গান, কবিতা, বাদ্যযন্ত্র সবকিছু ধ্বংসের ইচ্ছাপত্রে সুমনের সই!



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কবীর সুমন

কবীর সুমন

  • Font increase
  • Font Decrease

কবীর সুমন, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী, কবি, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। যার গানে সংস্কৃতির ছোঁয়া আর আলাদা ধাঁচের সঙ্গীতের নির্যাস! গান দিয়ে শুধু দুই বাংলা নয়, বিশ্ব বাঙালির কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। রোজকার জীবনযাত্রা, অচেতন মনের চিন্তাধারা, নগর জীবনের বাস্তবতা আর এর সাথে জড়ানো অনুভূতিগুলো বিস্ময়কর এক দ্যুতি ফুটে ওঠে তার গানে। তাকে বলা হয় ‘জীবনমুখী’ গায়ক।


হঠাৎ কি হলো যে নিজের সৃষ্টি ধ্বংসের ইচ্ছা পোষণ করলেন। জীবনের কোন তিক্ত অভিজ্ঞতায় নাকি স্বেচ্ছায়; নাকি কোন অভিমান থেকে মৃত্যুর পর নিজের সৃষ্টি ধ্বংসের ইচ্ছাপত্রে স্বাক্ষর করলেন কবীর সুমন!

তার সৃষ্ট গান, স্বরলিপি, কবিতা এমনকি বাদ্যযন্ত্রসহ সংগীতের কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামসহ সবকিছু ধ্বংসের ইচ্ছাপত্রে সই করেছেন দুই বাংলার জনপ্রিয় এ শিল্পী! সেই সঙ্গে মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ চিকিৎসাশাস্ত্রের কাজে দান করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পোস্ট করেন তিনি।

জীবনমুখী এ শিল্পী তার ফেসবুকে চিঠিটি পোস্ট করে লিখেছেন- খুব জরুরি বিষয়। আবেগহীনভাবে সকলকে জানিয়ে রাখছি, কারণ হঠাৎ কিছু ঘটে গেলে কঠিন সমস্যা দেখা দেয়। প্রায় অনুরূপ একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল ২০১২ সালে আমি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার পর। খোলাখুলি সকলকে জানিয়ে রাখছি।  অনুগ্রহ করে মতামত দেবেন না। ভাল মন্দ কিছু লিখবেন না। এটা এক প্রবীণ মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞপ্তি। অনেক অভিজ্ঞতার পর, অনেক ভেবেচিন্তে লিখছি।  ফেসবুকে, যাতে অনেকেই এটা জেনে যান। অনুগ্রহ করে আবেগের বশবর্তী হবেন না, উপদেশ পরামর্শ দেবেন না। আমি আমার কাজ করে যাচ্ছি, যাবো। আমার জীবনে কোনও হতাশা, দুঃখ, ব্যর্থতাবোধ, অবসাদ নেই। আমি সানন্দে বেঁচে আছি, আমার কাজ করে যাচ্ছি। আমার জীবনে ভালবাসা কামনা কাম লালসা আনন্দ স্ফুর্তি মজা রঙ্গরগড় হাসাহাসি নিভৃত কান্না কাজ অধ্যবসায় নিয়মিত রেয়াজ পরিশ্রম সৃজনশীলতা সবই আছে। প্রয়াত খুশওয়ান্ত সিং তাঁর ' দি এণ্ড অফ ইণ্ডিয়া' গ্রন্থে লিখেছিলেন - "কাজই ধর্ম"। আমি তাইই মনে করি। আমার ধর্ম কাজ। প্রতিনিয়ত আমি আমার কাজ করে যাচ্ছি, অর্থাৎ স্বধর্ম পালন করছি। আমি জানি আমি সানন্দে,খুশি মনে মারা যাবো।

আমি বেঁচে আছি বাংলা খেয়াল বাংলা গান সুরতালছন্দলয়, আমার স্বভাবসিদ্ধ ভালবাসা কাম কামনা খামখেয়ালিপনা inconsistency এক ধরণের ক্ষ্যাপামি আর সুরতাললয়ে থেকে মৃত্যুর অপেক্ষায়। অন্য কোনও বিষয়ে আমি নেই।

জন্মস্বাধীন

স্বপরিশ্রমে ও স্বখরচায় স্বেচ্ছাচারী,

কবীর সুমন

২৩,১০, ২০

কলকাতা

আমার স্বহস্তে লেখা ইচ্ছাপত্রের ছবি তুলে ছাপিয়ে দিলাম -

কবীর সুমনের নিজের হাতে লেখা চিঠি

কবীর সুমনের লেখা চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

সকলের অবগতির জন্য-

স্বজ্ঞানে, সচেতন অবস্থায়, স্বাধীন ভাবনা চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আমি জানাচ্ছি : আমার কোনও অসুখ করলে, আমায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে অথবা আমি মারা গেলে আমার সম্পর্কিত সবকিছুর, প্রতিটি বিষয় ও ক্ষেত্রে দায়িত্ব গ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাকবে একমাত্র মৃন্ময়ী তোকদারের (মায়ের নাম প্রয়াত প্রতিমা তোকদার, বাবার নাম দেবব্রত তোকদার) অন্য কারুর কোনও অধিকার থাকবে না এই সব বিষয় ও ক্ষেত্রে। আমার মৃতদেহ যেন দান করা হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজে। কোনও স্মরণ সভা, শোকসভা, প্রার্থনা সভা যেন না হয়। আমার সমস্ত পাণ্ডুলিপি, গান, রচনা, স্বরলিপি, রেকর্ডিং, হার্ডডিক্স, পেইনড্রাউভ, লেখার খাতা, প্রিন্ট আউট যেন কলকাতা পুরসভার গাড়ি ডেকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়-সেগুলি ধ্বংস করার জন্য- হাতে লেখা সবকিছু, অডিও ও ভিডিও ফাইল সব। আমার কোনও কিছু যেন আমার মৃত্যুর পর পড়ে না থাকে। আমার ব্যবহার করা সব যন্ত্র, বাজনা, সরঞ্জাম যেন ধ্বংস করা হয়। এর অন্যথা হবে আমার অপমান।

কবীর সুমন

২৩, অক্টোবর ২০২০

১৯/জি বৈষ্ণবঘাটা বাইলেন, কলকাতা-৭০০০৪৭


চিঠিতে কবীর সুমন তার সব ইচ্ছা পূরণের দায়িত্ব দেন পশ্চিমবঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা মৃন্ময়ী তোকদার নামে এক নারীকে। ফেসবুকের মৃন্ময়ী তোকদার মন্তব্য করেন, ‘আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব আমার দায়িত্ব পালনের’।