জ্ঞান সহজলভ্য করতে গ্রন্থাগারের ডিজিটাল রূপান্তর



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘লাইব্রেরি’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘লাইবার’ থেকে, যার মানে হচ্ছে বই। পৃথিবীর যেকোনো সুস্থ সমাজের ভিত্তি হচ্ছে গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগার মানুষকে নতুন ধারণা, জ্ঞান অর্জন, চাকরির অনুসন্ধান এবং বিশেষত চমৎকার সব গল্পের জগতে হারিয়ে যেতে সাহায্য করে। লাইব্রেরিতে একই মানসিকতার মানুষের সমাবেশ ঘটে এবং তাদের মধ্যে উদ্ভাবনী ধারণার সঞ্চার হয়।

বাংলাদেশের গ্রন্থাগারের সূচনা ঘটে ভারতীয় উপমহাদেশে গ্রন্থাগার বিকাশের সময়কালে। বগুড়ায় উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি, যশোর পাবলিক লাইব্রেরি, বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি এবং রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ১৮৫৪ সালে বাংলাদেশে গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীকালে, ১৯৫১ সালে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশসহ সারাদেশে আরও অসংখ্য গ্রন্থাগার নির্মাণ করা হয়। সেসময় বেশিরভাগ গ্রন্থাগার বেসরকারি মালিকানা বা সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হতো।

সরকার ১৯৫৪ সালে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণ করে। তবে, গ্রন্থাগারটি ১৯৫৮ সালে ১০ হাজার ৪০টি বই নিয়ে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বর্তমানে, এটি সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার নামে পরিচিত। এটি ছিল বাংলাদেশে গ্রন্থাগারের প্রাথমিক সূচনা। ক্রমান্বয়ে, দেশের অগ্রগতির সাথে সাথে দেশজুড়ে অসংখ্য গ্রন্থাগার নির্মাণ করা হয়। কিছু গ্রন্থাগারে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল, আর বিশেষ করে যেগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল সেগুলো শিক্ষার্থী এবং স্কুলের লোকজন ব্যবহার করতেন। বিদেশ থেকে অসংখ্য মানবিক সংস্থা বাংলাদেশে গ্রান্থাগারের বিকাশের জন্য আর্থিক অনুদান প্রদান করেছিল।

সাধারণত নির্দিষ্ট কোনও ভবনের ভেতর গ্রন্থাগার নির্মাণ করা হয়। তবে, কিছু চলমান গ্রন্থাগার আছে যেগুলো সর্বসাধারণের কাছে বই পৌঁছে দিতে এবং মানুষকে বইমুখী করে তুলতে সারাদেশে ঘুরে বেড়ায়। কিছু কিছু বই বেশ ব্যয়বহুল, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে। গ্রন্থাগার ভবনের ভেতর থাকুক কিংবা চলমান, মানুষকে স্বল্পমূল্যে কিংবা বিনামূল্যে এটি বই সরবরাহ করে থাকে।

এখন সময় বদলাচ্ছে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও ডিজিটালায়নের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকার প্রয়োজনীয়তাকে দূর করে ডিজিটাল লাইব্রেরি বিশ্বের অনেক দেশে বেশ দ্রুত জনপ্রিয় এবং ‘আদর্শ’ হিসেবে গড়ে উঠেছে। ডিজিটাল লাইব্রেরিতে মানুষ দূর থেকে গ্রন্থাগারের সকল সুবিধা উপভোগ করতে পারে। এছাড়া, বর্তমানে মহামারি চলাকালীন সময়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তথ্য এবং গল্পের বই হাতের কাছের পাবার এ এক অসাধারণ উপায়।

অনলাইন গ্রন্থাগার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের ঐতিহ্যকে সামনের দিকে বয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। প্রায় সময় দেখা যায় যে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংবলিত বই যেমন, বৈজ্ঞানিক বই এবং গবেষণাগ্রন্থ নষ্ট হয়ে যায়, বেহাল দশা হয় না হলে হারিয়ে যায়। বর্তমানে, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং ক্লাউড স্টোরেজ সুবিধার মাধ্যমে এই গবেষণাগ্রন্থগুলো যে কোন সময় সহজেই রেকর্ড করা যায় এবং হাতের নাগালে পাওয়া যায়।

ডিজিটাল লাইব্রেরি এটি কেবল মানুষকে বই-ই সরবরাহ করে না, এটি অডিওবুক, পুরষ্কারপ্রাপ্ত সিনেমা এবং ডকুমেন্টারি, ম্যাগাজিন, ই-জার্নাল, ই-পত্রিকা এবং আরও অনেক রকম কনটেন্ট সরবরাহ করে।  ডিজিটাল লাইব্রেরি জ্ঞান অর্জনের নতুন দিগন্তকে প্রসারিত করেছে এবং বর্তমানে সামান্য কিছু ফি দিয়ে মানুষ বিস্তৃত তথ্য সহজে পেতে পারে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে কেন তাদের ডিজিটাল লাইব্রেরির সদস্য হওয়া বা ডিজিটাল লাইব্রেরি ব্যবহার করা উচিত? যেহেতু এই সমস্ত বিষয়বস্তু ইতোমধ্যে বিনামূল্যে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যেতে পারে। তবে, বেশিরভাগ সময়ই এ কথা সঠিক নয়। ইন্টারনেটে অসংখ্য জার্নাল, ম্যাগাজিন, গবেষণা, বই এবং বিভিন্ন ধরণের সামগ্রী পেতে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ (স্বতন্ত্র সাবস্ক্রিপশন) দিতে হয়। এছাড়া গ্রন্থাগারে সাধারণত সারা বিশ্বের অসংখ্য বইয়ের সন্ধান মেলে এবং সদস্যরা সেগুলো সহজেই পড়তে পারে।

এ ব্যাপারে নীল গাইমান বলেছেন, ‘গুগল হয়তো আপনাকে এক লাখ উত্তর দিতে পারে, কিন্তু একজন লাইব্রেরিয়ান আপনাকে সঠিক উত্তরের সন্ধান দিতে পারে।’

বাংলাদেশে গ্রন্থাগারের সহজলভ্যতা বাড়াতে এবং মানুষের জীবন আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশ নামমাত্র ফি-তে ডিজিটাল লাইব্রেরির সুবিধা প্রদান করছে। ডিজিটাল লাইব্রেরির মাধ্যমে সদস্যরা জেস্টোরের ২ হাজারের বেশি জার্নাল, প্রোকুয়েস্ট সেন্ট্রালের ১৫ হাজার এর বেশি জার্নাল, এক লাখ ২০ হাজার ই-বুকস ও অডিওবুকস এবং ইকোনোমিস্টস, অ্যামেচার ফটোগ্রাফার এবং নিউ সায়েন্টিস্টসহ ই-ম্যাগাজিন সহজে পেতে পারে। একশোটি দেশের প্রায় ৮ হাজারের বেশি ই-পত্রিকার পাশাপাশি ৪০ হাজার অনলাইন লার্নিং মডিউল, শিশুদের জন্য ই-রিসোর্স, ১৬ হাজারের বেশি গ্রাফিক নভেল এবং ই-কমিক্স, থিয়েটারের অভিনয়, সংগীত ডকুমেন্টারি এবং স্ট্রিম লাইভ কনসার্টের অ্যাক্সেস পাওয়া যায়।

শারীরিক সত্ত্বা হোক কিংবা ডিজিটাল, লাইব্রেরি যেকোন জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গ্রন্থাগার কেবল বইয়ের কোনও এলোমেলো সংগ্রহ নয়, এটি একটি সমাজ গড়ে তোলে।

রে ব্র্যাডবারি বলেছেন, ‘গ্রন্থাগার ছাড়া আমাদের কী আছে? আমাদের না আছে অতীত, না আছে ভবিষ্যৎ।’