ভারতে কেরালা মডেল: টিকা নষ্ট হয়নি, অক্সিজেন উদ্বৃত্ত, করোনা নিয়ন্ত্রণে



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
রাজাগিরি হাসপাতালের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্ট এবং চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার রেভারেন্ড ফাদার জনসন

রাজাগিরি হাসপাতালের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্ট এবং চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার রেভারেন্ড ফাদার জনসন

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনার নতুন আঘাতের সর্বসাম্প্রতিক দিনগুলোতে মৃত্যুর মিছিল আর অক্সিজেনের জন্য হাহাকারের পটভূমিতে ভারতে কেরালা মডেল সবার নজর কেড়েছে। সেখানে টিকা নষ্ট হয়নি, অক্সিজেন উদ্বৃত্ত রয়েছে এবং প্রবল মহামারি করোনাভাইরাসের বিস্তার এবং তাণ্ডবকেও রাখা হয়েছে নিয়ন্ত্রণে।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, দেশজুড়ে ৪৪ লক্ষ ৭৮ হাজার টিকার ডোজ ইতিমধ্যেই একাধিক কারণে নষ্ট হয়েছে। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১০ কোটি ৩৪ লক্ষ করোনা টিকার ডোজ প্রয়োগ করা হয়েছে। তথ্য জানার অধিকার আইনে আরও জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ও কেরাল ছাড়াও হিমাচল প্রদেশ, মিজোরাম, গোয়াতেও করোনা টিকার একটি ডোজও নষ্ট হয়নি। একইসঙ্গে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল দমন ও দিউ, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ও লাক্ষাদ্বীপেও করোনা টিকার কোনও ডোজ নষ্ট হয়নি।

এদিকে ভারতে প্রতিদিন ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর বিশ্ব রেকর্ডের প্রেক্ষাপটে দেশটিতে যে অক্সিজেনের তীব্র সংকট চলছে, সেটাও এখন আন্তর্জাতিক বড় খবর। তবে, ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে কেবল কেরালায় কোনও অক্সিজেন–সংকট নেই। শুধু তা–ই নয়, এ মুহূর্তে তাদের অক্সিজেন মজুত আছে ৫০০ থেকে ৬০০ টন। বাকি ভারত যখন অক্সিজেনের জন্য হাহাকার করছে, তখন শুধু কেরালায় নিজেকে নিরাপদ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে পেরেছে।

করোনা মহামারির বিরুদ্ধে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী আরব সাগর তীরে মালাবার উপকূলে অবস্থিত মালয়ালাম ভাষী কেরালা ভারতের ২২তম রাজ্য, যেখানে ভারতের জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশ লোক বাস করে। কিন্তু নাগরিক নিরাপত্তার জন্য যা কিছু জরুরি, তার অনেক কিছুতেই বরাবর এগিয়ে এই ছোট রাজ্য। এক দশক ধরে পুরো ভারত যখন তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক মডেল’-এ মাতোয়ারা, তখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি খাতে প্রকৃত অগ্রগতি ঘটিয়ে চলেছে কেরালা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে কেরালাকে বলা হয় 'সৃষ্টিকর্তার নিজের দেশ'। করোনার প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুতি নিয়ে সতর্কতা ও অবকাঠামো তৈরিতে সক্ষম হয় কেরালা। কমিউনিস্ট শাসিত এই রাজ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম মুসলিম বসতি, যারা পুরো ভারতের শ্রেষ্ঠতম বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী জনগোষ্ঠী। রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াকু সংগ্রামী মোপলা মুসলিম নৃগোষ্ঠী।  আরো আছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বপ্রাচীন খ্রিস্টান জনপদ, যেখানে প্রথম ইউরোপীয় আগমনকারী ভাস্কো-দা-গামার সমাধিও অবস্থিত।

ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-সামাজিক দিক থেকে বহুমাত্রিক বর্ণালি যেন কেরালা। করোনা পরিস্থিতি  মোকাবিলায় দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়েছে ভারতের কেরালা রাজ্য। ভারতের প্রথম করোনা আক্রান্ত এই রাজ্যে শনাক্ত হলেও এখন সর্বোচ্চ আক্রান্ত রাজ্যের মধ্যে কেরালার অবস্থান অষ্টম। কেরালায় মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম। কেরালা যেভাবে করোনা মহামারির মোকাবিলা করছে, তা এখন শুধু ভারতে নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও স্বীকৃতি পাচ্ছে ‘কেরালা মডেল’ নামে।

এ সম্পর্কে জানতে কথা হয় কেরালার কোচি শহরের রাজাগিরি হাসপাতাল (rajagirihospital.com) কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। তারা জানায়, যখনই এই ভাইরাসের কথা শোনা যায়, তখন থেকেই রাজ্যে প্রস্তুতি নেয়া হয়। ২০১৮ সালে আরেক ভাইরাস ‘নিপাহ’ কেরালা রাজ্যে ছড়িয়েছিল। ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল তখন। তখন থেকে রাজ্যের স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ নজর দেওয়া হয় এবং অবকাঠামো ও অক্সিজেনের উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়, যা করোনার চরম সঙ্কটে বিশেষভাবে কাজে লাগছে।

রাজাগিরি হাসপাতাল (rajagirihospital.com)-এর এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্ট এবং চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার রেভারেন্ড ফাদার জনসন (Rev Fr Johnson Vazhappilly CMI) বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় কেরালা। এ রাজ্যে শিক্ষার হার ঈর্ষণীয়। করোনার সূচনাতেই পাবলিক-প্রাইভেট উভয় সেক্টরই হাতে হাত রেখে কাজ করে এবং ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রেখে পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, শুধু ভারত নয়, সারা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ হাসপাতালগুলোতে কেরালার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা জনশক্তি কর্মরত রয়েছে। আমরা তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নিয়েছি। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি আহরণ করেছি। এবং স্বল্প ব্যয়ে সর্বাধিক সেবার মনোভাব ছড়িয়ে দিয়েছি। ফলে কেরালার স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাত ভারতের মধ্যে সর্বঅগ্রণী, মানবিক ও রোগি-বান্ধব। যাদের অধিকাংশই আবার চ্যারিটেবল মনোবৃত্তিসম্পন্ন। সকলেই একযোগে ঝাঁপিয়ে কেরালার করোনা পরিস্থিতি সামলাতে সচেষ্ট হয়েছেন।

রেভারেন্ড ফাদার জনসন (Rev Fr Johnson Vazhappilly CMI) আরো বলেন, মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে কেরালার স্বাস্থ্যখাতের প্রচেষ্টা দৃষ্টান্তস্বরূপ। কেরালার কিছু কিছু জায়গা, যেমন, বন্দর শহর কোচি ও এর আশেপাশে অত্যাধুনিক-অতিঅগ্রসর মেডিকেল সিটি তৈরি হচ্ছে। এসব মজবুত অবকাঠামো শুধু রাজ্য নয়, সমগ্র ভারতের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যখাতের নেতৃত্ব দেবে। অচিরেই ভারতের স্বাস্থ্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাধুনিক সেবা কার্যক্রম কেরালার নেতৃত্বে পরিচালিত হবে, যা শুধু রাজ্য বা ভারতবাসী নয়, সারা দক্ষিণ এশিয়ার চাহিদা মিটাতে সক্ষম হবে।