রিজেন্ট হাসপাতালের কারসাজি ও ‘সর্ষের ভূত’

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

  • Font increase
  • Font Decrease

রঙবেরঙের চোর-জালিয়াতের তালিকায় মানুষের জীবন নিয়ে অভিনব কারসাজির খবরও যুক্ত হয়েছে। পাওয়া গেছে করোনা-বান্ধব চোরদের নামও। যারা করোনাকালে খয়রাতি সাহায্য, চাল, রিলিফ চুরি করেই ক্ষান্ত হয়নি, করোনার রিপোর্ট নিয়েও জাল-জালিয়াতি করেছে। পয়সা নিয়ে ‘করোনা হয়েছে’ বা ‘হয়নি’ রিপোর্টের পাশাপাশি কোনো পরীক্ষা ছাড়াই সরকারি অফিসের সিল-স্বাক্ষর চুরি-জালিয়াতি করে মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে।

রিজেন্ট নামের একটি হাসপাতালের জঘন্যতম ঘটনা উন্মোচিত হওয়ার পর ভয়াবহ বিষয়টি সবার নজরে আসে। বিশেষ করে র‌্যাবের অভিযানের পর পুরো বিষয়টি জানা যায়। এতে দেখা যায়, ‘‘২০১৪ সালে অর্থাৎ ৬ বছর আগে যে হাসপাতালটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে, সে হাসপাতালটি টেস্ট না করেই কোভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ ও ‘নেগেটিভ’ সনদ দিচ্ছিল।’’

তদন্তকারীরা বলছেন, ‘‘রিজেন্ট হাসপাতালের প্রধান কার্যালয় থেকেই এই অপকর্মগুলো হতো, যা সিলগালা করা হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালটির উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান পরিচালিত হয়েছে।’’

জানা যায়, ‘‘সরকারিভাবে যে টেস্টগুলো ফ্রি করার কথা সেই টেস্টের জন্য রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাড়ে তিন হাজার টাকা করে নিচ্ছে। সবচাইতে জঘন্য যে কাজ করেছে সেটা হলো টেস্ট না করে রিপোর্ট দেওয়া এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া সিল ও প্যাড ব্যবহার করা।’’

জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট বা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনসহ (নিপসম) যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্যাড ও সিল তারা ব্যবহার করেছে ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হয়েছে ওইসব সিল বা প্যাড তাদের নয়। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনা চিকিৎসার নামে সরকারের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে আবার রোগীদের কাছ থেকেও মোটা অংকের বিল নিচ্ছে। হাসপাতাল থেকে বিপুল পরিমাণ কোভিড টেস্টের ভুয়া সনদ জব্দ করা হয়েছে।

সাড়ে ৪ হাজার ভুয়া করোনা টেস্ট, র‌্যাবের অভিযান এবং সিলগালার পর অবশেষে রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু ততদিনে এই হাসপাতাল নামধারী প্রতিষ্ঠান রিপোর্ট জালিয়াতি ও মিথ্যা রিপোর্টের মাধ্যমে সমাজে করোনা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক অপরাধ করেছে সকলের চোখের সামনে।

বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিজেন্ট সম্পর্কে বহু অভিযোগ এসেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যোগাযোগের চিত্র বের হয়েছে। রিজেন্টের সঙ্গে লেনদেনের সূত্রে জড়িত একদল সাংবাদিকের নামও এসেছে, যারা সকলের চেনা।

রিজেন্টের মালিকের বিষয়ে এন্তার অভিযোগ ও মামলার বিবরণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের সঙ্গে লাইন করে হাসপাতালটি অবাধে অপকর্ম করে চলছে। র‌্যাবের হাতে ধরা না পড়লে এদেরকে শনাক্ত করাই ছিল অসম্ভব। ভদ্রবেশী অপরাধী হয়ে তারা নির্বিঘ্নে অপরাধ করেই যেত দাপটের সঙ্গে।

এই যে অবাধে, আইন না মেনে, নিয়ম বা লাইসেন্সের পরোয়া না করে অপরাধ করার মানসিকতা, প্রবণতা ও দৃষ্টান্ত, তা কেমন করে সম্ভব হচ্ছে? সরকারের অধীনে এত সব সংস্থা ও দফতরের এত অফিসার, কর্মচারী কোথায় ছিলেন? বছরের পর বছর লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতালের মতো জীবন-মরণের মারাত্মক কাজ রিজেন্ট অবলীলায় করে গেছে দেশের আইন-কানুনকে তোয়াক্কা না করে? সাহস বাড়তে বাড়তে করোনার মতো প্রাণঘাতী ভাইরাস নিয়েও রিজেন্ট মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করে কারসাজি করেছে।

এসবই ভয়ঙ্কর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দোষীদের পাকড়াও করে উপযুক্ত শাস্তি বিধান আইনের শাসনের অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু কল্যাণমুখী সুশাসনের দিক থেকে এই শাস্তিই শেষ কথা নয়, অপরাধীদের নেপথ্য-সাহায্যকারীদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর শৈথিল্য ও গাফিলতির বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখতে হবে।

নইলে লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল, বাস, ট্রাক, কারখানা, নৌযান ইত্যাদি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতেই থাকবে। অসাধু চক্রের সহযোগিতায় এমন অপকর্ম বাংলাদেশে শুধু রিজেন্ট হাসপাতালই নয়, বহু প্রতিষ্ঠানই করছে।

বিশেষত যে সরকার নিজেদের জনবান্ধব-প্রমাণে প্রতিনিয়ত কাজ করতে করতে হয়রান হচ্ছে, সেই সরকারের ছত্রছায়ায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি অপকর্মের দোসরদের সাহায্য করে জনক্ষতি ঘটায়, তাহলে সরকারে সকল প্রচেষ্টা বিনষ্ট হবে। অপরাধীদের ধরা ও শাস্তি দেওয়ার মতোই অপরাধ প্রচেষ্টায় গুপ্তভাবে সহায়তাকারী ‘সর্ষের ভূতদের’ ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। যদি এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে পরজীবী-প্যারাসাইটের মতো এরা মানুষের রক্ত ও অর্থ খেয়ে খেয়ে সরকারের সকল সুকীর্তি-সুনাম নস্যাৎ করে দিতেই থাকবে।


ড. মাহফুজ পারভেজ
অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম ও প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।