ভোট গ্রহণ শেষ, অপেক্ষা নতুন নগরপিতার



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
মেশিনে আঙুলের ছাপ নেওয়া হচ্ছে

মেশিনে আঙুলের ছাপ নেওয়া হচ্ছে

  • Font increase
  • Font Decrease

ভোটারদের ভোট দিতে না দেওয়া, কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট নেই, এজেন্ট বের করে দেওয়া বিএনপির প্রার্থীদের এমন অভিযোগের মধ্য দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া এ ভোটে নতুন নগরপিতা নির্বাচন করতে সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্র ভোটারদের লাইন দেখা যায়। তুলনামূলক ভোটার উপস্থিতি কম হলেও নগর জুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ।   

এবার প্রথমবারের মতো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হয় ইভিএম প্রযুক্তিতে।  ২ হাজার ৪৬৮টি ভোটকেন্দ্রে ২৮ হাজার ৮৭৮টি ইভিএমে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। আধুনিক এই প্রযুক্তিতে সহজেই ভোট দিতে পারলেও আঙ্গুলের ছাপ ও তথ্যে মিল না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।

ইভিএমে ভোট দিয়ে নতুন ভোটারদের আঙুল প্রদর্শন

ভোট গ্রহণ শুরুর পর থেকেই বিএনপির পক্ষে অভিযোগ করা হয়, পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে সমস্যা হচ্ছে, ঢুকতে পারলেও কোথাও কোথাও বের করে দেওয়া হচ্ছে। অনেক কেন্দ্রে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না। তবে আওয়ামী লীগের দাবি, নির্বাচন নিয়ে বিএনপির মিথ্যা অভিযোগ তাদের রাজনৈতিক কৌশল।

বিএনপির পোলিং এজেন্ট না থাকার বিষয়ে ডিএসসিসি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন অভিযোগ করে জানান, কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়া হচ্ছে, এজেন্ট থাকবে কোথা থেকে। একই অভিযোগ করেছেন উত্তর সিটির বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিউ আউয়ালও।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ক্ষমতাশীল মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জানিয়েছেন, বিএনপির সাংগঠনিক ক্ষমতা নেই তাই এজেন্ট দিতে পারে নি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে। আমাদের কাছে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর আসেনি। বিএনপির লোকজন কিছু কিছু জায়গায় বানোয়াট মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে। তারা ঠিকই ভোটকেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে ভোট দিয়ে আসছে তারপরও তারা মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে। এটা তো তাদের একটি রাজনৈতিক কৌশল। 

প্রথমবার ইভিএমে ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোটাররা

এদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্রে টিকে থাকার সক্ষমতা থাকতে হবে। কেউ বললেই বেরিয়ে যাওয়া যাবে না।

ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সিইসি বলেন, ভোটার উপস্থিতি কম। আশা করছি, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারের সংখ্যা বাড়বে।

অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারও নিজ ভোটকেন্দ্রে বিরোধীদলীয় প্রার্থীর এজেন্ট দেখতে পাননি বলে জানিয়েছেন।

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ নয়টি দলের ১৩ জন প্রার্থী মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া কাউন্সিলর পদে প্রায় সাড়ে সাতশ প্রার্থী রয়েছেন ভোটের মাঠে।

এর মধ্যে উত্তরে মেয়র পদে ৬ জন, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ২৫১ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ৭৭ জন অর্থাৎ তিন পদে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ৩৩৪ জন। মেয়র প্রার্থীরা হলেন- বিএনপির তাবিথ আউয়াল, আওয়ামী লীগের আতিকুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ, পিডিপির শাহীন খান, এনপিপির মো. আনিসুর রহমান দেওয়ান ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আহম্মেদ সাজ্জাদুল হক।

আঙুলের ছাপ দিতেই ভোটারের ছবি ও তথ্যাবলি মনিটরে প্রদর্শিত

অন্যদিকে ডিএসসিসিতে মেয়র পদে ৭ জন, ৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৩৩৫ জন ও ১৮টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৮২ জন অর্থাৎ ৪২৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছে। মেয়র পদে সাত প্রার্থী হলেন-বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নুর তাপস, বিএনপির ইশরাক হোসেন, জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন, ইসলামী আন্দোলনের মো. আবদুর রহমান, এনপিপি'র বাহরানে সুলতান বাহার, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আকতার উজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লা ও গণফ্রন্টের আব্দুস সামাদ সুজন।

দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষক:

নির্বাচনে নয়টি দেশ ও একটি সংস্থার ৭৪ জনকে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দিয়েছিলেন কমিশন। এদের মধ্যে ৪৬জন বিদেশি ও ২৮ জন দেশি নাগরিক।

বিদেশি পর্যবেক্ষকদের তালিকা থেকে জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৭ জন, যুক্তরাজ্যের ১২ জন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৫ জন, নেদারল্যান্ডের ৬ জন, সুইজারল্যান্ডের ৬ জন, জাপানের ৫ জন, ডেনমার্কের ৩ জন, নরওয়ের ৪ জন, অস্ট্রেলিয়ার ২ জন ও কানাডার ৪ জন পর্যবেক্ষণ করেছেন।

ভোটগ্রহণে অর্ধলক্ষ কর্মকর্তা

প্রতি ভোটকেন্দ্রে ১ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, প্রতি ভোটকক্ষে ১ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও ২ জন পোলিং অফিসার দায়িত্বে ছিলেন। দুই সিটিতে সব মিলিয়ে ২ হাজার ৪৬৮জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, ১৪ হাজার ৪৩৪জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও ২৮ হাজার ৮৬৮জন পোলিং কর্মকর্তা। এছাড়াও কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবস্থাপনায় সশস্ত্র বাহিনীর ৫ হাজার ১৫ জন সদস্য ছিলেন। তারা শুধু ইভিএম পরিচালনার দায়িত্বে পালন করেছেন। সবমিলে দুই সিটির ভোট দায়িত্ব পালন করছেন অর্ধলক্ষ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা।

থাকছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অর্ধলক্ষ সদস্য:

দুই সিটির ভোটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অর্ধলক্ষ সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। ভোটে কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ ও আনসার-ভিডিপির সদস্য থাকছে ৪১ হাজার ৯৫৬ জন। সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ জন করে সদস্য মোতায়েন থাকছে। পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসারের সমন্বয়ে গঠিত ১২৯টি মোবাইল ফোর্সে থাকবেন ১ হাজার ২৯০ জন, ৪৩টি স্ট্রাইকিং ফোর্সে থাকছেন ৪৩০ জন, রিজার্ভ স্ট্রাইকিং ফোর্সে থাকছেন ৫২০ জন। আর দুই সিটিতে র‌্যাবের টিম থাকছে ১৩০টি। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে টিম দায়িত্ব পালন করছে। গড়ে ১১ জন করে এতে মোট ১ হাজার ৪৩০ জন র‌্যাব সদস্য থাকছেন। দুই সিটিতে র‌্যাবের ১০টি রিজার্ভ টিম থাকছে, তাতে ১১০ জন সদস্য থাকবেন। রিজার্ভসহ দুই সিটিতে ৭৫ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্বে পালন করছেন। প্রতি প্লাটুনে গড়ে ৩০ জন করে মোট ২ হাজার ২৫০ জন বিজিবি সদস্য থাকছেন ভোটের দায়িত্বে।

এছাড়াও উত্তর সিটিতে ২৭জন ও দক্ষিণে ৩৭জন বিচারিক হাকিম দায়িত্ব পালন করছেন ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত।

ভোটার সংখ্যা:

দুই সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৮ লাখ ৪৩ হাজার ৮জন ও নারী ভোটার ২৬ লাখ ২০ হাজার ৪৫৯জন। সিটি করপোরেশন হিসাবে ঢাকা উত্তর সিটিতে মোট ভোটার রয়েছেন ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩জন; যার মধ্যে পুরুষ ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭জন ও নারী ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৭০৬জন। অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভোটার সংখ্যা ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪জন; যার মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪১জন ও নারী ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩জন।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনের সময় দুই সিটিতে ভোটার ছিল ৪২ লাখ ১৬ হাজার ১২৭জন। পাঁচ বছরে ভোটার বেড়েছে ১২লাখ ৪৭ হাজার ৩৪০ জন।

ভোটকেন্দ্র:

ঢাকার দুই সিটিতে ২ হাজার ৪৬৮টি ভোটকেন্দ্র ও ১৪ হাজার ৪৪৫টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটিতে ১ হাজার ৩১৮টি ভোটকেন্দ্র ও ৭ হাজার ৮৫৭টি ভোটকক্ষ এবং দক্ষিণ সিটিতে ১ হাজার ১৫০টি ভোটকেন্দ্র ও ৬ হাজার ৫৮৮টি ভোটকক্ষ রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে ৬৩৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং দক্ষিণে ৬৪৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব কেন্দ্র অবস্থিত।