চন্দ্রাভিযানের নেপথ্য নায়কের চিরবিদায়



লুৎফে আলি মহব্বত, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট,  বার্তা২৪.কম
তিন চন্দ্রাভিযাত্রী

তিন চন্দ্রাভিযাত্রী

  • Font increase
  • Font Decrease

চন্দ্রাভিযানের অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি। ছিলেন চন্দ্র জয়ী তিন মার্কিন মহাকাশচারীর একজন, যারা বদলে দিয়েছিলেন মানব সভ্যতার ইতিহাস। অভিযানের পাইলট মাইকেল কলিন্স চিরবিদায়ের পথে চলে গেলেন। তিনি চাঁদের মাটিতে পা না দিলেও চন্দ্রাভিযানের মূল রূপকার ও নেপথ্য নায়ক ছিলেন।

চাঁদের বুকে মানুষের পায়ের স্পর্শের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে করোনাকালে ২০১৯ সালের ২০ জুলাই। ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই ‘স্যাটার্ন ৫’ রকেটে চেপে চাঁদে পাড়ি দিয়েছিল ‘অ্যাপোলো ১১’। যদিও তারপর একাধিকবার সফল চন্দ্র অভিযান হয়েছে, তবু অ্যাপোলো-১১-এর অভিযান, মানব ইতিহাস ও সভ্যতার অন্যতম মাইলফলক হিসেবেই চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে।

১৬ জুলাই ১৯৬৯। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় ভোর ৬টা ৪৫ মিনিটে তিন নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং, এডউইন অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স তাদের নাশতা সারেন। এরপর নভোচারীর পোশাক পরেন। সবার উদ্দেশে হাত নেড়ে ধীরে ধীরে রকেটের ভেতর প্রবেশ করেন। সকাল ৯টা ৩২ মিনিটে ৭৬ লাখ পাউন্ড জ্বালানি ভরা নাসার ‘স্যাটার্ন ৫’ রকেটের ইঞ্জিন প্রজ্বলিত হয়। উড়াল দেয় মহাকাশের দিকে। চাঁদের মাটিতে পৌঁছাতে তাদের সময় লেগেছিল চার দিন।

২০ জুলাই চাঁদের কক্ষপথে প্রদক্ষিণের পর এই উপগ্রহের মাটিতে প্রথম পা রাখেন মার্কিন মহাকাশচারী নীল আর্মস্ট্রং। তারপরে এডউইন অলড্রিন। পাইলট মাইকেল কলিন্স নভোযান নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। চরম সুযোগ পেয়েও তিনি অবতরণ করেননি। বরং অন্য দুইজনের অবতরণকে সফল ও সম্ভব করেছিলেন।

ফেরার সময় একটি ব্যাগে নমুনা হিসেবে সাড়ে ২১ কিলোগ্রাম চাঁদের মাটি এবং পাথর ভরে ফিরে এসেছিলেন তারা। পরে জানা গিয়েছিল, সেই ব্যাগটি হারিয়ে ফেলেছিল নাসা। তবে ২০১৩ সালে সেটির খোঁজ মেলে। যে রকেটে চেপে উড়েছিল অ্যাপোলো ১১, তার উচ্চতা ছিল ৩৬৪ ফুট। ওজন ছিল ২ লাখ ৩৯ হাজার ৭২৫ কিলোগ্রাম। আর অ্যাপোলো-১১-এর ওজন ছিল ৪৫ হাজার ৭০২ কিলোগ্রাম। পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণ এবং ফের পৃথিবীতে অবতরণ, এই মিশনটা সম্পন্ন হতে মোট সময় লেগেছিল ৮ দিন ৩ ঘণ্টা ১৮ মিনিট। আজ সারা বিশ্বই সফল ওই অভিযানের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করবে।

‘একজন মানুষের জন্য একটি ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু মানবতার জন্য এক বিশাল অগ্রযাত্রা।’ চাঁদে অবতরণের পর এই বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে নীল আর্মস্ট্রং বোঝাতে চেয়েছিলেন, ৫০ বছর আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কী অসামান্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল। সফল চন্দ্রাভিযানের ওই ঘটনা তখন থেকে মানব সভ্যতাকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে। অ্যাপোলো কর্মসূচিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থ কোনোভাবেই অপচয় হয়নি। কারণ মানুষের জীবনে বিজ্ঞানের পথে নবযাত্রার শুরুটা এসেছিল ওই দিনটি থেকে। পাশাপাশি মহাকাশ জয়ের প্রথম সোপানটিও রচিত হয়েছিল সেই অভিযানটি থেকে।

সফল তিন অভিযাত্রীর মধ্যে মাইকেল কলিন্স ছিলেন অপেক্ষাকৃত অনালোচিত, বিস্মৃতপ্রায় একটি নাম। না সেদিন চাঁদের মাটিতে অবতরণ করেননি মাইকেল। বরং টানা ৮দিন ৪ ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন মুন-অরবাইটারে বসে। তিনি না থাকলে হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে যেত মানব সভ্যতার প্রথম বহির্বিশ্বজয়।

গত ২৮ এপ্রিল প্রয়াত হলেন কিংবদন্তি এই নভোচারী। বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছিলেন দুরারোগ্য ক্যানসারে। চন্দ্রজয় করলেও, মারণ রোগকে হারাতে পারেননি। হারিয়ে গেলেন ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায় হয়ে। তাঁর মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত করে তাঁর পরিবার। সহকর্মীর প্রতি টুইটারে শ্রদ্ধা জানান অলড্রিনও। জানা যায়, ফ্লোরিডাতে নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ‘লোনলিয়েস্ট ম্যান ইন হিস্ট্রি’ নামে খ্যাত মাইকেল কলিন্স। কারণ দুইজন চাঁদে অবতরণ প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন একাকী ও নিঃসঙ্গতম মানব।

মার্কিন নাগরিক হলেও কলিন্সের জন্ম ইতালির রোমে। বাবা ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ইতালিতে কর্মরত ছিলেন তিনি। সেই সূত্রেই কলিন্সের বড় হয়ে ওঠা ইতালিতে। জীবনের প্রথম ১৭ বছর তিনি কাটিয়েছেন ইতালির বিভিন্ন শহরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে ইতালি থেকে সেনা সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্রে। সেইসময়েই মার্কিন দেশে ফিরে আসেন কলিন্স।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রথম উড়ানের স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন তিনি। বাবার সহকর্মীদের থেকে আয়ত্ত করেছিলেন বিমানচালনা। ইতালি ছাড়ার আগে ডুয়েল ইঞ্জিন উভচর এয়ারক্র্যাফট ‘গ্রুম্যান উডগন’-এর পাইলটের আসনে বসেছেন বেশ কয়েকবার। ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি অ্যাকাডেমি থেকে ‘মিলিটারি সায়েন্স’-এ স্নাতকতা করেন কলিন্স। তারপরই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষেক হয় পাইলটের আসনে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় মার্কিন সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন তিনি।

ষাটের দশকের শুরুর দিকে মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করে নাসা। খোঁজ শুরু হয় উপযুক্ত নভোচারীদের। শেষ পর্যন্ত মার্কিন বিমানবাহিনীর দক্ষ ৩১ জন পাইলটকে বেছে নেয় নাসা। সেই তালিকাতেই ছিলেন কলিন্স। সাহস ও আগ্রহের মতো কমতি ছিল না তার উৎসাহে। ফলে নতুন করে শুরু করেন পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ। এবার তিনি শান দিলেন সনাতন বিজ্ঞানে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলল পদার্থবিদ্যা, জিওলজির পাঠক্রম। সেইসঙ্গে ট্রেনিংও। কঠিন থেকে কঠিনতর প্রতিটি পরীক্ষাই সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি তারপরই সুযোগ পান সেই ঐতিহাসিক চন্দ্র অভিযানে এবং অ্যাপোলো-১১ নভোযানে।

এই অভিযানের দৌলতেই তিনি পরিচিতি পান ‘ইতিহাসের নিঃসঙ্গতম মানুষ’ হিসাবে। চন্দ্রপৃষ্ঠে নীল এবং অলড্রিন অবতরণ করলেও, অরবাইটারে থেকে যান কলিন্স। সেখান থেকেই মডিউল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। তবে খুব সহজ ছিল না সেই কাজ। চাঁদের অন্ধকারে অংশে চলে যাওয়া মাত্রই পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন হয়ে যেত সম্পূর্ণভাবে। থাকত না নীল আর্মস্ট্রং কিংবা অলড্রিনের সঙ্গেও বেতারে যোগাযোগ করার সুযোগ। অন্ধকারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু প্রতীক্ষার মধ্যেই কাটিয়েছেন তিনি। সেই ঘটনাই এনে দেয় এমন পরিচিতি ও অভিধা।

অ্যাপোলো অভিযানের সময়, মহাশূন্য থেকে তোলা পৃথিবীর ছবিগুলির পিছনেও রয়েছেন তিনিই। অরবাইটার বসেই তিনি লেন্স-বদ্ধ করেছিলেন নীলগ্রহ এবং চন্দ্রপৃষ্ঠের কয়েক হাজার ছবি।

ঐতিহাসিক সেই চন্দ্র-অভিযানের পর পেরিয়ে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার চাঁদের মাটিতে মানুষ পা দিলেও, ১৯৭২ সালের পর অধরাই থেকে গেছে উপগ্রহ-জয়। আগামী ২০২৪ সালে আবার চাঁদের মাটি ছুঁতে চলেছে মানুষ। আরও এক ইতিহাস গড়তে চলেছে নাসা। কিন্তু তার আগেই বিদায় নিলেন চন্দ্রাভিযানের সফল ইতিহাস রচয়িতা কলিন্স।