চা বাগানের বউ কথা কও



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
গাছের ডালে বসে আছে বউ কথা কও। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

গাছের ডালে বসে আছে বউ কথা কও। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

মাত্র তো গেল পহেলা বৈশাখ। মানে এর আগের দিনগুলো বসন্ত ছিল। এই ঋতুর সূচনায় পাখি, ফুল, প্রকৃতির মাঝে বিরাট উৎসব শুরু হয়ে যায়। এর সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা বাংলাসাহিত্যের ক্লাসিক সাহিত্যিকরা দিয়ে গেছেন। যা বাংলা সাহিত্যজগৎকে করে তুলেছে পুরোপুরিভাবে প্রকৃতি সমৃদ্ধ। অতুলনীয়। 

ঋতুরাজ বিদায় নিয়েছে তাতে কি? প্রকৃতির তার নানান ছাপ প্রায় বৈশাখ পর্যন্ত গাড়াবে। বসন্ত প্রকৃতিকে আবাহন করে বারবার ডেকে যাওয়া একটি বিশেষ প্রজাতি পাখি বৌ কথা কউ। চা বাগানের টিলায় টিলায় কিংবা বনের নির্জন গভীরে যে পাখির ডাক বহু দূর থেকে বারংবার প্রতিধ্বনিত তার নাম ‘বউ কথা কও’ (Indian Cuckoo)। কী অপূর্ব সেই ডাক। যেনো প্রকৃতিকে ধন্য করে তুলে।

বাংলা সাহিত্যের অনুভূতিজুড়ে এই পাখিটি কথা জনপ্রিয়তার সাথে মিশে রয়েছে। মাত্র ৩৩ সেন্টিমিটারের বউ কথা কও ‘কোকিল’(Western Koel) গোত্রের পাখি। প্রচন্ড প্রজনন ঝুঁকি নিয়ে কোকিলারা যেভাবে অন্য পাখির বাসায় ডিম পাড়ে ‘বউ কথা কও’ও তাই। তারপরও সফল বেশ সফল। কিন্তু কি করে?

বউ কথা কও পাখির ক্রমাগত ডাক দারুণ মুগ্ধতা ছড়ায়। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক বলেন, পৃথিবীতে ১১ হাজারের বেশি পাখির প্রজাতির মধ্যে ১০০ প্রজাতির ‘কোকিল’ আছে যারা প্রজননের ক্ষেত্রে একেবারে ভিন্ন। সব পাখি ডিম পেড়ে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চাকে লালনপালনে ছানাকে বড় করে শুধুমাত্র ওই ১০০ প্রজাতির কোকিল ছাড়া। অন্য পাখি বাসায় ডিম পেড়ে আসা -এই মারাত্মক ঝুঁকিটা কোটি বছর ধরে করে আসছে কোকিল।’

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘নিজে বাসা বেঁধে ডিম পেড়ে তা দিয়ে বাচ্চাকে খাইয়ে বড় করা হলো সবকিছুই নিজের হাতের নিয়ন্ত্রণে থাকা। ভালো হোক মন্দ হোক নিজেই করা যায় সবকিছু। যখনই এটা অন্যর ঘরে দিয়ে চলে আসা যায় তাহলে তো জানাই হলো না কি হচ্ছে?– অন্যর বাসায় ডিম পাড়লে অন্য পাখির একটি ডিম নিচে ফেলে দিতে হয়।’

‘ধরা যাক – একটি ছাতারে (Babblar) পাখি সে নিজে একত্রে তিনটি ছানা তোলে। এখন বউ কথা কও পাখি ছাতারের একটি ডিম ফেলে তারপর নিজের ডিমটি পাড়তে হয়। এখন যদি ছাতারে বুঝতে পারে যে এই ডিমটি তার নয়। তাহলে তো সব প্রচেষ্ঠাই বিফল হয়ে যাবে। তাছাড়া পাখিটি তো সারাক্ষণ তার নিজের ডিমে তা দিচ্ছে। এখানে অন্য পাখি এসে ডিম পাড়াও কঠিন। সুতরাং ওই পাখিকে ভুলিয়ে চালাকি করে বাইরে আনতে হবে। পাখিটি বাসা থেকে অন্যত্র গেলে তখনই ডিমটি দ্রুত পেড়ে দিয়ে আসতে হবে। তারপরেও অনিশ্চিত রইল যে – এই বাচ্চা হবে কি না?’

‘বউ কথা কও’ বলে ডাকে বউ কথা কও পাখিটি। ছবি: আবু বকর সিদ্দিক

অপর একটি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ইনাম আল হক বলেন, এই যে যার বাসায় ডিম পাড়া হলো ওই পাখির ডিমটি মাটিতে ফেলে দেয়া হলে তার বংশ যদি বৃদ্ধি না হয় তাহলে ক’দিন পরে যদি ওই পাখিটিও বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে সে কার বাসায় ডিম পাড়বে? তার মাঝে এটা ‘সিমবায়োটিক’ অর্থাৎ দু’জনেরই উপকার হতে হবে। যে আরেক জনের বাসায় ডিম পাড়লো তার যদি অপকার হয় তাহলে কিন্তু সেও বাঁচবে না।

‘বউ কথা কও সর্বদাই ‘পালক বাবা-মা’ (ফোস্টার প্যারেন্স) পাখিদের বেছে নেয় যারা অন্য পাখির বাচ্চা পালবে। সেই পালক বাবা-মা পাখি হিসেবে ছাতারে বা ফিঙে কিন্তু বেশ শক্তিশালী পাখি। তারা বছরের এক বারের চাইতে বেশি বাসা করে ছানা তুলতে পারে। কোকিল যাদের বাসায় ডিম পাড়ে সেই কাক বা ছাতারে অথবা ফিঙে কেউই খারাপ অবস্থানে নেই। বরং অন্য পাখি বিপজ্জনক অবস্থানে রয়েছে, যেমন শকুন।’

বউ কথা কও এর ডিম ছাতারে (Babblar) ছাড়াও শালিক (Maya), ফিঙে (Drongo) পাখি ফুটায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বউ কথা কও কিন্তু এক প্রজাতির পাখির বাসায় ডিম পাড়ে না। বেশ কয়েক প্রজাতির বাসায় ডিম পাড়ে। অর্থাৎ যে পাখিটির সাথে বউ কথা কও এর ডিমের রং এবং আকার মিলবে ওই সুনির্দিষ্ট পাখিটির বাসাটিকেই বংশ পরম্পরায় ধরে তারা পছন্দ করে ডিম পড়ে যায় বলে জানান পাখি বিজ্ঞানী ইনাম আল হক।