‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি’র মনোস্বাস্থ্য প্রসঙ্গ

মোস্তাফা কামাল যাত্রা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১১ জুলাই, ২০১১ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাই সদর স্টেডিয়াম থেকে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা দেখে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিল আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়সহ মায়ানি ও মগাদিয়া ইউনিয়নের ৫টি একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭০ জন ছাত্র। বরতাকিয়া-আবু তোরাব সড়কের মধ্যবর্তী স্থান দক্ষিণ সৈদালী গ্রাম এলাকায় ছাত্রদের বহনকারী ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে ঘটনাস্থলেই ৩৯ জন ছাত্র মারা যায়।

অতি ব্যস্ত ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্য থেকে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় আরো ৫ জন ছাত্র। ফলে মৃতের সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ৪৫-এ।

২০-২৫ জন ছাত্র কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে যায় সেই সময়ের এক দুসঃহ স্মৃতির সাক্ষী হয়ে। অনেকেই কমবেশি আঘাতের চিহ্ন নিয়ে এখনো বেঁচে আছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মানসিক আঘাত ও ভীতির প্রসঙ্গটি দুর্ঘটনার ৯ বছর পরেও প্রবল আতঙ্ক হয়ে হানা দেয়।

এখনো আশেপাশের এলাকায় ‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি’ শব্দটি শুনলে আঁতকে ওঠে এ জনপদের মানুষসহ দেশ ও বিশ্ববাসী। ট্র্যাজেডির সাথে যারা নিবিড়ভাবে জড়িত তারা শব্দটি শুনলে এখনো অবিরাম কান্নায় ভেঙে পড়ে। এ সময় স্মৃতিকাতর মানুষদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রায় অর্ধশত লাশের সারি। যেখানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল একঝাঁক স্কুল শিক্ষার্থী।

কোনো একটা দুর্ঘটনা শুধুমাত্র শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতিই সাধন করে তা নয় বরং ক্ষতি সাধিত হয় বিভিন্ন দিক থেকে যেমন—মানসিক, সামাজিক, পারিবারিক, পরিবেশগত ইত্যাদি। ‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি’র ৯ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো ৪৬ পরিবারের অধিকাংশ লোকজনই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণে এই চরম মানবিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাও মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী কাউন্সেলিং এবং সাইকোথেরাপি সেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সরকারের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সমাজ কল্যাণ কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন, সুশীল সমাজ, পেশাজীবীসহ সচেতন মহলকে উপর্যুক্ত বিষয়ে এগিয়ে আসার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যুতে কর্মরত সংগঠন ‘মেন্টাল হেলথ অ্যাডভোকেসি এসোসিয়েশন (MHAA/মা)’।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে এই সংগঠনের উদ্যোগে মাঠ পর্যায়ে ‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি’তে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের স্বজনদের মনোসামাজিক স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি জানতে এক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ১৫টি পরিবারের স্বজনদের ওপর পরিচালিত এই জরিপে অংশগ্রহণ করেন নিহত ও আহত শিশু কিশোরদের মা, বাবা, বোন, ভাই, মামা, দাদী, চাচা, নানী, সহপাঠী, এবং ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগী কিশোর।

স্বজনদের সাথে আলোচনা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জানা যায়, তখন পর্যন্ত দুর্ঘটনার চার বছর অতিবাহিত হলেও তাদের অনেকের মধ্যে অহেতুক ভয়, দুঃশ্চিন্তা, আতঙ্ক, দুঃস্বপ্ন, উদ্বেগ এবং পিটিএসডি (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসওর্ডার)-এর মতো মানসিক সমস্যার লক্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

দিনে দিনে এসব সমস্যা অনেকের মধ্যে মনোবৈকল্যের সৃষ্টি করছে। ফলে একটি দুর্ঘটনায় আহত বা নিহতই শেষ কথা নয়। পরবর্তীতে নানা রকম নেতিবাচক প্রতিফলও দেখতে পাওয়া যায়। যার লক্ষণীয় দিক হলো পঙ্গুত্ব ও মনোবিকার। ‘মিরসরাই ট্র্যাজেডি’-র স্মরণে শোক ও সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের শারীরিক ও মানসিক সেবা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাও অতীব জরুরি।

বিষয়টি শুধু 'মিরসরাই ট্র্যাজেডি’র ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং সব ধরনের দুর্ঘটনা, মানবিক বিপর্যয় ও আঘাতের ফলে আহত, নিহতের পরিবার-পরিজন ও সংশ্লিষ্টদের জন্যেও সমভাবে প্রযোজ্য।


মোস্তাফা কামাল যাত্রা
নাট্যকর্মী ও শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।