টেকসই বাঁধ নির্মাণের আর্তনাদ কি শুনতে পাচ্ছে সরকার?



নিজামুল হক বিপুল
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বানের জলে ভাসি ডুবি/শুনতে কি পাও আর্তনাদ/ বেঁচে থাকার জন্য মোরা চাই টেকসই বেড়িবাঁধ।’

‘কৃষকের প্রাণের দাবি-নিরাপদ বেড়িবাঁধ চাই।’ ‘জোড়াতালির বাঁধ নয়-নিরাপদ বেড়িবাঁধ চাই।’ ‘ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ চাই’—এমন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। কেউ কেউ আবার বুকে-পিঠে এসব স্লোগান লিখে সেই ছুবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে ন্যায্য দাবির কথা জানাচ্ছেন রাষ্ট্র ও সরকারকে। যদি সরকার বাহাদুরের হৃদয়ে একটু হলেও নাড়া দেওয়া যায়।

এগুলো নিছক স্লোগান বা অন্য দশটা দাবির মতো সাধারণ কোনো দাবি নয়। এটি হচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার দাবি, নূন্যতম সুযোগ সুবিধা নিয়ে বেঁচে থাকার দাবি। উপকূল আর উপকূলে বসবাসকারী মানবসন্তান, জীব-বৈচিত্র্য এবং সম্পদ রক্ষার দাবি। এসব দাবি পূরণ হতে পারে শুধুমাত্র একটি টেকসই বাঁধ নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে।

গত ২০ মে উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুপার সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সুন্দরবন, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটের বিস্তৃীর্ণ এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। ঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গেছে উপকূলের মাইলের পর মাইল বেড়িবাঁধ। বাঁধ ভেসে যাওয়ার পর প্রায় দেড়মাস গত হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের। প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ যুদ্ধ করছেন প্রতিদিন। এই দেড়মাস সময়েও আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে পারেননি বহু এলাকার মানুষ। নিজেদের বাড়িঘর থাকলেও সেখানে রাত কাটাতে সাহস পাননা তারা। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে তাদের জীবনযাত্রা। তাদের স্বপ্নগুলো ভেসে যাচ্ছে জোয়ারের পানিতে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা খুলনা বাগেরহাট উপকূলের ৪১টি নদ-নদীর প্রায় পাঁচ হাজার কিলমিটার বেড়িবাঁধের প্রায় ১৫০ কিলমিটার ভেঙে গেছে আম্পানের আঘাতে। ফলে পানিতে ভাসছে উপকূলের মানুষ ও মানুষের সুখ দুঃখ। শুধু যে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে তা নয়। সরকারের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী আম্পানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলের অবকাঠামো। প্রায় আড়াই লাখ বাড়িঘর, পৌনে দুই লাখ হেক্টর ফসলি জমি, চিংড়ি ও অন্য মাছের খামার, সড়ক, দুই শতাধিক ব্রিজ ও কালর্ভাট, প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন, ৫০ হাজারেরও বেশি গবাদিপশু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বারবার সাইক্লোনের হাত থেকে উপকূলকে রক্ষাকারী বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী সুন্দরবনের ১২ হাজার ৩৩২টি গাছ ভেঙে পড়েছে। এর বাইরে সুপেয় পানির সংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরো অনেক কিছু আছে এই ক্ষতির তালিকায়।

ক্ষতির এমন পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে উপকূলের মানুষ তাদের টুকরো টুকরো স্বপ্নগুলোকে তিল তিল করে একত্রিত করেছিলেন, গড়ে তুলেছিলেন সুখের সংসার, সেই স্বপ্ন তাদের চোখের সামনে মুহূর্তেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সুপার সাইক্লোন আম্পান এবং তার কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস।

আমরা একটা বিষয় দেখি, যখনই কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয় তখনই উপকূলের মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। সেই সাহায্য হচ্ছে সাময়িক প্রতিষেধক। অর্থাৎ ত্রাণ সামগ্রী, নগদ অর্থ, ঘর মেরামতের জন্য নূন্যতম সংখ্যক ঢেউটিন—এরকম আরো অনেক সাহায্য। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, বিশেষ করে বেড়িবাঁধ ভেঙে জনপদের পর জনপদকে মাসের পর মাস সমুদ্রের নোনা পানি ভাসিয়ে রাখে, উপকূলের মানুষের জীবনকে অনিয়শ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়, সেই অনিয়শ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসতে, ঘুরে দাঁড়াতে, নতুন করে জীবনকে সাজাতে মানুষ কি সাময়িক ত্রাণ চায়? নাকি স্থায়ী প্রতিষেধক চায়? আমার মনে হয়, মানুষ স্থায়ী সমাধানই চায়। আর এই স্থায়ী সমাধান হচ্ছে একটি শক্তিশালী, টেকসই ও জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধে সক্ষম উঁচু ও মজবুত বেড়িবাঁধ। কিন্তু বারবার তাদের এই দাবিটিই উপেক্ষিত হয়ে আসছে। যার ফলে তাদেরকে প্রতিবারই ঘুর্ণিঝড়ের সময় চরম মূল্য দিতে হয় নিঃস্ব হয়ে।

সিডর এবং আইলার আঘাতের পর থেকে উপকূলের মানুষের যে দুর্দশা-দুর্গতি শুরু হয়েছিল, গত ১২-১৩ বছরেও সেটি কাটিয়ে উঠতে পারেননি তারা। এর কারণ একটাই ‘টেকসই বাঁধ’ নির্মাণ না হওয়া। আর এই সময়ের মধ্যেই ফণী, বুলবুল, মহাসেন-এর মতো বেশ কয়েকটি সাইক্লোন আঘাত হেনেছে উপকূলে। মানুষও নিঃস্ব হয়েছেন প্রতিটি আঘাতে। কেউ কেউ ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন। প্রিয় জন্ম মাটি ছেড়েছেন অনেকে।

অথচ দীর্ঘস্থায়ী, টেকসই, মজবুত বাঁধ নির্মাণের জন্য কত শত, হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, নকশা হয়েছে, কত কত প্রতিশ্রুতি, আশ্বাস পেয়েছেন উপকূলের মানুষ। আর প্রতিবার ঘুর্ণিঝড়ের পর বাঁধ মেরামত ও সংস্কারের নামে দুর্নীতি-অনিয়মের মাধ্যমে কত অর্থের অপচয় হয়েছে তার কোনো শেষ নেই। তবে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলা পরবর্তী সময়ে ভবিষ্যত ঝুঁকি মোকাবেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ‘কোস্টাল এমব্যাকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ (সিইআইপি) গ্রহণ করে। ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকার পাঁচ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পে ৬৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জমি না পাওয়া, নদী ভাঙনসহ নানা জটিলতার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বৃদ্দি করলেও কাজ আর শেষ হয়নি। যদিও এ প্রকল্পের আওতায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে।

আবার ২০১২ সালে বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় উপকূলীয় বাঁধ পুনঃনির্মানের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। সে প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরা থেকে ভোলা পর্যন্ত ১-৫৪ নম্বর পোল্ডারে কাজ হওয়ার কথা ছিল। সেটিও আর হয়নি। কিন্তু কেন হয়নি সেটা আজও অজানা।

বিভিন্ন সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হতো তাহলে হয়তো উপকূলের মানুষকে এভাবে জোয়ারের পানিতে ভাসতে হতো না বারবার। তাদের স্বপ্নগুলোও ভেসে যেত না এক একটি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে।

সরকারের ডেল্টা পরিকল্পনায় উপকূলীয় এলাকার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলের বিদ্যমান পোল্ডারের কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঝড়বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ মোকাবেলা করা হবে; পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বন্যার ঝুঁকি হ্রাস করা হবে। খুবই আশার কথা।

প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা উপকূলের মানুষও চায় জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগকে মাথায় রেখে স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণ করা হোক। যে বাঁধ হবে নিচে ১০০ ফুট ও উপরে ৩০ ফুট প্রশস্ত এবং উচ্চতা হবে ৩০ ফুট। বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জরুরি তহবিল গঠন ও বাঁধ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করারও দাবি স্থানীয়দের। একই সঙ্গে উপকূলীয় সকল মানুষের খাবার পানির টেকসই ও স্থায়ী সমাধান করার দাবি তাদের। উপকূলের মানুষগুলোর বেঁচে থাকার জন্য এসব দাবির প্রতিটিই যৌক্তিক। তাদের এসব দাবি পূরণ হলে বছর বছর ঘূর্ণিঝড়ের সময় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে ত্রাণ সাহায্য নিয়ে ছুটে যেতে হবে না উপকূলের পথে-প্রান্তরে। বরং টেকসই বাঁধই হবে তাদের রক্ষা কবচ। তাই সরকারের উচিত উপকূলের মানুষের আর্তনাদ আমলে নিয়ে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রকল্প পরিকল্পনা, আবেদন, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় নষ্ট না করে দ্রুত বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে উপকূলীয় নাগরকিদের বেঁচে থাকার অধিকার সুনিশ্চিত করা। তাদের জীবন-জীবিকাকে বাঁচিয়ে রাখা। তাহলেই হয়তো উপকূলবাসীর কাছ থেকে দায়মুক্ত হবে রাষ্ট্র।