করোনা মোকাবিলায় হার্ড ইমিউনিটি, কোন পথ অনুসরণ করবে বাংলাদেশ?

নিতীশ কুমার কুন্ডু
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পৃথিবীর ইতিহাস নতুন করে লেখার সুযোগ করে দিয়েছে করোনা নামক এক অদৃশ্য ভাইরাস। যেখানে লিপিবদ্ধ হবে করোনা দ্বারা উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পন্ন দেশগুলোর নাকানিচুবানি খাওয়ার ইতিহাস, এই ছোট অনুজীবকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে পুরো বিশ্ব।

করোনা মোকাবিলায় এখনো দিকবিদিক ছোটাছুটি করছে পৃথিবীর তাবৎ শক্তি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ তো দূরে থাক, এই ভাইরাস প্রতিমুহূর্তেই জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবর্তন করছে তার চরিত্র, তা জানতেই হিমশিম খাচ্ছে গোটাবিশ্ব। নতুন নতুন উপসর্গ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হচ্ছে করোনা, এ পর্যন্ত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে করোনা প্রতিনিয়ত মিউটেশনের ফলে রীতিমতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে বিশ্ব জুড়ে। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু শ্বাসযন্ত্রেই নয়, এই ভাইরাস সংক্রমণ ঘটাতে পারে স্নায়ুতন্ত্র, হৃদযন্ত্র, কিডনিসহ মানবদেহের মাথা থেকে পা পর্যন্ত। সাড়ে চার মাস অতিবাহিত হলেও পৃথিবীতে এখনো কার্যকর ও নিরাপদ কোনো ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার হয়নি, তবে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন দ্রুত কার্যকর ওষুধ ও টিকা তৈরির। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ওষুধ ও টিকা তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে শুরু হয়েছে মানবদেহে পরীক্ষামূলক ব্যবহার বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। কিন্তু কার্যকর ও নিরাপদ ওষুধ ও টিকার জন্য সাতশ’ কোটি মানুষের অপেক্ষা কবে শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। আবার বিশ্বকে অচল করে মাসের পর মাস লকডাউনও সম্ভব নয়। তাই হয়তো করোনাকে পৃথিবীর মানুষের নিত্যসঙ্গী হিসেবে মেনে নিয়ে চলতে হবে আগামীর পথ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তা স্বীকার করেছে অবলীলায়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সংক্রমণ রোধে হার্ড ইমিউনিটি বা গোষ্ঠী রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতাতে আশার আলো খুঁজছে গোটা বিশ্ব।

হার্ড ইমিউনিটি বা গোষ্ঠী রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা কি?

হার্ড (herd) শব্দের অর্থ জনগোষ্ঠী আর ইমিউনিটি (immune) অর্থ মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। হার্ড ইমিউনিটি বা গোষ্ঠী রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা হলো সমাজের বেশিরভাগ মানুষের শরীরে যখন কোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায় (মানবশরীরে দুইভাবে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তৈরি হতে পারে- প্রথমত, টিকার মাধ্যমে, যেটি কৃত্রিম প্রক্রিয়া, দ্বিতীয়ত, জীবাণুর সংক্রমণের ফলে মানবদেহে অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে, যেটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া) তখন সংক্রমণের শিকল ভেঙে যায় অর্থাৎ তার সুবিধা নিয়ে বাকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার কমে যায়।

অর্থাৎ ধরুন, আপনি টিকাও নেননি আবার জীবাণু দ্বারা আক্রান্তও হননি, কিন্তু আপনার আশেপাশে যারা আছেন, তারা যদি দুই প্রক্রিয়ার যে কোনো একটির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেন, তাহলে আপনার মধ্যে ওই জীবাণুর সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকবে না, এমনকি অন্য কেউ এই জীবাণু নিয়ে এলেও শুধু আপনি আক্রান্ত হবেন, কিন্তু অন্যরা যারা আপনার সাথে মেলামেশা করবেন, তাদের মধ্যে এই সংক্রমণ ছড়াবে না, অর্থাৎ একের থেকে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর শৃঙ্খল ভেঙে যাবে। ফলে কমে যাবে সংক্রমণের হার বা রোগের প্রাদুর্ভাব। যেটা হয়েছে পোলিও, গুটিবসন্ত, হাম, মাম্পসসহ কিছু রোগের ক্ষেত্রে। সমাজের বেশিরভাগ মানুষ টিকার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধী হলে যারা টিকা নেননি তারাও নিরাপদ থাকেন।

ছবি: সংগৃহীত

করোনা মোকাবিলায় হার্ড ইমিউনিটি অর্জন কি একমাত্র সমাধান এবং তার স্থায়িত্ব কত দিনের?

পৃথিবীতে অনেক ভাইরাস আছে কয়েক দশক ধরে চেষ্টা করেও তার কার্যকর ও নিরাপদ টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি, যেমন এইচআইভি, ডেঙ্গু, ইবোলা ইত্যাদি। ইতোমধ্যে করোনার অনেকগুলো টিকা ও ওষুধ নিয়ে মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হলেও নিরাপদ ও কার্যকর টিকা বা ওষুধ যে পাওয়া যাবে, তার শতভাগ নিশ্চয়তা নেই বা হলেও কতদিন লাগবে তাও নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারবে না। কার্যকর ওষুধ আবিষ্কার হলেও এই রোগে মৃত্যুর হার হয়তো কমবে, কিন্তু সংক্রমণ হ্রাস সম্ভব হবে না। অন্যদিকে কোভিড-১৯ রোগের এখন পর্যন্ত কোনো টিকা আবিষ্কার না হওয়ায় করোনার ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হওয়ার এখন একমাত্র উপায় প্রাকৃতিকভাবে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে মানবদেহে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি করা। তবে টিকা আবিষ্কার হলে সেটা কৃত্রিম উপায়ে জনগোষ্ঠীতে সংক্রমণ প্রতিরোধী ব্যবস্থা তৈরি করবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁশিয়ার করে বিশ্বকে জানিয়েছে, এমন হতে পারে যে কোনো দিনই আবিষ্কার হবে না এই রোগের কার্যকর টিকা। যেমনটা হয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ক্ষেত্রে। তাই নিত্যসঙ্গী হতে পারে এই মরণঘাতী ভাইরাস। করোনার এ পর্যন্ত পৃথিবীতে ২৯টি জিনোম সিকুয়েন্স আবিষ্কার হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত মিউটেশনের ফলে পরিবর্তন হচ্ছে এ বৈশিষ্ট্য। ফলে একটি টিকা সব দেশে কার্যকর নাও হতে পারে।
এই বাস্তবতায় করোনার (SARS-CoV-2) হার্ড ইমিউনিটি বা জনগোষ্ঠী রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবে করা যাবে। কারণ এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হলে তার শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডির স্থায়িত্বকালের ওপর নির্ভর করছে কতদিন দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট থাকবে। তবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডির স্থায়িত্বকাল নিয়ে এখনো তথ্য পর্যাপ্ত নয়। সার্স মহামারিতে আক্রান্ত রোগী সুস্থ হলে তার শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি তিন বছর কার্যকর ছিল, তাই বিজ্ঞানী ধরে নিয়েছিলেন যে করোনা যেহেতু একই গ্রুপের, তাই এটি হয়তো অন্তত বছর তিনেক সুবিধা দেবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন, কারণ চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরানসহ কিছু দেশে দ্রুত সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় বার আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মিউটেশনের সময় জেনেটিক কোডের খুব বেশি পরিবর্তন হয় না, তাই বিশেষজ্ঞদের মতে মিউটেশনের কারণে পুরোপুরি না হলেও আংশিক বা পার্শিয়াল হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করে একবার সংক্রমণের পর অবশ্যই কিছু দিন সুরক্ষা দেবে।

করোনার ক্ষেত্রে কীভাবে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে?

প্রাকৃতিক নিয়মেই, যদি কোনো ভাইরাসের মারণ ক্ষমতা বেশি হয়, তাহলে তার সংক্রমণ ক্ষমতা কম হয়, যেমন ইবোলা ভাইরাস। অন্যদিকে কোনো ভাইরাসের মারণ ক্ষমতা কম হলে তার সংক্রমণ বেশি যেমন করোনা, এ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত এক ব্যক্তি এক মাসে চার হাজার মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন। তাই এই শক্তিশালী সংক্রমণ ক্ষমতা সম্পন্ন ভাইরাসকে এইচআইভি ভাইরাসের মত শুধুমাত্র কিছু সুরক্ষাবিধি পালন করে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কারণ এই ভাইরাস হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ড্রাপলেট আকারে বায়ুতে ছড়ায়। এমনকি স্পর্শেও ছড়াতে পারে। তাই হার্ড ইমিউনিটির মাধ্যমেই কেবল এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। যদিও এটি অনেক কঠিন কাজ, যার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামো ও নীতিমালা। প্রাকৃতিকভাবে সংক্রমণ ঘটালে আশি শতাংশের মতো রোগী বাসায় থেকে সুস্থ হয়ে যাবেন, কিন্তু ১৫-২০ শতাংশ রোগীর জন্য প্রয়োজন হবে হাসপাতালের, আবার এদের মধ্যে অনেকের প্রয়োজন হবে ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ।

অন্যদিকে কত শতাংশ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটলে প্রাকৃতিকভাবে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে তা নিশ্চিত করা হয় হার্ড ইমিউনিটি থ্রেসহোল্ড সূচক নির্ণয় করে। যার অর্থ মহামারি কমাতে গেলে কতজন মানুষের মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধী ব্যবস্থা তথা অ্যান্টিবডি তৈরি হতে হবে। বিভিন্ন ভাইরাসের ক্ষেত্রে এটি বিভিন্ন হয়। যেমন, মাম্পসের ক্ষেত্রে ৯২ শতাংশ অর্থাৎ ৯২ জনের শরীরে রোধ প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হলে বাকি আটজন নিরাপদ। জনহপ কিন্স্ বিশ্ববিদ্যায়ের বলেছে, করোনার ক্ষেত্রে থ্রেসহোল্ড ৭০ শতাংশ অর্থাৎ ৭০ ভাগ মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হলে বাকি ৩০ ভাগ জনগোষ্ঠী নিরাপদ থাকবেন।

হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে কোন দেশ কোন পন্থা অনুসরণ করছে
করোনার মত দ্রুত সংক্রমণ ক্ষমতা সম্পন্ন ভাইরাস মোকাবিলায় শুরু থেকেই চীন লকডাউন পন্থা অবলম্বন করে সফল হয়েছে দেখে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই পন্থা অবলম্বন করেছে, ফলে ভেঙে পড়েছে পৃথিবীর সামগ্রিক অর্থনীতি। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোও সামাল দিতে পারছে না, বেকারত্বের সংখ্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এখন সবচেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলোও লকডাউন শিথিল করে সচল করছে তাদের দেশের অর্থনীতি আর উন্নয়নশীল ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অন্যদিকে সব লকডাউন করেও ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা গেছে তা এক বাক্যে বলা যাবে না, তা আমরা ইউরোপ-আমেরিকার দিকে তাকালেই বুঝতে পারি, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সুশৃঙ্খল মানুষ ও কঠোর লকডাউন করেও আক্রান্তের সংখ্যা লাখ লাখ এবং মৃত্যু হয়েছে প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষের।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে লকডাউন নিয়েও। কারণ এতো কিছু পরেও ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এমনকি চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু দেশে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ। তবে লকডাউনের ফলে কিছু সুবিধা যে হয়েছে তা মেনে নিয়েছে অধিকাংশ দেশ। অন্তত কার্যকর টিকা বা ওষুধের আসার আগ পর্যন্ত সংক্রমণ কম রেখে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর চাপ কমানোর পাশাপাশি প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাওয়া গেছে। হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে সবার অপেক্ষা টিকার জন্য, কিন্তু কখন টিকা পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। আবার বেশি দিন লকডাউন রাখলে বিশ্বের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন হয়তো কোভিড-১৯ রোগের চেয়ে না খেয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি হবে।

পক্ষান্তরে, লকডাউন না দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ মেনে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিপণিবিতান-রেস্তোরাঁ খোলা রেখেও সুউডেন হেঁটেছে প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত হার্ড ইমিউনিটির দিকে। তার ফলে লকডাউন থাকা দেশগুলো যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে সংক্রমণ ঠেকোতে ব্যস্ত, সেখানে সুইডেন আগামী জুনের মধ্যেই আশা করছে নিয়ন্ত্রণ করবে ভাইরাসের সংক্রমণ। তবে এর বিনিময়ে তাদের হারাতে হয়েছে প্রবীণ নাগরিকদের। কিন্তু সেখানে মৃত্যুর হার আমেরিকা-ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম, ভেঙে পড়েনি তাদের দেশের অর্থনীতি। এজন্য তাদের ছিল সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে একদিকে তারা মেনে চলছে সব স্বাস্থ্যবিধি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অন্যদিকে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে সাধারণ জনগণের যথার্থ চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে।

বাংলাদেশ হাঁটবে কোন দিকে?

করোনা গত সাড়ে চার মাস ধরে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর দেশগুলোকে যেভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশর মতো তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের অবস্থা হ-য-ব-র-ল হবে এটা অস্বাভাবিক নয়। একদিকে বিশাল জনগোষ্ঠী অন্যদিকে দূর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দেড় মাসের বেশি লকডাউনের পরও দেশে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত না, একটি ছোট্ট দেশে বিশাল জনগোষ্ঠীকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখানো সহজ ব্যাপার নয়, ফলে লকডাউনের মধ্যেই বেড়ে যাচ্ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। কিন্তু এই লকডাউন যা সরকার সাধারণ ছুটি বলছে, সেটা চার দফা বাড়িয়ে ৩০ মে পর্যন্ত করেছে, তার মধ্যে কিছু দিন ঈদের কথা বিবেচনা করে মার্কেট ও রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খোলায় মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ।

আবার এভাবে লকডাউন বেশি দিন চালানো সরকারের পক্ষে সম্ভব না, কারণ দেশের স্থবির অর্থনীতি দ্রুতই চালু করতে হবে বাঁচার তাগিদে কিছু বিধিনিষেধ ও সামাজিক দূরত্ব মেনে। যা আমাদের দেশে প্রায় অসম্ভব। টিকা দিয়ে কোভিড-১৯ রোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠা পর্যন্ত লকডাউন রাখা বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক করোনা টেস্ট করে আক্রান্ত রোগীকে আলাদা করাও সম্ভব নয়। কারণ এদেশে প্রতিদিন কয়েক হাজার টেস্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আমেরিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) মতে, করোনায় আক্রান্ত রোগীর ৩০ শতাংশের অধিক অ্যাসিম্টোমটিক বা উপসর্গবিহীন। যদিও অন্যান্য দেশে এই উপসর্গবিহীন রোগী ৫০ শতাংশ বা তার বেশি। যেমন আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এটি ৮০ শতাংশ। তাই ধরে নিই, আমাদের দেশে এই উপসর্গবিহীন রোগীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ হলেও সবার অজান্তেই তারা অন্য মানুষকে আক্রান্ত করছেন। তাই আক্রান্তের সঠিক পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে জানা অসম্ভব। ফলে অজান্তেই মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে হার্ড ইমিউনিটি।

পক্ষান্তরে যদি বাংলাদেশ সুনির্দিষ্টভাবে প্রাকৃতিকভাবে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করতে চায় তাহলে ১৭ কোটি মানুষের ৭০ শতাংশ বা প্রায় ১২ কোটি মানুষের আক্রান্ত হতে হবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দূর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না। কারণ আক্রান্ত রোগীর ১০ শতাংশকে ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ দেওয়ার প্রয়োজন হবে। তা এই ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে সম্ভব নয়। পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঘরে বন্দী রাখতে হবে প্রবীণদের।

সুইডেন যেভাবে অংক কষে উন্নত অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে মাঠ নেমে সহজে হার্ড ইমিউনিটির পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তা বাংলাদেশে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু এটাও মেনে নিতে হবে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে বেশি দিন লকডাউন সম্ভব নয়। ফলে আজ হোক বা কাল, স্বাভাবিক করতে হবে অর্থনীতির চাকা। তখন টিকা আবিষ্কার না হলে আর এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে ইউরোপ-আমেরিকার মতো। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে টিকা বা প্রাকৃতিকভাবে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজন তা দেশকে করতে হবে খুবই দ্রুত। এখন এই উভয় সংকটে দেখার বিষয় বাংলাদেশ কোন দিকে এগিয়ে চলে...।

দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এখন দায়িত্ববান ব্যক্তিদের দূরদর্শিতার প্রয়োজন, সামনের সময় বড্ড ভয়ংকর। কারণ একদিকে ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতি, অন্যদিকে অসচেতন বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা।

তথ্যসূত্র:
১) https://www.jagranjosh.com/general-knowledge/herd-immunity-1584451602-1
২) https://www.sciencefocus.com/news/coronavirus-can-herd-immunity-protect-us-from-covid-19/


লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সন্তোষ, টাঙ্গাইল

আপনার মতামত লিখুন :