারে। মনে রাখতে হবে, এখন সাধারণ ছুটি অথবা লকডাউন—নাম যাই হোক না কেন, মানুষ ঘরে আছে। ছুটির পরে স্বভাবতই কোটি কোটি মানুষের চলাচল শুরু হবে এবং তাদের প্রধান বাহন হবে গণপরিবহন। অতএব এই খাত নিয়ে খুব শক্তিশালী পরিকল্পনা লাগবে, যেটি বাস্তবায়নের সূচনাটা করতে হবে এখনই।

আমীন আল রশীদ: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, রংধনু টেলিভিশন।

আপনার মতামত লিখুন :