পাট-চিনির পর চামড়া শিল্পও ধ্বংসের আয়োজন!

মো: মোসলেহ উদ্দিন
পাট-চিনির পর চামড়া শিল্পও ধ্বংসের আয়োজন!

পাট-চিনির পর চামড়া শিল্পও ধ্বংসের আয়োজন!

  • Font increase
  • Font Decrease

পাট দিয়ে শুরু

এক সময় বিশ্বব্যাপী আমাদের দেশের পাটের খুব কদর ছিল। পাট রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পেতাম বলে আয়েশ করে এর একটা যুৎসসই নামও দিয়েছিলাম আমরা। হ্যাঁ, ”সোনালী আঁশ।” বলাবাহুল্য সেসময় জাতীয় অর্থনীতিতে পাটের ভুমিকা ছিল মুখ্য। কিন্তু সেই পাট ঐতিহ্য হারিয়ে এখন অস্তিত্বও সংকটে। পাটের আন্তর্জাতিক বাজার চাহিদা নেই। পাটপণ্যের দেশীয় উৎপাদনের সেই সুদিনও নেই। একের পর এক সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাবার ঘটনা জানান দিচ্ছে পাটের কোনো ভবিষ্যতও আর বাংলাদেশে নেই।

পাটের সোনালী সময়ে রফতানি আদেশের পাটের সাথে নিম্নমানের ভেজাল পাট মেশানো, ভালো পাটের গাঁটের ভেতর ধুলোপানি মেশানো এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে গাঁটের ভেতর কলা গাছ ঢুকিয়ে দেয়ার মতো নানাবিধ অসসতা ও দুর্নীতির কারণে পাট আন্তর্জাতিক বাজারে এক পর্যায়ে  আস্থার সংকটে পড়ে। আমাদের প্রতারণার সাথে নানাভাবে পেরে উঠতে না পেরে আমদানিকারক দেশগুলো ধীরে ধীরে বাংলার পাট থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করে।

এরপর যখন পাটের বিকল্প কৃত্রিম আঁশ বাজারে এসে যায় তখনও আমাদের হঁশ ফিরেনি। বাজার ধরে রাখার কিছু চেষ্টা হলেও আমাদের চরিত্র না বদলানোয় আমদানিকারকদের আস্থা আর ফেরানো যায়নি। ফলে যা হবার তাই হলো। রফতানি আদেশ বাতিল হতে লাগলো। নতুন রফতানি আদেশ আসা বন্ধ হয়ে গেল। কৃষকদের অতি কষ্টে উৎপাদন করা পাট তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ালো। আয়েশ করে নাম দেয়া “সোনালী আঁশ” হয়ে দাঁড়ালো ”চাষির গলার ফাঁস।” লোকসান গুনতে গুনতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর পাট চাষ ছাড়তে শুরু করে কৃষকরা।

আখের আখেরি খবর

অর্থকরি ফসল হিসেবে আখের চাষও দেশময় খুব জনপ্রিয় ছিল। বেলে-দোআঁশ জাতের অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে আখের চাষ হতো। আখ দিয়ে দু’ধরণের চিনি তেরি হতো। সনাতনী পদ্ধতির মাড়াইয়ে আসতো লাল চিনি। এটা দিয়ে কৃষক পরিবারের সারা বছরের চিনির চাহিদা যেমন মিটতো তেমনি বিক্রয়ের মাধ্যমে তাদের হাতে আসতো প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ। এর বাইরে বৃটিশ আমল থেকে স্বাধীনতার অব্যবহতি সময় পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত চিনিকলগুলোতে একই আখ দিয়ে লালচে সাদা চিনির উৎপাদন হতো। চিনিকল এলাকায় আখের যোগান নিশ্চিত করতে সাধারণত: সনতনী মাড়াই নিষিদ্ধ ছিলো।

তবে এখানেও এক পর্যায়ে চিনিকলের হর্তাকর্তাদের দুর্নীতি রাজত্ব কায়েম হয়ে যায়। ট্রেড ইউনিয়নগুলোও একইরূপে দুর্নীতির অসুর হিসেবে আবির্ভূত হয়।  অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে চিনিকলে সরবরাহকৃত আখের দাম সময়মত না পাওয়া কিংবা মাপ কারচুপি ঘটিয়ে চাষিদের ঠকানোর ফলে আখ চাষিদের লোকসান হতে থাকে। কর্তা ব্যক্তিদের নানারূপ আশ্বাসে বিশ্বাস করেও বার বার ঠকতে ঠকতে শেষ পর্যন্ত আখ চাষও থেকেও সরে দাঁড়ায় অনেক এলাকার চাষি। ফলাফল আখের অভাবে আখকলগুলো চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন আরো লোকসান ঠেকাতে বেশকিছু  চিনিকল লেঅফ ঘোষনা করে অনেকটা পানির দরে বিক্রি করে দেয়া হয়। আর বাকি যেগুলো চলছে সেগুলোর অবস্থাও নানা কারণে নাজুক।

আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়ে পাট চাষ বন্ধ হয়ে পড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের একটি বড় পথ বন্ধ হয়ে পড়ার ক্ষতির চেয়ে চিনিকল বন্ধ হয়ে পড়ার তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ছিল অনেক বেশি। কারণ চাষিদের নিজেদের প্রয়োজনে যে পরিমাণ পাট এখানো দেশে উৎপাদন হয় তা দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটে যায়। কিন্তু চিনির ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্নই বলা যায়। কারণ উৎপাদন এবং বাজার হাতছাড়া হবার পর আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের জন্য চিনির আমদানি নির্ভরতা বেড়ে গেছে। আর সেইসব আমদানিকৃত চিনি প্রকৃত কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত চিনিও নয়।

উল্লেখ্য যে, বিশ্বের ৮০ ভাগ চিনি উৎপাদন হয় আখ থেকে।আর ২০ শতাংশ হয় সুগার বিট থেকে।আখের চিনি হলো স্বাস্থ্যসম্মত ও মানব দেহের জন্য উপকারি।অপরদিকে পরিশোধিত চিনি হয়  রাসায়নিক সংমিশ্রণে সম্পুর্ণ কৃত্তিম উপায়ে। মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন পরিশোধিত চিনি বর্জন শুরু করছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম হওয়ায় পরিশোধিত চিনি কিংবা অপরিশোধিত বিট বাংলাদেশের মতো মুনাফাখোর আমদানিকারক এবং ব্যবসায়িদের প্রথম পছন্দ। ফলে চিনি নামের এই কৃত্রিম পণ্যটিই আমরা পাচ্ছি এবং খাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

বলাবাহুল্য, বর্তমানে বাজারে পাওয়া আমাদের দেশের চিনির প্রায় শতভাগই আমদানি নির্ভর। দেশে কাগজেপত্রে ১৫টি চিনিকল চালু থাকা সত্বেও স্বাদ আর গুণগত মানে উন্নত এবং স্বাস্থ্যসম্মত দেশীয় আখজাত ভিজে  এবং লালচে চিনি পাওয়া যায় না অজ্ঞাত কারণে। মজার ব্যাপার হলো দেখতে ধবধবে সাদা এবং ঝরঝরে মিহি দানার চিনি আসলে চিনিই না সেকথাটাও আমাদের জানা নেই।

অতঃপর চামড়া শিল্প

বর্তমানে রফতানি খাতে ৯ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখা চামড়া শিল্পের যে শক্তিশালী ভিতটা আমাদের নড়বড়ে হয়ে পড়ছে তা দেখে এক ধরণের শংকাবোধ থেকেই পাট এবং চিনির সোনালী ইতিহাসের যৎকিঞ্চিৎ এবং বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরলাম। এ শিল্প নিয়েও মনে হয় আমারা ধ্বংসাত্মক খেলায় মেতে উঠেছি। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চামড়া আহরণের সবচে’ বড় মওসুম ঈদুল আযহার সময় চামড়ার দাম নির্ধারণ এবং ক্রয়বিক্রয় নিয়ে গড়িমসি লক্ষ্য করা যায়। নানা রকম চালবাজিতে বড় ব্যবসায়ী কর্তৃক মওসুমী চামড়া ব্যবসায়িদের চামড়া ছিলে নেবার কুটকৌশলে দিশেহারা হয়ে পড়ে তারা। ফলস্বরূপ মাঠ পর্যায়ে ক্রেতার অভাবে চামড়ার দাম কমতে কমতে এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে বিকির বদলে চামড়া এখন মাটি চাপা হয় কিংবা নদীর স্রোতে ভাসে।

অথচ অপার সম্ভাবনাময় আমাদের চামড়া খাত।  ‍গুণগত মানে ফরাসিদের ‘ফ্রেঞ্চ কাফের’ পর আমাদের দেশের চামড়াই দুনিয়া সেরা। এরকম স্মোথ গ্রেইনের চামড়া বিশ্বের আর কোথাও মেলে না। গত এক দশকে সমানতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে চামড়াজাত পণ্য রফতানির পরিমাণ ও বাজার।আমাদের দেশের চামড়া দিয়ে বিশ্বমানের হুগো বসের মতো প্রতিষ্ঠান জুতা তৈরি করে বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি এক জোড়া জুতা বাংলাদেশের অর্থমানে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। ইউরোপের সবচেয়ে বড় জুতা বিক্রেতা ডাচ্ম্যানের প্রায় চার হাজার শোরুমে এখন বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত চামড়াজাত জুতা বিক্রি হয়। এছাড়া  আমেরিকা, ইউরোপ জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম রাশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াতেও বাংলাদেশের চামড়ার জুতার বাজার রয়েছে। এশিয়ার জাপানেও খুব পছন্দ বাংলাদেশি জুতা।

ধারণা করা হয়, গার্মেন্টস শিল্পের পর চামড়া শিল্পই এখনো দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগের অতি সম্ভাবনাময় খাত। দেশে বর্তমানে ১১০টি রফতানিমুখী কারখানায় চামড়ার জুতা তৈরি হয়। এর মধ্যে এপেক্স, এফবি, পিকার্ড বাংলাদেশ, জেনিস, আকিজ, আরএমএম, বেঙ্গল এবং বে’র রয়েছে নিজস্ব ট্যানারি ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। এর বাইরে শুধু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে এমন কারখানার সংখ্যা ২০৭টি। এরপরও কাঁচা চামড়া অবহেলিত। ভাবা যায় ব্যাপারটি?

অথচ নানা কারণে চামড়া শিল্পে বাংলাদেশ হয়ে উঠছে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের প্রধান আকর্ষণ। কারণ এ শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং জুতা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে আমাদের। সস্তায় পাওয়া দক্ষ জনবলও এ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ। বাড়তি সুবিধার মধ্যে চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে সরকারের ১৫ ভাগ ভর্তুকি সুবিধাও রয়েছে।

সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবার নতুন খবর হলো ,চামড়ার জুতা উৎপাদনকারী প্রধান দেশ চীন, ভিয়েতনাম এবং ব্রাজিল এ খাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। ফলে গার্মেন্টসের মতো আমাদের দেশে এখন এ খাতের ব্যবসা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ওসব দেশের ছেড়ে দেয়া বিশ্বের জুতার বাজারের ওই অংশটিই ধরতে পারেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারাই।

দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ ট্যানারি রফতানিমুখী। এ খাতে বর্তমানে আমাদের রফতানি আয় ১ বিলিয়নের বেশি এবং এটি আরএমজির পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত হিসেবে তৈরি হয়েছে। গত এক দশকে দেশের চামড়া শিল্পের রফতানি ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ উৎপাদনে বিশ্বে ৬ষ্ঠ স্থান এবং বিশ্বব্যাপী রফতানিতে ২০তম স্থান অর্জন করেছে। বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টি দেশে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে আরও ১০টি দেশে জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চামড়া শিল্পে রফতানি আয় হয়েছে রেকর্ড ১০১৯.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে অন্যান্য পাদুকা (চামড়াবিহীন) শিল্পের রফতানি আয় ১১.২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ২০২২ সালের মধ্যে এ খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় করা সম্ভব হবে। এমন সম্ভাবনার মাঝেও চামড়ার প্রতি কি অবহেলা এবং অবিচারটাই না করছি আমরা? আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে চামড়ার দাম নেই। ভাবা যায় ব্যপারটা ?

মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, জাতীয়ভাবে গুরুত্ব না দেয়ায় এই পণ্যটি নিয়ে এক ধরণের খেলা চলছে। আগে যখন কাঁচা চামড়ার দাম ভালো ছিলো তখন পার্শ্ববর্তি দেশে চামড়া পাচার ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হতো। আর এখন দেশে প্রায় মূল্যহীন এ চামড়া একদিকে রাস্তায় পড়ে থাকা, মাটি চাপা দেয়া কিংবা পানিতে ভাসিয়ে দেবার ঘটনাবলির আড়ালে তা যে পাচার হয়ে যাচ্ছে না তারও কিন্তু খবর নেই।

অথচ কথায় আছে, ঘরের সহজলভ্য জিনিসকে অবহেলা করলে সেটা একসময় হাতছড়া হয়ে যায়। আমাদের অবহেলায় পাটের সুদিন গেল। গেল চিনির রাজত্বও।  এভাবে চলতে থাকলে চামড়া শিল্পের শেষ পরিণতি দেখাও হয়তো সময়ে ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

লেখক: মো. মোসলেহ উদ্দিন, কবি, প্রাবন্ধিক ও ব্যাংকার