যে কারণে বর্ষায় বাড়ছে বজ্রপাতের প্রকোপ

বদরুল হুদা সোহেল
গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে হারুর মৃত্যুদৃশ্য পড়লে গা শিউরে ওঠে। ‘আকাশ দেবতার কটাক্ষ’ মর্মে বর্ণিত মৃত্যুর কারণ বজ্রপাত, যা বর্ষা ঋতুর নিয়মিত ঘটনা ও উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক বিপদ।

কোভিড-১৯, বন্যা, লঞ্চডুবি, আত্মহত্যা, চিকিৎসাসেবায় দুর্নীতি, অর্থনৈতিক মন্দা ইত্যাদির মধ্যে বর্ষায় বজ্রপাতের প্রকৃতির দুর্যোগ ভাবনার বিষয়। এবছর ৪ জুনে একই দিনে বজ্রপাতে মারা যায় ২৫ জন।

গত বছর বজ্রপাতে ২৪৬ জন মারা যায়। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩০৮৬ জনের মৃত্যু হয় বজ্রপাতে, যার মধ্যে ১২২৫ জন ফসল সংগ্রহের জন্য উন্মুক্ত মাঠে ছিল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের হিসেবে গত ৯ বছরে বজ্রপাতে ১৯৫৮ জন মারা যায়। চলতি বছরে ৬ মাসে ২৫০ জন মারা গেছে। বিশ্বে বজ্রপাতের প্রায় ২৫ ভাগ মানুষ প্রাণ হারায় বাংলাদেশে।

তবে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে বজ্রপাত বেশি হলেও সারাবিশ্বের হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় বজ্রপাত হয় সবচেয়ে বেশি। ঐ দেশে বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩০০ দিনই বজ্রপাত ঘটার ইতিহাস রয়েছে।

কেন বর্ষায় বাড়ছে বজ্রপাত? এজন্য দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞদের মতে বায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে তাপমাত্রা বাড়ায় বজ্রপাতও বাড়ছে। তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে বজ্রপাত বাড়ে দশ গুণ। বাংলাদেশে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বজ্রপাতের প্রকোপ বেশি হলেও অনবরত তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে তা জুলাই হয়ে পুরো বর্ষাকাল জুড়ে অব্যাহত থাকে।

এত বজ্রপাত হলেও এ সম্পর্কে অনেকের বৈজ্ঞানিক ধারণা নেই। আকাশের মেঘে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চার্জ সঞ্চিত হয়ে একসময় প্রবল শব্দে মাটিতে নেমে বিপরীত চার্জের সঙ্গে মিলিত হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়, এটাই বজ্রপাত। পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বায়ুমন্ডল উত্তপ্ত হয়ে উপরে উঠে জলীয়বাষ্পের সংস্পর্শে এসে তা আয়ন কণায় পরিণত হয়ে বজ্রপাত সংঘটনের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়।

উল্লেখ্য, শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যু তুলনামূলক বেশি। গ্রামের অসচেতন মানুষ বজ্রপাত বা আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকে। আকাশে কালো মেঘের ছড়াছড়িতে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার হলেও অনেকে মাছ ধরতে বা খেতে কাজ করতে যায়। বিপদে তারা খোলা মাঠে দিশেহারা হয়ে পড়ে বা কোনো গাছের নিতে আশ্রয় নেয়, যা বজ্রপাতের কবলে পড়ার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

প্রসঙ্গত বলা দরকার, বজ্রপাতের জন্য প্রাকৃতিক কারণের সঙ্গে মোবাইল টাওয়ার ও বৃক্ষ নিধন দায়ী। যানবাহন ও কলকারখানার ক্ষতিকারক গ্যাস যেমন কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ও ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (সিএফসি) ইত্যাদি নির্গমনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতাও সমানভাবে দায়ী।

বজ্রপাত থেকে রক্ষার জন্য প্রথম কাজ হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হওয়া। বায়ু তথা পরিবেশ দূষণ, বৃক্ষনিধন রোধসহ নিয়মিত বৃক্ষ রোপণে তৎপর হওয়া। একটি গাছ কাটলে অন্তত পাঁচটি চারাগাছ রোপণ করা। বিদ্যুৎ চমকালে খোলা বিস্তৃত প্রান্তরে না থেকে ঘরের ভেতরে থাকা। নির্মাণ কাজে তামার তারের মাধ্যমে আর্থিং করা। বাড়ির পেছনে, রাস্তায় উভয় পাশে, পুকুর পাড়ে বা উন্মুক্ত স্থানে সুপাড়ি, নারকেল, খেজুর বা তাল জাতীয় গাছ লাগানো। আবহাওয়াবিদদের মতে, উঁচু গাছ—ঘরবাড়ি ও মানুষকে বজ্রপাত থেকে রক্ষা করে।

আবহাওয়া বিভাগ বজ্রপাতের অন্তত একঘণ্টা আগে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পূর্বাভাস জানানোর চেষ্টায় আছে। তা সম্ভব হলে মানুষ সতর্ক হতে পারবে।

তদুপরি, বিস্তীর্ণ জলাভূমি বা উন্মুক্ত প্রান্তরে কৃষক যেন অল্প সময়ে নিরাপদ স্থানে আসতে পারে সেজন্য ‘বজ্রপাত নিরাপত্তা বলয় জোন’ স্থাপন করা যেতে পারে। বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। এ সময় টেলিভিশন, ফ্রিজ, বা এসিসহ সকল বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি বন্ধ করে বৈদ্যুতিক সকেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। তাছাড়া এ সময় বারান্দায় ব্যবহৃত ধাতব পদার্থের তৈরি গ্রিল স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রান্নাঘর বা টয়লেটের ধাতব পানির কলের মুখসহ অন্যান্য ধাতব পাইপ থেকেও দূরে থাকতে হবে। বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে বাসাবাড়িতে থাকা ছোট বাচ্চাদের কাছে নিয়ে আওয়াজ না হওয়া পর্যন্ত দু’হাতে কান বন্ধ করে রাখা ভালো। এতে বিকট আওয়াজ থেকে কচিকাঁচাদের শ্রবণেন্দ্রিয় রক্ষাসহ মানসিক চাপ ও ভয় থেকে তারা রক্ষা পাবে। কৃষক, জেলেসহ বাইরে গমনেচ্ছু ব্যক্তি বা যাত্রীর ঘর থেকে বের হওয়ার আগে আবহাওয়া অধিদপ্তর ঘোষিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া ভালো।

আবহাওয়াবিদদের মতে বর্ষা পরবর্তী অক্টোবর বা নভেম্বর মাসেও বাংলাদেশে বজ্রপাতের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। বজ্রপাতের সময় পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নিতে এবং গাছপালা বা বৈদ্যুতিক খুঁটি বা লাইন থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। ধাতব পদার্থের হাতলযুক্ত ছাতার পরিবর্তে প্লাস্টিক হাতলযুক্ত ছাতা ও বিদ্যুৎ অপরিবাহী রাবারের জুতা বজ্রপাতের সময় ব্যবহারের তাগিদ দিচ্ছেন তারা।

করোনা মহামারির ক্রান্তিলগ্নে জীবন-জীবিকার তাগিদে দিকবিদিক ছুটে চলা মানুষ বর্ষাকালের প্রকৃতির রূঢ় ও বৈরি আবহাওয়াজনিত কারণে সৃষ্ট বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সর্বদা সচেতন থাকবেন, এটাই প্রত্যাশিত।


বদরুল হুদা সোহেল
সহকারী অধ্যাপক, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :