করোনা মোকাবেলায় শেখ হাসিনা কেন অনন্য দৃষ্টান্ত?



ড. প্রণব কুমার পান্ডে
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

পৃথিবীর প্রায় সকল দেশ যখন করোনাভাইরাসের তাণ্ডব মোকাবেলার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে তখন কোভিড-১৯ মোকাবেলায় শেখ হাসিনার দূরদর্শি নেতৃত্বের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে আবিষ্কৃত হওয়া এই ভাইরাস গত একবছরের ওপর সময় ধরে বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব চালাচ্ছে। পৃথিবীর কোন কোন দেশ এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় ব্যস্ত থাকলেও অনেক দেশ ভাইরাসের তৃতীয় বা চতুর্থ ঢেউ মোকাবেলা করছে। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশসহ, আমেরিকা ও কানাডা করোনার তৃতীয় ধাপ মোকাবেলায় ব্যস্ত থাকলেও সাউথ এশিয়ার দেশগুলো মূলত বাংলাদেশ এবং ভারত করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই দুই দেশে করোনার যে তাণ্ডব চলছে সেটি অত্যন্ত ভয়াবহ। ভারতে গত কয়েকদিন যাবৎ তিন লাখের উপরে রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি। দিল্লি এবং মহারাষ্ট্র মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সেখানে একদিকে যেমন রয়েছে হাসপাতালে শয্যা সঙ্কট, অন্যদিকে রয়েছে অক্সিজেনের ঘাটতি। রোগীদের আত্মীয়-স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ ভারী হয়ে উঠছে। ফলে, অনেকেই প্রশ্ন করছেন যে এই অবস্থার জন্য দায়ী কে?

আমরা সবাই জানি করোনার প্রথম ঢেউ বাংলাদেশের মত ভারতকেও তেমন প্রভাবিত করতে পারেনি। অল্পসময়ের মধ্যে দিয়ে করোনা তাণ্ডব নিয়ন্ত্রণে এসেছিল সেখানেও। ফলে জনগণ স্বাভাবিক জীবন যাত্রা শুরু করে। কিন্তু গত কয়েক মাস যাবত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নামে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে আসলে কোভিড সুরক্ষা বিধি কোনোভাবেই মানা হয়নি। গত একমাসের উপর ধরে পশ্চিমবাংলায় নির্বাচনকেন্দ্রিক যে ডামাডোল চলছে সেটির যৌক্তিকতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। ফলে,ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন ভারতের নির্বাচন কমিশন।

এমনকি কলকাতা এবং মাদ্রাজ হাইকোর্ট ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের করোনাকালীন সময় নির্বাচন পরিচালনার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। আমরা এটাও লক্ষ্য করেছি ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পশ্চিম বাংলার ভোটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থানে বড় বড় জনসভা করেছেন যেখানে আসলে কোভিড প্রটোকল কোনভাবেই মেনে চলা সম্ভব হয় নি। এরইমধ্যে ভারতের ডাক্তারদের অ্যাসোসিয়েশনের তরফ থেকে এই কোভিড অবস্থা খারাপ হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করে বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। তারা বলার চেষ্টা করেছেন যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মতো একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির পক্ষে এই ধরনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত হয় নি।

এমনকি, আমরা এটাও দেখেছি যে যুক্তরাষ্ট্রে করোনার প্রথম ঢেউ এর সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে অপেশাদারিত্বের প্রমাণ রেখেছিলেন তার ফলে করোনার অবস্থা আরো বেশি খারাপ হয়েছিল। তাঁর এই অপেশাদার আচরণকে অনেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন সময় সমালোচনা করেছেন। ফলে যে প্রশ্নটি বার বার আলোচিত হয়ে আসছে সেটি হল করোনার মত মহামারি মোকাবেলায় একটি দেশের নেতৃত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এই অবস্থায় নেতৃত্ব যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এ বিষয়ে কারও কোন সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই। কারণ নেতৃত্বে দূরদর্শিতার উপরে নির্ভর করে একটি দেশ কিভাবে করোনার মত মহামারি মোকাবেলা করবে। আমরা যদি বাংলাদেশের দিকে তাকায় তাহলে দেখব বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত এক বছরের উপর সময় ধরে ঠাণ্ডা মাথায় দূরদর্শিতার সাথে যেভাবে দেশ পরিচালনা করছেন সে কারণেই হয়তো করোনার মত মহামারি বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ব্যাপক তাণ্ডব চালাতে সক্ষম হয়নি।

করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত নেয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি সিদ্ধান্ত সফল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আমরা যদি করোনা মহামারীর প্রথম ঢেউ এর কথা চিন্তা করি তাহলে দেখবো লকডাউন এর পরিবর্তে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সময় এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন। এমনকি লকডাউন বা সাধারণ ছুটি চলাকালীন সময়ে গার্মেন্টসহ কল-কারখানা খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত জন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। অনেকেই বলেছিলেন যে এই ধরনের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে কারণ এ সিদ্ধান্তের ফলে করোনা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কিন্তু কার্যত সেটি হয়নি বরং আমরা অল্প সময়ের মধ্যে সংক্রমণের হার যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম তেমনি অর্থনীতির চাকা সচল ছিল। এমনকি করোনার ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আয়োজনকে সংক্ষিপ্ত করেছিলেন।

করোনাকালীন সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির মোড়লরা যখন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ অন্য দেশের তুলনায় অনেক ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এমনকি করোনার এক বছর পরেও অর্থাৎ বর্তমান অর্থ বছরে এডিবির ভাষ্য মতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশের মতো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের ফলে করোনার সংক্রমণ যখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ঠিক সেই সময়ে সরকারের বারং বার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ পুনরায় স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে শুরু করে। করোনার প্রথম ঢেউ এ বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের চিন্তা ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারবে না।

ফলে, বেশির ভাগ জনগণ সুরক্ষা বিধি মানার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করা শুরু করে। এমনকি যারা এতদিন ঘরের মধ্যে অন্তরীণ ছিল তারা হাঁপিয়ে ওঠার ফলে বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর শুরু করেছিল। আমরা এমনও দেখেছি একদিনে কক্সবাজারে আড়াই লাখের উপরে মানুষ জড়ো হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে মানুষের উপচে পড়া ভিড় আমরা লক্ষ্য করেছি। ফলে, গত একমাস যাবত করোনা পরিস্থিতি আবারও ব্যাপক আকার ধারণ করে। তবে, মাননীয় প্রধান মন্ত্রী আবারও ধন্যবাদ পাবার যোগ্য কারণ খুব সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে লকডাউন বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিতীয় ঢেউ এ করোনা সংক্রমনের হার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবার কারণে।

সরকার যখন লকডাউন বাস্তবায়ন করে তখন প্রতিদিন পরীক্ষার তুলনায় রোগীর সংখ্যা ছিল ২২ থেকে ২৫ শতাংশ। কিন্তু তিন সপ্তাহ লকডাউন বাস্তবায়নের ফলে সেই হার ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি শুধুমাত্র সম্ভব হয়েছে নেতৃত্বের বিচক্ষণতার কারণে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে সংক্রমনের হার ৯ শতাংশে নেমে আসলেও আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন হবে না। এই হারকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে হবে এবং সেখানেই ধরে রাখতে হবে। আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছি সরকার ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকার কথা চিন্তা করে দোকানপাট ও শপিং মল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছ। ঈদকে সামনে রেখে মানুষের বাজার করার এক ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যেটি অস্বাভাবিক নয়। আবার অনেকের মধ্যে ঈদ উদযাপনের জন্য শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার একটি প্রবণতা আছে। কিন্তু এই সময় আমরা যদি স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি না মানতে পারি তাহলে পরিস্থিতি পুনরায় খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গত এক বছরের উপরে চলমান এই করোনাভাইরাস এর এইসময় আমরা লক্ষ্য করেছি যে সরকার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিতে। অর্থনীতির গতি ধরে রাখার জন্য বড় প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করেছে সরকার। এমনকি যতদূর সম্ভব বিনা খরচে করোনা আক্রান্ত মানুষদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে। এটাও মনে রাখতে হবে যে এই মরণঘাতী সংক্রামক ভাইরাসের কবল থেকে আমরা কবে মুক্তি পাব সেই সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো রুপরেখা এখন পর্যন্ত কেউ দিতে পারে নি। সরকার ইতিমধ্যেই অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে প্রায় ১ কোটি মানুষকে টিকা প্রদান করেছে যেখানে পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ তাদের জনগণের টিকা জোগাড় করতে সক্ষম হয়নি। আরো দুই কোটি ভ্যাকসিন কেনা আছে যা ভারত থেকে এখন আসে নি ভারতে করোনা পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করার জন্য। এরই মধ্যে ভ্যাকসিন জটিলতার কারণে সরকার রাশিয়া এবং চীনের সাথে চুক্তি করেছে ভ্যাকসিন আমদানির জন্য। কিন্তু ভ্যাকসিন প্রদান করা হলেই একজন মানুষ পুরোপুরি সুরক্ষিত হবেন সে বিষয়টি কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাছাড়া, মাননীয় প্রধান মন্ত্রী ইতিমধ্যেই ভ্যাকসিনকে "গ্লোবাল পাবলিক গুড" হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি জানিয়েছেন যা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরামে এ জাতীয় দাবি উত্থাপনের মাধ্যমেই মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ পাওয়া যায়।

মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বার বার সুরক্ষা বিধি মেনে চলার জন্য জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছেন। সুরক্ষা বিধিগুলো আমরা যদি মেনে না চলি তাহলে পরিস্থিতি আবার যেকোনো সময় খারাপের দিকে যেতে পারে। আজ অবধি বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এটা খুব সুস্পষ্টভাবেই বলা যায় এই পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে নিয়েছিলেন। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বের কারণেই বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি।

তবে, দুর্যোগ চলাকালীন সময়ে সরকার জনগণের কাছে যে ধরনের সহায়তা প্রত্যাশা করে তা এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পর্যায় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কারণ জনগণের এই মুহূর্তে যেটি করা সব চেয়ে প্রয়োজন না হল বাড়িতে থাকা, প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে গেলে মাস্ক পরিধান করা, জন সমাগম এড়িয়ে চলা এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা। কিন্তু জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ এই বিষয়ে কোনো রকম মাথা না ঘামিয়ে পূর্বের মতোই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে। আমরা এখনোও যদি নিজেদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ না করি তাহলে কিন্তু যেকোনো সময় পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যোগ্য নেতৃত্ব একদিকে যেমন জনগণকে ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করছে, ঠিক তেমনিভাবেই অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। আর এই কারণেই কমনওয়েলথ যথার্থ ভাবে শেখ হাসিনাকে করোনা মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধে সফলভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পৃথিবীর তিনজন অনুপ্রেরণামূলক নেতার এক জন হিসেবে বেছে নিয়েছে।